সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৫)

 শিকলে কি আর মায়াবী পাখি ধরা পড়ে

টম যেখানে থাকে সেটি কোনাে অ্যাপার্টমেন্ট নয়চমৎকার একটি বাড়িসামনে লন আছে, ফুলের বাগান আছে, পেছনে চমৎকার সুইমিংপুলবাড়ির মালিক একমাসের জন্যে যাচ্ছে সুইজারল্যান্ড

সবাই গেছে বনেসে জন্যে সে বাড়ি চার মাসের জন্যে ভাড়া দিতে চায়ভাড়া নামমাত্র মাসে চারডলারসবটা টাকা এক সঙ্গে দিতে হবে। 

টমের বাড়ি পছন্দ হয়ে গেল রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি, পছন্দ না হয়ে উপায় আছে ? আমি নেব তােমার বাড়ি। 

টমের পােশাক আশাক দেখে বাড়ির মালিক ঠিক ভরসা পায় নাগম্ভীর হয়ে বলে, ষােলশডলার একসঙ্গে দিতে হবে কিন্তু। 

বেশতাে নিয়ে আসব বিকেলে তুমি ঘরে থাকবেতাে

যেহেতু বিকেলে গেলে ভদ্রলােককে ঘরে পাওয়া যাবে সেহেতু টম আর বিকেলে গেল পরদিন দুপুরে গিয়ে হাজির ভদ্রলােক ঘরে নেই, তার স্ত্রী দরজা খুললােটম হাসি মুখে বললাে, আমি তােমার বাড়ি ভাড়া করতে এসেছিতােমার স্বামীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। 

হ্যা তােমার জন্যে সে অপেক্ষা করছিলােতুমি কি ষােলশডলার নিয়ে এসেছেনিয়ে এসেছি। 

টম কাঁধের ব্যাগ থেকে কাগজে মােড়া একটি পেইন্টিং বের করলােগম্ভীর মুখে বললাে, এর দাম কম করে হলেও তিন হাজার ডলার, তােমাকে জলের দামে দিচ্ছি। 

দ্রমহিলা স্তম্ভিতভয় নেই পছন্দ না হলে নগদ দাম দেবদেখ ভাল করে । 

সবাই গেছে বনে -পর্ব-১৫

সন্ধ্যাবেলার ছবিপুরনাে ধরনের একটি লাল রঙা ইটের বাড়ির ভাঙা জানালা দিয়ে একটি কিশােরী মেয়ে উঁকি দিচ্ছেমেয়েটির চোখে মুখে সূর্যের রক্তিম আলােছবি থেকে চোখ ফেরানাে মুশকিলভদ্রমহিলা আমতা আমতা করতে লাগলেন। 

আমার হাসবেন্ডের সঙ্গে কথা না বলে তাে রাখতে পারি নাবেশ তাহলে নগদ দাম দিচ্ছি। 

টম গম্ভীর মুখে পকেটে হাত রাখলাে (পকেটে একটি মাত্র পঞ্চাশ ডলারের নােট)ভদ্রমহিলা থেমে থেমে বললাে, তারচেএক কাজ কর, ছবিটা রেখে যাওআমি ওর সঙ্গে আলােচনা করে তােমাকে জানাব। 

বেশতাে বেশতাে। 

টম জানে এই মেয়েটির স্বামীকে ছবিটি রাখতেই হবেঅবশ্যি একটি ভাল ছবি হাতছাড়া হলােতাতে কিছুই আসে যায় নাকাউকেই ধরে রাখা যায় নাসমস্তই হাতছাড়া হয়ে যায়। 

রুনকি যখন প্রথম উঠে এলাে টমের ঘরে তখন টম সিরামিক্সে কিছু ফ্যান্সি পেইন্ট করছিলদশটি টবের অর্ডার আছে, বিকাল পাঁচটার মধ্যে দিতে হবেসময় লাগছে খুব বেশিরুনকিকে ঢুকতে দেখে টম ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাে, কিছু বললাে নারুনকি বললাে, তােমার সঙ্গে থাকতে আসলাম টম। 

বেশতাে ভাল করেছ। 

টম ছবি আঁকায় মন দিলনীল রঙটা ঠিক মানাচ্ছে নাকেমন যেন লেপ্টে লেপ্টে যাচ্ছেরুনকি গম্ভীর হয়ে বললাে, আমি বাবা মা সবাইকে ছেড়ে এসেছিতুমি বােধহয় ঠিক বুঝতে পারছে না| টম ডিজাইন থেকে চোখ তুলেই বললাে, বাবামাকে সঙ্গে নিয়ে আমার সঙ্গে থাকতে আসাটা ঠিক হতাে নাআমি বুড়ােবুড়ি সহ্য করতে পারি না| তুমি মন দিয়ে শুনছাে না টমদয়া করে শােন আমি কী বলছিতাকাও আমার দিকেপ্লিজ। 

টম তাকালাে। 

আমি তােমার জন্যে সব ছেড়ে ছুড়ে এসেছি। 

সবাই গেছে বনে -পর্ব-১৫

রুন এটি তুমি ভুল বললেতুমি আমার জন্যে আস নিএসেছ নিজের জন্যেআমি তােমাকে কখনাে আসতে বলি নিমনের মধ্যে এসব ভুল ধারণা থাকা ঠিক নাএতে পরে কষ্ট পাবে। 

রুনকি জবাব দিল নাটম বললো, চট করে কফি বানিয়ে আনতাে দেখি আমার জন্যেচিনি দুচামচ চাই নাে ক্রিম। 

বাইরে থেকে টমকে ভবঘুরে ছন্নছাড়া মনে হলেও আসলে সে মােটেও সে রকম নয়রুনকি অবাক হয়ে দেখলাে টমের অত্যন্ত গােছালাে স্বভাবসিগারেট খেয়ে ঘরময় ছড়িয়ে রাখে নাহৈচৈ হুল্লোড় কিছুই করে নারুনকির ঘুম ভাঙার আগেই সে ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট তৈরি করে ছবি নিয়ে বসেঘণ্টা তিনেক এক নাগাড়ে কাজ করেএই সময় তার মূর্তি ধ্যানী পুরুষের মূর্তিকথা বললে জবাব দেবে নাচা খাবে না সিগারেট খাবেসকালের কাজ শেষ হলেই ঘণ্টা খানেক শুয়ে থাকবে চুপচাপতার ভাষায় এটি হচ্ছে মেডিটেশনবারােটা নাগাদ লাঞ্চ তৈরি হবেলাঞ্চ শেষ করেই বেরুবে কাজের খোঁজেসারাদিন কাজ পাওয়া যায় না

ঘােরাঘুরিই সারতখন সে তার আঁকা চমক্কার একটি ছবিরাস্তার মােড়ে টাঙিয়ে বসে থাকবেছবির নিচে বড় বড় হরফে লেখাএকজন দুরারােগ্য ক্যান্সারে মরণাপন্ন শিল্পীকে সাহায্যের জন্যে ছবিটি কিনুনএই শিল্পী গনিনের মত ক্ষমতানিয়ে জন্মেছেন কিন্তু হায় ভাগ্যের কী ছলনা!ছবি বিক্রি হয়ে যায় চট করেযে কোনাে ছবি বিক্রি হলেই টমের খানিক মন খারাপ হয়বিড়বিড় করে নিজের মনে কিছুই ধরে রাখা যাচ্ছে নাকোনাে কোনােদিন মন খারাপের তীব্রতা এতই বাড়ে যে সে হুইস্কি খেতে খেতে চোখ লাল করে বাড়ি ফেরেকুনকিকে গম্ভীর হয়ে বলে, প্রচুর ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলাম কিন্তু কিছুই হচ্ছে না

 

Read more

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৬)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *