লাল হচ্ছে আমার সবচে’ ফেভারিট কালার অথচ লাল রঙের ব্যবহারটা এখনাে শিখতে পারলাম না। এরকম জীবনের কোনাে মানে হয় ?
এই জাতীয় কথাবার্তার কোনাে অর্থ হয় না বলাই বাহুল্য। তবু রুনকির ভয় করে। বড় শিল্পী না হওয়াই ভাল। টম আর দশজন মানুষের মত সহজ স্বাভাবিক মানুষ হােক। সংসারে ভালােবাসা থাকুক সুখ থাকুক। খ্যাতির কি সত্যি কোনাে প্রয়ােজন আছে ? | টম অবশ্যি রুনকিকে খুব পছন্দ করে। তবু রুনকির ভয় কাটে না। সব সময় মনে হয়। একদিন সে হয়ত ভাল মানুষের মত ঘর থেকে বেরুবে আর ফিরবে না। পৃথিবীতে এক ধরনের মানুষ আছে যাদের ভালােবাসা দিয়ে ধরে রাখা যায় না।
রুনকি নিজেকে মানিয়ে নিল খুব সহজেই। বাজার করা, রান্না করা, কোনাে কিছুই আর আগের মত জটিল মনে হল না তার কাছে। বাইরে বেরুলে একটি ক্ষীণ অস্বস্তি অবশ্যি থাকে মনের মধ্যে যদি পরিচিত কারাের সঙ্গে দেখা হয়। সবচে‘ ভাল হত যদি টমকে নিয়ে বহু দূরে কোথাও চলে যাওয়া যেত। প্রশান্ত মহাসাগরের ছােট কোনাে একটি দ্বীপে। যেখানে জনমানুষ নেই। সারাক্ষণ হুহু করে হাওয়া বইছে। সন্ধ্যাবেলা আকাশ লাল করে সূর্য ডুবে হঠাৎ করে চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়।
সবাই গেছে বনে -পর্ব-১৬
টমের এই বাড়িটিও অবশ্যি দ্বীপের মতই। শহরের বাইরে খােলামেলা একটা বাড়ি। কেউ ঠিকানা জানে না বলেই কেউ আসে না। রুনকি মাকে টেলিফোন করে ঠিকানা দিতে চেয়েছিল। রাহেলা শান্ত স্বরে বলেছেন, তােমাদের ঠিকানার আমার কোনাে প্রয়ােজন নেই।
রুনকি। তােমার ঠিকানা তােমার কাছেই থাকুক।
ঠিকানা না রাখলে টেলিফোন নাম্বার রাখ ।
রাহেলা উত্তর না দিয়ে টেলিফোন নামিয়ে রেখেছেন। | কেউ জানে না রুনকি কোথায় আছে তবু একদিন সফিক তার ভাঙা ডজ গাড়ি নিয়ে এসে উপস্থিত। রুনকির বিস্ময়ের সীমা রইলাে না। সফিক গাড়ি থেকে নেমেই বললাে, বাংলাদেশী কায়দায় তােমাদের একটা বিয়ের ব্যবস্থা করবার জন্যে আসলাম। গায়ে হলুদ টলুদ সব হবে। বরের বাড়ি থেকে কনের বাড়িতে রুই মাছ যাবে— গায়ে হলুদের তত্ত্ব। দেশের একটা পাবলিসিটি হয়ে যাবে। মেলা লােকজনকে বলা হবে কী বল ?
রুনকি বহু কষ্টে হাসি সামলায়। টম বুঝি রাজি হবে! তােমার যে কী সব চিন্তাভাবনা সফিক ভাই।
রাজি হবে না মানে ? টমের ঘাড় রাজি হবে। ব্যাটা দেশের একটা বেইজ্জতি করে ফেলেছে। বাংলাদেশী মেয়েকে ভাগিয়ে নিয়ে এসে...।
রুনকি গম্ভীর মুখে বললাে, সফিক ভাই, টম কাউকে ভাগিয়ে টাগিয়ে আনে নি। আমি নিজেই এসেছি। আর আমার জন্যে তােমার বাংলাদেশের কোনাে বেইজ্জত হয় নি। আমি বাংলাদেশী নই। আমি বাই বার্থ আমেরিকান। আমার বাবা মার মত নেচারালাইজড সিটিজেন না।
সফিক সারাদিন তাকলাে রুনকির ওখানে। দি মেঘনা রেস্টুরেন্ট খােলার ব্যাপারে তার রুনকির সাহায্যের দরকার । হুলস্থুল কাণ্ড করতে হবে সেখানে। লাঞ্চ ও ডিনারের টাইমে পল্লীগীতির সুর বাজবে। বাংলাদেশের বিখ্যাত সব শিল্পীদের তেল রঙের নিসর্গ দৃশ্যের ছবি দিয়ে সাজানাে হবে লবি। খাওয়ার শেষে হাতে তুলে দেয়া হবে এক খিলি পান এবং খাঁটি বাংলায় বলা হবে আবার আসবেন।
সবাই গেছে বনে -পর্ব-১৬
কিন্তু টাকাটা তুমি পাচ্ছ কোথায় ?
সবার কাছ থেকে চেয়ে চিন্তে যােগাড় হবে। তােমাকেও দিতে হবে। ছাড়াছাড়ি নেই। আমার কাছে আছেই কুল্যে একশ‘ ডলার। দাও একশ’ ডলারই সই। তােমাকে দিয়েই শুরু।
সারাদিন অপেক্ষা করেও টমের দেখা পাওয়া গেল না। সে আসবে রাত আটটায়। রুজভেল্ট স্কুলের কী একটা ডেকরেশনের কাজ নাকি পেয়েছে। শেষ করে ফিরবে।
অক্টোবর মাস।
বরফ পড়ার সময় নয় কিন্তু আবহাওয়া অফিস বলেছে তুষারপাত হতে পারে। সম্ভাবনা শতকরা বিশ ভাগ। আকাশ অবশ্যি পরিষ্কার। ঝকঝকে রােদ। সন্ধ্যার আগে আগে দেখা গেল সব ঘােলাটে হয়ে আসছে। সাড়ে ছ‘টা থেকে ঝুর ঝুর করে বরফ পড়তে শুরু করলাে।
বৎসরের প্রথম বরফ, খুশীর ঢেউ খেলে গেলাে চারদিকে। ছেলে বুড়াে সবাই চোখ বড় বড় করে বলছে— আহ্ কী চমৎকার তুষার পড়ছে। হাউ লাভলী।
রাত নটার খবরে বললাে– কানাডা থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে আর উষ্ণ হাওয়া আসছে সাউথ থেকে কাজেই সারারাত ধরে ব্লিজার্ড হতে পারে। ইতিমধ্যে এক ফুটের মত বরফ পড়েছে। রাস্তা–ঘাট পিছল। কেউ যেন বিনা প্রয়ােজনে বাইরে না যায়। হাইওয়ে আই নাইন্টি বন্ধ। বড়ই ফুর্তির সময় এখন। শুরু হবে ব্লিজার্ড পার্টি। উপকরণ সামান্য বিয়ার, বাদাম ভাজা এবং চড়া মিউজিক। বৎসরের প্রথম ব্লিজার্ডকে স্বাগত জানানাের এই হচ্ছে ফার্গোর সনাতন পদ্ধতি।
আনিস মােটা একটি কম্বল গায়ে জড়িয়ে সােফায় আরাম করে বসলাে । ঘরে একটি ফায়ার প্লেস আছে। ফায়ার প্রেসে আগুন জ্বালানাের কায়দা কানুন তার ভাল জানা নেই। চিমনি পরিষ্কার আছে কিনা কে জানে। এর চেয়ে কম্বল জড়িয়ে থাকাই ভাল।
Read more