‘ওর সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না । পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম দেখা করে যাই।’
‘রাত ক’টা বাজে জান?’
‘জিও না’।

‘ওয়ান ফর্টি । রাত একটা চল্লিশে কেউ কারোর বাড়িতে অকারণে আসে আমার জানা ছিল না।’
‘অকারণে আসিনি স্যার-অনেকদিন দেখা হয় না । ও ভাল আছে তো?’
‘হ্যাঁ ভাল আছে । তোমার নাম কি যেন বললে? এভারেস্ট?’
‘জ্বি না, এভারেস্ট না । হিমালয় । বাবা শখ করে রেখেছিলেন । উনার ইচ্ছা ছিল আমি হিমালয়ের মত হই । হা হা হা ।’
‘শোন হিমালয়, এখন বাসায় যাও । আমার ধারণা, তুমি নেশা টেশা করে এসেছ । নেশাগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে হৈ চৈ করে লাভ নেই বলে চুপ করে আছি । জহিরের সঙ্গে দেখা করতে হলে সকালে বা বিকেলে আসবে । আন আর্থলি টাইমে আসবে না । মনে থাকবে?’
‘জ্বি স্যার মনে থাকবে ।’
আমি পা ছুয়ে সালাম করবার জন্যে নিচু হলাম । দু’জনই খানিকটা সরে গেলেন । ঠিক তখন, ‘‘কার সঙ্গে কথা বলছ মা?’’ বলতে বলতে জহিরের ছোট বোন তিতলী এসে দাঁড়াল । আমি হাসিমুখে বললাম, তিতলী ভাল আছ ? এখনও ঘুমাওনি? একটা চল্লিশ বাজে ।
দরজার ওপাশে খন্ড-৮
তিতলীও তার বাবা-মা’র মত কিংবা তাদের চেয়েও বেশীরকম চমকাল । কারণ সে আমাকে চেনে না, দেখেনি কোনদিন আমি জহিরের কাছ থেকে ওর নাম জানি । চেহারায় মিল দেখে আন্দাজে তিতলী বললাম।
একটা পুরো পরিবারকে হকচকিয়ে দেবার মধ্যে আনন্দ আছে । জহিরদের পরিবার নিয়ে এ জাতীয় আনন্দ আরো কয়েকবার পাওয়ার ইচ্ছা ছিল । তা সম্ভব হয়নি। কারণ ঐ ঘটনার ছ’মাসের মধ্যে তার বাবা মন্ত্রী হয়ে গেলেন । কিছু কিছু লোক মন্ত্রী -কপাল নিয়ে জন্মায় । জিয়া, এরশাদ যেই থাকুক, এরা মন্ত্রী হবেই। জহিরের বাবা এরকম একজন ভাগ্যবান মানুষ ।
মন্ত্রীদের বাড়ি রাত দেড়টা বা দু’টোর সময় যাওয়া সম্ভব না । সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ এ্যারেস্ট করে থানায় নিয়ে বাঁশডলা দেবে । দুপুরের দিকে যাওয়া যায় । এই সময় দর্শনার্থীর ভীড় থাকে না । তবে দুপুরে ঢুকলেও সরাসরি বাড়িতে যাওয়া যায় না । গেটে পুলিশের কাছে স্লিপ দিতে হয়। সেই স্লিপ একজন ভেতরে নিয়া যায় । নিয়ে যাওয়ার কাজটা করে নিতান্তই অনিচ্ছায় । যেন সে হাঁটা ভুলে গেছে । হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে নতুন হাঁটা শিখছে ।
দরজার ওপাশে খন্ড-৮
জহিরের আচার আচরণ, ভাবভঙ্গি কোনটাই মন্ত্রীর ছেলের উপযোগী নয় । কোন কালেও ছিল না । বোহেমিয়ান ধরণের ছেলে । ঘর-পালানো রোগ আছে । কোন কারণ ছাড়াই দেখা যাবে হঠাৎ একদিন হাঁটা ধরেছে । কোনবারই নিজ থেকে ফিরে না । লোকজন পাঠিয়ে ধরিয়ে আনতে হয়। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হয় । তবে বছর কয়েকের মধ্যে পালায়নি । রোগ সম্ভবত সেরেছে । তাকে দেখলাম গেটের পুলিশ দু’জনের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে । মুখভর্তি পান ।
চিবুক গড়িয়ে পানের রস পড়ছে । আমি কোন একটা মজার গল্পের মাঝামাঝি উপস্থিত হলাম । পুলিশ দু’জন অত্যন্ত সন্দেহজনক দৃষ্টিতে আমাকে দেখতে লাগল । চাদর গায়ে মন্ত্রীদের বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করা সম্ভবত নিষেধ ।দুজন পুলিশই তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার চাদরের দিকে । জহির পানের পিক ফেলে উঠে এল । আমাকে হাত ধরে রাস্তার ও-পাশে নিয়ে নিচু গলায় বলল, কি কাজে এসেছিস চট করে বলে চলে যা দোস্ত । বাবা এসে যদি দেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছি, সর্বনাশ হয়ে যাবে । পুলিশের সঙ্গে মাঝে মাঝে আড্ডা দেই ।
এতেই বাবা সারাক্ষণ নাইনটি নাইন হয়ে থাকে । বাড়িতে তোর পজিশন পুলিশের চেয়েও খারাপ । মন্ত্রী হবার পর বাবার মেজাজ যা হয়েছে । আমাকে দেখতেই পারে না । শূল কিভাবে বানানো যায় এই কায়দা জানা থাকলে বাবা নিজেই কাঠমিস্ত্রি ডাকিয়ে একটা শূল বানিয়ে রাখত । সকাল বিকাল আমাকে শূলে চড়াত । লাইফ হেল হয়ে যাচ্ছে দোস্ত ।
‘বাসায় তোর অবস্থা তাহলে কাহিল?’
‘কাহিল বলে কাহিল -‘Gone’ অবস্থা।’
‘কাজকর্ম কিছু করছিস?
Read More