মজিদ দোকান খুলে একা একা চুপচাপ বসে থাকে। কাঁচের বৈয়ম ভরতি তালমিছরি। মাঝে মাঝে তালমিছরির টুকর। মুখে ফেলে দেয়।মতি মজিদের দোকানের একপাশে শুয়ে থাকবে সাব্যস্ত করল। পথে কুসুমের বাড়িতে থামবে–পানি খেয়ে যাবে। কুসুমের বাবা অনেকদিন বাইরে, উনার কোন খোঁজ খবর আছে কিনা তাও জানা দরকার।কুসুমের বয়স কুড়ি হয়েছে। এই বয়সে গ্রামের মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়–কুসুমের হচ্ছে না। সম্বন্ধই আসছে না কেন আসে না সেও এক রহস্য।
তার গায়ের রঙ শ্যামলা–গরীব ঘরের বিয়েতে মেয়ের গায়ের রঙ তেমন প্রাধান্য পায় না। কুসুম দেখতে সুন্দর। চেহারার অতি কোমল ভাব অবশ্যি তার স্বভাবে নেই। তার জন্য কোন মেয়ের বিয়ে আটকে থাকে না। কুসুমের আটকে আছে। মনগড়ের পীর সাহেবের হলুদ সুতা গলায় বাঁধার পরও সম্বন্ধ আসছে না। মনগড়ের পীর সাহেবের সুতা গলায় দেয়ার এক মাসের ভেতর সম্বন্ধ আসার কথা। সব সময় আসে।
মতিকে দেখে কুসুম চোখ কপালে তুলে বলল, আফনের হইছে কি? মতি উদাস গলায় বলল, কিছু হয় নাই। পানি খাব।চউক করমচার মত লাল–হইছে কি? জ্বর? না। পানি দেও দেখি।পানি দিমু ক্যামনে? হাত বন্ধ দেহেন না? কুসুমের হাত ঠিকই বন্ধ। মাটিগোবর মিশিয়ে মশলা বানাচ্ছে। ঘর লেপা হবে। কুসুমের পরনে সবুজ রঙের শাড়ি। মাথায় লম্বা চুল গাইনবেটিদের মত চুড়ো খোপা করা। সকালের রোদ পড়েছে তার চোখে-মুখে। কি সুন্দর তাকে লাগছে! মতি বলল, পানির পিয়াস লাগছিল। ঘরে আর কেউ নাই? না?
আইচ্ছা তাহলে যাই।বসেন। হাতের কাম শেষ করি–তারপর পানি দেই… থাউক দরকার নাই।গোস্বা হইলেন?না–গোস্বা হব কেন? গোস্বা হওয়ার মত তো কিছু বল নাই।ভাব দেইখ্যা মনে হয় গোস্বা হইছেন।ভাব দেইখ্যা কিছু বোঝা যায় না কুসুম। মানুষের অন্তরের ভাব বড়ই জটিল। সে নিজেই জানে না, অন্যে কি জানব।কুসুম মুখ টিপে হাসছে। মতি দুঃখিত গলায় বলল, হাস কেন?
বড় বড় জ্ঞানের কথা শুইন্যা হাসি। ছাগল ব্যা কইরা ডাক দিলে ভাল লাগে, আদর করতে মন চায়। ছাগল যখন হালুম ডাক দেয় তখন ভয় লাগে না–হাসি লাগে।খুবই অপমানসূচক কথা। মতি অণমান গায়ে মাখল না–প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্য বলল, মোবারক চাচার খবর কিছু পাইছ?
না।চিডিপত্র? উঁহু। বল কি! চিন্তার বিষয় হইল। যাই কুসুম, পরে খোঁজ নিব।মতি চলে যাচ্ছে। কেমন টলতে টলতে যাচ্ছে। কুসুমের খুব মায়া লাগছে। হাত বন্ধ থাকার জন্য সে যে পানি দিচ্ছিল না–তা না। কুসুম এই কথাটা বলেছিল যাতে মতি কিছুক্ষণ বসে। পানি এনে দিলে তো পানি খেয়ে চলেই যাবে।
মেয়ে হয়ে জন্মানোর অনেক যন্ত্রণার একটা হল–মনের কথা বলা যায় না। মনের কথা বলার নিয়ম থাকলে অনেক আগেই কোন এক চান্নিপসর রাতে কুসুম উপস্থিত হত মতির বাড়িতে। মতি অবাক হয়ে দরজা খুললে হাসিমুখে বলত, তারপর অধিকারী সাব, আফনের সংবাদ কি? মতি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকত–কুসুম বলত, কি সুন্দর চান্নিপসর দেখছেন? মতি আমতা আমতা করে বলত–তুমি অত রাইতে, বিষয় কি?
কুসুম বলত, আফনের ঐ গানটা শুননের খুব ইচ্ছা হইল–চইলা আসলাম।
কোন গান?
কুসুম তখন গুন গুন করে গাইত—
তুই যদি আমার হইতি
আমি হইতাম তোর।
কোলেতে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর…
মতি অবাক হয়ে বলত–তোমার গলা তো বড় সৌন্দর্য কুসুম।হ্যাঁ, কুসুমের গলা অনেক সৌন্দর্য। মতি সেটা জানে না। মেয়েছেলে হয়ে তো সে গানে টান দিতে পারে না। মেয়েছেলে গানে টান দিলে সাথে সাথে জ্বীনের আছর হয়। সংসারে অমঙ্গল হয়। পুরুষছেলে গানে টান দিলেই সংসার টিকে না–এই যে মতি ভাল ছিল, সুখে ছিল, যেই গানের টান দিল ওমি সব গেল। ঘর নাই, বাড়ি নাই, সংসার নাই।
কুসুমের প্রায়ই ইচ্ছা করে, যদি শুধু সে আর মতি মিলে একটা গানের দল দিত! আর কেউ না, শুধু তারা দুজন।কুসুমের মা মনোয়ারা ঘরের ভেতর থেকে ঝাঝালো গলায় ডাকলেন, কুসুম, ও কুসুম। কুসুম বিরক্ত মুখে উঠে গেল।মনোয়ারা তিক্ত গলায় বললেন–ছেলেটা পানি চাইছে, তুই যে দিলি না! দেখ না হাত বন্ধ। পানি কি দিয়া দিমু? পাও দিয়া?
এটা কেমন কথা! পানি চাইছে–হাত ধুইয়া পানি দিবি। পানি চাইছে পানি পাইল না–এইটা কেমন কথা… সংসারে তুই অলক্ষণ ডাইক্যা আনতেছস।আনতেছি ভাল করতেছি? পুষ্প কই? পুষ্প! পুষ্প কই আমি কি জানি। পুষ্প তো ছাগল না যে দেইখ্যা রাখব।তোর কথাবার্তা এই রকম ক্যান?
আমি যেমন মানুষ–তেমন কথাবার্তা। সামনে থাইক্যা যা কুসুম। যা কইলাম। তোরে দেখলে শইল জ্বলে।কুসুম বাড়ির পেছনের ডোবায় হাত ধুয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এসে রান্নাঘরে ঢুকল। মনোয়ারা পেছনে পেছনে ঢুকলেন। কুসুম তেলের শিশি হাতে নিচ্ছে।যাস কই? তেল আনতে যাই।তোর বাপ না তোরে ঘরের বাইর হইতে নিষেধ করছে! ঘোমটা দিয়া যামু, ঘোমটা দিয়া আসমু।
তেল ছাড়া রান্ধা হইব না।না হইলে না হইব। খবর্দার, তুই ঘরের বাইর হবি না।কুসুম কিছু বলল না। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল সে যাবেই। মনোয়ারার ইচ্ছা করছে চুলের মুঠি ধরে মেয়েকে আছড়ে উঠানে ফেলে দিতে। সাহস হচ্ছে না। ভয়ংকর জেদী মেয়ে, কি করে বসবে কে জানে! তোর যে বিয়া হয় না–চালচলনের জন্যে হয় না। সম্বন্ধ আফনাআফনি আসে না–খোঁজখবর নিয়া আসে। তোর খোঁজখবর যা পায়…
কুসুম মার কথা শেষ করতে দিল না। তার আগেই বের হয়ে পড়ল। মজিদের দোকানে তেল আনতে যাচ্ছে। হাতের কাছে দোকান। আগেও অনেকবার গিয়েছে। মজিদ সম্পর্কে চাচাতো ভাই হয়–এমন কিছু ভয়ংকর অপরাধ কুসুম করছে না। তারপরেও মনোয়ারার গা জ্বলে যাচ্ছে। মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না এটা তার কাছে সৌভাগ্যের মত মনে হচ্ছে। যে বিশ্রি স্বভাব কুসুমের হয়েছে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন কিছুদিনের মধ্যেই শাড়িতে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মেরে ফেলবে।
কুসুম মজিদের দোকানে তেল আনতে যায়নি। সে মোটামুটি নিশ্চিত মতিকে দোকানেই পাবে। জ্বর যা এসেছে তাতে দোকানের একপাশে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকার কথা। পানি খেয়েছে কি-না কে জানে। জ্বরে পিয়াসের পানি না পেলে শরীর চড়ে যায়।মতি দোকানে ছিল না। মজিদ একা তালমিছরি মুখে দিয়ে বিরস মুখে বসে আছে। কুসুমকে তার বেশ পছন্দ। বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে না, কারণ গরীব ঘরের মেয়ে, একে বিয়ে করলে কিছুই পাওয়া যাবে না।
সৌন্দর্য দিয়ে কি হয়–দু-তিনটা ছেলেপুলে হলেই সৌন্দর্য শেষ। সময়ের সঙ্গে সব নষ্ট হয়, শুধু টাকাপয়সা নষ্ট হয় না। টাকাপয়সা বাড়ে। তেলের শিশি এগিয়ে দিতে দিতে কুসুম বলল, মতি ভাইরে দেখছেন? মজিদ সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, তেল কতখানি দিমু? তিন আঙ্গল।আঙ্গুলের হিসাব আমার দোকানে নাই। হয় এক ছটাক নাও, নয় এর কমে আধা ছটাক।তিন আঙ্গুলে যতদূর হয় দেন–মতি ভাইরে দেহেন নাই?
দেখছি, পানি খাইতে আইছিল। আমি পানির মটকি নিয়া দোকানে বসছি? তেল দিলাম এক ছটাক। নগদ পয়সায় খরিদ করণ লাগব। টেকা আনছ? কুসুম নিঃশব্দে শাড়ির আঁচল থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে দিল। কুসুমের মন খুবই খারাপ হয়েছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি দোকানের সামনে থেকে চলে যেতে পারে ততই মঙ্গল।মতি ভাই গেছে কোনদিকে জানেন?
না। দোকান লইয়া কুল পাই না–কে কোনদিকে গেছে অত খোঁজ ক্যামনে রাখব?আফনের দোকানে তো মাছিও বসে না, অত বড় গলার কথা বেহুদা কন ক্যান?ঝাঁঝালো ধরনের কথা বলায় কুসুমের লাভ হয়েছে–ভেজা চোখ শুকিয়ে আসছে।মজিদ বলল, তালমিছরি খাইবা? মাগনা দিলে খামু। দেন।মজিদ এক টুকরা তালমিছরি দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মনটা খারাপ করল। অকারণে মিছরি খরচ হয়ে গেল। কোন দরকার ছিল না।
মতি ভাইয়ের একটা খোঁজ নিতে পারলে ভাল লাগত। কিভাবে খোঁজ পাওয়া যায়? পুষ্প সকাল থেকেই নেই–সে থাকলে তাকে পাঠানো যেত। এইসব কাজে পুষ্প খুব সেয়ানা…।কুসুম ক্লান্ত পায়ে ফিরছে। মজিদের সঙ্গে ঝাঁঝালো ধরনের কথা বলেও বিশেষ লাভ হয়নি। কুসুমের চোখ আবার ভিজে আসছে। যা করতে চায় না সব সময় সে সেই কাজটাই কেন করে?
সবসময় সে ঠিক করে রাখে পরেরবার মতি ভাইয়ের সঙ্গে যখন দেখা হবে তখন খুব ভাল ব্যবহার করবে। এত ভাল যে মতি ভাইকে চিন্তায় পড়ে যেতে হয়। কখনো তা করা হয় না। সে সম্পূর্ণ উল্টোটা করে। কেন সে এরকম হল? কেন? পানি চেয়েছিল, দিয়ে দিলেই হত। পানির গ্লাস হাতে দিয়ে সে তো বলতে পারত–জ্বর নিয়া কই যাইবেন বইস্যা যান। তাদের বাংলোঘর বলে কিছু নেই–বাংলোঘর থাকলে সেখানে কি করে দিতে পারত। অসুস্থ মানুষ শুয়ে থাকত বিছানায়।
বাবা, তুমি আমার সালাম নিও। দাদাজান আমাকে দিয়ে জোর করে চিঠি লেখাচ্ছেন। তোমার কাছে নাকি ঐ চিঠি হাতে হাতে পৌঁছানো হবে।আমরা সুখানপুকুর ঠিকমত পোঁছেছি। পথে কোন অসুবিধা হয়নি। শুধু ঠাকরোকোনা স্টেশনে পায়ে গোবর লেগে গিয়েছিল। তার কি যে কড়া গন্ধ! এখনও যাচ্ছে না। আমি এ বাড়ির বুয়াকে গরম পানি করতে বলেছি। গরম পানিতে আজ সারাদিন পা ড়িবিয়ে রাখব।
এদিকে আমাদের খুব একটা খারাপ খবর আছে। ভয়ংকর খারাপ। দাদাজান বলছেন দশদিন থাকতে হবে। দশদিনের আগে তিনি আমাদের ছাড়বেন না। আপা হাল ছেড়ে দিয়েছে, আমি এখনও হাল ছাড়িনি। আমি খুব চেষ্টা করছি দাদাজানকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে দুই-তিন দিন থেকে চলে আসতে। দাদাজান হয়ত বুঝতে চাইবেন না। কিছু কিছু মানুষ আছে–অন্যের সুবিধা-অসুবিধা বুঝতে পারে না।
তবে জায়গাটা খুব সুন্দর। অবশ্য দশদিন ধরে দেখার মত সুন্দর না।যদি দশদিন থাকতে হয় তাহলে আমি খুব বিপদে পড়ব। কারণ আমি মাত্র দুদিন পড়ার জন্য গল্পের বই নিয়ে এসেছি।বাবা শোন, তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। আমার যে বন্ধু আছে–মনীষা–তাকে টেলিফোন করে হ্যাপি বার্থডে দিতে হবে। তার জন্মদিন ১৭ তারিখ। তার টেলিফোন নাম্বার ৮১ ৩২ ১১।
চিঠি লেখার কাগজ শেষ হয়ে গেছে–চিঠি এখানেই শেষ করলাম। এবার তাহলে ৬০ + ২০
ইতি
নীতু
পুনশ্চ : বাবা, তোমার বাবাকে আমার মোটামুটি পছন্দ হয়েছে। খুব বেশি পছন্দ হয়নি।
নীতু এক গামলা গরম পানিতে তার পা ডুবিয়ে রেখেছে। গোবরের গন্ধ দূর করার একটা চেষ্টা। তার হাতে গল্পের বই। সে খুব ধীরে ধীরে পড়ছে। তাড়াতাড়ি পড়লেই বই শেষ হয়ে যাবে। মস্তবড় ভুল হয়েছে–অনেকগুলি বই নিয়ে আসা উচিত ছিল।
শাহানা বোনের কাণ্ড দেখল। তাকে মনে মনে স্বীকার করতেই হল নীতু খুব গোছানো মেয়ে। এর মধ্যেই গরম পানি গামলা সব জোগাড়যন্ত্র করে ফেলেছে। বেশ শান্ত শান্ত ভঙ্গি করে গল্পের বই নিয়ে বসেছে। যেন সে এ বাড়ির একজন কর্ত্রী। শাহানা বলল, ঘুরতে যাবি না-কি রে?
নীতু নাসূচক মাথা নাড়ল। বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরাল না। শাহানা বলল, চল হেঁটে আসি–তুই তোর পায়ে আরও খানিকটা গোবর মাখার সুযোগ পেয়ে যাবি। স্টেশনের গোবরের মত বাসি গোবর না, টাটকা গোবর। এর মজাই অন্য রকম।আপা, বিরক্ত করবে না। প্লীজ।
গ্রাম দেখে আসি চল্।গ্রাম আমার দেখতে ভাল লাগে না। গ্রামের গল্প বই-এ পড়তে ভাল লাগে, দেখতে ভাল লাগে না।বেশিক্ষণ পা পানিতে ড়িবিয়ে রাখবি না। সমস্যা হবে।কি সমস্যা হবে? মাছের মত তোর পায়ে আঁশ বেরিয়ে যেতে পারে। শেষে দেখা যাবে মৎস্যকন্যা হয়ে গেছিস।তুমি সব সময় ঠাট্টা কর আপা। মাঝে মাঝে ঠাট্টা ভাল লাগে না… তুই যাবি না তাহলে? না।
শাহানা একাই বের হল। কেউ তাকে লক্ষ্য করল না।শাহানার সবচে বড় ভয় ছিল কাদার ভয়। দেখা গেল ভয় অমূলক। কাদা তেমন নেই। হাঁটার জন্যে কাদাবিহীন শুকনো জায়গা যথেষ্ট আছে। সাবধানে হাঁটলেই হয়। অস্বস্তির ব্যাপার একটাই–মাঝে মাঝে শাড়ি খানিকটা টেনে তুলতে হচ্ছে।হাঁটতে শাহানার অসম্ভব ভাল লাগছে–ছায়াঢাকা পথ কথাটা বই-টইয়ে পাওয়া যায়–এই প্রথম সে ছায়াঢাকা পথ দেখলকড় বড় ছাতিম গাছ সারা পথ জুড়ে এমনভাবে ছড়ানো যেন মাথার উপুর ছাতা ধরার জন্যেই এরা আছে।
পথের একদিকে বেতবন। শাহানা চিনতে পারল বেত ফল দেখে থোকায় থোকায় ফলে আছে। কিছু বেতফল কি সে ছিঁড়ে নিয়ে নেবে? নীতু দেখলে মজা পেত।পথে হাঁটতে হাঁটতে গ্রাম সম্পর্কে শাহানার ধারণা কিছু কিছু পাল্টাচ্ছে। যেমন ঘুঘুপাখির ডাক। শাহানার ধারণা ছিল, ঘুঘুপাখি শুধু ভরদুপুরেই ডাকে।
এখন দেখা যাচ্ছে তা না, এরা সারাক্ষণ ডাকে। পাখিরা মোটেই শান্ত এবং চুপচাপ ধরনের না–এরা বেশ ঝগড়াটে এবং সারাক্ষণ কিচির-মিচির করতে ভালবাসে।শাহানা লক্ষ্য করল, বিভিন্ন বাড়ি থেকে মেয়েরা উঁকি-ঝুঁকি মেরে তাকে দেখছে। সে কোন পুরুষমানুষ না, মেয়েরা তাকে এমন আড়াল থেকে দেখছে কেন কে জানে। শাহানা তাকালেই এরা আবার দ্রুত সরে যাচ্ছে। পুরুষমানুষ তেমন চোখে পড়ছে না। সবাই বোধহয় কাজে চলে গেছে।
শ্রাবণ মাসে হাওড় অঞ্চলের পুরুষদের তেমন কাজ থাকার কথা না–এরা গেছে কোথায়? ছোট ছোট ছেলেমেয়ে প্রচুর চোখে পড়ছে। এরা কেমন ভয়ে ভয়ে শাহানাকে দেখছে। তাকে এরা ভয় পাচ্ছে। কেন? একটা ঐ দশ বছরের মেয়ে ভয় জয় করে শাহানার পেছনে পেছনে আসতে শুরু করেছিল। পেছন থেকে তার মা তাকে ডেকে থামিয়ে দিল।পথটা এখন তিন ভাগে ভাগ হয়েছে। শাহানা দাঁড়িয়ে আছে। তিনপথের কোনটায় সে যাবে বুঝতে পারছে না।
যদিও তিনটা পথই তার কাছে এক রকম। একটায় গেলেই হয়। সে নিরিবিলি কিছুক্ষণ হাঁটতে চায়–কাজেই এমন পথ তাকে বাছতে হবে যেখানে লোকজন কম চলাফেরা করে। সেটা বের করা তেমন কঠিন কিছু না, পথের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে কোন পথে লোক চলাচল কম।হারিয়ে যাবার ভয় নিশ্চয়ই নেই। এত ছোট জায়গায় কেউ হারায় না। আর যদি সে হারিয়ে যায় তাহলেও সমস্যা নেই। বললেই হবে–রাজবাড়িতে যাব।
তাদের বাড়িটা হল রাজবাড়ি। সেই অর্থে রাজবাড়ির মেয়ে হয়ে সে হল রাজকন্যা। দি প্রিন্সেস।রাজকন্যা একা একা হাঁটছে–প্রজারা সব দূর থেকে আগ্রহী ও কৌতূহলী হয়ে দেখছে। মজার ব্যাপার তো। তার বেশভূষা ঠিক রাজকন্যার মত না। শাড়ি আরও জমকালো হলে ভাল হত। সাদামাটা সুতির শাড়ি। গায়ে কোন গয়না নেই। রাজকন্যার থাকবে গা ভর্তি গয়না। জড়োয়া গয়না। আলো পড়ে পাথর চিকমিক করতে থাকবে।
শাহানা ভুল পথ বেছেছে। কিছুদূর গিয়েই পথ শেষ হয়ে গেল। ঘন জঙ্গল শুরু হল। জঙ্গলের ভেতর ঢোকার কোন প্রশ্ন ওঠে না।(শ্রাবণ মাসের জঙ্গল–মাটিতে হাঁটু-উঁচু ঘাস জমে আছে–নিশ্চয়ই সাপখোপ কিলবিল করছে। বাঁ পাশে উঁচু ঢিবির মত আছে। তার বাঁধের ওপাশে হাওড়। শাহানা কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ফিরে যাবে, না বাঁধের ছোট পাহাড়টায় উঠবে?
আচ্ছা, এই সমতল ভূমিতে হঠাৎ এরকম উঁচু একটা জায়গার মানে কি? ডেবে যাওয়া পুরোনো কোন মঠ-টঠ না তো? আর্কিওলজী বিভাগ কি জানে এই জায়গা সম্পর্কে? ঢিবির উপর উঠে দেখার মত কিছু কি আছে? না থাকারই কথা। তবু উঁচু জায়গা দেখলেই মানুষের উঠতে ইচ্ছে করে। শুধুমাত্র এই কারণেই শাহানা উঠা ঠিক করল। হিল পায়ে বাধে উঠা যাবে না। খালি পা হতে হবে। তার নীতুর মত শুচিবায়ু নেই, তবু পা থেকে জুতা খুলতে মন সায় দিচ্ছে না।হঠাৎ পেছন থেকে তীক্ষ্ণ গলায় কে ডেকে উঠল–আপনে কে গো? আপনে কে?
হিল পায়েই শাহানা অনেকখানি উঠে পড়েছিল। সেইখানেই সে থামল। পেছন ফিরল। শ্যামলামত হালকা-পাতলা একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। তার চোখে গভীর কৌতূহল। মেয়েটার হাতে বাঁশের খলুই। আশ্চর্য মিষ্টি চেহারা তো মেয়েটির! মেয়েটা আগের মতই তীক্ষ্ণ গলায় বলল–নামেন কইলাম। নামেন। তাড়াতাড়ি নামেন।কেন?
সাপে ভর্তি। এইটার নাম–মা মনসার ভিটা। এক্ষণ নামেন।তোমার নাম কি? নাম পরে শুনবেন। আগে নামেন। প্রতি বছর এই জায়গায় সাপের কামড়ে গরুবাছুর মরে।আমি তো গরুবাছুর না।মানুষও মরে। গত বাইস্যা মাসে মরছে একজন।এতদূর ওঠে সাপের ভয়ে নেমে যাওয়া ঠিক না–আরো খানিকটা উঠা যাক। ঝাঁঝালো রোদে সাপ বের হয় না।
তাদের চোখ আলো সহ্য করতে পারে না। শাহানা তর তর করে উপরে উঠে গেল। মেয়েটা হতভম্ব হয়ে তাকে দেখছে। ঢিবিটায় শেষ পর্যন্ত না উঠলে মেয়েটার হতভম্ব মূর্তি দেখা যেত না। বড় রকমের একটা মজা থেকে সে বঞ্চিত হত। শাহানা নেমে আসছে। নামাটা কঠিন মনে হচ্ছে হিল খুলতেও সাহস হচ্ছে না। সাপের কথা বলে মেয়েটা ভয় পাইয়ে দিয়েছে।
হিল না খুলেই শাহানা নামল। শাহানা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মেয়েটা বলল, আপনে কে? সহজ সপ্রতিভ ভঙ্গি। গ্রামের মেয়েরা এমন আগবাড়িয়ে কথা কি বলে? বোধহয় না। দরজার আড়াল থেকে উঁকি-ঝুঁকি দিতেই তারা পছন্দ করে।আমার নাম শাহানা। আমি ইরতাজুদ্দিন সাহেবের বড় নানী। তুমি কে? আমি কেউ না।কেউ না মানে কি? তোমার তো একটা নাম আছে। না-কি নামও নেই? আমার নাম কুসুম।খলুইতে কি?
গোবর। গোবর টুকাইতে বাইর হইছি। এর মধ্যে আপনেরে দেখলাম। আফনের বেজায় সাহস–মনসার ভিটাতে কেউ উঠে না।শীতের সময়ও উঠে না? তখন তো সাপ থাকে না।জ্বি না, শীতের সময়ও না।এই জায়গাটা এমন উঁচু কেন জান? আল্লাহ তাকে উঁচা কইরা বানাইছে, এই জন্যে উঁচা।শাহানা হেসে ফেলল। কুসুমও হাসছে। শাহানা বলল–গোবর দিয়ে কি করবে? সার বানাবে? খড়ি করব।এই বিশ্রি জিনিশটা হাতে মাখতে খারাপ লাগে না? জ্বে না। খারাপ লাগবে ক্যান?
শাহানা হাসিমুখে বলল, আমার একটা ছোট বোন আছে–ওর নাম নীতু। নীতুর পায়ে গোবর লেগেছিল। সে পুরো একটা সাবান পায়ে ঘষে শেষ করেছে। এখন গরম পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছে।কুসুম বলল, আফনেরা রাজবাড়ির মেয়ে, আফনেরার কথা আলাদা।আমরা বুঝি রাজবাড়ির মেয়ে? জ্বি।রাজা থাকলে তবেই না রাজবাড়ি হয়। রাজা কোথায়?
রাজবাড়ি যার থাকে হেই রাজা।মেয়েটা শুধু যে সপ্রতিভ তাই না–লজিক নিয়ে খেলতেও পছন্দ করছে। বেশ তো। শাহানা বলল, তোমাদের বাড়ি কোষ্টা? কুসুম উৎসাহের সঙ্গে কাল–ঐ যে দেখা যায়। যাইবেন আমরার বাড়িত? হ্যাঁ যাব।আফনেরে বুবু বললে আফনে কি রাগ হইবেন?
না, রাগ হব না।কুসুম উজ্জ্বল চোখে তাকাল। খুশি খুশি গলায় বলল, বুবু আসেন।শাহানার যাওয়া হল না। সে অবাক হয়ে দেখল, তার দাদাজান প্রায় ছুটতে ছুটতে আসছেন। এভাবে আসতে তাঁর যে কষ্ট হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে। তাঁর ফর্সা মুখ লাল টকটক করছে। তিনি খুব ঘামছেন।
