সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-১৪

-সাইকেলরিকশাে বা একাগাড়ি? 

চা-ওয়ালা হাসল। আজ্ঞে না। খামােকা কেন রাত্তিরবেলা ওরা আসবে? বাবুমশাই! আপনি বড় ভুল করেছেন। আসবার সময় দেখেননি সােনাগড় জংশনে হঠাৎ ট্রেনের কামরায় বেজায় ভিড় হয়েছিল?

ভৌতিক গল্পসমগ্র

মনে পড়ে গেল। বললুম,—তুমি ঠিক বলেছ। কামরা একেবারে ফঁকা ছিল। হঠাৎ ওই জংশনে ভিড়ের চাপে কোণঠাসা হয়ে গিয়েছিলাম। 

ব্যাপারটা হল, এ তল্লাটের অসংখ্য লােক সােনাগড়ে কলকারখানায় চাকরি করে। তারা প্রতি শনিবারে বাড়ি ফেরে। রােববারটা কাটিয়ে আবার সােমবার সােনাগড় যায়। আপনি যদি ট্রেন থেকে নেমেই ওদের সঙ্গে দৌড়ে আসতেন, তা হলে হয়তাে বাসে বা সাইকেলরিকশাে, নয়তাে এক্কাগাড়িতে ঢুকে যেতে পারতেন। হ্যা সহজে পারতেন না। একটু কসরত করতে হতাে, এই যা! 

এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারলুম। নির্মলের ওপর রাগ হল। এই ব্যাপারটা আমাকে তার খুলে বলা উচিত ছিল। 

কিন্তু আর রাগ করে লাভ নেই। তাছাড়া নির্মলের মেয়ের অন্নপ্রাশন কাল রবিবার। আমি কবে যাব, নির্দিষ্ট করে তাকে তাে বলিনি! শুধু বলেছিলুম, নিশ্চয় যাব। শনিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করিস। 

ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-১৪

বললুম,—এক কাপ চায়ের ব্যবস্থা করা যায় না দাদা? | চা-ওয়ালা গম্ভীরমুখে মাথা নাড়ল,না বাবুমশাই! উনুনে আমার রাতের রান্না শেষ করে জল ঢেলে দিয়েছি। আর চা করার কোনও উপায় নেই। 

আচ্ছা, এখানে হরির হােটেলটা কোথায় ? 

লােকটা যেন চমকে উঠল-হরির হােটেল। এর আগে কখনও হরির হােটেলে খেয়েছিলেন নাকি? 

—না। আমি এই প্রথম এখানে আসছি। হরির হােটেলের কথা স্টেশনমাস্টারের মুখে শুনলুম। 

—ও। হরির হােটেলে যখন যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে, চলে যান। তবে একটু দেখেশুনে যাবেন। 

বলে চা-ওয়ালা আমার মুখের সামনেই দোকানের ঝাপ ফেলে দিল। এখানে দেখছি সবই অদ্ভুত। লােকজনও অদ্ভুত! হরির হােটেলে যেতে দেখেশুনে যাব কেন? কিছু বােঝা গেল না। 

এতক্ষণে চাদ আরও উজ্জ্বল হয়েছে। সব দোকানপাট বন্ধ। শুধু শেষদিকটায় আলাে জ্বলছে। সেখানে গিয়ে দেখলুম, একটা ঘর খােলা আছে। দরজার কাছে টেবিলের সামনে একজন রােগাটে গড়নের কালাে রঙের লােক বসে আছে। পরনে ধুতি আর হাতকাটা ফতুয়া। ভেতরে দুসারি লম্বা বেঞ্চের সঙ্গে উঁচু ডেস্ক আঁটা। দেখেই বােঝা যায় এটা একটা হােটেল। 

এই তা হলে হরির হােটেল? লােকটি আমাকে দেখেই কেন যেন সবিনয়ে 

হরির হােটেল করজোড়ে নমস্কার করল। আমিও নমস্কার করে বললুম,—এটাই কি হরিবাবুর হােটেল ? 

ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-১৪

সে জিভ কেটে মাথা নেড়ে বলল,“আজ্ঞে স্যার, দয়া করে আমাকে বাবু বলবেন না। আমি একজন সামান্য লােক। বাইরে টাঙানাে সাইনবাের্ড দেখুন! লেখা আছে অন্নপূর্ণা হােটেল। কিন্তু এ তল্লাটে সবাই বলে হরির হােটেল।। 

ঠিক এই সময় আমার মনে পড়ে গেল, আজ বেলা এগারােটায় খেয়েছি। তা:পর ট্রেনে বার তিনেক বিস্বাদ চা। আর একই সময়ে ডাল-ভাতমাছের ঝােলমিশ্রিত লােভনীয় খাদ্যের তীব্র ঘ্রাণ আমার বাঙালি পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধার উদ্রেক করল। 

সটান হােটেলে ঢুকে কাছের বেঞ্চে বসলুম। ব্যাগটা একপাশে রেখে বললুম, —আমার খুব খিদে পেয়েছে। শিগগির ব্যবস্থা করুন হরিবাবু। ডাল-ভাত যা হােক— 

হরি ডাকল,খাদা! ও তেঁদু! ঘুমােলি নাকি? 

ভেতর থেকে ঢােলা হাফপ্যান্ট পরা একটা নাদুসনুদুস গােলগাল গড়নের যুবক এসে একগাল হেসে বলল,তখন তােমাকে বলেছিলুম না হরিদা, দু-মুঠো চাল বেশি করে নিই? আর তরকারি তাে অনেক আছে। 

হরি বলল,—তা হলে স্যারকে একখানা পুরাে মিল দে! 

কিছুক্ষণের মধ্যে গােগ্রাসে এক থালা ভাত-ডাল-তরকারি-মাছ পরম তৃপ্তিতে খেয়ে সেঁকুর উঠল। হাতমুখ ধুয়ে এবং মুছে বললুম,অপূর্ব! খাসা আপনার হােটেলের রান্না! খেয়ে এমন তৃপ্তি জীবনে পাইনি! 

হরি বলল,—অথচ ব্যাটাচ্ছেলেরা আমার হােটেলের বদনাম রটায়! কী আর বলব স্যার? আমার নামে থানায় পুলিশের কাছে নালিশ পর্যন্ত করেছিল। যাকগে সেসব কথা। আপনি আমার অতিথি। আপনার কাছে দাম নেব না। 

ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-১৪

কিছুতেই হরি মিলের দাম নিল না। অবশেষে বললুম, ঠিক আছে। তাহলে আমাকে রাত্রে থাকার জন্য একটা ঘর ভাড়া দিন।। 

 হরি জিভ কেটে বলল,ঘর তাে নেই স্যার! আমার হােটেল শুধু খাওয়ার হােটেল। এখানে থাকার ব্যবস্থা নেই। আমি আর খ্যাদা ওপরের ঘরে রাত্তির কাটাই। নিচে কি থাকবার জো আছে? নানা উপদ্রবের চোটে অস্থির হতে হবে। 

কী উপদ্রব? হরিবাবু! আমি এই বেঞ্চে শুয়ে রাত কাটাতে পারব। কোনও উপদ্রব গ্রাহ্য করব না। 

 হরি হাসল। আপনার মাথা খারাপ? কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমারও খিদে পেয়েছে। তা আপনি যাবেন কোথায় ? 

কাঞ্চনপুর। 

—দিব্যি জ্যোৎস্না-রাত্তির! মােটে তাে তিন কিলােমিটার রাস্তা। হাঁটতে-হাঁটতে চলে যান। কোনও ভয় করবেন না। আমাদের এ তল্লাটে আর যা কিছু থাক, চোর ছিনতাইবাজ-ডাকাত নেই। মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে চলে যান। 

 

Read More

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-১৫

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *