হিমু পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

হিমু পর্ব – ৭

‘এষা, এখন আমি উঠব। আরেকদিন আসব। আপনার দাদীমা’র জন্যে আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আমাকে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতে হবে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। রাত ন’টায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট। ন’টা প্রায় বাজতে চলল।’ ‘কবে আসবেন?’ ‘খুব শিগ্‌গিরই আসব। এষা, আপনাকে আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি। কথাটা হচ্ছে—আমার কথাবার্তা থেকে দয়া করে কোনো ভ্রান্ত ধারণা নেবেন না। মনে করবেন না আমি খুব কায়দা করে মোরশেদ সাহেবের কাছে আপনাকে ফিরে যেতে বলছি।’ ‘আপনি বলছেন না?’

‘অবশ্যই না। মোরশেদ সাহেব যদি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতেন আমি হয়তো- বা বলতাম। সেই সম্ভাবনা একেবারেই নেই। উঠি এষা’ ডক্টর ইরতাজুল করিম সাহেবও ঠিক এষার মতো ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকালেন, যেন চিনতে পারছেন না। ‘স্লামালিকুম ডাক্তার সাহেব, আমি হিমু।’ ‘কি ব্যাপার?’ ‘আপনার সঙ্গে আমার অ্যপয়েন্টমেন্ট আছে।’

‘আপনি ডাইরিতে লেখে রেখেছেন। প্রথম যেদিন এসেছিলাম সেদিনই বলেছিলেন এক সপ্তাহ পর রাত ন’টার দিকে আসতে। বসব?’ ‘বসুন।’ ‘শুরু করব?’ ‘কী শুরু করতে চাচ্ছেন?’ ‘জীবন-কাহিনী। আমার বাবা কি করে আমাকে মহাপুরুষ বানানো চেষ্টা করতে লাগলেন, তিনি কতটুকু পারলেন, কতটুকু পারলেন না। অর্থাৎ ঐ রাতে যেখানে শেষ করেছিলাম, সেখান থেকে শুরু…’

‘হিমু সাহেব।’ ‘জ্বি?’ ‘আমার একটি মেয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে। আপনি সেই খবর খুব ভাল করেই জানেন। ওর এখন স্কিন গ্রাফটিং হচ্ছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় থেকে চামড়া কেটে লাগানো হচ্ছে। আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। রোগী দেখছি না। কিছু করার নেই বলে চেম্বারে এসে বসেছি।’ ‘আমি তা হলে চলে যাই?’

‘এসেছেন যখন বসুন। আমার কাছে আপনার একটি ডিনার পাওনা আছে। আসুন, আমরা একসঙ্গে ডিনার করি। ঘরে সাত দনি ধরে রান্নাবান্না হচ্ছে না। আমার স্ত্রী থাকেন হাসপাতালে, কাজেই আমরা কোনো-একটা হোটেলে বসব। আপনার আপত্তি আছে?’

‘না, আপত্তি নেই।’ ‘চলুন তাহলে ওঠা যাক।’ আমরা গুলশান এলাকার একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। ডাক্তার সাহেব বললেন, এই রেস্টুরেন্টটা ছোট, কিন্তু খুব ভাল। এদের কুক একজন ভিয়েতনামি মহিলা। তিনি খাবার তৎক্ষণাৎ তৈরি করে দেন। আপনি কি খাবেন মেনু দেখে অর্ডার দিন। আমি নিজে শুধু একটা স্যুপ খাব। আপনি কি মদ্যপান করেন?

‘জ্বি-না।’ ‘বিয়ার? বিয়ার নিশ্চয়ই চলতে পারে।’ ‘আপনি খান। আমার লাগবে না।’ বিয়ারের ক্যান খুলতে-খুলতে ডাক্তার সাহবে বললেন, আমি আপনার একটি বিষয় জানার জন্যে আগ্রহী। আপনার ভবিষ্যৎ বলার ক্ষমতা কি সত্যি আপনার আছে? ‘আমি ঠিক জানি না। মাঝে-মাঝে যা ভাবি তা হয়ে যায়। সে তো সবারই হয়। আপনারও নিশ্চয়ই হয়?’ ‘না, আমার হয় না?’

‘অবশ্যই হয়। ভাল করে ভেবে দেখুন—এরকম কি হয় না যে আপনি দুপুরে বাসায় ফিরছেন—আপনার মনে হল আজ বাসায় বেগুন দিয়ে ইলিশ মাছ রান্না হয়েছে। খেতে বসে দেখেন, সত্যি তাই।’ ‘এটা হচ্ছে কো-ইনসিডেন্স।’ ‘আমার ব্যাপারগুলিও কো-ইনসিডেন্স। এর বাইরে কিছু না।’ ‘আপনি বলতে চাচ্ছেন আপনার কোনো ক্ষমতা নেই?’ ‘না।’ ডাক্তার সাহেব তিনটি বিয়ার শেষ করে চতুর্থ বিয়ারের ক্যানে হাত দিলেন। মদ্যপান তিনি খুব অভ্যস্ত বলে মনে হচ্ছে না। চোখটোখ লাল হয়ে গেছে। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।‘হিমু সাহেব।’ ‘জ্বি?’

‘আমার কিন্তু ধারণা, আপনার ক্ষমতা আছে। আপনার বাবা পুরোপুরি ব্যর্থ হননি—strange কিছু জিনিস আপনার ভেতর তৈরি করতে পেরেছেন। তার একটি হচ্ছে মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা আপনার প্রচুর আছে।’ ‘এই ক্ষমতা অল্পবিস্তর সবারই আছে।’ ‘আপনাকে অনেক বেশি আছে। ইয়াদ সাহেবের সঙ্গে কি রিসেন্টলি আপনার দেখা হয়েছে?’ না।’ আপনি কি জানেন তিনি গত দু’দিন ধরে ভিক্ষুক সেজে পথে-পথে ঘুরছেন? দু’রাত বাড়ি ফেরেননি?’

‘না—জানি না।’ ‘ইয়াদ সাহেবের স্ত্রী আপনি আসার কিছুক্ষণ আগেই আমার কাছে এসেছিলেন। ভদ্রমহিলা যে কী পরিমাণ মানসিক অর্ডিয়েলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন তা তাঁকে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব।’ ‘আপনি তাঁকে কী বলেছেন?’ ‘বলেছি এটা সাময়িক ঝোঁক। ঝোঁক কেটে যাবে। ইয়াদ সাহেব বাসায় ফিরবেন। আপনার কি ধারণা হিমু সাহেব?’ ‘কোন ধারণার কথা জানতে চাচ্ছেন?’ ‘ইয়াদ সাহেব প্রসঙ্গে জানতে চাচ্ছি।উনার ঝোঁক কাটতে কতদিন লাবে?’ ‘বলতে পারছি না। ঝোঁক নাও কাটতে পারে।’ ‘তার মানে?’

খাওয়া বন্ধ করে আমি সিগারেট ধরাতে-ধরাতে বললাম, মানুষ খুব বিচিত্র প্রাণী ডাক্তার সাহেব। সে সারা জীবন অনেক কিছুই অনুসন্ধান করে ফেরে। সেই অনেক অনুসন্ধানের একটি হল—তার অবস্থান। সে কোথায় খাপ খায় তা জানতে চায়—সেই বিশেষ জায়গাটা যখন পেয়ে যায় তখন তাঁকে নড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।

‘আপনি ভুলে যাচ্ছেন হিমু সাহেব, মানুষ খুব Rotional প্রাণী।’ ‘মানুষ মোটেই Rational প্রাণী নয়। সমস্ত পশুপাখি, কীটপতঙ্গ Rational, মানুষ নয়।যখন বৃষ্টি হয়, পাখি তখন বুষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য গাছের নিচে আশ্রয় নেয়। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। মানুষের ভেতর ব্যতিক্রম আছে। এদের কেউ –কেউ ইচ্ছা করে বৃষ্টিতে ভেজে। কেউ-কেউ গাছের নিচে দাঁড়ায় ঠিকই,কিন্ত মন পড়ে থাকে বৃষ্টিতে। সে মনে-মনে ভিজতে থাকে।’ ‘হিমু সাহেব।’ ‘জ্বি?’

‘আপনি কিছুই খাচ্ছেন না। খাবারটা কি আপনার পছন্দ হচ্ছে না?’ ‘জ্বি-না, সবকিছুর মধ্যে ধোঁয়া-ধোঁয়া গন্ধ পাচ্ছি।’ ডাক্তার সাহেব বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আপনাকে কোথায় নামিয়ে দেব বলুন। ‘কোথাও নামাতে হবে না। আমি এখান থেকেই হেঁটে-হেঁটে চলে যাব।’ ‘অনেকটা দুর কিন্ত।’ ‘খুব দুর নয়। আবার কবে আপনার কাছে আসব,ডাক্তার সাহেব?’

‘আপনাকে আর আসতে হবে না। আমি আপনার চিকিৎসা করব না।’ ‘আপনার কি ধারণা আমি অসুস্থ না?’ ‘বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, গূড নাইড।’ বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত একটা বেজে গেল। মেসের অফিসে বাতি জ্বালিয়ে জীবনবাবু বসে আছেন। আমাকে দেখেই বললেন, আপনার জন্যে বসে আছি হিমু ভাই। আপনাকে বলেছি না, আমি একটা ভয়ংকর বিপদে পড়েছি? বিপদের কথাটা বলতে চান? ‘জ্বি।’ ‘আসুন আমার ঘরে। বলুন।’

জীবনবাবু অনেকক্ষণ আমার ঘরের চৌকিতে বসে থেকে, কিছু না বলেই চলে গেলেন। খুব জাকিয়ে শীত পড়েছে। আমার ঘরের জানালার একটা কাঁচ ভাঙ্গা। শীতের ঠান্ডা হাওয়া বাতাস আসছে। জীবনবাবুকে বলতে মনে থাকে না। আজ কি বার? বৃহস্পতিবার? পাশের ঘরে তাস খেলা হচ্ছে। হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। বিছানায় যাবার পর লক্ষ করলাম—মাথাধরা শুরু হয়েছে। ইরতাজুল করিম সাহেবকে এই মাথাধরার কথাটা বলা হয়নি।

টেলিফোন করার জায়গা পাচ্ছি না। গ্রীন ফার্মেসি বন্ধ। কম্পউটারের নতুন একটা সার্ভিস সেন্টার হয়েছে। ওদের টেলিফোন আছে—গেলেই টেলিফোন করতে দেয়। সার্ভিস সেন্টারটিও বন্ধ। এসছি তরঙ্গিণী স্টোরে। নতুন ছেলেটা আমাকে দেখেই বলল, টেলিফোন নষ্ট। মিথ্যা বলছে বোঝাই যাচ্ছে। বলার সময় মুখের চামড়া শক্ত হয়ে গেছে। সে মনে হয় আগেই থেকে ঠিক করে রেখেছিল—আমাকে দেখলেই বলবে,“টেলিফোন নষ্ট।”

আমি আন্তরিক ভঙ্গিতে বললাম, গোটা দশেক টাকা দিলে কি ঠিক হবে? ‘বললাম তো নষ্ট।’ ‘আপনার চাকরি কতদিন হয়েছে?’ ‘তা দিয়ে আপনের কী প্রয়োজন?’ ‘কোনো প্রয়োজন নেই, এম্নি জিজ্ঞেস করছি। মুহিব এসেছিল এর মধ্যে?’ ‘না।’ ‘ওর ঠিকানা জানেন?’ ‘না।’ ‘আপনার ঠিকানা কি?’ ‘আমার ঠিকানা ‍দিয়ে কি করবেন?’

ছেলাটা কঠিন গলার স্বর বের করছে। একে বিরক্ত করতে ভাল লাগছে। কি করে আরো রাগিয়ে দেয়া যায় তাই ভাবছি।‘আপনাদের এই দোকান খোলে কখন?’ ‘খামাখা প্যাচাল পাড়তেছেন ক্যান। সওদা করার থাকলে সওদা করেন, নয়তো যান গিয়া।’ ‘আপনার ঠিকানাটা তো এখনও বলেননি?’ ‘আরে দুত্তেরি।’ আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললাম, বল পয়েন্ট কলম আছে? দেখান দেখি।

সে একটা কলম সামনে রাখল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে কলম দিয়ে খোঁচা মেরে সে যদি আমার চোখ গেলে দিতে পারত তাহলে খুশি হত।‘দাম কত?’ ‘দশ টাকা।’ ‘বাংলাদেশি বল পয়েন্ট না?’ ‘হুঁ।’ ‘এগুলি তিন টাকা করে বাইরে বিক্রি হয়। আপনার এখানে দশ টাকা কেন?’ ‘আপনে বাইরে থাইক্যা কিনেন।’ ‘আমি আপনার এখান থেকে কিনতে চাচ্ছি। তিন টাকার জিনিস বেশি হলে চার টাকা হবে। তার চেয়েও বেশি হলে হবে পাঁচ। দশ টাকা কেন?’ ‘দাম বেশি ঠেকলে নিবেন না।’

‘মানিব্যাগ খুলে আমি আমার শেষ সম্বল দশ টাকার নোটটা দিয়ে তিন টাকা দামের বল পয়েন্ট কিনে বের হয়ে এলাম। টাকার সন্ধানে যেতে হবে। মাসের প্রথম তারিখে ফুপা আমাকে চার’শ টাকা দেন। শর্ত একটাই—আমি কখনো তাঁর বাসায় যেতে পারব না। তাঁর ছেলে বাদল যেন কখনো আমার দেখা না পায়। ফুপার ধারণা, আমার প্রভাবে বাদলের সর্বনাশ হচ্ছে। বাদলকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় আমার কাছ থেকে দুরে রাখা। দু’মাস ফুপার কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়নি।

ফুপার অফিসঘরে শীতকালেও এয়ার কুলার চলে। এয়ার কুলারের বিজবিজ আওয়াজ না হলে বোধহয় তাঁর মেজাজ আসে না। ‘কেমন আছেন ফুপা?’ ফুপা ফাইল থেকে মুখ না তুলেই বললেন, ভেতরে আস। অনেক দিন দেখা হয় না। তোমাকে তুই করে বলতাম, না তুমি করে বলতাম ভুলে গেছি। ভাল আছ? ‘জ্বি।’ ‘আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে তুমি জেলে আছ। তোমার মতো লোক দীর্ঘদিন বাইরে ঘুরে বেড়াতে পারে না। একসময়-না একসময় তাদের জেলে ঢুকতে হয়। এর মধ্যে পুলিশ ধরেনি তোমাকে?’ ‘না’

‘আমি অবশ্যি বাদলকে বলেছি—তুমি জেলে আছ। তোমার এক বছরের সাজা হয়েছে। না বললে তোমার খোঁজ বের করার জন্যে অস্থির হয়ে পড়ত।’ ‘আমি কি বসব ফুপা।’ ফুপা বিস্মিত হয়ে বললেন, অনুমতি নিচ্ছ কেন? বস।‘আপনার অফিসে ঢুকলেই নিজেকে অফিসের একজন কর্মচারী বলে মনে হয়।আপনাকে মনে হয় বড় সাহেব। সামনে বসতে ভয় লাগে।’ ফুপা খুশি হলেন। ফাইল সরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। ‘তোমার টাকা আলাদা করে রেখেছি।’ ‘থ্যাংকস ফুপা।’ ‘নাও, খাম দু’টা রাখ। চার’শ চার’শ করে আটশ’ আছে।’

খাম পকেটে ভরলাম। ফুপা আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে আমার অফিসে কাজ করতে পার। এন্ট্রি লেভেল অফিসারের একটা পোস্ট খালি হয়েছে। আমরা অ্যাডভাটাইজ করব না। অ্যাডভাটাইজ করলে সামাল দেয়া যাবে না। তুমি চাইলে আজই তোমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়া যেতে পারে। ‘বেতন কত?’ ‘বেসিক তিন হাজার প্লাস ফর্টি পারসেন্ট হাউস রেন্ট। টু হানড্রেড কনভেন্স। থ্রী হানড্রেড মেডিকেল –হিসেব কর। কত হল?’

‘জটিল হিসাবে আমাকে দিয়ে হবে না ফুপা। তবে আমি খুব ভাল একজন লোক দিতে পারি। ভেরি অনেস্ট।’ ‘তোমার কাছে তো আমি লোক চাইনি।’ ‘তা চাননি। তবু হাত যখন আছে তখন বললাম। আমার জানামতে তাঁর মতো মানুষ এই পৃথিবীতে দ্বিতীয় কেউ নেই। এর উপর আমি আট শ’ টাকা বাজি রাখতে পারি। এই টাকাটাই আমার সম্বল। আপনি যদি এমন কাউকে পান যে ঐ লোকটার মতো, তাহলে আমি সঙ্গে-সঙ্গে আপনাকে আট শ’ দিয়ে দেব।’

ফুপা চুরুট ধরাতে ধরাতে বললেন, কি আছে লোকটার যা অন্য কারোর নেই? ‘সে তার বাড়ির সামনে একটা আমগাছ দেখতে পার, যদিও সেখানে কোনো গাছ নেই। কোনোদিন ছিলও না। সে পরিষ্কার আমগাছ দেখে, গাছে পাখি বসে থাকতে দেখে। পাখির কিচিমিচির শুনতে পায়।’ ফুপা বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি এই বদ্ধ উন্মাদকে আমার এখানে চাকরি দিতে চাচ্ছ? ‘জ্বি।’ ‘কেন বল তো?’

‘ভদ্রলোকের চাকরি খুব দরকার। উনি অসুস্থ। এপিলেপ্সি আছে। আগে ভাল চাকরি করতেন। এখন চাকরি নেই। যদি চাকরি হয় মানসিক শক্তি পাবেন। এতে শরীর সুস্থ হতে থাকবে।’ ‘তোমার ধারণা,আমার অফিস পাগল সারাবার কারখানা?’ ‘না, তা হবে কেন?’ ‘একে উন্মাদ, তার উপর এপিলেপটিক পেশেন্ট, তাকে তুমি আমার এখানে চাকরি দেবার কথা ভাবলে কি করে বল তো?’ ‘আর ভাবব না ফুপা।এখন তাহলে যাই?’ ‘যাও। খবর্দার, বাসায় আসবে না।’ ‘বাদল আছে কেমন?’

‘ও ভালই আছে। তোমার প্রভাব থেকে দুরে আছে, ভাল না থাকার তো কোনো কারণ নেই।’ ‘আমি কি ওর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে পারি ফুপা? অনেক দিন দেখি না—কথা বলতে ইচ্ছা করে।’ ‘অসম্ভব! টেলিফোন করতে পারবে না। একেবারেই অসম্ভব।’ ‘বলব—ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে টেলিফোন করা হচ্ছে। মিনিট দুই কথা বলব। দু’মিনিটে কী আর হবে।’

‘কিছু হবার থাকলে দু’ মিনিট হবে। বাদলের মাথা খারাপ হয়েই আছে—ঠিক করার চেষ্টা করছি। তোমার টেলিফোন পেলে—আর ঠিক হবে না। হিমু, তুমি বিদেয় হও। ক্লিয়ার আউট। এখন থাক কোথায়?’ কোথায় থাকি বলতে যাচ্ছিলাম, ফুপা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, থাক, বলতে হবে না।জানতে চাচ্ছি না।আমি ঘর ছেড়ে বেরুবার আগে বললাম, ফুপা। বাদলের ব্যাপারে একটা ক্ষুদ্র সমস্যা হতে পারে। ঐ সমস্যাটা নিয়ে কি ভেবেছেন? ‘কি সমস্যা?’

‘আমি জেলে আছি শুনে সেও ভাবতে পারে জেলে যাওয়াটা প্রয়োজনীয়। কাজেই জেলে যাবার একটা চেষ্টা করতে পারে।’ ফুপার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। আমি চলে এলাম। মজনু ‍মিয়ার ভাতের হোটেলে যেতে হবে। ভাতের বিল দিতে হবে। অনেক টাকা বাকি পড়ে আছে। মজনু মিয়া হোটেলে খুব ভিড়। প্রচুর কাস্টমার। সবার জায়গা হচ্ছে না। কেউ—কেউ দাঁড়িয়ে আছে। মজনু মিয়া টাকা গুনতে হিমশিম খাচ্ছে। আমাকে দেখে শীতল গলায় বলল, ভাইজান, কথা আছে।

‘কি কথা—সাধারণ না প্রাইভেট?’ ‘প্রাইভেট।’ আমি প্রাইভেট কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বসার জায়গা নেই। দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। মজনু মিয়া তার ছোট ভাইটাকে ক্যাশে বসিয়ে এগিয়ে এল। আমি বললাম, খুব ভাল বিজনেস হচ্ছে, মজনু মিয়া। ব্যাপার কি?

‘ব্যবসাপাতি হইল আপনার ভাগ্যের ব্যাপার। কখন কি হয় কিছু বলা যায় না। কয়েকদিন ধরে দেখতেছি আমার সামনের হোটেলের সব বান্ধা কার্স্টমার এইখানে আসতেছে।’ ‘বয়-বাবুর্চি তো বাড়াতে হবে। এরা পারছে না। আরো কয়েকজন নিন।’ ‘দেখি।’ ‘আর এদের বেতন বাড়িয়ে দিন।’ ‘বাজে কথা বলবেন না তো হিমু ভাই। বাজে কথা শুনেতে ভাল লাগে না।’ ‘আচ্ছা যান। বাজে কথা বলব না। আপনার প্রাইভেট কথা শুনব। প্রাইভেট কথাটা কি?’

‘আপনি যে আপনার এক ভাগ্নেকে গছায়ে দিয়ে গেলেন—তার আছে মৃগী বেরাম। ঐ দিন দুপুরে শরীর কাঁপতে কাঁপতে পড়ে গেল। কেলেঙ্কারি অবস্থা। কার্স্টমাররা সব খাওয়া ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছে।’ ‘তাতে অসুবিধা কী?’

‘অসুবিধা আছে না? এইরকম রোগী নিয়ে কারবার করলে তো হবে না ভাইজান। দোকানের বদনাম হবে। লোক আসা কমে যাবে। আপনে উনারে আমার দোকানে আসতে নিষেধ করে দেবেন।’ ‘আচ্ছা, নিষেধ করে দেব।’

‘আপনি রাগ হলেও কিছু করার নাই। আপনার জন্যে সব মাপ। কিন্তু হিমু ভাই—পাগল, ছাগল, মৃগীরোগী এদের আমি দোকানে ঢুকাব না। ঐদিন আপনার ভাগ্নেরে দেখে আমি কানে হাত দিয়েছি। অনেক কাস্টমার বাইরে দাঁড় হয়েছিল। গণ্ডগোল দেখে ভিতরে ঢুকে নাই। আপনার ভাগ্নেরে আমি বলে দিয়েছি আর যেন এখানে না আসে।’ ‘আপনি নিজেই বলে দিয়েছেন?’ ‘জ্বি ভাইজান, আমি বলেছি। মৃগীরোগী আমার দরকার নেই।’

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *