রাহেলা অসন্তুষ্ট হলেন। তার কপালের চামড়ায় সূক্ষ্ম ভাজ পড়লাে, বাইরে চেয়ার পেতে বসলে বুঝি হুলুস্থুল হয়?
তা হয় না কিন্তু ফুলদানি রাখলে হুলুস্থুল হয়। তুমি ছয় ডলার খরচ করে ফুল আনিয়েছ মা।
বেশ তাে তােমার অপছন্দ হলে ফুলদানি তুলে নাও।
রুনকি অপ্রস্তুত হলাে। তার মা স্পষ্টই রেগে গেছেন। সে তার মাকে ঠিক বুঝতে পারে না। অত্যন্ত ছােট কারণে তিনি অসম্ভব রেগে যেতে পারেন। রুনকি হাসি হাসি মুখে বললাে, মা তুমি যদি চাও তাহলে আমি নীল শাড়িটা পরব।
আমার আবার চাওয়া চাওয়ি কী রুনকি? আমি কখনাে কারাে কাছে কিছু চাই নি।
রুনকি মুখ কালাে করে তার ঘরে চলে গেল । এমন একটি চমক্কার দিন কেমন করেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রুনকি তার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। এই ঘরে নিজের মনে কাদা যায়। উঁচু ভ্যলুমে গান বাজানাে যায়। এটি তার নিজের গােপন পৃথিবী।
টুকটুক করে টোকা পড়ছে দরজায়। নিশ্চয়ই বাবা। এমন শালীন ভঙ্গিতে বাবা ছাড়া আর কেউ দরজা নক করতে পারেন না। রুনকি নরম গলায় বললাে, কী চাও বাবা ?
দরজা খুলে বেটি। তােমার জন্যে একটা সারপ্রাইজ আছে। কী সারপ্রাইজ ? খুলেই দেখ।
রুনকি বেরিয়ে এলাে, তার দু‘চোখ ভেজা। চুল এলােমেলাে। তােমার জন্যে একটি গিফট প্যাকেট এসেছে। ইতালি থেকে। ইতালিতে কে আছে তােমার মা ?
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
টম। সামার কাটাতে গিয়েছে।
রুনকি প্যাকেট খুলে স্তম্ভিত হয়ে গেল। প্লাস্টার অব প্যারিসের তৈরি অপূর্ব একটি নারী মূর্তি। নিশ্চয়ই মাইকেল এঞ্জেলাের কোনাে ভাস্কর্যের ইমিটেশন। রুনকি গাঢ় স্বরে বললাে, কী সুন্দর দেখেছ ?
হ্যা সুন্দর। খুবই সুন্দর। মাকে দেখিয়ে আনি। রুনকি ছুটে বেরিয়ে গেল।
রাহেলা রান্না ঘরে। রান্না বান্নার কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। খাবার দাবার গরম রাখার জন্যে শুধু ওভেনে দিয়ে রাখা। অনেক রকম আয়ােজন হয়েছে তবু রাহেলার মনে হচ্ছে আয়ােজন পূর্ণাঙ্গ হয় নি। কাচামরিচ নেই ঘরে হর্নবাকারসে কাঁচামরিচ পাওয়া যায় নি। তিনি বা আমিন সাহেব কেউ অবশ্যি ঝাল খান না তবে প্রবাসী বাঙালিরা খাবার টেবিলে কাঁচামরিচ দেখতে ভালােবাসে।
মা দেখ টম কী পাঠিয়েছে। কোন টম ? পাগলা টম ?
কুনকি বেশ বিরক্ত হল । টম আবার কয়জন আছে যে পাগলা টম বলতে হবে ? রুনকি বললাে, মূর্তিটি আমি বাগানে সাজিয়ে রাখি মা ? তােমার অতিথিরা দেখলে অবাক হবে।
রাহেলা থেমে থেমে বললেন, না রুনকি, এটি তােমার ঘরেই থাক। মূর্তিটি অশালীন।
রুনকি স্তম্ভিত হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঝড়াে বেগে দোতলায় উঠে গেল।
অতিথিদের মধ্যে প্রথম আসলেন নিশানাথ রায়। গ্রান্ড ফোকস ইউনিভার্সিটির অঙ্কের প্রফেসর। ভদ্রলােকের বয়স ৫৫ কিন্তু দেখায় ৭০ এর মত । লম্বা দড়ি পাকানাে চেহারা। যে কোনাে নিমন্ত্রণে সবার আগে এসে উপস্থিত হন এবং নিরিবিলি একটি কোণ বেছে চোখ বন্ধ করে বসে থাকেন কিংবা ঘুমান। আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতেও ক্লাস নিতে গিয়ে একই কাণ্ড। তবু তিনি টিকে আছে কারণ ‘টপলজি’তে একজন প্রথম শ্রেণীর বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁকে এখনাে ধরা হয় (যদিও টপলজি তিনি ছেড়েছেন দশ বছর আগে)। অনেকের ধারণা গ্রান্ড ফোকস ইউনির্ভাসিটির নাম লােকে জানে কারণ প্রফেসর নিশানাথ এখানে মাস্টারি করেন।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
নিশানাথ বাবু তাঁর স্বভাব মত পাঁচটার দিকেই এসে পড়লেন এবং লজ্জিত স্বরে বললেন, দেরি করে ফেললাম নাকি ?
আমিন সাহেব হাসি মুখে বললেন, না দেরি হয় নি। চা দেব, না লিকার ?
নিশানাথ বাবু বিড়বিড় করে কী যেন বললেন। পরিষ্কার বােঝা গেল না। তিনি বেছে বেছে সবচে‘ পেছনের একটি চেয়ারে পা উঠিয়ে বসলেন। আমিন সাহেব মার্টিনির একটি বড় গ্লাস নিয়ে এসে দেখেন নিশানাথ বাবু চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন।
নিশানাথ বাবু নিন, মার্টিনি এনেছি। ইয়ে কী যেন বলে আমি অবশ্যি চা চেয়েছিলাম। চা নিয়ে আসতে পারি পানি গরম আছে। নিশানাথ বাবু তার উত্তর দিলেন না। চুপচাপ বসে রইলেন।
রাত আটটা বেজে গেল। অন্য দুজন নিমন্ত্রিতের কোনাে খোঁজ নেই। সফিকের ঘরে টেলিফোন করা হল কয়েকবার কেউ ধরলাে না। রুনকি বললাে, নিশ্চয়ই কোনাে অসুবিধা হয়েছে মা। তুমি এমন মুখ কালাে করে থেকো না।
কী আজেবাজে কথা বল রুনকি ? মুখ কালাে করব কেন? আমি সরি মা। ঠিক আছে খেতে বস।
নিশানাথ বাবু নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছেন। আমিন সাহেব একবার বললেন, রান্না কেমন হয়েছে নিশানাথ বাবু ?
নিশানাথ বাবু তার জবাব দিলেন না। তিনি কখনাে অপ্রয়ােজনীয় প্রশ্নের জবাব দেন। না। রুনকি বললাে, নিশা চাচার জিহ্বায় কোন টেস্টড নেই। তিনি যাই খান তাই তার কাছে ঘাসের মত লাগে। তাই না চাচা ?
Read more