হ্যালাে আমি সফিক।
রাহেলা শুকনাে গলায় বললেন, আমরা সবাই খেতে বসেছি, একটু পরে ফোন করতে পার ?
রাহেলা কঠিন মুখ করে খেতে বসলেন। রুনকি মায়ের দিকে না তকিয়ে বললাে, মা এটা কিন্তু তুমি ঠিক করলে না।
রাহেলা উত্তর দিলেন না। নিশানাথ বাবু বললেন, প্রচুর আয়ােজন করেছেন। মনেই হয় বিদেশ। রুনকি বললাে, মা ওদের হয়তাে বিশেষ কোনাে ঝামেলা হয়েছে। টেলিফোন নামিয়ে না রেখে তােমার উচিত ছিল...
আমার কী উচিত অনুচিত তা আমি তােমার কাছ থেকে শিখতে চাই না। তুমি ভাজা মাছ আরাে নেবে।
না। নিশানাথ বাবু আপনি নেবেন? না। নিশানাথ বাবু অবাক হয়ে বললেন, এটা ভাজা মাছ ? আমি ভাবছিলাম...।
রুনকি বললাে, তুমি শুধু শুধু রাগ করছ মা। ওদের নিশ্চয়ই বড় রকমের কোন ঝামেলা হয়েছে।
নিশানাথ বাবু বললেন, কাদের ঝামেলা হয়েছে ? যাদের আসবার কথা ছিল তাদের।
কী ঝামেলা ?
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
সেটা এখনাে জানা যাচ্ছে না। হয়তাে ভদ্রলােক বাথরুমে গিয়ে দেখেন বাথটাবে একটি ডেডবড়ি পড়ে আছে। ডেড বডিটির পিঠে একটি ওরিয়েন্টাল কাজ করা ছুরি।
আমিন সাহেব হেসে ফেললেন। হাসির কী হল বাবা ? হতেও তাে পারে।
নিশানাথ বাবু বললেন, এদেশে সবই সম্ভব। খুন–খারাবি এদের কাছে কিছুই না, অতি অসভ্য বর্বরের দেশ।
ঝামেলাটা কী হয়েছে তা জানা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। গাড়ি নিয়ে হাইওয়েতে আটকা পড়েছে। সফিকের প্রাচীন ফোর্ড ফিয়াসটার ট্রান্সমিশন কাজ করছে না। হাইওয়ের একটি রেস্ট হাউসে বসে আছে দু‘জন। রুনকি বললাে, রাস্তার মাঝখানে গাড়ি নিয়ে আটকা পড়া দারুণ এক্সাইটিং। রাহেলা জ কুঁচকালেন। ঠাণ্ডা স্বরে বললেন, এর মধ্যে এক্সাইটিং কী দেখলে তুমি ? সাধারণ মানুষদের মত ভাবতে শেখ। গাড়ি নিয়ে আটকা পড়াটা হচ্ছে যন্ত্রণা। এক্সাইটমেন্ট নয়।
তুমি এত রেগে রেগে কথা বলছ কেন মা? | রুনকি কথা বন্ধ করে গাড়ি নিয়ে ওদের খোজে যাও। তােমার বাবাকে পাঠাব না । সন্ধ্যা থেকে মার্টিনি খাচ্ছে, ওর হাত স্টেডি নেই।
কথাটা ঠিক না। দুপেগের মত মার্টিনি আমিন খেয়েছেন। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। রাহেলার মেজাজ চড়ে আছে। চুপ করে থাকাই ভাল। নিশানাথ বাবু বসার ঘরের সােফায় পা গুটিয়ে আবার ধ্যানস্থ হয়েছেন। আমিন তার পাশে এসে বসতেই তিনি বললেন বুঝলেন, অতি অসভ্য অতি বর্বর জাত।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
রাহেলা রুনকির সাথে গ্যারেজ পর্যন্ত গেলেন। রুনকির হাতে চাবি দিয়ে বললেন,
নতুন ছেলেটির সঙ্গে খুব দ্র ব্যবহার করবে। রুনকি অবাক হয়ে বললাে, আমি অভদ্র মা? কী বলছ তুমি ?
যা বলছি মন দিয়ে শােন। আমি চাই তুমি বাঙালি ছেলেদের সঙ্গে কিছুটা মেলামেশা কর।
রুনকি চুপ করে রইলাে। রাহেলা বললেন, তােমার একটি ভাল বিয়ে হােক সেটাই আমি চাই। আমি তােমাকে হ্যাপী দেখতে চাই। | বাঙালি ছেলের সঙ্গে বিয়ে হলেই আমি হ্যাপী হব ?তােমার তাে বাঙালি ছেলের সঙ্গেই বিয়ে হয়েছে। তুমি কি হ্যাপী ?
রাহেলা উত্তর দিলেন না। রুনকি বললাে, এইসব নিয়ে আমি এখন ভাবতে চাই না। আর আমি চাই না তুমিও ভাব। ইদানীং আমাকে নিয়ে তুমি বেশি চিন্তা করছ।
তুমি বলতে চাও চিন্তার কিছু নেই।
রুনকি গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। রাহেলা বললেন, শাড়ি একটু উপরের দিকে টেনে নাও। এক্সিলেটরের সঙ্গে যেন না লেগে যায়।
হাইওয়েতে নেমেই রুনকি গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে সত্ত্বরে নিয়ে এল । থ্যাণ্ড ফোকস থেকে ফার্গো ইন্টারস্টেট হাইওয়ে ফাকা থাকে বলেই পুলিশটুলিস তেমন থাকে না। যত ইচ্ছা স্পীড ভােলা যায় গাড়িতে। রুনকির বান্ধবী শ্যারণ একবার পঁচানব্বই পর্যন্ত তুলেছিল।
কী প্রচণ্ড কাঁপুনি গাড়ির! রুনকির এতটা সাহস নেই। সত্ত্বরেই তার খানিকটা হাত কাঁপে। তা ছাড়া ফল সিজন‘ বলেই গাছের পাতা ঝরছে। শুকনাে পাতার উপর দিয়ে গাড়ি গেলেই অদ্ভুত শব্দ হয়, কেমন যেন ভয় ভয় করে।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
আপনাদের নিতে এসেছি আমি। | আনিস মেয়েটিকে দেখে অবাক হলাে। হালকা পাতলা গড়নের বাচ্চা একটি মেয়ে। শিশুদের চোখের মত তরল চোখ। কেমন যেন অভিমানী পাতলা ঠোট।
আপনি বুঝি সেই টিচার ? আনিস ? আনিসের উত্তর দেয়ার আগেই মেয়েটি বললাে, আমি কিন্তু মাস্টারদের একটুও পছন্দ করি না। আপনি আবার রাগ করবেন না যেন।
আনিস হাসি মুখে বললাে, না আমি রাগ করবাে না। মাস্টাররা ক্লাসের বাইরে কিছু জানে না, জানতে চায়ও না। তাই কি ?
Read more