সাতকাহন পর্ব-(৭)-সমরেশ মজুমদার

সাতকাহন

কি আশ্চর্য ! কারা এসেছিল ? ‘নেখালির ওরা ।

ঘরে সবাই একদম চুপ। এই সময় বাইরে একটা জিপ এসে থামল। এস ডি ও কৌতুহলী হয়ে বেরিয়ে গেলেন, পেছনে দীপাবলী । জিপ থেকে নামছে অর্জুন নায়েক। সে তার দুই সঙ্গীকে নির্দেশ দিচ্ছে কিছু নামাতে। তারা ভারী দুটো বাক্স নামাচ্ছে। এস ডি ও চেঁচিয়ে উঠলেন, “আরে আপনি ?’  অর্জন ঘরের ছায়ায় চলে এল, এই আর কি! শুনলাম মিনিস্টার নেখালি দেখতে এসেছেন তাই এই গরমে ওঁর সেবার জন্যে চলে এলাম।

কোল্ড ড্রিঙ্কস আর তেমন কোল্ড নেই যদিও। নমস্কার মেমসাহেব, নেখালিতে আজ সকাল থেকে কুয়াে খুঁড়তে লাগিয়ে দিয়েছি। আপনার আদেশ অমান্য করিনি।  দীপাবলী দেখল দু-হাতে অর্জুনের আনা দুটো ঠাণ্ডা পানীয়ের বােতল নিয়ে এস ডি ও মন্ত্রীকে দেবার জন্যে ছুটে যাচ্ছেন। অর্জুন ফিস ফিস করল, ‘মিনিস্টার কোথায় ? 

এরকম একটা দিনের কথা অনেককাল ভুলতে পারবে না দীপাবলী। সন্ধের মুখে জিপগুলাে যখন চলে গেল শহরের দিকে তখন মাটির রাস্তায় একা সে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এখন জিপের আরােহীদের অবস্থান বদল হয়েছে। সে নেমে যাওয়ার পরে মন্ত্রীমশাইয়ের জিপে শুধু অর্জুন নায়েক ছাড়া আর কেউ নেই। ডি এম, এস ডি ও এবং মন্ত্রীর পি এ অর্জুন নায়েকের জিপে উঠেছিল মন্ত্রীর ইঙ্গিতে। সমস্তটা পথ মন্ত্রী অর্জুনের সঙ্গে কি কথা আলােচনা করবে তা তিনিই জানেন। আর মীর কাছে এমন গুরুত্ব পাওয়া মানে এস ডি ও-ডি এমের সম্ভ্রম আদায় করা একথা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয় কারাে । 

সাতকাহন পর্ব-(৭)

দীপাবলীর অফিসে সাততাড়াতাড়ি ছুটে এসেও সতীশবাবু যা করতে পারতেন না অর্জুন তা করে দিল অনায়াসে। প্রত্যেকের জন্যে অল খাবার, ঠাণ্ডা পানীয়, মন্ত্রীকে সারা সময় হাওয়া করার জন্যে একজন সেবক থেকে শুরু করে যা কিছু তা দীপাবলীর পক্ষে এখানে ব্যবস্থা করা অসম্ভব ছিল। অফিসের অন্য কর্মচারীরা মন্ত্রী এসেছেন শুনে মাথায় সূর্য নিয়ে 

ছুটে এসেছিল কিন্তু ঘরে ঢুকতে পারেনি। বাইরের ঘরে ডি এম এবং এস ডি ও বসেছিলেন। মন্ত্রীমশাই দীপাবলীব অফিসঘরে। অর্জুন নায়েক একবার হাতজোড় করে প্রস্তাব দিয়েছিল যে ওখান থেকে তার বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি নয়, মন্ত্রীমহাশয় যদি অনুগ্রহ করে রাজি হন তাহলে সেখানে বেশ আবামে বিশ্রাম করতে পারবেন। মন্ত্রীমশাই রাজি হননি। বলেছেন, কাজে এসেছি, বিশ্রাম কবব কি ? এই যে মেয়ে, শােন এদিকে। দীপাবলীকে ডেকেছিলেন তিনি, ওসব দোকানের খাবার ওদের দিতে বল। তােমার জন্য বাসায় ভাত হয়নি ? 

‘হয়েছে। দীপাবলী জবাব দিয়েছিল । ‘তাহলে সেটাই দুজনে ভাগাভাগি করে খাই চল। দীপাবলী মুখ নিচু করেছিল। আপনি খেতে পারবেন না।’ ‘কেন ? পারব না কেন? মন্ত্রী অবাক হয়েছিলেন। খুব সামান্য খাবার। এখানে রােজ সবকিছু পাওয়া যায় না। 

হাে হাে করে হেসেছিলেন ভদ্রলােক, পাঁচ বছর ইংরেজের জেলে কাটিয়েছি হে, সেখানে কি রাজভোেগ খেতে দিত ? তাছাড়া বাইরে যখন থাকতাম তখন কি রােজ খাওয়া জুটত। পােস্ত আছে বাড়িতে ? | দরজার ওপাশে দাঁড়িয়েছিল তিবি। কথা বলতে নিষেধ কবা সত্ত্বেও সে বলে উঠেছিল, ‘আজ তাে পােস্ত আর ডিমের ঝােল হযেছে। 

‘বাঃ । চমৎকার ! তাই দাও। ভাগে তােমার কম পড়লে আর কি করা যাবে! 

সাতকাহন পর্ব-(৭)

মন্ত্রীমশাই ভেতরের ঘরে গিয়ে তার সঙ্গে খেলেন। তরকারি বেশি ছিল কিছু কিন্তু তিরির ভাগ্যে আজ ডিম জোটেনি। মেয়েটাও যেন চুপসে গিয়েছিল। দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এসেছেন এবং তিনি যখন অর্জুন নায়েকের নিয়ে আসা খাবার খাননি তখন তাঁকে ভাল ভাবে যত্ন করা অবশ্যকর্তব্য। কিন্তু সেইসময় দীপাবলী মন্ত্রীমশাইয়ের ব্যবহারে আপ্লুত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের পূর্ণমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যাঁর বেশ নামডাক, তিনি তার সামনে বসে প্রফুল্ল মুখে অতি সাধারণ খাবার খেয়ে বললেন, ‘রান্নটি তাে জব্বর হে!’ এতে শ্রদ্ধা না বেড়ে যাওয়ার কোন কারণ নেই। 

খাওয়দাওয়ার পর দীপাবলীর অফিসঘরে তিনি তিনজনকে নিয়ে বসলেন। তখনও অর্জন নায়েক ওর কাছে ঘেষতে পারেনি। বাইরের ঘরে পুলিশ এবং পি. এর সঙ্গে বসেছিল। মন্ত্রীমশাই একটি কাগজ কলম টেনে নিয়ে দীপাবলীকে জিজ্ঞাসা করলেন, কী নাম যেন বললে তখন ? ও হাে, নেখালি। নেখালির মত আর কটা গ্রাম আছে এদিকে ? 

দীপাবলী কিছু বলার আগে এস ডি ও বললেন, ‘আমার সাব-ডিভিসনে প্রায় সমস্ত গ্রামের দশা একইরকম সার।। 

‘একথা আজকের মিটিং-এ বলেননি কেন?’ মন্ত্রীমশাই কড়া গলায় জানতে চাইলেন। 

এস ডি ও মাথা নিচু করলেন। মন্ত্রীমশাই দীপাবলীর দিকে তাকালেন, ‘ঠিক কটা গভীর নলকূপ অথবা কুয়াে খোঁড়া দরকার বলে। 

‘আমি শুধু নেখালি নিয়ে ভেবেছি স্যার।’ দীপাবলী জবাব দিল । ‘ভেরি ব্যাড। একই এলাকার অন্য গ্রামগুলাের অবস্থা আলাদা হতে পারে না। 

দীপাবলীর মনে পড়ল সতীশবাবু বলেছিলেন অন্তত আটটি গ্রাম একইরকম খরায় পুড়ছে। সে বলল, “অন্তত চব্বিশটা দরকার। 

সাতকাহন পর্ব-(৭)

মন্ত্রী সেটি লিখলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, কাছাকাছি নদীগুলােয় তাে এসময় 

একফোঁটা জল থাকে না। আপনারা একটা কিছু ভাবুন যাতে এই অঞ্চলে জল স্টোর করা যায়। আপাতত ওই চব্বিশটার ব্যবস্থা আমি করছি । সেইসঙ্গে মাসখানেকের জন্যে ওদের চাল যাতে দেওয়া যায়! তাব বেশী দেবার সামর্থ্য আমার হাতে নেই। আমি মনে করি 

শুধু সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভর করে এতগুলাে গ্রামের মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। ওদের রােজগাবের ব্যবস্থা হয় এমন কোন প্রকল্প তৈরি করে আমার কাছে পাঠান, আমি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব ।। 

বােদের তেজ কমে গেলে তিনটে জিপ রওনা হয়েছিল নেখালরি দিকে। এবার সঙ্গে ছিলেন সতীশবাবু। তিনি অবশ্য দুপুরেই খবর পাঠিয়েছিলেন গ্রামে । রাস্তা থেকেই দেখা গেল গ্রামসুদ্ধ লােক ভিড় জমিয়েছে সামনে। ওদেব দেখতে পেয়ে ডি এম বলেছিলেন, ‘বিক্ষোভ হতে পারে। পুলিশদের তৈরি থাকতে বলুন। 

কিন্তু কেউ একটা শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করল না। জিপগুলাে ঢুকে গেল গ্রামের মাঝখানে। জিপ থেকে নামামাত্র দীপাবলী হতভম্ব। মন্ত্রীমশাই জিজ্ঞাসা করলেন, “ওখানে কি হচ্ছে ? 

সতীশবাবু ততক্ষণে ছুটে গিয়েছেন গ্রামের মানুষদের কাছে যারা খানিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছিল।

সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসে তিনি দীপাবলীকে নিচু গলায় কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু 

মন্ত্রীমশাই ধমক দিলেন, “আঃ, যা বলার জোরে বলুন। 

সতীশবাবু দুই হাত জোড় করে বললেন, ‘আজ্ঞে, কুযযা হচ্ছে। দুটো। ‘কুয়াে?’ মন্ত্রীমশাই দীপাবলীর দিকে তাকালেন, “কি ব্যাপার ? 

সাতকাহন পর্ব-(৭)

সতীশবাবু বললেন, “আজ্ঞে, ওরা বলল অর্জুনবাবু আজ সকালে লােক পাঠিয়েছেন কুয়াে খোঁড়ার জন্যে। এ বাবদ যে টাকা কেটেছিলেন তাও ফেবত দিয়েছেন। 

‘অর্জুনবাবুটি কে?’ মন্ত্রীমশাই জানতে চাইলেন। দুটো হাত বুকের ওপর জড়াে করে এগিয়ে এল অর্জুন, ‘স্যার, আমার নাম অর্জুন। ‘ও আপনি। দুপুর থেকে দেখা লােকটিকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করলেন মন্ত্রীমশাই, আপনি নিজের পয়সায় এখানে কুয়াে খুঁড়ে দিচ্ছেন ?

হাত কচলালাে অর্জুন, ‘আজ্ঞে, এরা খুব কষ্টে আছে, জল পায় না, তা উনি আমাকে সেকথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। হাত বাড়িয়ে দীপাবলীকে দেখাল, ‘আমার মনে হল জীবনে তাে অনেক রােজগার করব কিন্তু কাউকে যদি জীবন ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করি সেটাই পুণ্য। জলের আর এক নাম তাে জীবন। 

“বাঃ, খুব ভাল !

আপনাদের মত ব্যবসায়ীরা যদি নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে এভাবে গরিব মানুষের সেবার জন্যে এগিয়ে

আসেন তাহলে সরকারের কাজ সহজ হয়ে যায়। 

 

Read more

সাতকাহন পর্ব-(৮)-সমরেশ মজুমদার

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *