টিভিতে জনি কার্সন শাে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট কার্টার দাঁত বের করে কী ভাবে হাসে তাই দেখাচ্ছে। আহামরি কোনাে অভিনয় নয় এতেই স্টুডিও’র লােকজন হেসে গড়াগড়ি দিচ্ছে। চ্যানেল ফোরে লেট নাইট মুভি শুরু হল।
অর্থাৎ রাত বেশি হয় নি। একটা এখনাে বাজে নি। আনিস কফি বানালাে । ঘুমুতে যাওয়ার আগে কফি খাবার এই একটি বিশ্রী অভ্যাস তার আমেরিকা এসে হয়েছে।
মালিশা কি কফি খাবে ? সম্ভবত না। মেয়েটিকে থাকতে দেয়া ভুল হয়েছে।
ড্রাগস ট্রাগস খেয়ে এসেছে কি না কে বলবে ? হয়ত রাত দুপুরে চেঁচামেচি শুরু করবে।
আনিস ঘুমুতে গেল অনেক রাতে। বাতি নেভাবার ঠিক আগের মুহূর্তে মনে হলাে আজ সন্ধ্যায় যে মহিলা কবির সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার নাম মনে পড়ছে না। চমৎকার একটি নাম। খুব সম্ভবত এম দিয়ে শুরু হয়েছে। নামটি মনে না আসা পর্যন্ত কিছুতেই ঘুম আসবে।
ছটফট করতে হবে বিছানায়। পুরনাে সেই রােগ আবার দেখা দিচ্ছে। স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে উঠছে। ঘাড়ের পাশের রগদুটি ফুলে উঠছে। কাউকে জিজ্ঞেস করলে হয় না? সফিক তাে অনেক দিন ধরে আছে এইখানে। এত রাত্রে টেলিফোন করাটা কি ঠিক হবে ?
যালাে সফিক ? জেগে ছিলে ? হ্যা। কী ব্যাপার ? আচ্ছা শােন, তুমি কি এখানকার কোনাে মহিলা কবিকে চেন? বেশ বয়স ভদ্রমহিলার । সফিক বেশ কিছু সময় চুপ করে থেকে বললাে, কী ব্যাপার আনিস ভাই ?
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
কোনাে ব্যাপার না এমি জিজ্ঞেস করছি। ভদ্রমহিলার নাম এম দিয়ে শুরু। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কী জন্যে ?
আনিস লাইন কেটে দিল। সফিক এখন নির্ঘাৎ আবার টেলিফোন করবে। কাজেই এখন প্লগ থেকে টেলিফোন খুলে রাখা উচিত।
আনিসের সারা রাত ঘুম হলাে না। ঘুম আসলাে ভাের বেলা।
ফার্গো খুবই ছােট শহর।
আমেরিকানরা একে সিটি বলে না বলে টাউন।
সাধারণ একটি সিটিতে যা যা থাকে তার সবই অবশ্যি আছে। আকাশ ছোঁয়া দালানই শুধু নেই। দুটি নাইট ক্লাব আছে। মেয়েরা সেখানে নগ্ন হয়ে নাচে। একটা বড় ক্যাসিনাে আছে। সেখানে সপ্তাহে ছয়দিন দিন–রাত চব্বিশ ঘণ্টা ব্লাক জ্যাক খেলা হয়। অত্যাধুনিক শপিং মল আছে বেশ কয়েকটি, তবু ফার্গো সিটি নয় টাউন। নিউইয়র্ক বা শিকাগাে থেকে যেসব বাঙালি এখানে আসে তারা চোখ কপালে তুলে বলে, আরে এ তাে আমাদের কুমিল্লা শহর। ভিড় নেই হৈচৈ নেই। বাহ্ চমৎকার তাে!
কিন্তু বেশিদিন কেউ থাকে না এখানে। শীতের সময় প্রচণ্ড শীত পড়ে। কানাডা থেকে উড়ে আসে ঠাণ্ডা হাওয়া। থার্মোমিটারের পারদ ক্রমশ নিচে নামতে থাকে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তাপমাত্রা শূন্যের ত্রিশ ডিগ্রি নিচে নেমে থমকে দাঁড়ায়। অসহনীয় অকল্পনীয় ঠাণ্ডা। একটা শীত কোনােমতে কাটাবার পরই ফার্গোর মােহ কেটে যায়। ঘরের মধ্যে ছ‘মাস বন্দি হয়ে থাকতে পারে কেউ ? বাঙালিরা মুখ কুঁচকে বলাবলি করে, এখানে মানুষ থাকতে পারে ? এখানে বাস করতে পারে পােলার বিয়ার আর সীল মাছ।
তবু অনেকেই আসে। ঘর বাড়ি কিনে স্থায়ী হয়ে যায় কেউ কেউ। যেমন স্থায়ী হয়েছেন আমিন সাহেব। শহরে বাড়ি করেছেন। মিনেসােটায় পেলিকেন লেকের ধারে সামার হাউস কিনেছেন। বিশ বছর আগে যে দেশ ছেড়ে এসেছিলেন আজ আর তার জন্যে মন কাঁদে না।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
অথচ শুরুতে কী দিন গিয়েছে! ইউনিভার্সিটি থেকে সন্ধ্যাবেলা ক্লান্ত হয়ে ফিরতেন। ঘরে রাহেলা একা। কিছুই করবার নেই। কতক্ষণ আর টিভির সামনে বসে থাকা যায়। একা একা দোকানে ঘুরতে কার ভাল লাগে ? আমিন সাহেব সান্ত্বনা দিতেন, আর একটা মাত্র বৎসর। পি,এইচ–ডি করব না। এম.এস. করে ফিরে যাব। আর মাত্র কটা দিন কষ্ট কর।
পরিবর্তন হল খুব ধীরে। আমিন সাহেব একদিন অবাক হয়ে লক্ষ করলেন রাহেলা চমৎকার ইংরেজি শিখেছে।
বাহ তুমি তাে চমৎকার ইংরেজি বল। কোথেকে শিখেছ ? একেবারে আমেরিকান একসেন্ট। কীভাবে শিখলে ?
টিভি দেখে দেখে শিখেছি। কী আর করব বল ?
দু’বছরের মাথায় চাকরি হল রাহেলার। আহামরি কিছু নয়। রিসার্চ ল্যাবে সূর্যমুখী ফুলের চারা বাছা। সেই বছর গাড়ি কিনলেন আমিন সাহেব। নাইনটিন সেভেন্টি ওয়ান
মডেল ডজ পােলারা। প্রকাণ্ড গাড়ি। নিজের গাড়িতে করে স্ত্রীকে নিয়ে গেলেন ডেডিলস লেকে। রাহেলার মনে হল সে বোধহয় আগের মত অসুখী নয়।
দেখতে দেখতে কতদিন হয়ে গেল। প্রচুর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দেশে যাওয়া হয়ে উঠলাে না। বেড়াতে যাবার জন্যেও নয়। একটা না একটা ঝামেলা থাকেই। পি এইচ–ডি‘র বছর দেশে যাওয়া যাবে না। নতুন চাকরি, দেশে যাওয়া যাবে না। ইমিগ্রেশন না হওয়া পর্যন্ত বের হওয়া ঠিক হবে না। নতুন বাড়ি কেনা হয়েছে। এখন বাড়ি ঠিকঠাক করতে হবে, দেশে যাওয়া পিছাতে হবে। প্রথম বাচ্চা হবে এ সময়টা তাে আমেরিকাতে থাকতেই হবে।
তারা প্রথম বারের মত যখন দেশে গেল তখন কনকির বয়স চার বছর। প্রায় এক যুগ পর দেশে ফেরা। কী দারুণ উত্তেজনা গিয়েছে।
Read more