আপনি আমাদের এত কষ্ট দিচ্ছেন কেন ?
কষ্ট দিচ্ছি ?
হ্যাঁ দিচ্ছেন । না হয় আমরা একটা ভুল করেছিলাম । সব মানুষই তো ভুল করে । সামান্য ভুলের জন্যে যদি এত কষ্ট দেন !
আমি টেলিফোন করলে কষ্ট পাও ?
হ্যাঁ পাই । কারণ আপনি হঠাৎ রেখে দেন । আপনি কি মানুষটাই এমন, না ইচ্ছা করে এসব করেন ?
বেশিরভাগ সময় ইচ্ছা করেই করি ।
আপনি কি একবার আসবেন আমাদের বাসায় ?
এখনো বুঝতে পারছি না । হয়তো আসব ।
কবিতার খাতাটা নিতে আসবেন না ?
ওটা আমি তোমাকে উপহার দিলাম, মীরা ।
তার মানে আপনি আসবেন না ?
না । মানুষের মুখোমুখি হতে আমার ভালো লাগে না । এতে অতিদ্রুত মায়া পড়ে যায় । টেলিফোনে কথা বললে মায়া জন্মানোর সম্ভাবনা কম, সেইজন্যেই টেলিফোন আমার এত প্রিয় । টেলিফোনে কথা বললে মায়া জন্মায় না । মায়া জন্মানোর অনেক কষ্ট ।
তাছাড়া-
তাছাড়া কী ?
থাক, আরেকদিন বলব ।
আপনার বান্ধবী রূপার সঙ্গে কি আপনার প্রায়ই দেখা হয় ?
মাঝে মাঝে হয় । যখন সে যেতে বলে তখন যাই না । যখন যেতে বলে না তখন হঠাৎ উপস্থিত হই ।
উনি কি খুবই সুন্দর ?
তোমাকে তো একবার বলেছি- ও খুব সুন্দর ।
আপনি টেলিফোন রেখে দেবার আগে দয়া করে শুধু একটি সত্যি কথা বলুন । আমি তো সবই সত্যি বলছি । কী জানতে চাচ্ছ বল তো ?
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৪
ঐদিন কি পুলিশ আপনাকে মেরেছিল ?
না ।
এই তো মিথ্যা বললেন ।
আজ সত্যি বলছি- ঐদিন মিথ্যা বলেছিলাম ।
আপনার কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যা কে জানে ?
সে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনাকে একটা খবর দেই- টুটুলভাইকে পাওয়া গেছে । কাউকে কিছু না বলে এক মাসের জন্যে কোলকাতা গিয়েছিল । মজার ব্যাপার কি জানেন- এখন আর আমার টুটুলভাইকে ভালো লাগছে না । ঐদিন টেলিফোন করেছিল, আমি কথাও বলিনি । আমার এরকম হলো কেন বলুন তো ?
আমি টেলিফোন রেখে ফুপার খোঁজে গেলাম ।
তিনি ছাদে । হুইস্কির বোতল খোলা হয়েছে । বরফের পাত্র, ঠাণ্ডাপানি, প্লেটে ভিনিগার মেশানো চিনাবাদাম । আমাকে দেখেই তিনি খুশি খুশি গলায় বললেন, বাদলের পরিবর্তটা সেলিব্রেট করছি ।
ফুপু রাগ করবেন না ?
না, তাকে বলেছি । আজ সে কোনোকিছুতেই রাগ করবে না । বমি করে যদি সারা ঘর ভাসিয়ে দেই তবু রাগ করবে না । তুমি বস হিমু, আরাম করে বস । সম্পর্ক মিশ খাচ্ছে না । মিশ খেলে তোমাকেও খানিকটা দিতাম । আপনি ক-পেগ খেয়েছেন ?
আরে না মাত্রই তো শুরু । আমি নটা পর্যন্ত পারি । আমার কিছুই হয় না । ঐদিন বলেছিলেন ছটা । বলেছিলাম ? বলে থাকলে ভুল বলেছি- নটা হচ্ছে আমার লিমিট । নাইন । এনআই এনই । নাইন ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৪
আর খাবেন না, ফুপা ।
ফুপা গ্রাসে নতুন করে ঢালতে ঢালতে বললেন, খেতে খেতে তোমার কথাই ভাবছিলাম । তুমি মানুষটা খারাপ না । পাগলা ভাব আছে, তবে ভালো । তোমার বাবা পাগলা ছিল তবে ভালো ছিল না ।
ভালো ছিল না বলছেন কেন ?
দেখেছি তো । ও বাড়ি ছেড়ে পালাল আমার বিয়ের অনেক পরে । উন্মাদ ছিল । ফুপা, আপনি কিন্ত্ত বড় দ্রুত খাচ্ছেন । শুনেছি দ্রুত খাওয়া খারাপ । ফুপা গভীর গলায় বললেন, নাইন হচ্ছে আমার লিমিট । নাইনের আগে স্টপ করে দেব । হ্যাঁ, যে- কথা বলছিলাম – আমার ধারণা তোমার বাবা ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর উন্মাদ । এটা হচ্ছে আমার ধারণা ! তুমি আবার রাগ করছ না তো ?
না ।
ছেলেকে মহাপুরুষ বানানোর অদ্ভুদ খেয়াল উন্মাদের মাথাতেই শুধু আসে, বুঝলে ? আরে বাবা, মানুষ কী হবে সব আগে থেকে ঠিক করা থাকে ।
কে ঠিক করে রাখেন, ঈশ্বর ?
প্রকৃতিও বলতে পার ।
হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৫
