তবে সমস্যা কি জানিস-আমি একটা কোন কথা বললেই তো মন্ত্রী শুনবে না। তিনি যেন মন দিয়ে আমার কথা শুনেন সেই ব্যবস্থা করতে হবে । আরেক কাপ চা খাবি?’

রফিক জবাব দিল না । মাথা নিচু করে বসে রইল । সে মনে হল আরো সুন্দর হয়েছে । বসে আছে কেমন হতাশ ভঙ্গিতে । বড় মায়া লাগছে । রফিকের সঙ্গে আমার পরিচয় কলেজে ওঠার পর । কোন একটা সমস্যা হলেই সে আমার কাছে এসে সমস্যা বলে নিশ্চিত হয়ে যায় । এখন সে বাড়ি যাবে পুরোপুরি চিন্তামুক্ত হয়ে । পঞ্জিকা দেখে পূর্ণিমার দিন গর্ত খুঁড়ে
অপেক্ষা করবে আমার জন্যে । কোন কারণে সেদিন ঝড়বৃষ্টি হলেও দমবে না। তার এই আনুগত্য আমার একার প্রতি না, সবার প্রতি। এ ধরণের অন্ধ আনুগত্য শুধু পশুদের দেখা যায়। রফিক পশু না, মানুষ। বুদ্ধিমান সৎ ভালমানুষ ধরণের মানুষ । এমন সুন্দর একজন মানুষ যে দেখলেই মনে হয় প্রকৃতি তার এই সৌন্দর্য কোন এক বিশেষ উদ্দেশ্যে তৈরী করেছে। সেই উদ্দেশ্য কি কে জানে?
‘রফিক।’
‘হু।’
‘তোর মা’র শরীর আশা করি ভালই আছে।’
‘বেশি ভাল না। শিগগির মারা যাবেন। কিছু খেতে পারেন না।খুব নাকি গরম লাগে । সারাক্ষণ তালপাখা পানিতে ভিজিয়ে সেই পাখায় হাওয়া করতে হয় । ফ্যানের হাওয়া সহ্য হয় না।’
উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-৬
‘হাওয়া কে করে? তুই?’
রফিক আমার দিকে তাকাল । কিছু বলল, না পর পর দুটি প্রশ্ন করা হয়ে গেছে । তার জবাব দেবার কথা না ।
পিচ গলা রোদ উঠেছে ।
রাস্তার পিচ গলে স্যান্ডেলের সঙ্গে উঠে আসছে । দুৃটা স্যান্ডেলে সমানভাবে লাগলে কাজ হত, তা লাগেনি । ডান দিকেরটায় কম । শুধুমাত্র রোদের কারণে এই মুহুর্তে আমার ডান পা, বা পায়ের চেয়ে লম্বা । আমি ইচ্ছা করে ডান পায়ের স্যান্ডেলে আরো খানিকটা পিচ লাগিয়ে দেড় ইঞ্চি হিল বানিয়ে ফেললাম । এখন আমাকে হাঁটতে হচ্ছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে । আমার হাঁটার ভঙ্গি দেখে যে-কেউ মনে করতে পারে-উদ্দেশ্যবিহীন যাত্রা । আসলে তা নয় । দুপুরে রোদে অকারণে হাঁটছি না । বিশেষ উদ্যেশ্য আছে, বিশেষ পরিকল্পনা আছে । আমি যাচ্ছি মন্ত্রীর সন্ধানে । সরাসরি মন্ত্রী ধরা যাচ্ছে না । জহিরের মাধ্যমে ধরা হবে । সুক্ষ পরিকল্পনা ব্যাপার আছে ।
চৈত্র মাসের ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে আমার গায়ে একটা গরম চাদর । চুল দাড়ি কাটা হয়নি বলে চেহারা হয়েছে ভয়ংকর । দুটা অসমান পা নিয়ে হাঁটছি । তারপরেও আমাকে দেখে মনে হতে পারে আমি পুরো ব্যাপারটায় বেশ মজা পাচ্ছি । কারণ আমার হাতে জলন্ত সিগারেট । মাঝে মাঝে আয়েশ করে সিগারেটে টান দিয়ে নাকে-মুখে ধোঁয়া ছাড়ছি । রাস্তাঘাট ফাঁকা । হরতাল হরতাল ভাব । প্রভেদ এইটুকুই-হরতালের সময় রাস্তায় ছোট ছোট ছেলেপুলেদের মহানন্দে খেলতে দেখা যায় । এখন দেখা যাচ্ছে না । পথের ধারে বেলের শরবত বিক্রি করে তাদের চোখে-মুখে তৃষ্ণার্তের ভঙ্গি থাকে । এই শরবতওয়ালার মধ্যে সেই ভঙ্গি খুব বেশি মাত্রায় । সে গভীর আগ্রহে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । এত আগ্রহ নিয়ে গত তিন বছরে কেউ আমার দিকে তাকায়নি । মানুষের আগ্রহকে উপেক্ষা করা ঠিক না । আমি থমকে দাঁড়ালাম সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে এবং হাসিমুখে বললাম, খবর ভাল?
উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-৬
বেচারা হকচকিয়ে গেল । কি বলবে ভেবে পেল না । তাকাল জগের দিকে । জগভর্তি হলুদ পানীয়তার উপরে বরফের কুচি ভাসছে। আমার ধারণা, পৃথিবীতে যে ক’টি কুৎসিত পানীয় আছে বেলের শরবত তাদের মধ্যে এক নম্বর । দু’নম্বরে আছে তোকমার শরবত ।তোকমার শরবত খাবার সময় মনে হয় ছোট ছোট কেচোর টুকরা পানিতে গুলে খেয়ে ফেলছি ।
শরবতওয়ালার হকচকানো ভাব কমানোর জন্যে বললাম, বেলের শরবত কত করে ?
‘ডাবল তিন টেকা । সিঙ্গেল দুই টেকা’।
‘তোকমারশরবত বিক্রি করেন না?’
‘জ্বি না। চলে না । ভাল জিনিসের কদর নাই।’