সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৬)

রাহেলা অসন্তুষ্ট হলেনতার কপালের চামড়ায় সূক্ষ্ম ভাজ পড়লাে, বাইরে চেয়ার পেতে বসলে বুঝি হুলুস্থুল হয়

সবাই গেছে বনেতা হয় না কিন্তু ফুলদানি রাখলে হুলুস্থুল হয়তুমি ছয় ডলার খরচ করে ফুল আনিয়েছ মা। 

বেশ তাে তােমার অপছন্দ হলে ফুলদানি তুলে নাও। 

রুনকি অপ্রস্তুত হলােতার মা স্পষ্টই রেগে গেছেনসে তার মাকে ঠিক বুঝতে পারে নাঅত্যন্ত ছােট কারণে তিনি অসম্ভব রেগে যেতে পারেনরুনকি হাসি হাসি মুখে বললাে, মা তুমি যদি চাও তাহলে আমি নীল শাড়িটা পরব। 

আমার আবার চাওয়া চাওয়ি কী রুনকি? আমি কখনাে কারাে কাছে কিছু চাই নি। 

রুনকি মুখ কালাে করে তার ঘরে চলে গেল এমন একটি চমক্কার দিন কেমন করেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রুনকি তার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলএই ঘরে নিজের মনে কাদা যায়উঁচু ভ্যলুমে গান বাজানাে যায়এটি তার নিজের গােপন পৃথিবী। 

টুকটুক করে টোকা পড়ছে দরজায়নিশ্চয়ই বাবাএমন শালীন ভঙ্গিতে বাবা ছাড়া আর কেউ দরজা নক করতে পারেন নারুনকি নরম গলায় বললাে, কী চাও বাবা

দরজা খুলে বেটিতােমার জন্যে একটা সারপ্রাইজ আছেকী সারপ্রাইজ ? খুলেই দেখ। 

রুনকি বেরিয়ে এলাে, তার দুচোখ ভেজাচুল এলােমেলােতােমার জন্যে একটি গিফট প্যাকেট এসেছেইতালি থেকেইতালিতে কে আছে তােমার মা

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ 

টমসামার কাটাতে গিয়েছে। 

রুনকি প্যাকেট খুলে স্তম্ভিত হয়ে গেলপ্লাস্টার অব প্যারিসের তৈরি অপূর্ব একটি নারী মূর্তিনিশ্চয়ই মাইকেল এঞ্জেলাের কোনাে ভাস্কর্যের ইমিটেশনরুনকি গাঢ় স্বরে বললাে, কী সুন্দর দেখেছ

হ্যা সুন্দর। খুবই সুন্দরমাকে দেখিয়ে আনিরুনকি ছুটে বেরিয়ে গেল। 

রাহেলা রান্না ঘরেরান্না বান্নার কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছেখাবার দাবার গরম রাখার জন্যে শুধু ওভেনে দিয়ে রাখাঅনেক রকম আয়ােজন হয়েছে তবু রাহেলার মনে হচ্ছে আয়ােজন পূর্ণাঙ্গ হয় নিকাচামরিচ নেই ঘরে হর্নবাকারসে কাঁচামরিচ পাওয়া যায় নিতিনি বা আমিন সাহেব কেউ অবশ্যি ঝাল খান না তবে প্রবাসী বাঙালিরা খাবার টেবিলে কাঁচামরিচ দেখতে ভালােবাসে। 

মা দেখ টম কী পাঠিয়েছেকোন টম ? পাগলা টম

কুনকি বেশ বিরক্ত হল টম আবার কয়জন আছে যে পাগলা টম বলতে হবে ? রুনকি বললাে, মূর্তিটি আমি বাগানে সাজিয়ে রাখি মা ? তােমার অতিথিরা দেখলে অবাক হবে। 

রাহেলা থেমে থেমে বললেন, না রুনকি, এটি তােমার ঘরেই থাকমূর্তিটি অশালীন। 

রুনকি স্তম্ভিত হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলতারপর ঝড়াে বেগে দোতলায় উঠে গেল। 

অতিথিদের মধ্যে প্রথম আসলেন নিশানাথ রায়গ্রান্ড ফোকস ইউনিভার্সিটির অঙ্কের প্রফেসরভদ্রলােকের বয়স ৫৫ কিন্তু দেখায় ৭০ এর মত লম্বা দড়ি পাকানাে চেহারাযে কোনাে নিমন্ত্রণে সবার আগে এসে উপস্থিত হন এবং নিরিবিলি একটি কোণ বেছে চোখ বন্ধ করে বসে থাকেন কিংবা ঘুমানআমেরিকান ইউনিভার্সিটিতেও ক্লাস নিতে গিয়ে একই কাণ্ডতবু তিনি টিকে আছে কারণ টপলজিতে একজন প্রথম শ্রেণীর বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁকে এখনাে ধরা হয় (যদিও টপলজি তিনি ছেড়েছেন দশ বছর আগে)অনেকের ধারণা গ্রান্ড ফোকস ইউনির্ভাসিটির নাম লােকে জানে কারণ প্রফেসর নিশানাথ এখানে মাস্টারি করেন। 

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ 

নিশানাথ বাবু তাঁর স্বভাব মত পাঁচটার দিকেই এসে পড়লেন এবং লজ্জিত স্বরে বললেন, দেরি করে ফেললাম নাকি

আমিন সাহেব হাসি মুখে বললেন, না দেরি হয় নিচা দেব, না লিকার

নিশানাথ বাবু বিড়বিড় করে কী যেন বললেনপরিষ্কার বােঝা গেল নাতিনি বেছে বেছে সবচেপেছনের একটি চেয়ারে পা উঠিয়ে বসলেনআমিন সাহেব মার্টিনির একটি বড় গ্লাস নিয়ে এসে দেখেন নিশানাথ বাবু চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন। 

নিশানাথ বাবু নিন, মার্টিনি এনেছিইয়ে কী যেন বলে আমি অবশ্যি চা চেয়েছিলামচা নিয়ে আসতে পারি পানি গরম আছেনিশানাথ বাবু তার উত্তর দিলেন নাচুপচাপ বসে রইলেন। 

রাত আটটা বেজে গেলঅন্য দুজন নিমন্ত্রিতের কোনাে খোঁজ নেইসফিকের ঘরে টেলিফোন করা হল কয়েকবার কেউ ধরলাে নারুনকি বললাে, নিশ্চয়ই কোনাে অসুবিধা হয়েছে মাতুমি এমন মুখ কালাে করে থেকো না। 

কী আজেবাজে কথা বল রুনকি ? মুখ কালাে করব কেন? আমি সরি মাঠিক আছে খেতে বস। 

নিশানাথ বাবু নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছেনআমিন সাহেব একবার বললেন, রান্না কেমন হয়েছে নিশানাথ বাবু

নিশানাথ বাবু তার জবাব দিলেন নাতিনি কখনাে অপ্রয়ােজনীয় প্রশ্নের জবাব দেননারুনকি বললাে, নিশা চাচার জিহ্বায় কোন টেস্টড নেইতিনি যাই খান তাই তার কাছে ঘাসের মত লাগেতাই না চাচা ?

 

Read more

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *