হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৩

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৩

এসব বলবেন না তালই সাব । আত্মীয়ের মধ্যে গণ্ডগোল আমার পছন্দ হয় না । আইনের আশ্রয় নিলে আপনারও ক্ষতি, আমারও ক্ষতি ।

আর্থিক ক্ষতি, মানসিক ক্ষতি। কোর্ট ফি এখন বাড়ায় করেছে তিনগুণ । গরিব মানুষ যে একটু মামলা-মোকদ্দমা করবে সে উপায় রাখে নাই । বাবা হিমালয়, তুমি কি আমার সঙ্গে যেতে চাও না ?                                                                                   

চাই ।                                                                                                                                       

এইটা তো বাপের ব্যাটা । আজ তাহলে উঠি তালই সাব । বেয়াদবি যদি কিছু করে থাকি মাফ করে দিবেন । আপনার পায়ে ধরি ।                                                                                                              

বড়মামা সত্যি সত্যি পা ধরতে গেলেন । দাদাজান চমকে সরে গেলেন । 

দুদিন পর আমি মামার সঙ্গে রওনা হলাম ।                                                                                        

গন্তব্য ময়মনসিংহের হিরণপুর ।                                                                                                   

আমার বাবা অনেকবারই বলেছেন, আমার মামারা পিশাচশ্রেণীর । কাজেই তাদের সম্পর্কে আগে থেকেেই একটা ধারণা মনের মধ্যে ছিল । আমি বড়মামা এবং অন্য দুই মামার আচরণে মোটেই অবাক হলাম না । মামার বাড়ি উপস্থিত হবার তৃতীয় দিনের একটা ঘটনার কথা বলি । এই ঘটনা থেকে মামাদের মানসিকতা একটা আঁচ পাওয়া যাবে ।   

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৩                                                           

 

বড়মামার বাড়িতে তিনটা বিড়াল ছিল । এরা খুবই উপদ্রব করত । বড়মামার নির্দেশে বিড়াল তিনটাকে ধরা হলো । তিনি বললেন, হাদিসে আছে বিড়াল উপদ্রব করলে- আল্লাহর নামে এদের জবেহ করা যায় । তাতে দোষ হয় না । দেখি বড় ছুরিটা বার কর । এই কাজ তো আর কেউ করবে না । আমাকে করতে হবে উপায় কী ! মামা নিজেই উঠানে তিনটা বিড়ালকে জবাই করলেন । এর মধ্যে একটা ছিল গর্ভবতী ।   

ঐ বাড়িতে আমার তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি । তিন মামা একসঙ্গে স্কুলঘরের মতো লম্বা একটা টিনের ঘরে থাকতেন । পুরো বাড়িতে ছেলে পুলের বিশাল দল । তাদের জগৎ ছিল ভিন্ন  । একসঙ্গে পুকুরে ঝাপ দেয়া, একসঙ্গে সন্ধ্যেবেলা পড়তে বসা, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া । জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলা, গোল্লাছুট খেলা । খাওয়াও হতো একসঙ্গে । এক মামী ভাত দিয়ে যাচ্ছেন, আর – এক মামী দিচ্ছেন একহাতা করে তরকারি , দুইহাতা ডাল । চামুচে যা উঠে আসে তাই । কেউ বলতে পারবে না আমাকে এটা দাও – ওটা দাও । বললেই চামচের বাড়ি ।                                                           

আমাদের মধ্যে মারামারী লেগেই ছিল । এ ওকে মারছে । সে তাকে মারছে । সেসব নিয়ে কোনো নালিশ হচ্ছে না । নালিশ দেয়ায় বিপদ আছে । একজন নালিশ দিল , কার বিরুদ্ধে নালিশ , কী সমাচার ভালোমতো শোনাই হলো না । হাতের কাছে যে- কয়জনকে পাওয়া গেল পিটিয়ে লাশ বানিয়ে ফেলা হলো । সত্যিকার অপরাধী হয়তো শাস্তিও পেল না ।   

 

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৩        

                                                         

আমি এই বিশাল দলের সঙ্গে অবলীলায় মিশে গেলাম । সীমাহীন স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতা সচরাচর শিশুরা ‍পায় না ।                                                                                         

আমরা কী করছি না করছি বড়রা তা নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাত না ।                                                                       

একজনের হয়তো জ্বর হয়েছে । সে বিছানায় শুয়ে কুঁ কুঁ করছে । কেউ ফিরে তাকাচ্ছে না । নিতান্ত বাড়াবাড়ি না হলে ডাক্তার নেই। মাসে একবার নাপিত এসে সবকটা ছেলের মাথা প্রায় মুড়িয়ে দিয়ে ধান নিয়ে চলে যাচ্ছে । কাপড়-জামারও কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই । এ ওরটা পরছে ! ও তারটা পরছে ।                                                                                                       

মামাদের বাড়ি থেকেই আমি মেট্রিক পাশ করি । যে-বছর মেট্রিক পাস করি বড়মামা সেই বছরই মারা যান । তার শত্রূর অভাব ছিল না । বলতে গেলে গ্রামের সবাই ছিল তার শত্রূ।                                                        

এক অন্ধকার বৃষ্টির রাতে একজন কেউ মাছ মারবার কোঁচ দিয়ে বড়মামাকে গেঁথে ফেলে । বিশাল কোচ । 

 

     Read more 

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৪

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *