সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৬)

একটু দেরি হবে ল্যাবরেটরিতে গিয়ে ওদের সকালের খাবার দিয়েই আসববাসায় থাকবেন আপনি। 

সবাই গেছে বনেভাের নটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে ডঃ লুইস সফিককে বললেনজং বাহাদুরকে নিয়ে ল্যাবরেটরি ওয়ানে যেতেখাচা খুলতেই শান্ত ভঙ্গিতে জং রেরিয়ে এলােগুটি গুটি হয়ে বসে রইলাে সফিকের কোলেডঃ লুইস হেসে বললেন, এটি দেখছি খুব শান্ত স্বভাবের খাঁচা থেকে বের করলেই এরা খুব চিৎকার করেওদের একটা সিক্সথ সেন্স আছে বুঝতে পারে কিছু একটা হবে। 

ডঃ লুইস জং বাহাদুরের গায়ে দুটি ইনজেকশন করলেন এবং সফিককে বললেন, একে এখন চব্বিশ ঘন্টা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবেতিন নম্বর খাচায় রেখে দাও। 

সফিক দেখলাে জং বাহাদুর ঝিম মেরে গেছে, নড়াচড়া করছে নাখাচায় নামিয়ে রাখতেই সে শান্ত ভঙ্গিতে মাঝখানে গিয়ে বসে রইলােসফিক বললাে, এই ব্যাটা কী হয়েছে তাের? | জং বাহাদুর দাঁত বের করলাে নাজিভ বের করে ভেংচে দিল না। শুধু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলাে। 

ডঃ লুইস কী দিয়েছেন ওকে

হেভি মেটাল পয়জনিং করা হয়েছেরক্তের মধ্যে মারকারির একটা সল্ট ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছেমারা যাবে ছত্রিশ ঘণ্টার মধ্যেআমরা মেটাল পয়জনিংএর ইফেক্ট লক্ষ করব ব্লাড প্রেসার কী করে ফল করে সেটা মনিটর করা হবে। 

সফিকের গা কাঁপতে লাগলােতিন নম্বর খাচার সামনে গিয়ে ভাঙা গলায় ডাকলাে, জং বাহাদুর, জং বাহাদুর। 

জং বাহাদুর ঘাড় ঘুরিয়ে থাকলােকী শান্ত দৃষ্টি

দুনম্বর খাচার সব কটি বানর ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জং বাহাদুরের দিকেওরা কি কিছু বুঝতে পারছে ? ডঃ লুইস এসে দেখলেন পিপুল ডাইলেটেড হতে শুরু করেছেমুখ দিয়ে ফেনা ভাঙছেলােহিত রক্ত কণিকা ফুসফুস থেকে আর রক্ত নিয়ে যেতে পারছে

সবাই গেছে বনে-পর্ব-২৬

সফিক ক্লান্ত স্বরে বললাে, উঃ লুইস বড় খারাপ লাগছে আমার| সফিকের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগলােজং বাহাদুর তাকাচ্ছে সফিকের দিকেসফিক মৃদু স্বরে বললাে, লা ইলাহা ইল্লা আনতা সােবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনায যােয়ালেমিন। 

ডঃ লুইস অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেনসেন্টিমেন্টাল ইন্ডিয়ানসসিলি সেন্টিমেন্টের জন্যেই ওদের কিছু হয় নাচাইনিজ পােস্ট ডকটিও চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে সফিকের দিকেসে অস্পষ্ট স্বরে চাইনিজ ভাষায় কী যেন বললােনিশ্চয়ই কোনাে ইস্টার্ন ফিলােসফিরাবিশ, এসব সেন্টিমেন্টাল ইন্ডিয়ানদের নিয়ে মুশকিলএরা বড় ঝামেলা করে। 

সফিক জং বাহাদুরের খাচার শিক দুহাতে ধরে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছেজং বাহাদুর মনে হল এগিয়ে আসছে তার দিকেসফিক চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলাে। 

মিস মালিশা আপনার কি রাতে ঘুম হয় নি

নাহ। 

স্নায়ু উত্তেজিত হয়েছিল সে জন্যে এই হয়েছেডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে কোনাে একটা সিডেটিভের ব্যবস্থা করার প্রয়ােজন ছিলভুলটা আমার। 

মালিশা চোখ তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালাে অ্যাটর্নির দিকেঅল্প বয়সী এই ছেড়াটাকে বেশ লাগছে তারসে বললাে, আমি তােমার নাম ভুলে গেছিআই অ্যাম সরি। 

আমার নাম ডেনিস বেয়ারতুমি আমাকে বিল ডাকতে পারবিল একটি বুইক গাড়ি পাঠাবার কথা বলেছিলাম পাঠানাে হয়েছেকে পাঠিয়েছে কী কিছুই লেখা নেই তাে

সবাই গেছে বনে-পর্ব-২৬

কিন্তু মিস মালিশা কাউকে গিফট দেয়ার প্রধান আনন্দইতাে হচ্ছে গিফট পেয়ে সে কেমন খুশি হল তা জানা, ঠিক নয় কি

মালিশা জবাব দিল নাডেনিস বেয়ার মিটমিট করে হাসতে লাগলােমালিশা বললাে, হাসছাে কেন

আজকের ন্যাশনাল ইনকোয়ারারে তােমার ছবি ছাপা হয়েছেতুমি বিখ্যাত হতে শুরু করেছ। 

মালিশ ক্লান্ত স্বরে বললাে, আমার শরীরটা ভাল লাগছে না। আজ আমি কোথাও যেতে চাই না। 

মিস মালিশা ডিসট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসে আজকে একবার যেতেই হবে। ঘণ্টা খানিকের বেশি লাগবে নাঅনেস্ট। 

মালিশা জবাব দিল নাডেনিস বেয়ার একটি সিগারেট ধরিয়ে হাসি মুখে বললাে, সেখান থেকে যাব চেস ম্যানহাটনে, কথা দিচ্ছি ত্রিশ মিনিটের মধ্যে সব ঝামেলা চুকিয়ে ফেলব। 

আজকে না গেলে হয় না? | নাআজকে যেতে হবেভলার একটি চমৎকার জিনিসপৃথিবীর মধুরতম শব্দকটির একটিকিন্তু শব্দটি মধুময় করে রাখার যন্ত্রণাও কম নয়। 

প্রকাণ্ড একটি ফোরডাের শেভ্রোলেট গাড়ি হােটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলগাড়ির পেছনের সিটে মধ্য বয়সী একজন ভদ্রলােক একটি সামার কোট পরে বসে আছেনডেনিস বেয়ার মৃদু স্বরে বললাে, ওর নাম জিম তুমি যখনি বাইরে যাবে ছায়ার মত থাকবে তােমার সঙ্গেতােমার বডিগার্ডখুব এফিসিয়েন্ট লোক। 

মালিশ ক্লান্ত স্বরে বললাে, আমার এসব দরকার ছিল নাদরকার আছেগাড়িতে উঠেই মালিশা বললাে, আমার কেন যেন ভাল লাগছে না, কিছুতেই মন বসছে 

সন্ধ্যাবেলা অপেরা দেখতে চাওটিকিট পাওয়া যাবে ? ডলার দিয়ে পৃথিবীর যে কোনাে জিনিস পাওয়া যায়তাই কি

সবাই গেছে বনে-পর্ব-২৬

হ্যাতুমি কী চাও আমাকে বলবে আমি ব্যবস্থা করবডলারের মত চমৎকার জিনিস কি পৃথিবীতে আছে

ডলারের মত চমৎকার জিনিস পৃথিবীতে নেই, না

মালিশার মনে হল তার জ্বর আসছেকিছুই ভাল লাগছে নাগায়ের সঙ্গে গা ঘেসে জিম বসে আছেলােকটি মূর্তির মত, সমস্ত রাস্তায় একবার শুধু বললাে, চমত্তার ওয়েদারমিস মালিশা। 

ডিসট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসে দুঘন্টার মত লাগলােমালিশাকে তেমন কিছু করতে হল নাশুধু চুপচাপ বসে থাকামাঝে মাঝে দুএকটা ফর্মে সই করাঅ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে মিনিট দশেকের কথাবার্তা বলতে হলদুঘণ্টা বসেই মালিশার প্রচণ্ড মাথা ধরে গেল। 

 

Read more

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(শেষ-পর্ব)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *