পর্দার আড়াল থেকে সুশ্রী একটি মেয়ে উঁকি দিয়ে আমায় দেখে গেল। বেশ মেয়েটি। ইচ্ছে হচ্ছিল ডেকে কথা বলি। কিন্তু ইচ্ছাটা গিলে ফেলতে হল। এ বাড়িতে কিছু সময় থাকতে হবে আমাকে। এ সময় এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে এ বাড়ির লােকগান বিরক্ত হয়।
‘মালিকুম। ‘আলায়কুম সালাম।
‘আমি গনি মিয়ার চাচাত ভাই। উত্তরের বাড়িতে থাকি। মিয়া সাহেবের শরীশঙা এখন কেমুন?
‘ শে।’
শুধু গনি মিয়ার চাচাত ভাই-ই নয়, আরাে অনেকেই জড়ো হয়েছে। সম্ভবত আরাে শােকজন আসছে। আমার বিরক্ত লাগছে, আবার ভালােও লাগছে। বিরক্ত লাগছে কথা বলতে হচ্ছে বলে, ভালাে লাগছে লােকজনদের কৌতূহলী চোখ দেখে। তােমরা তাহলে শেষ পর্যন্ত কৌতূহলী হয়েছ? দেখতে এসেছ মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের? বেশ বেশ।
ইস, কী দিনই না গিয়েছে শুরুতে। গ্রামবাসী দল বেঁধে মুক্তিবাহিনী তাড়া করেছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে। অবশ্যি তাদেরই–বা দোষ দিই কী করে? মিলিটারি মেয়ে ওঁৎ পেতে। যেই শুনেছে অমুক গ্রামে মুক্তিবাহিনী ঘােরাফেরা করছে, হুকুম হল—‘দাও ঐ গ্রাম জ্বালিয়ে। যেই শুনেছে অমুক লােকের বাড়ি মুক্তিবাহিনী এক রাত্রি ছিল, অমনি হুকুম হল, ‘অমুক লােককে গুলী করে মার গ্রামের মধ্যিখানে, যাতে সবার শিক্ষা হয়। আহ্, শুরুতে বড়াে কষ্টের দিন গিয়েছে।
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৬)
কয়টা বাজে এখন? আমার কাছে ঘড়ি নেই। সময়টা জানা থাকলে হত। বুঝতে পারতাম কখন গুলীর আওয়াজ পাব। অবশ্যি প্রথম শুনব ব্রীজ উড়িয়ে দেবার বিকট আওয়াজ। ব্রীজটা ওড়াতে পারবে তাে ঠিকমতাে? শুনেছি রেঞ্জাররা পাহারা দেয় সারা রাত। খুব অস্থির লাগছে। ওদের সঙ্গে গেলেই হ’ত। না–হয় একটু দূরে বসে থাকতাম। রেসের ঘােড়ার মতাে হল দেখি। রেসের ঘােড়া বুড়াে হয়ে গেলে শুনেছি জং–উন্মাদ হয়ে যায়। ব্লেস শুরু হলে পাগলের মতাে পা নাচায়।
‘আপনার জ্ঞানাে দুধ আনব এক গ্লাস?
সেই সুশ্রী মেয়েটি ঘরের ভেতর ঢুকেছে দেখে অবাক লাগছে। গ্রামঘরের বাড়িতে এ–রকম তাে হয় না। বেশ কঠিন পর্দার ব্যাপার থাকে। আমার খানিকটা অস্বস্তি লাগছে। গনি মিয়ার ভাই, যিনি আমার বিছানার পাশে বসেছিলেন, তিনিও আমার অস্বস্তি লক্ষ করলেন।
মেয়েটি আবার বলল, ‘আনব আপনার জন্যে এক গ্লাস দুধ? ‘না–না, দুধ লাগবে না।
খান, ভালাে লাগবে। আনি? ‘আন।’ গনি মিয়ার চাচাত ভাই বললেন, ‘বড়াে ভালাে মেয়ে। শহরে পড়ে।
কী পড়ে? ‘বি. এ. পড়ে। হােস্টেলে থাকে।
শুনে আমি অপ্রস্তুত। তুমি তুমি করে বলছি, কী কাণ্ড! কামিজ পরে আছে বলেই বােধহয় এত বাচ্চা দেখা যায়। তাছাড়া তার হাবভাবও ছেলেমানুষী। মেয়েটি মােক্তার সাহেবের বড়াে ভাইয়ের মেয়ে। বড়াে ভাই ও ভাবী দু জনেই মেয়েটিকে ছােট রেখে মারা গেছেন।
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৬)
মেয়েটি মােক্তার সাহেবের কাছেই বড়াে হয়েছে। পড়াশােনার খুব ঝোঁক, ঢাকায় হােস্টেলে থেকে পড়ে। গণ্ডগােলের আভাস পেয়ে আগেভাগেই চলে এসেছিল। মেয়েটি দুধের গ্লাস আমার সামনের টেবিলে নামিয়ে রাখল না, হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আমি বললাম, তােমার নাম?
‘হামিদা। হামিদা বানু।
আমি চুপ করে রইলাম। কী বলব ভেবে পেলাম না। অথচ মেয়েটি দাঁড়িয়েই আছে। হয়তাে কিছু কথা শুনতে চায়। যুদ্ধের গল্প শুনতে মেয়েদের খুব আগ্রহ। হামিদা একসময় বলল, আমার নামটা খুব বাজে! একেবারে চাষাচাষা নাম।
আমি বললাম, নাম দিয়ে কী হয়? | ‘হয় না আবার, আমার বন্ধুদের কী সুন্দর সুন্দর নাম! এক জনের নাম কিন্নরী, এক জনের নাম স্বাতী।
মােক্তার সাহেব বললেন, ‘আপনার জন্যে ডাক্তার আনতে লােক গেছে।
ভালো ডাক্তার—এল. এম. এফ.। হামিদা আম্মাজি, ভেতরে যান।
বাহ্। কী সুন্দর আম্মাজি ডাকছে। মেয়েটি বােধহয় সবার খুব আদরের। মােক্তার সাহেবের কথায় সে ঘাড় ঘুরিয়ে হাসল। আমাকে দেখতে–আসা লােকগুলি। চলে যাচ্ছে একে একে। এত তাড়াতাড়ি কৌতূহল মিটে গেল? মােক্তার সাহেব অবশ্যি লােকজনদের ঝামেলা না করবার জন্যে বলছেন। তবুও তাদের আগ্রহ এত কম হবে কেন?
অন্দরমহলের ফিসফিসানি শােনা যাচ্ছে। পর্দার ওপাশে জটলা–পাকান মেয়েদের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। হামিদা বলল, ‘ওরা আপনাকে দেখতে চায়। মুক্তিবাহিনী কোনাে দিন তাে দেখে নাই।
‘তুমি দেখেছ নাকি? *এই তো আপনাকে দেখলাম।
Read More