সাতকাহন পর্ব-(১৭)-সমরেশ মজুমদার

সাতকাহন

‘তােকে কি বলেছে ও? ‘না, বলল, তিৰি তােমার মত একটা মেয়েকে যদি কলকাতায় পেতাম তা হলে এমন মানাতাে না আমার চবিত্রটাব সঙ্গে, আহা! একটু অভিনয় করতে পারলেই হত ? 

‘তুই কি বললি ? ‘আমি আবার কি বলব ! শুনেই গলা শুকিয়ে কাঠ। ‘ত গিযেই দ্যাখ না। এই দাদাবাবু খুব বড় পরিচালক। গাধা পিটিয়ে ঘােড়া বানিয়ে নেয় । তােকেও ঠিক অভিনেত্রী বানিয়ে দেবে। দীপাবলী হাসল। 

‘অভিনেত্রী ? তিবি অবাক হয়ে তাকাল। ‘তুই সিনেমা দেখিসনি ? 

একবাব এখনে পুদা খাটিয়ে সিনেমা দেখিয়েছিল। সেই সিনেমায় যেসব মেয়েরা কথা বলে তারা অভিনেত্রী। সবাই খুব খাতির করে, অনেক টাকা পায়।’ 

‘না বাবা?’ ‘কেন ?’ দীপাবলীর খুব মজা লাগছিল । ‘খারাপ খারাপ মেয়েরা এসব কাজ কবে ! 

হাে হাে করে হেসে উঠল দীপাবলী এবং তার পবেই গম্ভীর হয়ে গেল, ‘শােন, খুব দরকার না হলে দাদাবাবুর সঙ্গে কথাবার্তা বলার দরকার নেই। 

‘কেন খুব অবাক হয়ে গেল তিবি। 

থমকে গেল দীপাবলী। এই কথাগুলাে সে প্রায় অসাডে বলেছে। বলাব আগে ভাবেনি। এখন মনে হল না বললেই ভাল ছিল। তিরি তার দিকে এখনও তাকিয়ে আছে। অতএব তাকে বলতেই হল, ‘দাদাবাবুর মাথার ঠিক নেই। এই আমকেই ধরে অভিনয় করাতে চেয়েছিল। তুই এখানকার মেয়ে। তাের ওসবে দরকার নেই। 

সাতকাহন পর্ব-(১৭)

তিরির মুখ সহজ হল, দীপাবলী হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তিনটে বাজল। রােদ তখনও সমানে তেজী। কিন্তু আর দেরি করা সম্ভব নয়। আধঘণ্টা আগে খাওয়া শেষ করেছে দীপাবলী । এস ডি ও-র অফিস থেকে ঘুরে আসতে গেলে এখনই রওনা হওয়া দরকার । আজই যদি নেখালির এবং আশেপাশের গ্রামের কুয়াে এবং নলকূপের এস্টিমেট থু প্রপার চ্যানেল পাঠানাে যায় তা হলে কাজ হতে বেশি দেবি হবে না। তবু আরও একটু নিশ্চিত হবার জন্যেই দীপাবলী ঠিক করলে এস ডি ওকে বলেই : একটা অ্যাডভান্স কপি সে পাঠাবে মন্ত্রীর কাছে। লাল ফিতের বাঁধন টপকে থু প্রপার চ্যানেলের চিঠিটা পৌছবার আগেই তাতে বেশি কাজ হবে। 

ছাতা নিয়ে বেরুবার আগে সে তিরিকে পই পই করে বলে গেল শমিত এলে খাবার দিতে। সে রাত আটটার মধ্যেই ফিরবে । লাস্ট বাট ওয়ান বাসটা ওই সময়ের মধ্যেই এখান দিয়ে ফিরে যায়। মাথার ওপরে ছাতি থাকা সত্ত্বেও হাঁটাটা সহজ হচ্ছে না। পা এর মধ্যেই জ্বলতে শুরু করেছে। গরম হলকা লাগছে শরীরে।

বাড়ি বা অফিস থেকে মিনিট আটেক হাঁটার পর বাস রাস্তা। এদিকের বাসের একটাই গুণ বা দোষ হল হাত দেখালেই দাঁড়িয়ে যায়। তার ওপর মহিলা হলে কথাই নেই। স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়াবার প্রয়ােজন হয় না। দীপাবলীর প্রায়ই মনে হয় তার অফিসে যদি একটা গাড়ি থাকত তাহলে কাজের খুব সুবিধে হত। ছেলে হলে সাইকেল চেপে অনেক জায়াগায় যাওয়া যায়। মাঝে মাঝেই মনে হয় সরকারি গাড়ি পাওয়ার যখন কোন সম্ভাবনাই নেই তখন সাইকেলটা যদি শিখে নিতে পারে  

মন্দ হয় না। চা বাগানে থাকতে বেশ কয়েকবার অমরনাথের সাইকেল নিয়ে চেষ্টা করেছিল বিয়ের আগেই। সাইকেলটা সেই বয়সের তুলনায় বড় ভারী ছিল।

সাতকাহন পর্ব-(১৭)

আর বিয়ে এবং বিধবা হবার পর তাে জীবনযাত্রাই পালটে গেল। জীবনযাত্রা শব্দটা মনে হতেই হাসি এল। মানুষ যেভাবে জীবনযাপন করে তাই তার জীবনযাত্রা। একের সঙ্গে অন্যের যেমন মিল নেই তেমনি একের এখনকার সঙ্গে আগামীকালের কোন সাদৃশ্য থাকবে এমন কোনও কথাও নেই। আজকাল মনের ভেতরে এক ধরনের সুখ বুদ্বুদ তােলে, সে নিজের জীবনের অবশ্যম্ভাবী চেহারাটা বদলে ফেলতে পেরেছে। 

দুপুরের বাসে ভিড় সামান্য কম থাকে। তাকে দেখে কন্ডাক্টর যে সুবিধে করে দিল তা আজ চুপচাপ গ্রহণ করল দীপাবলী। প্রতিবাদ করে লাভ নেই। তা ছাড়া এই গরমে ভিড়ে প্রতিবাদ করে জেদ ধরে থাকলে অসুস্থ হবার সম্ভাবনাই বেশি। বাসের জানলা তাপের হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে এমনিতেই বন্ধ রাখা হয়েছে। বসা অবস্থাতেও কুলকুল করে ঘামতে লাগল সে। বিবেকের ব্যাপারটাই যেন গলে গলে পড়ছিল। 

রিকশা নিয়ে এস ডি ওর অফিসে পৌঁছে সে শুনতে পেল ভদ্রলােক ডি এমের কাছে গিয়েছে। অফিসে কাগজপত্র জমা দিয়ে সে প্রধান কেরানিকে বারংবার অনুরােধ করল যাতে কালকেই কাগজপত্র এস ডি ও নােট দিয়ে পাঠিয়ে দেন ওপরতলায়। কাগজে একবার চোখ বুলিয়ে প্রধান কেরানি অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এসবের কথা সাহেব জানেন ? 

হ্যাঁ। মন্ত্রীমশাই যখন নেখালিতে গিয়েছিলেন তখন উনি তাে সঙ্গে ছিলেন। ‘আহা, তারপর কি ওর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেছেন? 

না। আলাদা কথা বলতে হবে কেন? বৃদ্ধ ভদ্রলােক মাথা নাড়লেন, তা হলে এটা পাস হবে না। ‘মানে ? মন্ত্রী আমাকে নিজে বলে গিয়েছেন ! উত্তেজিত হল দীপাবলী। 

অনেক বছর কাজ করছি দিদি, আমার কথা আপনি শুনে রাখুন, ওর সঙ্গে কথা না বলে আন পাঠালে তা ওপরতলা থেকে পাস হবে না। মাথা নাড়লেন ভদ্রলােক।

সাতকাহন পর্ব-(১৭)

‘আপনি একথা বলছেন কেন ? ‘আপনি যে এস্টিমেট দিয়েছেন, এই যে এতগুলাে কয়াে খুঁড়তে এত লাগবে, এতগুলাে নলকুপের জন্যে এত, এগুলাে তাে উনি সাটিফাই করবেন, তাই না ? 

‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। এসবে একটুও বাড়ানাে রেট নেই। ‘সেটা তাে উনি যাচাই না করে বুঝবেন না। যাচাই করতে হলেই আমায় ডেকে বলবেন, হরিহরবাবু একটু বাজারে ঘুরে দেখুন তাে। 

‘তাতে অসুবিধে কি হল ? 

“ওঃ, আপনি দেখছি কিছুই বােঝেন না। ওসব করতে গেলে টাইম লাগবে। কাল পাঠানাে যাবে না। আবার সাতদিন ধরে দেখার পরও আপনার দেওয়া রেটের সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন সাহেব। তাই বলছি কি, অনেক টাকার ব্যাপার তাে, একবার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে নিন, কাল সকালেই সদরে পাঠিয়ে দেব। 

অতএব এস ডি ওর সঙ্গে দেখা না করে ফেরার কোন উপায় নেই। অবশ্য এখনও হাতে অনেক সময় আছে। প্রধান কেরানি আখাস দিলেন ভদ্রলােক বিকেলের মধ্যেই ফিরবেন। সে একটু ঘুরে আসছে বলে অফিস থেকে বের হল। বাসের জন্যে অন্তত দু ঘণ্টা অপেক্ষা 

করা যায়। দীপাবলী একটা রিকশা নিয়ে সােজা হাসপাতালে চলে এল। মফস্বলের হাসপাতাল, তার ওপর সাব ডিভিশন শহরের। চেহারা দেখেই ভক্তি আসে না। জলপাইগুড়ির সদর হাসপাতালে এর চেয়ে বেশী শ্ৰী ছিল ? সতীশবাবুর স্ত্রীর বেড খুঁজে পেতে খুব অসুবিধে হল না। লম্বা হল ঘরে পর পর রুগীরা শুয়ে আছেন।

সাতকাহন পর্ব-(১৭)

তার একেবারে শেষ বিছানার পাশে সতীশবাবু দু হাতে মাথা ধরে বসে আছেন কুঁজো হয়ে । বিছানায় যে মহিলা পড়ে আছেন তিনি জীবিত না মৃত বােঝা যাচ্ছে না দূর থেকে। কাছে গিয়ে দীপাবলী চাপা গলায় ডাকল, ‘সতীশবাবু।মুখ থেকে হাত সরিয়ে দীপাবলীকে দেখেও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না ভদ্রলােক। দীপাবলী ওর স্ফীত চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কি হয়েছে ? 

হঠাৎ সতীশবাবু হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। সেই কান্নার শব্দে পাশের বিছানায় রুগীরা এবং তাদের কাছে আসা মানুষেরা অবাক চোখে তাকাল। দীপাবলী তড়িঘড়ি শক্ত গলায় বলল, “আঃ, সতীশবাবু। আপনি বাইরে আসুন। 

ঘব থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চলে এল সে অস্বস্তি এড়াতে । পিছু পিছু চোখ মুছতে মুছতে সতীশবাবু বেরিয়ে এলেন, ম্যাডাম, আমার সব শেষ হয়ে গেল।

 

Read more

সাতকাহন পর্ব-(১৮)-সমরেশ মজুমদার

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *