হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৮

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৮

আচ্ছা, রূপার পরনে কী রঙের শাড়ি ছিল বল তো ?                                                      

লক্ষ্য করিনি তো ।                                                                                          

আমি মজিদের সঙ্গে অনেক সময় কাটাই । রাতে তার সঙ্গে এক চৌকিতে ঘুমাই । তার কাছ থেকে শিখতে চেষ্টা করি কী করে আশেপাশের জগৎ সম্পর্কে পুরোপুরি নির্লিপ্ত হওয়া যায় । সাধু-সন্ন্যাসীরা অনেক সাধনায় যে স্তরে পৌছেন মজিদ সে স্তরটি কী করে এত সহজে অতিক্রম করল তা আমার জানতে ইচ্ছা করে ।                                                                           

আমার বাবা তার খাতায় আমার জন্যে যেসব উপদেশ লিখে রেখা গেছেন তার মধ্যে একটার শিরোনাম হচ্ছে- নির্লিপ্ততা । তিনি লিখেছেন :                                                 

নির্লিপ্ততা                                                                                          

পৃথিবীর সকল মহাপুরুষ এবং মহাজ্ঞানীরা এই জগৎকে মায়া বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন । আমি আমার ক্ষুদ্র চিন্তা ও ক্ষুদ্র বিবেচনায় দেখিয়াছি আসলেই মায়া । স্বামী ও স্ত্রীর প্রেম যেমন মায়া বই কিছুই নয়, ভ্রাতা ওভগ্নির স্নেহসম্পর্কেও তাই । যে-কারণে স্বার্থে আঘাত লাগিবা মাত্র স্বামী-স্ত্রীর প্রেম বা ভ্রাতাভগ্নির ভালোবাসা কর্পূরের মতো উড়িয়া যায় । কাজেই তোমাকে পৃথিবীর সর্ব বিষয়ে পুরোপুরি নির্লিপ্ত হইতে হইবে ।

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৮ 

কোনোকিছুর প্রতিই তুমি যেমন আগ্রহ বোধ করিবে না আবার অনগ্রহও বোধ করিবে না । মানুষ অসাধ্য কিছুই নাই । চেষ্টা করিলে তুমি তা পরিবে । তোমার ভিতরে সেই ক্ষমতা আছ । সেই ক্ষমতা বিকাশের চেষ্টা আমি তোমায় শৈশবেই করিয়াছি । একই সঙ্গে তোমাকে আদর এবং অনাদর করা হইয়াছে । মাতার প্রবল ভালোবাসা হইতেও তুমি বঞ্চিত হইয়াছ । এই সমস্তই একটি বড় পরীক্ষার অংশ । এই পরীক্ষার সফলকাম হইতে পারলে প্রমাণ হইবে যে ইচ্ছা করিলে মহাপুরুষদের এই পৃথিবীতে তৈরি করা যায় ।                                                                          

যদি একটি সাধারণ কুকুরকেও যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, সেই কুকুর শিকারি কুকুরে পরিণত হয় । একজন ভালোমানুষ পরিবেশের চাপে ভয়াবহ খুনীতে রূপান্তরিত হয় । যদি তাই হয় তবে কেন আমরা আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী মানব সম্প্রদায় তৈরি করিতে পারিব না ?                                 

বাবা আমার ভেতর থেকে মায়া কাটানোর চেষ্টা করেছেন । শৈশবের কথা কিছু কিছু মনে আছে । একটা খেলনা আমার হয়তো খুব পছন্দ হলো । তিনি কিনে আনলেন । গভীর আনন্দে আমি আত্মহারা । তখন হঠাৎ বাবা বললেন, আচ্ছা আয় এইবার এই  খেলনাটা ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলি । আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, কেন ? এমনি ।                                                                   

বাবা একটা হাতুড়ি নিয়ে খেলনা ভাঙতে বসতেন । আমি কাঁদো কাঁদো চোখে তাকিয়ে দেখতাম ।                                                                     

একবার খাঁচায় করে একটা টিয়াপাখি নিয়ে এলেন । কী সুন্দর সবুজ রঙ লাল টুকটুকে ঠোট । আমি বললাম, বাবা, আমরা কি এটা পুষব ?                                       

তিনি হাসিমুখে বললেন, হ্যাঁ । আনন্দে আমার চোখে পানি এসে গেল । আমি বললাম, টিয়াপাখি কী খায় বাবা ?                                 

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৮ 

                             

শুকনা মরিচ খায় ।                                                                              

ঝাল লাগে না ?                                                                                       

না । একটা শুকনা মরিচ নিয়ে এসে দাও, দেখবে কীভাবে কপ কপ করে খাবে । আমি ছুটে গেলাম শুকনা মরিচ আনতে । মরিচ এনে দেখি বাবা টিয়াপাখির গলা টিপে মেরে ফেলেছেন । এমন সুন্দর একটা পাখি মরে পড়ে আছে । ভয়ঙ্কর একটা ধাক্কা লাগল । বাবা বললেন, মন খারাপ করবি না । মৃত্যু হচ্ছে এ জগতের আদি সত্য । তিনি তার পুত্রের মন থেকে মায়া কাটাতে চেষ্টা করছেন।                                                                    

তার চেষ্টা কতটা সফল হয়েছে ? মায়া কি কেটেছে ? আমার তো মনে হয় না । এই যে মজিদ চুপচাপ বসে আছে পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছে- কেন জানি বড় মায়া লাগছে তাকে দেখে । এই মায়া আমার বাবা শত ট্রেনিং-এও কাটাতে পারেননি । অথচ মজিদ কোনো রকম ট্রেনিং ছাড়াই সব মায়া কাটিয়ে বসে আছে ।   

Read more

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৯                                                                    

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *