হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া শেষ পর্ব

নৌকার অনেকেই এই কথায় হেসে উঠল। মজিদ রেগে গিয়ে বলল, ‘হাস কেন? ও মিয়ারা, হাস কেন? মজিদ রেগে যাওয়াতেই হাসিটা হঠাৎ করেই থেমে গেল। নৌকা নীরব হল মুহূর্তেই। তখনি শােনা গেল, বাইরে ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝি দু জন ভিজে চুপসে গেছে। জাফর বলল, ‘মাঝিরা তাে দেখি গােসল সেরে ফেলেছে

শ্যামল ছায়া

‘ই গাে ভাই, তিন দফা গােসল হইল। জাফর সুর করে বলল, বাইচ বাইতে মর্দ লােকের কাম।’ 

মজিদ ক্রমাগতই বিরক্ত হচ্ছিল। ভয় করছিল তার। ভয় কাটানর জন্যেই জিজ্ঞেস করল, ‘মর্টার কোথায় ফিট করেছ তােমরা? থানা কত দূর? 

গোঁসাই পাড়ায়। বেশি দূর না। পরথমে সেইখানে যাইবেন? ‘না-না, যাওয়ার দরকার কী? তাদের কাজ তারা করবে। হুমায়ূন ভাই কী বলেন?* 

হুমায়ুন কিছু বলল না, চুপ করে রইল। তার মচকেযাওয়া পা ব্যথা করছিল। সে মুখ কুঁচকে বসে রইল। তীর থেকে কে এক জন চেচিয়ে ডাকল, ‘কার নাও? কার নাও?’ 

নৌকার মাঝি রসিকতা করল, হেঁড়ে গলায় বলল, তােমার নাও। ‘নাও ভিড়াও মাঝি, খবর আছে, নাও ভিড়াও | 

নৌকা ভিড়ল না, চলতেই থাকল এবং কিছুক্ষণ পরেই তীব্র টর্চের আলাে এসে পড়ল নৌকায়। 

‘নৌকা ভিড়াও মাঝি, সামনে রাজাকার আছে। 

শ্যামল ছায়া শেষ পর্ব

কোনখানে? শেখজানির খালের পারে বইসা আছে। থাকুক বই, তুমি কেড়া গাে? 

‘আমি শেখজানি হাইস্কুলের হেডমাষ্টার আজিজুদ্দিন। মুক্তিবাহিনীর নাও নাকি? 

‘মনে য় হেই রকমই।’ 

নৌকা ভিড়ল না, কারণ নৌকা শেখজানির খালে যাচ্ছে না। আজিজুদ্দিন মাষ্টার হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই মারাত্রে সে ছয় ব্যাটারির টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কেন কে জানে? 

এখান থেকেই গ্রামের চেহারাটা বদলাতে শুরু করেছে। পুটি অ বাঙি, তার পরপরই চারটি পুড়ে যাওয়া বাড়ি। আবার একটা গােটা বাড়ি নগরে অাসছে আবার ধ্বংসস্তুপ। মিলিটারিরা প্রায় নিয়মিত আসছে এদিকে। লােকগুণ পালিয়ে গেছে। ফসল বােনা হয় নি। চারিদিক মুনশুন্য।

নৌকা যতই এগিয়ে যায় ধ্বংসলীলার ভয়াবহতা ততই বেড়ে ওঠে। আর এগােন ঠিক নয়। রাজাকারদের ছােটখাট দল প্রায়ই নদীর তীর ঘেঁষে ঘুরে বেড়ায়। নজর রাখে রাতদুপুরে কোনাে রহস্যজনক নৌকা চলাচল করছে কিনা। তাদের মুখােমুখি পড়ে গেলে তেমন ভয়ের কিছু নেই। তবে আগেভাগেই গােলাগুলীর শব্দে চারিদিক সচকিত করে লাভ কী? 

‘রুস্তম ভাই, এই রুস্তুম ভাই। 

কে গাে? ‘আমি চান্দু, পাঞ্জাবী মিলিটারি, হি হি হি। নৌকা থামান।

নৌকার গতি থেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে। একটি ছােটখাট রােগা মানুষ লাফিয়ে উঠল নৌকায়। জাফর বলল, কী ব্যাপার, কী চাও তুমি? কে তুমি? 

‘আমি কেউ না, চান্দু। ‘কী কর তুমি? ‘আমি খবরদারী করি। আপনেরার সাথে যামু। যা করবার কল করুম। 

রুস্তম বলল, চান্দুরে লন সাথে, খুব কামের ছেলে। গ্রেনেড নিয়া একেবারে থানার ভিতরে ফালাইব দেখবেন। 

শ্যামল ছায়া শেষ পর্ব

 চান্দু গম্ভীর হয়ে বলল, ‘নামেন গো ভালােমানুষের পুলারা। জিনিসপত্র যা আছে, আমার মাথায় দেন। পিনপিনে বৃষ্টি মাথায় করে দলটি নেমে পড়ল। সবে মাটিতে পা দিয়েছে, অমনি দূরাগত বিকট আওয়াজ কানে এল। কী হল, কী হল। দল দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ। মজিদ উৎকণ্ঠিত স্বর বের করল, ‘হুমায়ুন ভাই, কী ব্যাপার?’ উত্তর দিল চান্দু, কিছু না। পুল ফাটাইয়া দিছে। সাবাস, ব্যাটা বাপের পুত! 

তা হলে ব্রীজ উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আহ কি আনন্দ। ভয় কমে যাচ্ছে সবার। সবাই দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। বিকট শব্দটা হুম হুম করে প্রতিধ্বনি তুলল। থানার হলুদ রঙের দালানটি দেখা যাচ্ছে। রঙ দেখা যাচ্ছে না। কাঠামােটা স্পষ্ট নজরে আসছে। থানার আশেপাশে দু’ শ’ গজের মতাে জায়গা পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। ঘরবাড়ি নেই, গাছপালা নেইখাখী করছে। অনেক দূর থেকে যাতে শত্রুর আগমন টের পাওয়া যায়, সেই জন্যেই এই ব্যবস্থা। 

তিনটি দলে ভাগ হয়ে অপেক্ষা করছে ছেলেরা। এদেরও অনেক পেছনে আধইঞ্চি মটার নিয়ে অপেক্ষা করছে একটি ছােট্ট দল, যেদলে পেনসনভােগী এক জন বদ্ধ সদার আছেন। পরনাে ােক। তার উপর বিশ্বাস করা চলে। উত্তর দিকের ঢালু অলটায় রুস্তম একাই আট হয়ে বসেছে। মাটি হয়েছে পিছল। এল, এম. জি. 

শ্যামল ছায়া শেষ পর্ব

র পা পিছলে আসে। কিন্তু সে সব এখন না ভাবলেও চলে। | চান্দ বসে আছে জাফরের পাশে। তার ইচ্ছে—-বুকে হেঁটে থানার সামনে যে 

দু’টি বাঙ্কার, সেখানে গ্রেনেড ছুড়ে আসে। এ কাজ নাকি সে আগেও করেছে। জাফর কান দিচ্ছে না তার কথায়। 

বৃষ্টি থেমে গিয়ে আকাশ আবার পরিষ্কার হয়েছে। তারা দেখা যাচ্ছে। ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে হুহু করে। ঘন্টা দুয়েকের ভেতর অন্ধকার কেটে গিয়ে আকাশ ফর্সা হবে। শুরু হবে আরেকটি সূর্যের দিন।কর্দমাক্ত ভেজা জমি। চারপাশের গাঢ় অন্ধকার, ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটাএর মধ্যেই নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে সবাই।

কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। রুস্তম ফিসফিস করে বলে, পায়ের উপর দিয়ে কী গেল, সাপ নাকি? ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগল। তার কণ্ঠস্বর অন্য রকম শােনায়। কেউ কোনাে জবাব দেয় না। সবাই অপেক্ষা করে সেই মুহূর্তটির জন্যে, যখন মনে হবে পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। রাইফেলের উপর ঝুঁকে থাকা একেকটি শরীর আবেগে ও উত্তেজনায় কাঁপতে থাকবে থরথর করে।

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *