সইন্ধ্যা কালে শরাফত সায়েবের বাড়িত গিয়া দেখি, ঘরদোয়ার অন্ধকার। ছেলেডার মা একলা বইয়া আছে। তারে কেউ গুলীর খবর কয় নাই। আমারে দেইক্যা কইল, ৪ হাছান, আমার ছেলেডা বাঁইচ্চা আছে? আল্লাহর দোহাই—হাছা কথা কইবা।’
আমি তাঁর পা ছুইয়া কইলাম, ‘আম্মাজি বাঁইচ্চা আছে, আপনে চাইরড়া দানাপানি খান। সেই রাইতেই গেলাম মসজিদে। পাক কোরআন হাতে লইয়া কিরা কাটলাম। এর শােধ তুলবাম। এর শােধ না তুললে আমার নাম হাছান আলি না। এর শােধ না তুললে আমি বাপের পুলা না। এর শােধ না তুললে আমি বেজন্মা কুত্তা।
রাত্তিরে ক্যাম্পে ফিরতেই হাবিলদার সাব কইলেন পুর্বের বাঙ্কারে একটা লাশ পইড়া আছে, আমি যেন নদীর মধ্যে ফ্যালাইয়া দিয়া আসি।
কী সর্বনাশের কথা! ইয়া মাবুদে এলাহি। গিয়া দেখি কবিরাজ চাচার ঘােট মাইয়াটা। ফুলের মতাে মাইয়া গো বারাে–তেরাে বছর বয়স, ইয়া মাবুদ ইয়া মাবুদ। কাপড় দিয়া শইলডা ঢাইকা কইলাম, ভইন, মাপ করিস। এইটা কি, চউক্ষে পানি আসে কেন? আরে পােড়া চট্টখ! এখন পানি ফালাইয়া কি লাভ? আগে তো দেখলি না। আগে তাে আন্ধা হইয়া রইলি।
সাথের পুলাপানডির বড়াে পরিশ্রম হইতাছে। আল্লাহ আল্লাহ্ কইরা যদি রামদিয়া ঘাটে পৌছাইতে পারি, তয় রক্ষা। ইয়া মাবুদ, এই পুলাপানভিরে বাঁচাইয়া রাইখাে গাে। গরম পীরের দরগাত সিন্নি মানলাম। আমি তিন কালের বুড়া। আমি মরলে কী?
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১২)
এক চেয়ারম্যান সাব ছাড়া কেউ এক ফোঁটা চউক্ষের পানি ফালাইত মরণের পরে হাসরের মাঠে যদি কবিরাজ চাচার মাইয়ার সাথে দেখা হয়, ভয় মাইমার হাত ধইরা কমু, ‘ভইন, শােধ তুলছি। এখন কও তুমি আমারে মাফ দিছ কি দেও নাই।’
আবদুল মজিদ এখন কাছে একটা।
আর এক ঘন্টার মধ্যে কি রামদিয়া পৌছান যাবে? আমার মনে হয় না। হাসান আলিকে জিজ্ঞেস করলাম, আর কত দূর হাসান আলি?
জানি জবাব দেবে না, তবু জিজ্ঞেস করেছি, কারণ এখান থেকে রামদিয়া কত পূর তা জানে শুধু হাসান আলি। ব্যাটা নবাবের নবাব, কথা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেবে না। দেব নাকি ব্রাইফেলের বাঁট দিয়ে একটা–?
খিদে যা পেয়েছে, বলবার নয়। মনে হচ্ছে এক গামলা ভাত খেয়ে ফেলতে পারি। সেবার তালুকদার সাহেবের বাসায় জবর খাইয়েছিল। হারামজাদা ভীতুর একশেষ। মুক্তিবাহিনী এসেছে শুনে ভয়ে পেচ্ছাব করে দেবার মতাে অবস্থা। আরে বাটা বলল, তুই কি দালাল নাকি রে? তুই ভয় পাস কী জন্যে? সারাক্ষণ হাত জোড় করে হে হে হে, কী বিশ্রী।
তবে যাই হােক, খাইয়েছিল জবর! একেবারে এক নম্বর খানা। পােলাওটোলাও বেঁধে এলাহি কারবার। জিতা রাহ ব্যাটা। কইমাছ ভাজার স্বাদ এখনাে মুখে লেগে রয়েছে। আমাদের খাওয়ার কি আর ঠিক–ঠিকানা আছে? এক বার দু’দিন শুকনাে রুটি খেয়ে থাকতে হল, সে রুটিও পয়সার মাল। আবু ভাই বলেছিলেন, খিদে পেলে শুধু খাওয়ার কথা মনে হয়। মহসিন হলে ফিস্ট হল এক বার। জনে জনে ফুল রােস্ট। সেই সঙ্গে কাবাব, রেজালা আর দৈ-মিষ্টি। খেয়ে কুল পাই না এমন অবস্থা। বাবুর্চি রাঁধত ফার্স্ট ক্লাস।”
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১২)
পায়ের কাটাটা জানান দিচ্ছে। ভাঙা শামুকের এমন ধার। প্রথমে ভাবলাম সাপে কামড়াল বুঝি। বর্ষা–বাদলা হচ্ছে সাপের সীজন। এ অঞ্চলে আবার শামুকভাঙা–কেউটের ছড়াছড়ি। ছােবল মেরেশামুক ভেঙে খায়। রাত–বিরাতে এ রকম একটা সাপের গায়ে পা দিতে পারলে মন্দ হয় না। বন্দুক নিয়ে তাহলে এ রকম আর ঘুরে বেড়াতে হয় না। নিরবচ্ছিন্ন শান্তি যাকে বলে।
আমার আর ভালাে লাগে না, সত্যি। কী হবে দু–একটা টুশ–টাশ করে?
Read More