আমার মায়েরও তাই ধারণা। মা বলেন, বুড়াে বয়সে কোনাে ধনী মহিলার উচিত নয় তার মেয়েকে কাছে রাখা। বিশেষ করে সে মেয়ে যদি তােমার মত ইন্টেলিজেন্ট হয়।
কফি কেমন হয়েছে মালিশা ? ভাল। আরেক কাপ নেবে? দাও। তােমার নাম কিন্তু আমি জানি না।
আনিস। তুমি কি ইন্ডিয়ান ?
বাংলাদেশ হচ্ছে আমার দেশ । সেটা আবার কোথায় ? ইন্ডিয়ার পাশে ছােট একটা দেশ। সেখানেও কি ইন্ডিয়ার মত লক্ষ লক্ষ মানুষ থালা হাতে খাবারের জন্য ঘুড়ে বেড়ায় ? কোথায় শুনেছ এসব ?
আগে বল সত্যি কিনা। ডাস্টবিনের পাশে ছােট ছােট ছেলেমেয়েরা বসে থাকে। কখন কেউ এসে খাবার ফেলবে সেই আশায়। বল সত্যি নয় ? নাকি তােমার স্বীকার করতে লজ্জা লাগছে ?
আনিস ইতস্তত করে বললাে, সত্যি নয়। বড় বড় অভাব হয়েছে। সেতাে পৃথিবীর সব দেশেই হয়েছে। ইউরােপে হয় নি ? আমেরিকাতেও তাে ডিপ্রেসন হয়েছে।
আনিস তুমি রেগে যাও কেন ? তােমাকে রাগাবার জন্যে আমি বলি নি। তােমরা যা ভাব দেশটি মােটেই সে রকম নয়। মালিশা ঠোট চেপে হাসলাে। পরমুহূর্তে ভাল মানুষের মত বললাে, ইলেকট্রিসিটি আছে ? এসব জিজ্ঞেস করছাে কেন? কারণ জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। বলতে ইচ্ছা না হলে বলবে না। আনিস গম্ভীর মুখে বললাে, মালিশা ইলেকট্রিসিটি ফিটি নেই। গাড়ি ফাড়িও নেই। শহরে বাস সার্ভিসের বদলে আছে এ্যালিফেন্ট সার্ভিস। হাতির পিঠে চড়ে যাওয়া আসা ।
ঠাট্টা করছ ?
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
তা করছি। কেউ আমার সঙ্গে ঠাট্টা করলে আমার ভাল লাগে না। প্লীজ আমার সঙ্গে ঠাট্টা করবে না এবং আমি সরি।
সরি কী জন্যে ?
তােমাকে দেশের কথা বলে হার্ট করেছি সেই জন্যে। আমার যখন টাকা হবে তখন আমি তােমার দেশ দেখতে যাব।
বেশ তাে। দেশে তােমার কি বউ আছে ?
কোন সুইট হার্ট ?
তাও নেই। আমি মনে মনে আশা করছিলাম তুমি বলবে না। বিবাহিত লােকদের আমার ভাল লাগে না। | টুনটুন করে ঘন্টা বাজছে। যে এসেছে সে যদিও ডাের বেল বাজাচ্ছে তবু লােকটি অপরিচিত। এরকম করে ঘণ্টা কেউ বাজায় না। ছােট বাচ্চাদের মত অনবরত টিপেই যাচ্ছে। আনিস দরজা খুলে অবাক হয়ে গেল। নিশানাথ বাবু। | নিশানাথ বাবু ঘরে ঢুকেই মুগ্ধ কণ্ঠে বললেন, এই মেয়েটি বড় সুন্দর তাে ? দুর্গা প্রতিমার মত চোখ । মালিশা বললাে, আপনি কি আমাকে নিয়ে কিছু বলছেন ? আমার দিকে তাকিয়ে বলছেন তাই জিজ্ঞেস করছি।
নিশানাথ বাবু হাসি মুখে বললেন, আমি বলছি এই মেয়েটি কে ? আমাদের এক গডেস–এর চোখের মত অপূর্ব চোখ।
মালিশা হাসি মুখে বললাে, আমার নাম মালিশা। আজ আমার জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে আপনি কি আমার সঙ্গে দয়া করে ডিনার খাবেন ?
খাবাে না কেন ? নিশানাথ বাবুর ভাব দেখে মনে হলাে তিনি খুব অবাক হয়েছেন প্রশ্ন শুনে।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমার সঙ্গে কিন্তু মাত্র চল্লিশ ডলার আছে। মেক্সিকান রেস্টুরেন্টে গেলে মনে হয় এতেই তিনজনের হয়ে যাবে কী বলেন?
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
টেকো খেতে আর কয় পয়সা লাগবে ? হয়েও থাকবে দেখবে। নিশানাথ বাবু ঠিকানা যােগাড় করে কীজন্যে হঠাৎ করে আনিসের সঙ্গে দেখা করে আসতে হবে কেন নিশানাথ বাবু বুঝতে পারেন নি। অনেক কিছুই তিনি বুঝতে পারেন না। আসতে বলা হয়েছে তিনি এসেছেন, ব্যাস। আনিস বললাে, বাংলাদেশের স্টল কেমন দেখলেন ?
চমকার। ঐ টম ছােকরা কী সব কায়দা কানুন করে দিয়েছে আমি স্তম্ভিত । টেবিলটাতে হার্ডবাের্ড ফোর্ড লাগিয়ে রং টং দিয়ে এমন করেছে দেখে মনে হয় একটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ছােকরার গুণ আছে।
মালিশা অপ্রাসঙ্গিকভাবে বললাে, আপনার নামটা কী দয়া করে বলবেন?
আমার নাম নিশানাথ। এই নামের মানে কী? এর মানে হলাে ‘গড অব দ্যা ডার্কনেস‘। বাহু মজার নাম তাে!
নিশানাথ বাবু সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ঐ টম ছােকরার গুণ আছে। হুলুস্থুল করছে। বুঝলেন নাকি আনিস সাহেব। পেছনে হার্ডবাের্ডের উপর বৃষ্টির ছবি এঁকেছে। ছবির দিকে তাকালেই বৃষ্টি পড়ার শব্দ শােনা যায়। মনে হয় ব্যাঙ ডাকছে চারদিকে।
মালিশ বললাে, ব্যাঙ ডাকছে মানে?
আমাদের দেশে বৃষ্টি হলেই ব্যাঙ ডাকে। সেই শব্দ জগতের মধুরতম ধ্বনির একটি। তুমি না শুনলে বুঝতেই পারবে না।
ব্যাঙের ডাক তাে আমি শুনেছি। ওর মধ্যে মধুরতার কী আছে?এইসব তুমি কী বলছ ? মালিশা তােমাকে বুঝানাে যাবে না।
নিশানাথ বাবু ছােট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। মালিশা অবাক হয়ে বললাে, আপনি অদ্ভূত লােক! সত্যি অদ্ভুত!
মালিশার বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হল।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
মেট্রোপলিটন বাসে উঠতে গিয়ে দেখে একটার উপর বাজে। ফাকা বাস। সে ছাড়া অন্য কেউ নেই। একটি নব্বই বছরের বুড়ি ছিল সে টুয়েলভ স্ট্রীটে নেমে গেল। নামবার সময় বুড়িটি বললাে, আমাকে একটু হাত ধরে নামিয়ে দেবে? | মালিশা এমন ভাব করল যেন সে শুনতে পায় নি। বুড়ি দ্বিতীয়বার কিছু না বলে নিজে নিজেই নামলাে। এই বয়সেও রাত দুপুরে একা একা বাসে চড়া চাই। খোজ নিলে দেখা যাবে পাস বই ভর্তি ডলার। তবু পাঁচ ডলার খরচ করে ক্যাব ডাকবে না। দেশে একটা ফেডারেল আইন থাকা দরকার। যে আইনে সত্তুরের উপর বয়স হলে সব টাকা পয়সা সরকারের কাছে সারেন্ডার করে নির্বাসনে যেতে হবে।
Read more