ধার নিতে পারি?
আনিস সিগারেট বের করলাে। মেয়েটি ফস করে লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরালাে। বাদামি রঙের ঢেউ খেলানাে চুল মেয়েটির। টানা টানা চোখ। লাইটারের আলাের জন্যেই হােক বা অন্য যে কোনাে কারণেই হােক আনিসের মনে হলাে মেয়েটির মুখ যেন এইমাত্র কেউ তুলি দিয়ে একেছে। সিগারেটের জন্যে তােমাকে ধন্যবাদ।

ছেলে–মেয়ে দুটি পিয়ানাের আড়ালে চলে গেল। মেয়েটি অনবরত হাসছে খিলখিল করে। হাসির ধরন কেমন অসংলগ্ন। নিশ্চয়ই প্রচুর বিয়ার খেয়েছে। আনিস লম্বা হয়ে সােফায় শুয়ে পড়লাে। ইলেকট্রিসিটি এখনাে আসছে না। ট্রান্সমিশন লাইন কোথাও পুড়ে টুড়ে গেছে বােধহয়। মেয়েটির চাপা গলার স্বর শােনা যাচ্ছে।
আহ কী অসভ্যতা করছাে! হাত সরাও প্লিজ।
আবার খিলখিল হাসি। তারপর দীর্ঘ সময় আর কিছুই শােনা গেল না। বাইরে ঝড়ের বেগ বাড়ছে। ঘনঘন বিজলী চমকাচ্ছে। আনিস শুয়ে থাকতে থাকতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাে।
ঘুম যখন ভাঙলাে তখন ঝড় থেমে গিয়েছে। ইলেকট্রিসিটি এসেছে। মেমােরিয়াল ইউনিয়ন আলােয় ঝলমল করছে। ছেলেটি নেই মেয়েটি টেবিলে পা তুলে বসে আছে একা
একা।
তােমার কাছ থেকে কি আমি আরেকটি সিগারেট নিতে পারি ?
আনিস একটি সিগারেট দিল। মেয়েটি সিগারেট ধরিয়ে ক্লান্ত স্বরে বললাে, তােমার সঙ্গে গাড়ি আছে ?
না। কেন বলতাে ? গাড়ি থাকলে তােমাকে একটা লিফটের জন্যে অনুরােধ করতাম। সরি, গাড়ি নেই আমার। তুমি থাক কোথায়? টুয়েলভ অ্যাভি। তােমার সঙ্গে আমি টুয়েলভ অ্যাভিন্যু পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে যেতে পারি, কী বল ?
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
তা পার । আমার বড় মাথা ধরেছে।
মেয়েটি বাঁ হাতে তার কপাল টিপে ধরলাে। আনিস বললাে, তােমার ছেলে বন্ধুটি কোথায়?
ও আমার বন্ধু হবে কেন ? কোথায় গেছে কে জানে? ওর সঙ্গে বকবক করেই তাে আমার মাথা ধরেছে।
বৃষ্টি নেই কিন্তু ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। রাস্তায় নেমেই মেয়েটি খুব সহজ ভঙ্গিতে আনিসের হাত ধরলাে।
তােমার অ্যাপার্টমেন্টে কি টাইলানল আছে ? আছে। মনে হয় আমার জ্বর আসছে। দুটি টাইলানল এবং গরম কফি খেতে পারলে হত। আনিস কথা বললাে না। মেয়েটির সত্যি সত্যি জ্বর আসছে। হাত বেশ গরম।।
আমি কি তােমার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে এক কাপ গরম কফি খেতে পারি ? রাত বেশি। হয় নি তাই জিজ্ঞেস করছি।
হ্যা খেতে পার। আমাকে আরেকটা সিগারেট দাও। মাথা ধরা তাতে আরাে বাড়বে।
আমি তাতে কেয়ার করি না। আমি কোনাে কিছুতেই কেয়ার করি না। তা ভাল। ভাল হােক মন্দ হােক আমি কেয়ার করি না।
বাসার সামনে এসে মেয়েটি থমকে দাঁড়ালাে। অবাক হয়ে বললাে, এত বড় বাড়ি! এটা তােমার ?
ভাড়া দিয়ে থাকি। নিজের নয়। আমি ভেবেছিলাম তুমি স্টুডেন্ট।
আমি স্টুডেন্ট নই।
আনিস টাইলানল নিয়ে আসলাে। পানির বােতল আনলাে। মেয়েটি ক্ষীণ স্বরে বললাে, আমার জ্বর আসছে। তােমার কাছে থার্মোমিটার আছে ?
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
না থার্মোমিটার নেই।
তােমার গাড়ি থাকলে ভাল হত, আমাকে পৌছে দিতে পারতে। আমি আমার এক বন্ধুকে টেলিফোন করছি। সে তােমাকে পৌছে দেবে।
আমি কি তােমার এখানে এক রাত থাকতে পারি ? ঘরে ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না আমার।
আনিস চুপ করে রইলাে। মেয়েটি থেমে থেমে বললাে, কি থাকতে পারি ? তা পার ।
আমাকে শােবার ঘর দেখিয়ে দাও। আমার বড্ড খারাপ লাগছে।
শােবার এই ঘরটি চমৎকার করে সাজানাে। মেয়েটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাে অনেকক্ষণ। তারপর খানিক ইতস্তত করে বললাে, তুমিও কি শােবে আমার সঙ্গে ?
আরাে শােবার ঘর আছে ?
মেয়েটি পায়ের জুতা খুললাে। মাথায় স্কার্ফ বাধা ছিল। স্কার্ফ খুলে মুখ মুছলাে তারপর খুব সহজভাবে বললাে, তােমাকে অনেক ধন্যবাদ। অবশ্যি তােমার ইচ্ছা হলে আমার সঙ্গে শুতে পার। আমি কিছুই কেয়ার করি না।
নাম কী তােমার ? মালিশা।। শুভরাত্রি মালিশা ।।
মালিশা কোনাে জবাব দিল না। আনিস – কুঞ্চিত করে ভাবলাে কাজটা বােধহয় ঠিক হলাে না। এইসব ‘হােবাে’ শ্রেণীর মেয়েদের ঘরে থাকতে দিতে নেই। হয়তাে একটি প্রস্টিটিউট। শহরের নষ্ট মেয়েদের একজন। কিন্তু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না। মন খারাপ হয় শুধু।
Read more