হুজুরের সামনে চা, একটা টেস্ট বিস্কুট এবং এক প্যাকেট বেনসন এন্ড হেজেস রাখলাম। সিগারেটের প্যাকেট দেখে হুজুরের চেহারা কোমল হয়ে গেল। তিনি নরম গলায় বললেন, বাবা, ম্যাচ এনেছ? আমি বললাম, জি হুজুর।তোমার উপর আমি দিলখোশ হয়েছি। আমার যেমন দিলখোশ হয়েছে। বাচ্চাবাবাও সন্তুষ্ট হয়েছেন। উনার সন্তোষ আর কেউ না বুঝলেও আমি বুঝি। তোমার কোনো মানত থাকলে বাচ্চাবাবারে বলো। আমি নিজেও দোয়া বখশায়ে দিব। আছে কোনো মানত?
জি আছে। বাংলা ভাষায় দুটা শব্দ ঢুকাতে চাই।হুজুর চায়ে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরাতে ধরাতে তৃপ্তি নিয়ে বললেন, দুটা কেন, দশটা ঢুকাও। কোনো সমস্যা নাই। বাবার দরবারে এসেছ, খেয়াল রাখবা, বাবা কৃপণ না। যা চাবা অধিক চাবা।হুজুরের মোবাইলে কি একটা ফোন করতে পারব?
অবশ্যই পারবে, তবে কথা অল্প বলবে। বেশি কথা আমাদের নবীজী সাল্লালাহু আলেয়স সালাম পছন্দ করতেন না। আমিও করি না। সর্ব কর্মে আমি নবীজীকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি।আমি বাংলা একাডেমীর ডিজি সাহেবকে টেলিফোন করলাম। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, কে বলছেন?
আমি অতি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, স্যার আমার নাম হিমু। সকালে আপনার সঙ্গে দুটা নতুন শব্দ নিয়ে কথা হয়েছে। একটা ফুতুরি, আরেকটা ভুতুরি। ভুতুরি শব্দটার বানানে দুটা চন্দ্ৰবিন্দু লাগবে। ভূতের বিষয় তো, এইজন্য চন্দ্ৰবিন্দু। শব্দটা হবে ‘ভুঁতুঁরি’।ডিজি সাহেব লাইন কেটে দিলেন। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি হুজুরের সামনে বসে আছি। হুজুর সিগারেট টানতে টানতে বৃষ্টি দেখছেন। তার চেহারায় উদাসভােব চলে এসেছে। আমি বললাম, হুজুর, আরেক কাপ চা কি আনব?
হুজুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, প্রয়োজন নাই। তুমি কি পা টিপতে পারো? আমি বললাম, আমরা বাঙালি। বাঙালি আর কিছু পারুক না-পারুক, পা টিপতে পারে। হুজুরের পা কি টিপে দিব? হুজুর উদাস গলায় বললেন, দাও। মুরুব্বিদের পা দাবানোর মধ্যে সোয়াব আছে। মুরুব্বিদের সঙ্গে আদবের সঙ্গে কথা বলাতেও সোয়াব। জন্মের সময় আল্লাহপাক প্রত্যেকের নামে ব্যাংকে একটা সোয়াবের একাউন্ট খুলে দেন। আমাদের কাজ হলো একাউন্টে সোয়াব জমা দেওয়া। বুঝেছ?
আমি হুজুরের পা দাবাতে গিয়ে দেখলাম, তার দুটা পা হাঁটুর ওপর থেকে কাটা। পা কাটা মানুষের সঙ্গে ক্র্যাচ থাকে। ইনার নেই বলে কাটা পার বিষয়টা এতক্ষণ ধরতে পারি নি। তা ছাড়া লুঙ্গিও কায়দা করে পরেছেন। লুঙ্গির শেষ প্ৰান্তে স্যান্ডেল আছে।আমি বললাম, হুজুরের পা কাটল কীভাবে?
হুজুর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আল্লাহর হুকুমে পা কাটা গেছে। এর সঙ্গে ডাক্তারের বদমাইশিও আছে। ডাক্তারের কানে শয়তান ধোঁয়া দিয়েছে। শয়তানের অছওয়াছায় ডাক্তার আমার দুটা ঠ্যাং কেটে ফেলে দিয়েছে। একটা কাটলেও চলত।আমি বললাম, অবশ্যই নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।হুজুর লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, কাটা ঠ্যাং আমাকে দেয় নাই, এটা একটা আফসোস।কাটা ঠ্যাং দিয়ে করবেন কী? হুজুর বিষন্ন গলায় বললেন, কবর দিবার জন্য চেয়েছিলাম। কবর দিতাম। ঠ্যাং শরীরের একটা বড় অংশ। এর কবর হওয়া প্রয়োজন।
হুজুরের পা নেই, পা কীভাবে দাবাবে বুঝতে পারছি না। হুজুর বললেন, পা কাটা পড়েছে, কিন্তু ব্যথা বেদনা ঠিকই আছে। পা নাই, তার পরেও ব্যথা বেদনা হয়। রগে টান পড়ে। আঙুল পর্যন্ত কটকট করে। পায়ের আঙুলগুলা আগে ফুটায়ে দাও। অনুমান করে যেখানে আঙুল থাকার কথা সেখানে টান দাও, আঙুল ফোটানোর শব্দ শুনবে। খুবই আচানক ঘটনা।
আমি হুজুরের অদৃশ্য পা দাবাচ্ছি। অদৃশ্য আঙুল টানছি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, আঙুল টানার সময় কট করে একটা আঙুল ফুটল।হুজুর বললেন, আঙুল ফোটার শব্দ শুনেছ? জি।আচানক হয়েছ? জি।আল্লাহপাকের আজিব বিষয় বুঝতে পেরেছ? বুঝার চেষ্টায় আছি।এইসব দেখেও কেউ কিছু বুঝে না। মূর্থের মতো বলে, আল্লাহ নাই, বেহেশত-দোজখ নাই। বলে কি না বলো? বলে।এই ধরনের কথা বলে এমন কাউরে যদি পাও আমার কাছে নিয়া আসবা, আল্লাহপাকের কেরামতি বুঝায়ে দিব। তোমার জানামতো এমন কেউ আছে?
একজন আছে। তার নাম বল্টু। তিনি বলেন, ঈশ্বর নাই, আত্মা নাই।হুজুর তৃতীয় সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, ঈশ্বর নাই বলে—এটা ঠিক আছে। ঈশ্বর হিন্দুদের বিষয়। তবে আত্মা নাই যে বলে—এটা ভয়ঙ্কর কথা। তাকে আমার কাছে নিয়া আসবা, আত্মা গুলায়ে তারে খাওয়ায়ে দিব। বদমাইশ!হুজুরের কথা শেষ হওয়ার আগেই তার আরেকটা অদৃশ্য আঙুল ফুটল।হুজুর তৃপ্তিমাখা গলায় বললেন, শুনেছ? জি।আগের চেয়েও শব্দে ফুটেছে, ঠিক না? জি ঠিক।আল্লাহপাকের কেরামত বুঝতে পারছ?
আমি পা দাবাতে দাবাতে বললাম, আল্লাহপাকের না, আপনারটা বুঝেছি। আমি যখন অদৃশ্য আঙুল টান দেই তখন আপনি নিজের হাতের আঙুল মটকান। সেই শব্দ হয়। ম্যাজিক প্ৰথমবার করা ঠিক আছে, দ্বিতীয়বার ঠিক না। দ্বিতীয়বারে ধরা খেতে হয়। ভবিষ্যতে আপনি পায়ের অদৃশ্য আঙুল ফোটানোর ম্যাজিক দ্বিতীয়বার দেখাবেন না।
হুজুর বিমর্ষ হয়ে গেলেন। আমি তার অদৃশ্য পা দাবাতেই থাকলাম। বৃষ্টি থেমে গেছে, তবে এখন বের হওয়া যাবে না। গলিতে হাঁটুপানি। অচেনা গলির কোথায় ম্যানহোল কে জানে! হাঁটতে গেলে ম্যানহোলে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।হুজুর গলা খাঁকারি দিলেন। আমি বললাম, কিছু বলবেন? হুজুর বললেন, তুমি পা দাবাচ্ছ আরাম পাচ্ছি। তোমার উপর সমানে দোয়া বকসে দিচ্ছি।ভালো করেছেন।
তোমার মতো একটা চালাক চতুর ছেলে আমার দরকার। আগে একজন ছিল, নাম হেকিম। কাজে কর্মে ভালো ছিল। কেরাতের গলা চমৎকার। মাজারের নিয়মকানুন জানে। কী করলে মাজারের আয় হয়, তাও জানে। জানবে না কেন, মাজারে মাজারে খাদেমের অ্যাসিসটেন্টগিরি করাই তার কাজ। হেকিম কী করেছে শোনো, দানবাক্সের তালা ভেঙে টাকা পয়সা নিয়ে পালায়ে গেল। আমি মাফ করতে গিয়েও করি নাই। আল্লাহপাকের দরবারে নালিশ দিয়ে দিয়েছি। ইশারায় পেয়েছি, আল্লাহপাক নালিশ কবুল করেছেন। এখন যে-কোনো একদিন দেখা যাবে, হেকিম এসে আমার পা চাটছে।আমি বললাম, আপনার তো পা নাই, চাটবে কীভাবে?
হুজুর হতাশ গলায় বললেন, সেটাও একটা কথা। পা না চাটলেও হেকিম আবার যদি আসে, ক্ষমা চায়, ক্ষমা করে দিব। নবীজীকে একবার জিজ্ঞাস করা হলো, হুজুরে পাক! দুশমনকে কতবার ক্ষমা করব? নবীজী বললেন, প্রথম দফায় সত্তর বার। ভালো কথা, তুমি কি আমার এখানে চাকরি করবে? বেতন কত দিবেন?
হুজুর বিরক্ত গলায় বললেন, মাজারের খাদেমের চাকরিতে বেতন জিজ্ঞাস করা মাজারের প্রতি অসম্মান। বলো, আস্তাগাফিরুল্লাহ! আস্তাগাফিরুল্লাহ! তোমাকে মাজারের আয়ের অংশ দিব।মাজারের কোনো আয় আছে বলে তো মনে হয় না।হুজুর বললেন, কথা সত্য। এখন আয় নাই। দানবাক্স বলতে গেলে খালি। একটা জিনিস খিয়াল রাখতে হবে। মাজারের চন্দ্রের সাথে যোগাযোগ। চন্দ্রের কারণে জোয়ারভাটা হয়। মাজারেও জোয়ারভাটা আছে। এখন ভাটা চলতেছে।আপনি তো দুপুরে কিছু খান নাই। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কী?
আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছি। উনি একটা ব্যবস্থা নিবেন। দেখবা সন্ধ্যার পর কোনো ভক্ত খানা নিয়া চলে আসবে। অনেকবার এ রকম হয়েছে। কথা নাই, বার্তা নাই, বিয়ে-বাড়ির খানা আসে; আকিকার খানা আসে, সুন্নতে খৎনার খানা আসে। সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকো, দেখো কী হয়।
আমি সন্ধ্যা পার করলাম। মাজার ঝাঁট দিলাম। দানবাক্সের ওপর ধুলা বসেছিল, ধুলা পরিষ্কার করলাম। মাজারের ভেতর পানি জন্মেছিল, পানি বের করার ব্যবস্থা করলাম। হুজুর বললেন, মোমবাতি জ্বালাও। বেজোড় সংখ্যায় জুলতে হবে, তিন অথবা পাঁচ। আল্লাহ একা বলে তিনি বেজোড় পছন্দ করেন।
তাহলে একটা জ্বালাই?জ্বালাও, একটাতেও চলবে।রাত আট্টার দিকে সন্দেহজনক চেহারার একজন মাজারে ঢুকল। মাজারের পেছনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে চলে গেল। হুজুর বললেন, দানবাক্সে কিছু দিয়েছে? আমি বললাম, না।হুজুর চাপা গলায় বলল, বদমাইশ।
রাত দশটা বাজল, খানা নিয়ে কাউকে আসতে দেখা গেল না। হুজুরের নির্দেশে দানবাক্স খোলা হলো। ভাঙতি পয়সা আর নোট মিলিয়ে একাত্তর টাকা পাওয়া গেল। হুজুর বললেন, দুই প্লেট ভুনা খিচুড়ি আর হাঁসের মাংস নিয়া আসো। বৃষ্টি বাদলার দিনে ভুনা খিচুড়ির উপর জিনিস নাই। রাত অধিক হয়ে গেছে, তুমি থেকে যাও। বিছানা বালিশ সবই আছে। হেকিম বিছানা-বালিশ নেয় নাই। রাত বারোটার সময় আমি জিগিারে বসব। আমার সঙ্গে জিগিারে সামিল হতে পারো। ব্যাংকের একাউন্টে সোয়াব বাড়বে। কি রাজি আছ?
জি হুজুর।হুজুর গলা নামিয়ে বললেন, রাতে ঘুম ভাঙলে যদি দেখ অস্বাভাবিক লম্বা কিছু মানুষ নামাজে দাঁড়ায়েছে, তখন ভয় পাবা না। এরা ইনসান না, জীন। মানুষের বেশ ধরে আসে, মাজারে মাজারে নামাজ পড়ে।হুজুর খুব আরাম করে ভুনা খিচুড়ি খেলেন। খিচুড়ি খেতে খেতে বললেন, পায়ের আঙুল ফোটার বিষয়ে তুমি যা বলেছি তা ঠিক আছে। আমি কায়দা করে হাতের আঙুল ফোটাই। তবে শুরুতে পায়ের আঙুল ফুটতো। ভাত হাতে নিয়া মিথ্যা বলব না। তিন মাস ফুটেছে, তারপর বন্ধ। আমার কথা কি বিশ্বাস করলা?
জি হুজুর।আমার সাথে থেকে যাও, আমার সেবা করো, বিনিময়ে অনেক বাতেনি জিনিস তোমারে শিখায়ে দিব। পরি দেখেছি কখনো? জি-না।আমি ইচ্ছা করলে পরির সাথে মুহাব্বতের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। তবে জীন পরিদের কাছ থেকে দূরে থাকা ভালো। আল্লাহহুম্মা ইন্নী আউয়ুবিকা মিনাল খুবুসি আল খাবায়িত।এর অর্থ কী?
অর্থ হলো, হে আল্লাহপাক! দুষ্ট পুরুষ জ্বীন এবং দুষ্ট মহিলা জীনের অনিষ্ট থেকে আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। পরি হলো মহিলা জ্বীন।রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিও বাড়তে লাগল। আরামদায়ক আবহাওয়া। হুজুর একমনে জিগির করতে লাগলেন। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে জিগিরের শব্দ মিলে অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি হলো।
রাত তিনটা পর্যন্ত আমি হুজুরের সঙ্গে জিগির করলাম। হুজুর বললেন, জিগির তোমার কলবের ভেতর ঢুকায়ে দিব। দিনরাত জিগির হতে থাকবে, তোমার নিজের কিছু করতে হবে না। বিলো, আলহামদুলিল্লাহ।আমি বললাম, আলহামদুলিল্লাহ।হুজুর বললেন, তুমি আমার সঙ্গে থেকে যাও। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা থাকো। দেখবা কী তোমারে দিব।আমি বললাম, হুজুর অনুমতি দিলে ফ্রি-ল্যান্স কাজ করব।সেটা আবার কী?
সময়-সুযোগমতো মাজারের কাজ করব। হুজুরের পা টিপব। পার্টটাইম চাকরি, ফুলটাইম না।হুজুর উদাস গলায় বললেন, ঠিক আছে তোমার বিবেচনা। জোর জবরদস্তি নাই।চেষ্টা করব রাতে এখানে থাকতে। দিনে পারব না। কাজকর্ম আছে।কী কাজকর্ম?
আমি জবাব দিলাম না, হুজুরের মতো উদাস হয়ে পেলাম।হুজুর বললেন, খারাপ কোনো কাইজ কাম যদি করো তাহলে কাজ শেষ হওয়ামাত্র পীর বাচ্চাবাবার সুপারিশ নিয়া আল্লাহপাকের কাছে মাফ চাবা, মাফ পায়া যাবে। দেরি করে ক্ষমা চাইলে কিন্তু হবে না। সঙ্গে সঙ্গে মাফি মাংতে হবে।আমি বললাম, ভালো জিনিস শিখলাম হুজুর। এখন আপনার মোবাইলটা দেন, একটা টেলিফোন করব।
এত রাতে কারে টেলিফোন করবা? আচ্ছা থাক, আমারে বলার প্রয়োজন নাই। মানুষের সবকিছু জানতে চাওয়া ঠিক না। সবকিছু জানবেন শুধু আল্লাহপাক।আমি ডিজি স্যারকে টেলিফোন করলাম। কয়েকবার রিং হতেই তিনি ধরলেন। আতঙ্কিত গলায় বললেন, কে? স্যার আমি হিমু। ওই যে আপনার কাছে দুটা শব্দ নিয়ে গিয়েছিলাম-ফুতুরি ও ভুঁতুঁরি।কী চাও? ভূতুরি বানানটা নিয়ে সমস্যায় পড়েছি। আমার মনে হয় একটা চন্দ্ৰবিন্দু থাকলেই চলবে। দুটা চন্দ্ৰবিন্দুতে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।
ডিজি স্যার লাইন কেটে দিলেন। তবে লাইন কাটার আগে চাপা গলায় বললেন, সান অব এ বিচ! আমি ডিজি, বাংলা একাডেমী আমি সচরাচর গালাগালি করি না। আমার রুচিতে বাঁধে। আমার গালাগালি স্টুপিডে সীমাবদ্ধ। তবে কিছুক্ষণ আগে হিমু নামধারী একজনকে ‘সান অব এ বিচ’ বলেছি। এই বদ আমার পেছনে লেগেছে। রাত বাজে তিনটা পঁয়তাল্লিশ। এত রাতে আমার ঘুম ভাঙিয়ে ‘ভুতুরি’ বানান নিয়ে কথা বলে? এ চাচ্ছে কী? বুঝতেই পারছি কোনো একটা বিশেষ মতলব নিয়ে সে ঘুরছে। বাংলাদেশ ভরতি হয়ে গেছে। মতলববাজে।
কে কোন মতলব নিয়ে ঘুরে বোঝার উপায় নেই। সব মতলববাজের পেছনে দু-তিনটা মন্ত্রী-মিনিস্টার থাকে। এইটাই সমস্যা।আমার হটলাইনের টেলিফোন নম্বর হিমু মতলববাজটাকে কে দিল? যে দিয়েছে সেও হিমুর সঙ্গে জড়িত। আমার পেছনে একটা চক্র কাজ করছে। চক্রের প্রধানটা কে? আমার পিএস। দাবির কি জড়িত? কম্পাসের কাটা তার দিকে ঘুরে।
দবির অতি ভদ্র অতি বিনয়ী ছেলে। ভদ্রতা ও বিনয়ের ভেতর শয়তান বসে থাকে। ভদ্রতা-বিনয়-ভালোমানুষি হলো শয়তানের মুখোশ।আমি ভোর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। ভোর হলেই দবিরকে টেলিফোন করব। অতি ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করব হিমু নামের বদটাকে সে আমার গোপন নম্বর দিয়েছে কি না। যদি দিয়ে থাকে তাহলে কেন দিল? হিমু এমন কে যে তাকে আমার গোপন নম্বর দিতে হবে!
আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এটা পরিষ্কার; কে করছে, কেন করছে।–এটাই বুঝতে পারছি না। আমার প্রধান সমস্যা, আমি কাউকে না বলতে পারি না। সরকারি ছাত্রদলের একসময়ের বড় নেতা এসে পাণ্ডুলিপি জমা দিল। পাণ্ডুলিপির নাম ‘বাংলার ঐতিহ্য চেপা শুঁটকির একশত রেসিপি’। তাকে কষে চড় দেওয়া দরকার। তা না করে বললাম, একটি দেশের কালচারের অং রান্নাবান্না। পাণ্ডুলিপি এখনই রিভিউয়ারদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
সে বলে কী, রিভিউয়ার লাগবে না, মন্ত্রীর সুপারিশ আছে। মন্ত্রী মহোদয় আপনাকে টেলিফোন করবেন।আমি বললাম, অবশ্যই, অবশ্যই। তবে আমাদেরও তো কিছু নিয়মকানুন আছে।যেখানে তিনজন মন্ত্রীর সুপারিশ সেখানে আবার নিয়মকানুন কী? আমি আবারও বললাম, অবশ্যই, অবশ্যই।নিন পূর্ত মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলুন।
আমাকে মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলতে হলো।এখন রাত প্ৰায় চারটা। হিমু বদমাইশটা যদি এখন বলে, রেল মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলুন, আমাকে কথা বলতেই হবে। মন্ত্রী মহোদয়রা রাতে কম ঘুমান। তারা অদ্ভুত অদ্ভুত সময়ে কথা বলেন। আমি ফ্রিজ থেকে বোতল বের করে একগ্লাস ঠান্ডা পানি খেলাম। বারান্দায় বসে একটা সিগারেট শেষ করলাম। মন অস্থির হয়েছে।
অস্থির অবস্থায় বিছানায় ঘুমুতে যাওয়া ঠিক না। অস্থির অবস্থায় ঘুমুতে যাওয়া মানুষ দুঃস্বপ্ন দেখে।সিগারেট খাওয়ার কারণেই কি না জানি না, অস্থিরতা খানিকটা কমল। বিছানায় গিয়েছি, চোখ লেগে এসেছে। আবার টেলিফোন। বদটাই কি আবার করেছে? নম্বর সেভ করা নাই বলে বুঝতে পারছি না। টেলিফোন ধরব ন?
মাইকেল এঞ্জেলো বলেছেন, ‘মেয়েদের সবচেয়ে সুন্দর দেখায় তাদের কেঁদে ফেলার আগমুহুর্তে।’মাইকেল এঞ্জেলোর কথা সত্যি হতে পারে। মাজেদা খালার বসার ঘরের সোফায় রোগা-পাতলা এক তরুণী বসে আছে। সে হালকা সবুজ রঙের শাড়ি পরেছে। শাড়ির সবুজ রঙ ছায়া ফেলেছে মেয়েটির মুখে। সবুজ আভায় তার চেহারা খানিকটা করুণ হয়েছে। সে মাথা নিচু করে বসে আছে।
তার চোখের পাতা যেভাবে কাঁপছে তাতে বোঝাই যাচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কাঁদবে। তাকে অপরূপ দেখাচ্ছে। মাইকেল এঞ্জেলো এই মেয়েকে দেখলে বাটালি দিয়ে পাথর কাটা শুরু করতেন। যে ভঙ্গিতে মেয়েটি বসে আছে, তিনি সেই ভঙ্গি হয়তো সামান্য পাল্টাতেন, যাতে মেয়েটির মুখ ভালোভাবে দেখা যায়। এখন মেয়েটির মুখ ভালো দেখা যাচ্ছে না।
আমি তার কেঁদে ফেলার দৃশ্য দেখার জন্যে অপেক্ষা করছি। সে চোখ তুলে আমাকে দেখে তার কান্না সামলে ফেলল। কিছু কিছু মেয়ে দ্রুত কান্না সামলাতে পারে। এ মনে হয় সেই দলের। আমি মেয়েটিকে পাশ কাটিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলাম। মাজেদা খালা রান্নাঘরের টুলে বসে আছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনিও কিছুক্ষণের মধ্যে কাঁদবেন। তবে তাকে রূপবতী দেখাচ্ছে না। বরং কদাকার লাগছে। কেঁদে ফেলার আগে সব মেয়েকে রূপবতী মনে হয়, এই তথ্য ঠিক না।খালা, সমস্যা কী?
এই বাড়িতে সমস্যা তো একটাই—তোর খালু। অপরিচিত এক মেয়ের সামনে তোর খালু আমাকে কুত্তি ডেকেছে।আমি বললাম, বাংলায় কুত্তি বলেছেন, নাকি ইংরেজিতে বলেছেন? বাংলায় কুত্তি ভয়ঙ্কর গালি, ইংরেজিতে ‘বিচ’ তেমন গালি না। বাংলা ‘গু’ শব্দ ভদ্রসমাজে উচ্চারণ করা যায় না, কিন্তু ইংরেজিতে ‘শীট’ কথায় কথায় বলা যায়।
খালা মনে হয়। অনেকক্ষণ কান্না ধরে রেখেছিলেন, আর পারলেন না। শব্দ করে কাঁদতে লাগলেন। শোবার ঘর থেকে খালু ইংরেজিতে হুঙ্কার দিলেন। কঠিন গলায় বললেন, Get lost! হুঙ্কার বাংলায় অনুবাদ করলে হয়, ‘হারিয়ে যাও।’ Get lost হলো গালি, আর ‘হারিয়ে যাও’ হলো বেদনার্তা দীর্ঘনিঃশ্বাস। বাংলা ভাষায় ঝামেলা আছে। বাংলা একাডেমীর ডিজি সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে হবে।মাজেদা খালা নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে বললেন, তোর খালুকে কি তুই বলে আসতে পারবি যে আমি তার সঙ্গে আর বাস করব না?
আমি বললাম, আমাকে কিছু বলে আসতে হবে না। তুমি কথাবার্তা যথেষ্ট উচু গলায় বলছি। খালু শোবার ঘর থেকে পরিষ্কার শুনতে পারছেন। আশপাশের অ্যাপার্টমেন্টের লোকজনও শুনছে।তারপরেও তুই বলে আয়।ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে হলো? তোর খালুকে জিজ্ঞেস কর কীভাবে হলো।সোফায় বসে যে মেয়ে কাদার চেষ্টা করছে, সে কে? আমার এক বান্ধবীর মেয়ে। আর্কিটেক্ট। ডিজাইনে গোন্ড মেডেল পাওয়া মেয়ে। হেজিপেজি কেউ না।আমি বললাম, গোন্ড মেডালিস্ট কাঁদার চেষ্টা করছে কেন?
তোর খালু সুপার ট্যালেন্টেড এই মেয়েকে পেত্নী বলেছে। বলেছে পেত্নীটাকে বিদায় করো। তাকে কোনো একটা বাঁশগাছে পা বুলিয়ে বসে থাকতে বলো।আমি বললাম, ঘটনা যথেষ্ট জটিল বলে মনে হচ্ছে। তুমি কড়া করে চা বানাও। চা খেয়ে মাথা ঠান্ডা করি, তারপর অ্যাকশান।চা বানাচ্ছি, তুই তোর খালুকে বলে আয়, আমি তার সঙ্গে এক ছাদের নিচে বাস করব না।
আমি খালু সাহেবের শোবার ঘরের দিকে (অনিচ্ছায়) রওনা হলাম। ছুটির দিনের সকালে মাজেদা খালার বাড়িতে আসাটা বোকামি হয়েছে। খালা-খালির সব ঝগড়া ছুটির দিনের সকালে শুরু হয়। দুপুরের দিকে শেষ হয়। দুপুরে খালু সাহেব দুটা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমান। তবে আজ মনে হয়। ঘুমাবেন না। কিংবা বাসায় ঘুমের ট্যাবলেট নেই।
খালু সাহেব ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসে আছেন। তাঁর ঠোঁটে পাইপ। ছুটির দিনে তিনি পাইপ টানেন। তার কোলের ওপর ওরহান পামুকের বই My name is red। খালু সাহেবের চেহারা শান্ত। ঝড়ের কোনো চিহ্নই নেই। তিনি আমাকে দেখে মিষ্টি গলায় বললেন, কেমন আছ হিমু?
আমি মোটামুটি ঘাবড়ে গেলাম। গত দশ বছরে খালু এমন গলায় ‘কেমন আছ হিমু জিজ্ঞেস করেন নি। আমি তাঁর কাছে কীটপতঙ্গের কাছাকাছি। আমার ভালো থাকা না-থাকায় তাঁর কিছু আসে যায় না।খালু সাহেবের মধুর ব্যবহারে হকচাকিয়ে গিয়ে বিনীত গলায় বললাম, আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
খালু সাহেব বললেন, আমি ভালো আছি। ব্রিলিয়ান্ট একটা উপন্যাস পড়ছি। ওরহান পামুকের। বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকেরা কীসব অখাদ্য লেখে, তাদের উচিত ওরহান সাহেবের পায়ের কাছে বসে থাকা।আমি ওই ভদ্রলোকের কিছু পড়ি নি। তারপরেও বললাম, অবশ্যই। শুধু পায়ের কাছে বসে থাকলে হবে না, মাঝে মাঝে পা চাটতেও হবে।খালু সাহেব বললেন, বসার ঘরের সোফায় সবুজ শাড়ি পরা মেয়েটা কি এখনো আছে, না চলে গেছে? এখনো আছে।কাদছে নাকি? না, তবে কাঁদবে কাঁদবে করছে।
খালু সাহেব বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন, এই একটি মেয়েকে আমি পেত্নী ডেকেছি—তার জন্যে লজ্জিত! তুমি তাকে বলে দিয়ে যে, আই অ্যাপোলোজাইজ। উপন্যাসে একটা জায়গায় পেত্নীর বর্ণনা পড়ছিলাম, সেই থেকে পেত্নী মাথায় ঘুরছিল। উত্তেজনার মুহুর্তে মুখ থেকে পেত্নী বের হয়েছে। আচ্ছন্ন অবস্থায় ছিলাম।
আমি বললাম, খুবই স্বাভাবিক। মহান লেখা মানুষকে আচ্ছন্ন করবেই। খালাকেও নিশ্চয়ই এই কারণে বিচ ডেকেছেন। পামুক সাহেবের বইয়ে মহিলা কুকুরের বর্ণনা পড়েছেন। সব দোষ ওরহান পামুক সাহেবের।খালু সাহেব শান্ত গলায় বললেন, তোমার খালাকে আমি মন থেকেই বিচ বলেছি। বাইরের প্রভাবমুক্ত উচ্চারণ।ও আচ্ছা।
তুমি তোমার খালাকে গিয়ে বলো, সে যেন চলে যায়। আমি এই বিচের মুখ দেখতে চাই না।আপনাদের দু’জনের মধ্যে তাহলে তো আন্ডারাষ্ট্যান্ডিং হয়েই গেল। খালা বলেছেন, তিনি আপনার সঙ্গে এক ছাদের নিচে বাস করবেন না।সে মুখে বলছে, আসলে যাবে না। নানান যন্ত্রণা করে আমাকে পাগল বানিয়ে পাবনার পাগলাগারদে পাঠাবে।আমি বললাম, ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, একটু কি বলবেন?
খালু সাহেব বললেন, আমি একটা বই পড়ছি, যথেষ্ট আনন্দ নিয়ে পড়ছি, এখন ঘটনার সূত্রপাত কিংবা মূত্রপাত কিছুই বলব না। তুমি তোমার খালাকে এবং পেত্নীটাকে নিয়ে আধাঘণ্টার মধ্যে বাড়ি ছাড়বে। যদি সম্ভব হয় আমাকে এক কাপ চা বানিয়ে দাও। তুমি নিজে বানাবে, বিচটাকে বলবে না।সব বড় ম্যাজিকের কৌশল যেমন সহজ হয়, সব বড় ঝগড়ার কারণও হয় তুচ্ছ। শেষ পর্যন্ত খালু সাহেবের মুখ থেকেই কারণ জানা গেল। তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, চা তুমি বানিয়েছ?
আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম। খালু সাহেব বললেন, চুমুক দিয়েই বুঝেছি, ওই গুড ফর নাথিং মহিলা চা-ও বানাতে পারে না। সে শুধু পারে ঝামেলা বাড়াতে। আমার বন্ধুর ছেলে এসেছে, হার্ভার্ড Ph.D. তোমার খালা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তাকে বিয়ে দিবে। মেয়ে একটা জোগাড় করেছে, তুতুরি ফুতুরি কী যেন নাম।সোফায় যে মেয়ে বসে আছে সে নাকি?
হ্যাঁ সে। আজ সকালে কী হয়েছে শোনো-আরাম করে বই পড়তে বসেছি, ওই মেয়ে গজ ফিতা নিয়ে দেয়াল মাপামাপি শুরু করেছে। আমি শান্ত গলায় বললাম, কী করছ? সে বলল, দেয়াল মাপছি।আমি বললাম, দেয়াল মাপাছ তা তো দেখতেই পাচ্ছি, কিন্তু কেন? হঠাৎ দেয়াল মাপার প্রয়োজন পড়ল কেন?
সব দেয়াল ভেঙে নতুন ইন্টেরিয়র হবে। ঘরে আলো-হাওয়া খেলবে।আমি বললাম, আমার আলো-হাওয়ার দরকার নেই। তোমার যদি দরকার হয় তুমি বাঁশগাছে চড়ে বসে থাকো। পেত্নী কোথাকার! খালু সাহেব বইয়ে মন দিলেন। বইয়ে খুব ইন্টারেস্ট্রিং কিছু নিশ্চয়ই পেয়েছেন।
নিজের মনেই বললেন, Oh God! খালা একবস্ত্রে গৃহত্যাগ করলেন। আমরা তিনজন রাস্তায় নেমে এলাম। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে খালা শোবার ঘরে ঢুকলেন। খালু সাহেবকে বললেন, এই যে যাচ্ছি, আর কিন্তু এ বাড়িতে ঢুকব না। আমার বাবা’র কসম, আমার মা’র কসম।খালু সাহেব বই থেকে চোখ না তুলেই বললেন, শুনে আনন্দ পেলাম, Go to hell.
