হিমু এবং হার্ভার্ড PhD বল্টুভাই পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

হিমু এবং হার্ভার্ড PhD বল্টুভাই

বাংলাদেশে এসে দামি হোটেলে বসে সময় কাটাচ্ছি। জানোলা দিয়ে একবার বাইরেও তাকাচ্ছি না। হিমু বলেছে জনৈক কেরামত আমার মাথার জন্ট খুলে দেবে। সে নাকি কোন রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি। আমি হিমু নামের পেছনে লিখলাম ‘কেরামত’, তারপর লিখলাম ‘তুতুরি ’। ‘তুতুরি’ নাম লেখার পেছনে কোনো ফ্বয়েডিয়ান সাইকোলজি কি কাজ করছে?

আমি ‘তুতুরি’ নামটা কেটে দিলাম। নারীসঙ্গ আমার প্রিয় না। তাদের আমার আলাদা প্রজাতি মনে হয়। পৃথিবী নারীশূন্য হলে ভালো হতো।হিমু মাথায় ‘ভূত’ চুকিয়ে গেছে। এই বিষয়গুলি Catalyst-এর মতো কাজ করে। catalyst নিজে কোনো রিঅ্যাকশনে অংশগ্রহণ করে না। তবে অন্য রিঅ্যাকশন শুরু বা শেষ করতে সাহায্য করে।আমার সিস্টেমে ভূত ঢুকিয়ে দেওয়ায় হয়তো অন্য কোনো সমস্যা তৈরি হবে।রুমের টেলিফোন বেজে যাচ্ছে।

নিতান্ত অনিচ্ছায় আমি টেলিফোন ধরলাম।বল্টুভাই, স্নামালিকুম।আপনি কে? আমি হিমু। কিছুক্ষণ আগেই তো তোমার সঙ্গে কথা হলো, আবার টেলিফোন করেছ কেন?আপনি যে ভূতের বইটা লিখবেন তা নিয়ে আরেকটা আইডিয়া এসেছে। স্যার, বলব? আমি বুঝতে পারছি রেগে যাচ্ছি, তারপরেও রাগ সামলে বললাম, বলো শুনছি।বাংলা ভূতের সঙ্গে আমেরিকান ভূতের একটা তুলনামূলক আলোচনা করলে কেমন হয়?

এই বিষয়ে কথা বলতে ভালো লাগছে না।হিমু বলল, স্যার! প্লিজ, আমাকে দুটা মিনিট সময় দিন। ভূতের বইয়ে বিজ্ঞান নিয়ে আসুন। মানুষ মরলে ভূত হয়। ভূত মরলে কী হয় এই ধরনের আলোচনা। মাঝে মাঝে বিকট সব ইকোয়েশন দিয়ে দিন। যে ইকোয়েশনের আগামাথা কেউ কিছু বুঝবে না।তোমার কথা কি শেষ হয়েছে?

মাত্র এক মিনিট পার হয়েছে। আরও এক মিনিট বাকি আছে স্যার। আর এক মিনিট কি পাব? আমি বললাম, You go to hell. বলেই খারাপ লাগল।কাউকে নরকে যেতে বলার অর্থ হচ্ছে নরকে বিশ্বাস করা। যে নরকে বিশ্বাস করবে তাকে স্বর্গেও বিশ্বাস করতে হবে। স্বৰ্গে বিশ্বাস করলে ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে হবে। ঈশ্বরে বিশ্বাস করলে ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করতে হবে। ভাগ্যে বিশ্বাস করতে হবে। কোনো মানে হয়?

হিমু হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে। আমি টেলিফোন রেখে দিলাম। হ্যালো হ্যালো করতে থাকুক। আমার রাগ আরও বেড়েছে। লেখক মার্ক টোয়েন বলেছেন, রাগ কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে পছন্দের কোনো বইয়ের কয়েকটা পাতা ছিড়ে ফেলা। ছেঁড়ামাত্ৰ মনে হবে, হায় হায় কী করলাম! প্রবল হতাশা তৈরি হবে। হতাশার নিচে রাগ চাপা পড়ে যাবে।

আমার হাতে বাংলা ডিকশনারি ছাড়া কোনো বই নেই। তার চারটা পাতা ছিঁড়ে কুচি কুচি করে বাতাসে উড়িয়ে দিলাম। ছেড়া কাগজের একটা টুকরা পড়ল আমার কোলে। সেখানে লেখা—‘অনিকেত’। অনিকেত শব্দটার মানে কী? আমার কাছে মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে শব্দটার মানে জানা দরকার।

যে করে হোক ipad খুঁজে বের করে পিঁপড়া মারতে হবে। সেখানে আরেকটা খেলা আছে, নাম মনে হয় office jerk, তার গায়ে নানান জিনিসপত্র ছুঁড়ে মারা যায়। সে ব্যথা পেয়ে আহ্‌ উহ্‌ করে, তাতেও রাগ কমে।অতি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের চেনা যায় ‘কান’ দিয়ে। তাদের দুটি ক্যানের একটি চ্যাপ্টা ধরনের হয়। কনের সঙ্গে মোবাইল ধরে সারাক্ষণ কথা বলার কারণে কর্ণ বেচারার এই দশা। মোবাইল ফোন ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

আমি বাংলা একাডেমীর ডিজি সাহেবের সামনে এক ঘণ্টা দশ মিনিট ধরে বসে আছি। মোবাইল কানে ধরে তিনি সারাক্ষণ কথা বলে যাচ্ছেন। একজনের সঙ্গে না, নানানজনের সঙ্গে। মাঝে মাঝে আঙুলের ইশারায় আমাকে অপেক্ষা করতে বলছেন। এই সময় তাঁর মুখ হাসিহাসি হয়ে যাচ্ছে। আমার দিকে হাসিমুখে তাকানোর একটাই কারণ-ডিজি সাহেব আমাকে গুরুত্বপূর্ণ কেউ ভাবছেন। গুরুত্বপূর্ণ লোকজনকেই শুধু তাঁর পিএস খাসকামরায় ঢুকতে দেয়। অভাজনরা সেই সুযোগ পায় না। যেহেতু আমি পেয়েছি আমি গুরুত্বপূর্ণ কেউ।

আমার এই বিশেষ ঘরে ঢোকার রহস্য সরল মিথ্যাভাষণ। আমি পিএস সাহেবের দিকে ঝুকে ফিসফিস করে বলেছি, আমি প্রধানমন্ত্রীর একটি গোপন চিঠি নিয়ে এসেছি। এই চিঠি স্যারের হাতে হাতে দিতে হবে।কারও সঙ্গে গলা নামিয়ে কথা বললে সেও গলা নামিয়ে কথা বলে, এটাই নিয়ম। পিএস সাহেব গলা নামিয়ে বললেন, চিঠিতে কী লেখা? আমি বললাম, প্ৰধানমন্ত্রীর চিঠির বিষয়বস্তু তো আমার জানার কথা না, তবে অনুমান করছি ডিজি সাহেবের দিন শেষ।বলেন কী?

ডিজি সাহেব প্রধানমন্ত্রীর ব্ল্যাকবুকে চলে গেছেন। কালো খাতায় তাঁর নাম উঠে গেছে।পিএস বললেন, এরকম ঘটনা যে ঘটবে তার আলামত অবশ্যি পেয়েছি। যান আপনি স্যারের ঘরে চলে যান। আমি স্যারকে জানাচ্ছি যে আপনি যাচ্ছেন।উনাকে আগেভাগে কিছু জানানোর দরকার নেই। যা বলার আমি সরাসরি বলব। গোপনীয়তার ব্যাপার আছে।

অবশ্যই! অবশ্যই! ডিজি সাহেবের টেলিফোন শেষ হয়েছে। তিনি হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, আপনার জন্যে কী করতে পারি? আমি বললাম, আপনি আমার জন্যে কিছু করতে পারেন না। তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্যে কিছু করতে পারেন।তার মানে? এক ভদ্রলোক বাংলা শব্দভাণ্ডারে নতুন একটি শব্দ যোগ করতে চাচ্ছেন। আমি সেই প্ৰস্তাব নিয়ে এসেছি। শব্দটা হলো ‘ফুতুরি’। ফুতুরি হবে ফুঁ দিয়ে যেসব বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয় তার সাধারণ নাম।

ডিজি সাহেব চোখ-মুখ কঠিন করে বললেন, এইসব ব্রেইন ডিফেক্টদের সকাল-বিকাল থাপড়ানো দরকার।আমি বললাম, যথার্থ বলেছেন স্যার। উনি আপনাকে একটা চিঠি দিয়েছেন। চিঠিটাতে কি একটু চোখ বোলাবেন? চিঠি আপনি আঁস্তাকুড়ে ফেলুন এবং আপনি এই মুহুর্তে ঘর ছেড়ে চলে যাবেন। আপনাকে এই ঘরে এন্ট্রি দিল কীভাবে?

আমি বললাম, আপনার পিএস সাহেব ব্যক্তিগত বিবেচনায় দিয়েছেন। উনার দোষ নাই। যখন শুনেছেন আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এসেছি তখনই উনি নরম হয়ে গেছেন। অবশ্যি নরম হওয়াটা উচিত হয় নাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আলতু-ফালতু লোকজন তো আসতে পারে। তাই না। স্যার?

ডিজি সাহেব সঙ্গে সঙ্গে নরম হয়ে গেলেন। তার চেহারায় হাবাগোবা ভাব চলে এল। আমি বললাম, যে ভদ্রলোক বাংলা ভাষায় নতুন একটি শব্দ দিতে চাচ্ছেন তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছেন। ভদ্রলোক পদার্থবিদ্যায় হার্ভার্ড থেকে Ph.D. করেছেন। এখন আছেন সোনারগাঁ হোটেলে। রুম নম্বর চার শ’ সাত। আপনি কি উনার সঙ্গে কথা বলবেন? আপনার পিএসকে বললেই সে ফোন লাগিয়ে দিবে।

অবশ্যই কথা বলব। কেন কথা বলব না! উনার চিঠিটা দিন। পড়ি। এর মধ্যে সোনারগাঁ হোটেলে লাইন লাগাতে বলছি।ডিজি স্যারের মুখ তেলতেলে হয়ে গেল। শরীরের ভেতরের তেল চুইয়ে বের হওয়া শুরু হয়েছে। দর্শনীয় দৃশ্য। বল্টুভাইয়ের সঙ্গে তাঁর টেলিফোনে কথাবার্তা হলো। বল্টুভাই কী বললেন শুনতে পারলাম না, তবে ডিজি সাহেবের তৈলাক্ত কথা শুনলাম।

আপনার চিঠি পড়ে ভালো লাগল। বাংলা ভাষাকে আপনার মতো মানুষরা সমৃদ্ধ করবে না তো কারা করবে? শব্দটাও সুন্দর বের করেছেন-ফুতুরি। শুরু হয়েছে ফুঁ দিয়ে। ধ্বনিগত মাধুর্য আছে। আগামী মাসের পনের তারিখ কাউন্সিল মিটিং আছে। আপনার প্রস্তাব কাউন্সিল মিটিংয়ে তোলা হবে। আশা করছি, পাস হয়ে যাবে। যদি পাস হয় তাহলে বাংলা একাডেমীর অভিধানে এই শব্দ চলে আসবে। আপনাকে অগ্ৰিম অভিনন্দন। আমি খুবই খুশি হব। যদি একদিন সময় করে বাংলা একাডেমীতে ঘুরে যান।

আমার কাজ শেষ। ডিজি স্যারের দিকে তাকিয়ে বিনয়ে নিচু হয়ে বললাম, স্যার যাই। আপনার সঙ্গে কথা বলে বিমল আনন্দ পেয়েছি।ডিজি স্যার বললেন, আচ্ছা আচ্ছা।আমি বললাম, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সামান্য সেবা করার সুযোগ যদি দেন। আমি একটা নতুন শব্দ দিতে চাই। শব্দটা হলো ‘ভুতুরি’।ভুতুরি? জি স্যার, ভুতুরি। এর অর্থ হবে ভূতের নাকে ফুঁ দিয়ে বাজানো বাঁশি।ভূতের বঁশি?

জি স্যার, ভূতের বাঁশি। এটা বিশেষ্য। বিশেষণ হবে ভুতুরিয়া। ডাকাতিয়া বাঁশির মতো ভুতুরিয়া বাঁশি। শচীন কর্তার ডাকাতিয়া বাঁশি গানটা কি শুনেছেন? আমি সুর করে গাইবার চেষ্টা করলাম— ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি।’ ডিজি সাহেব অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছেন। হিসাব মিলাতে পারছেন না। আমি হাত কচলাতে কচলাতে বললাম, কাউন্সিল মিটিংয়ে বল্টুভাইয়ের ফুতুরি’ শব্দটার সঙ্গে আমার ‘ভুতুরি’ শব্দটা যদি তোলেন খুব খুশি হব।বল্টুভাই কে?

হার্ভার্ডের Ph.D.-র ডাকনাম বল্টু। সবাই তাকে বল্টু’ নামে চেনে। এই নামেই ডাকে। আপনি যদি তাকে মিস্টার বল্টু ডাকেন, উনি রাগ করবেন না। খুশিই হবেন। তাঁর ভাইয়ের নাম নাট। দুই ভাই মিলে নাট-বল্টু। স্যার যাই।হতাশ এবং খানিকটা হতভম্ব অবস্থায় ডিজি সাহেবকে রেখে আমি বের হয়ে এলাম।

ফুতুরির সঙ্গে ভুতুরি যুক্ত হওয়ায় তিনি খানিকটা বিপর্যস্ত হবেন—এটাই স্বাভাবিক। বেচারার আজ সকালটা খারাপভাবে শুরু হয়েছে। তাঁর কপালে। আজ সারা দিনে আর কী কী ঘটে কে জানে! আমার জন্যে দিনটা ভালোভাবে শুরু হয়েছে, এটা বলা যেতে পারে। দিনের প্রথম চায়ের কাপে একটা মরা মাছি পেয়েছি।

মৃত মাছি চায়ে ভেসে থাকার কথা, এটি আর্কিমিডিসের সূত্র অগ্রাহ্য করে ডুবে ছিল। চা শেষ করার পর স্বাস্থ্যবান মাছিটাকে আমি আবিষ্কার করি। চায়ের কাপে মৃত মাছি ইঙ্গিতবহ। চায়নিজ গুপ্তবিদ্যায় চা শেষ করে কাপের তলানির চায়ের পাতার নকশা বিবেচনা করা হয়। চায়ের পাতায় যদি কোনো কীটপতঙ্গের আকার দেখা দেয়, তাহলে বুঝতে হবে আজ বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটবে। আমার চায়ের কাপের তলানিতে চায়ের পাতায় কীটপতঙ্গের নকশা না, সরাসরি মাছি।

আজ নিশ্চয়ই কিছু ঘটবে।‘মনে মনে সোনার মাছি খুন করেছি’ কবিতার লাইন বলে বাংলা একাডেমী থেকে বের হলাম। হাতের মুঠোয় ডিজি সাহেবের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের নম্বর। পিএস সাহেব আগ্রহ করে লিখে দিয়েছেন। এই নম্বর হটলাইনের নম্বরের মতো। যত রাতেই ফোন করা হোক, ডিজি সাহেব লাফ দিয়ে টেলিফোন ধরবেন। ফুতুরি-ভুতুরি নিয়ে তিনি কী পরিকল্পনা করেছেন মাঝে মাঝে টেলিফোন করে জানতে হবে।

আকাশে মেঘ আছে। মেঘ। সূর্যকে কাবু করতে পারছে না। মেঘের ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্য উঁকি দিচ্ছে, চনমনে রোদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। গায়ে রোদ মাখতে মাখতে এগোচ্ছি। শরীরে ভিটামিন ‘ডি’ জমা করে নিচ্ছি। সূর্যের আলো ছাড়া শরীরে এই ভিটামিন তৈরি হয় না। সূর্য থেকে ধার করে চন্দ্ৰ যে আলো ছড়াচ্ছে সেখানে কি কোনো ভিটামিন আছে? নরম-টাইপের ভিটামিন?

কয়েকজন ভিক্ষুকের সঙ্গে দেখা হলো। এরা ভুরু কুঁচকে আমাকে দেখল, কাছে এগিয়ে এল না। ভিক্ষা পাওয়ার ব্যাপারে ভিক্ষুকদের সিক্সথ সেন্স প্রবল হয়ে থাকে। এরা ধরে ফেলেছে আমার কাছে কিছু পাওয়ার আশা নেই।কদমফুল বিক্রেতা দুজন ফুলকন্যাকে দেখলাম। এদের নজর প্রাইভেট কারে বসা যাত্রীদের দিকে, আমার মতো ভবঘুরের দিকে না। তারপরেও একজন হেলাফেলা ভঙ্গিতে বলল, ফুল নিবেন?

আমি বললাম, হুঁ।এমন তো হতে পারে, যে বিশেষ ঘটনা ঘটবে বলে মনে হচ্ছে সেই ঘটনার প্রধান চরিত্র ফুলকন্যা। মেয়েটার চেহারা মিষ্টি, তবে হাতভর্তি ফুলের কারণেও চেহারা মিষ্টি মনে হতে পারে। ফুল হাতে নেওয়ামাত্র যে-কোনো মেয়ের চেহারা মিষ্টি হয়ে যায়। একইভাবে বন্দুক হাতে সুশ্ৰী মহিলা-পুলিশকেও কর্কশ দেখায়। বন্দুকের কারণেই দেখায়। তাদের নাকের নিচে হালকা গোঁফের মতো ভেসে ওঠে।

বন্দুক হাত থেকে নামানোমাত্ৰ গোঁফ মিলিয়ে যায়।আমি ফুলকন্যার দিকে তাকিয়ে বললাম, ফুলের দাম কত? দুই টেকা পিস।এত দাম! পাইকারি দর কত? ফুলকন্যা আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রেড লাইটে দাঁড়িয়ে পড়া লাল রঙের প্রাইভেট কারের দিকে ছুটে গেল। আমি বুঝলাম, আজকের বিশেষ ঘটনার সঙ্গে এই মেয়ে যুক্ত না।

‘নাক বরাবর এগিয়ে যাওয়া’ বলে একটা ভুল কথা প্রচলিত আছে। নাক বরাবর অর্থ হলো সোজা যাওয়া। কেউ যদি ডানদিকে ফিরে তার নাক ডানদিকে ফিরবে, সে নাক বরাবরই যাবে। আমি একটি বিশেষ ভঙ্গিতে নাক বরাবরই হাটছি। রাস্তায় যতবার ডান-বা গলি পাওয়া যাচ্ছে ততবারই আমি ডানে মোড় নিচ্ছি। গোলকধাঁধা থেকে বের হতে হলে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ঢাকা শহরকে গোলকধাঁধা ভাবলে হাঁটার এই পদ্ধতি শেষটায় আমাকে কোথায় নিয়ে যায় তা দেখা যেতে পারে।

গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার এই পদ্ধতি ব্রিটিশ ম্যাথমেটিশিয়ান তুরিন বের করেছেন। শেষটায় অবশ্যি তাঁর নিজের মাথায় গোলকধাঁধা। ঢুকে যায়। তিনি পিস্তল দিয়ে গুলি করে তাঁর মাথার খুলি গুড়িয়ে দেন। পৃথিবীর সেরা অংকবিদদের প্রায় সবার মাথায়ই এক পর্যায়ে জট লেগে যায়। তারা পাগল হয়ে যান। যারা পাগল হতে পারেন না তারা আত্মহত্যা করেন। অংকবিদদের জীবনে এই ঘটনা কেন ঘটে তা বল্টু স্যারকে জিজ্ঞেস করে জানতে হবে।

ডানে মোড় নিয়ে এগুতে এগুতে আগে চোখে পড়ে নি এমনসব জিনিস চোখে পড়তে লাগল। একটা বান্দরের দোকান দেখতে পেলাম। খাচার ভেতর নানান আকৃতির বীদার। বান্দরের সঙ্গে হনুমানও আছে। সবগুলি বাঁদর ও হনুমান খাচার ভেতর শিকল দিয়ে বাধা। দোকানের সামনে দাঁড়াতেই প্রতিটি বাঁদর একসঙ্গে আমার দিকে তাকাল। তারা চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে না, তবে নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করছে। বাঁদরের দোকানের মালিক সবুজ লুঙ্গি পরে লাঠি হাতে টুলের উপর বসা। তার বান্দরের মতোই লোমশ গা। চোখ তক্ষকের চোখের মতো কোটর থেকে বের হয়ে আছে। আমি বললাম, বাঁদর কত করে?

তক্ষক-চোখা বিরক্ত গলায় বলল, বিক্রি হয় না।বিক্রি হয় না। তাহলে এতগুলি বাদর নিয়ে সে বসে আছে কেন, এই প্রশ্ন করা হলো না। কারণ এই লোক লাঠি হাতে তেড়ে এসেছে। তার দোকানের সামনে কিছু ছেলেপিলে জড় হয়েছে। বাদারদের ভেংচি দিচ্ছে। তক্ষক-চোখ লোকের লক্ষ্য এইসব ছেলেপিলে। শিশুর দল তাড়া খেয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হলো।

তারা আবার আসছে। এটাই মনে হয় তাদের খেলা।একটা চায়ের দোকান পাওয়া গেল, যার সাইনবোর্ডে লেখা—’স্পেশাল মালাই চা’। বড় টিনের গ্লাসে করে চা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি গ্রাসের সঙ্গে পত্রিকার কাগজ ভাঁজ করে দেওয়া, গরম টিনের গ্লাস ধরার সুবিধার জন্যে। এই চায়ের মনে হয় ভালো কাটতি। কিছু কাস্টমার দোকানের বাইরে ফুটপাতে বসে চা খাচ্ছে।

একটা রেস্টুরেন্ট পাওয়া গেল। যার বাইরে লেখা—’গোসলের সুব্যবস্থা আছে। পরিষ্কার গামছা দেওয়া হয়। মহিলা নিষেধ।’ একবার এসে ভালোমতো খোঁজ নিতে হবে ব্যাপারটা কী। রেস্টুরেন্টে গোসলের সুব্যবস্থা থাকার প্রয়োজনইবা পড়ল কেন? মহিলা নিষেধ কেন, তাও বোঝা গেল না। তাদেরও তো গোসলের অধিকার আছে।

ঘানি দিয়ে সরিষা ভাঙানোর প্রাচীন কল পাওয়া গেল। গরুর বদলে আধমরা এক ঘোড়া ঘানি ঘোরাচ্ছে। এদের সাইনবোর্ডটি চোখে পড়ার মতো—‘আপনার উপস্থিতিতে সরিষা ভাঙাইয়া তেল করা হইবে। ফাঁকি ঝুঁকি নাই।‘বোতল হাতে বেঞ্চিতে কয়েকজন বসে আছে। এরা নিশ্চয়ই নিজে উপস্থিত থেকে সরিষা ভাঙিয়ে খাটি তেল নিয়ে বাড়ি ফিরবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে রুগ্ন। তিনটি গাভির বাথান পাওয়া গেল। খাঁটি সরিষার তেলের মতো খাঁটি গরুর দুধের সন্ধানে মনে হয় লোকজন। এখানে আসে। কিংবা গাভিদের নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ি বাড়ি। খরিদ্দারের সামনে দুধ দোয়ানো হয়। তিনটি গাভির সামনেই খড় রাখা আছে, তারা খাচ্ছে না। হতাশ চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। বাছুরগুলো একটু দূরে বাঁধা। তাদের চোখেও রাজ্যের বিষন্নতা। তাদেরই মায়ের দুধ, অথচ তাদের কোনো অধিকার নেই।

ডানদিকে ঘোরা ভ্ৰমণ একসময় শেষ হলো। এমন এক জায়গায় এসেছি ডানে ঘোরার উপায় নেই। অন্ধগলি। শেষ প্রান্তে লালসালু দেওয়া মাজার শরিফ।মনে হচ্ছে যে বিশেষ ঘটনা ঘটবে বলে সকাল থেকেই মনে হচ্ছিল, সেই বিশেষ ঘটনা ঘটেছে। ডানে আর যাওয়ার উপায় নেই, আমার ভ্রমণের সমাপ্তি।

মাজারের রেলিং ধরে বিড়বিড় করবে। থালা হাতে ভিখিরি থাকবে। সারা রাত গাজা খেয়ে চোখ টকটকে লাল হওয়া খালি গায়ের রুগ্ন দু’একজন থাকবে। এরা মাজারের খাদেম না, তবে খাদেমের সাহায্যকারী। এই মাজার শূন্য। খাদেমের ঘরে খাদেম বসে আছেন। আর কেউ নেই। সম্ভবত অন্ধগলিতে মাজার হওয়ার কারণে নাম ফাটে নি।

খাদেমের চোখ বাথানের গাভিগুলির মতোই বিষন্ন। তিনি সবুজ রঙের পাঞ্জাবি পরেছেন। মাথায় পাগড়ি আছে। পাগড়ির রঙ সবুজ। বয়স ষাটের মতো হবে। দাড়ি মেন্দি দিয়ে রাঙানো। খাদেমদের চোখেমুখে ধূর্তভাব থাকে, ইনার নেই। বরং চেহারায় খানিকটা আলাভোলাভাব আছে। খাদেম মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। তার মাথার উপর লেখা—’বাচ্চাবাবার গরম মাজার’।

এই লেখার নিচেই লাল হরফে লেখা, ‘পকেটমার হইতে সাবধান’।আমি খাদেমের দিকে এগিয়ে গেলাম। তিনি তীক্ষু দৃষ্টিতে তাকালেন। মোবাইল ফোন কানে ধরেই বললেন, দোয়া খায়ের করার জায়গা বা দিকে। মহিলারা যাবেন ডানে। দানবাক্স মহিলা-পুরুষের আলাদা।আমি বাঁ দিকে ঢুকেই দানবাক্স পেলাম। ‘লেড়কা সে লেড়কা কা গু ভােরী’র মতো দানবাক্সের তালা বড়। দান বাক্সে লেখা ‘পুং’ অর্থাৎ পুরুষদের।

বাচ্চাবাবা সম্ভবত বালক ছিলেন। রেলিং ঘেরা ছোট্ট কবর। কবরের ওপর একসময় গিলাফ ছিল, বৃষ্টির পানিতে ভিজে রোদে পুড়ে গিলাফ নানা ক্ষতচিহ্ন নিয়ে সেঁটে বসেছে। মাজারের পায়ের কাছে দর্শনীয় নিমগাছ। কংক্রিটের শহরে এই গাছ ভালোমতো শিকড় বসিয়ে স্বাস্থ্যে সৌন্দর্যে ঝলমল করছে। এত বড় নিমগাছ আমি আগে দেখি নি। নিমগাছের একটি প্ৰজাতির নাম মহানিম। মহানিম বটবৃক্ষে মতো প্ৰকাণ্ড হয়। এটি হয়তোবা মহানিম।

খাদেমের মোবাইলে কথা বলা শেষ হয়েছে। তিনি হাতের ইশারায় আমাকে ডাকলেন। আমি বিনীত ভঙ্গিতে তার সামনে দাঁড়ালাম। তিনি গভীর গলায় বললেন, পবিত্র কোরান শরিফে শয়তানের নাম কতবার আছে জানো? আমি বললাম, জি-না।তিনি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, বাহান্নবার। এর মরতবা জানো? জি-না।শয়তান এমনই জিনিস যে, স্বয়ং আল্লাহপাককে বাহান্নবার তার নাম নিতে হয়েছে। আমাদের চারিদিকে শয়তান। তার চলাফেরা রক্তের ভেতরে। বুঝেছ?

জি।খাদেম। হঠাৎ গলার স্বর পাল্টে বললেন, আমার পক্ষে মাজার ছেড়ে যাওয়া সম্ভব না। একটু চা খাওয়া প্রয়োজন। তুমি কি আমাকে এক কাপ চা খিলাতে পারবে? গলির মাথায় একটা চায়ের দোকান আছে, আবুলের চায়ের দোকান। আমার কথা বললে চা দিবে। টাকা নিবে না।হুজুর, চায়ের সাথে আর কিছু খাবেন? টোষ্ট বিস্কুট, কেক? সিগ্রেট খাব। একটা সিগ্রেট নিয়ে আসবে।আমি বললাম, সিগ্রেট কি আবুল ভাই মাগনা দিবে? নাকি খরিদ করতে হবে?

হুজুর জবাব দিলেন না, খানিকটা বিষন্ন হয়ে গেলেন। এর অর্থ, আবুল ভাই চা মাগনা দিলেও সিগারেট দিবে না।আবুল ভাইয়ের চেহারা মনে রাখার মতো। মানুষের কিছু দাঁত মুখের বাইরে থাকতে পারে, উনার প্রায় সবগুলোই মুখের বাইরে। মুখের বাইরে থাকার কারণেই মনে হয় দাঁতের যত্ন বেশি। প্রতিটি দাঁত ঝকমক করছে। ক্লোজ-আপ এই দাঁতের একটা বিজ্ঞাপন করলে ইন্টারেস্টিং হতো। বিজ্ঞাপনের ভাষা—‘মুখের বাইরের দাঁতের জন্যেও কোজআপ’।

হুজুরের জন্যে মাগনা চা নিতে এসেছি শুনে আবুল ভাই ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। অতি অশালীন কিছু কথা বললেন। অশিক্ষার কারণেই হয়তো বললেন। গরম চা শরীরের এক বিশেষ প্রবেশদ্বার দিয়ে সাইকেলের পাম্পার দিয়ে ঢুকাতে বললেন। আমাকে চা এবং টোষ্ট বিস্কুট নগদ টাকায় কিনতে হলো।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *