হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২

পুলিশ সার্জেন্ট আমার দিকে বলল, এ্যাই, তোর নাম কী ?

আমি স্তস্তিত হয়ে গেলাম । আমাকে আপনি বলছে, এখন সুন্দর একটা মেয়ের সামনে তুই করে বলছে!

এ্যাই তোর নাম বল ।  আমি উদাস গলায় বললাম, আমার নাম টুটুল । পুলিশ সার্জেন্ট ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বলল, ভুল নাম দিচ্ছে – যাই হোক, এই নামেই বুকিং হবে । হারামজাদা ইদানীং সেয়ানা হয়েছে । কিছুতেই কারেক্ট নাম বলবে না । ঠিকানা তো বলবেই না । বিশাল কারো গাড়ি হুশ করে বের হয়ে গেল । ফার্মগেটে যাওয়া আমার বিশেষ দরকার- ইন্দিরা রোডে আমার বড়ফুপুর বাসায় দুপুরে খাওয়ার কথা । সেই খাওয়া মাথায় উঠল । সার্জেন্ট আমাকে ছাড়বে না । রমনা থানায় চালান করবে, বলাই বাহুল্য । জাস্টিসের নাম শুনেছে । বড় কারোর নাম শুনলে এদের হুঁশ থাকে না ।

আমি এক প্যাকেট সিগারেট কিনে ফেললাম । হাজতে থাকতে হলে সঙ্গে সিগারেট থাকা ভালো । আমার ধারণা ছিল সার্জেন্ট তার মোটর সাইকেলের পেছনে আমাকে বসিয়ে থানায় নিয়ে যাবে । তা করল না । আজকাল পুলিশ খুব আধুনিক হয়েছে । পকেট থেকে ওয়াকি-টকি বের করে কী বলতেই পুলিশের জিপ এসে উপস্থিত । অবিকল হিন্দি মুভি ।     সম্পূর্ণ নিজের বোকামিতে দাওয়াত খাবার বদলে থানায় যাচ্ছি । মেজাজ খারাপ হওয়ার কথা । আশ্চর্যের ব্যাপার, খারাপ হচ্ছে না । বরং মজা লাগছে । অণ্জলী ঘোষের গানের পুরোটা শোনা  হলো না এইজন্যে অবশ্যি আফসোস হচ্ছে । হায় মদিনাবাসি বলে চমৎকার টান দিচ্ছিল ।

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২

থানার ওসি সাহেবের চেহারা খুব ভালো । মেজাজও বেশ ভালো । চেইন স্মোকার । ত্রমাগত বেনসন অ্যান্ড হেজেস হেজেস টেনে যাচ্ছে । বাজারে এখন সত্তর টাকা করে প্যাকেট যাচ্ছে । দিনে তিন প্যাকেট হলে মাসে কত হয় ? দুশোদশ গুণন তিরিশ । ছ-হাজার তিনশ । একজন ওসি সাহেব বেতন পান কত, এক ফাঁকে জেনে নিতে হবে । ওসি সাহেবরা শুরুতে প্রশ্ন করেন ভাব বাচ্যে। শুরুর কয়েকটি প্রশ্নে জেনে নিতে চেষ্ঠা করেন আসামি কোনো সামাজিক অবস্থায় আছে । তার ওপর নির্ভর করে আপনি তুমি বা তুই ব্যবহুত হয় ।

ওসি সাহেব বললেন, কী নাম ?  চৌধুরী খালেকুজ্জামান । ডাকনাম টুটুল ।  কী করা হয় ?    সাংবাদিকতা করি ।                             কোন পত্রিকায় ?

বিশেষ কোনো পত্রিকার সঙ্গে জড়িত নই । ফ্রী ল্যান্স সাংবাদিকতা । যেখানে সুযোগ পাই ঢুকে পড়ি । টুটুল চৌধুুরী নামে পা হয় । হয়তো আপনার চোখে পড়েছে । পুলিশের ওপর একটা ফিচার করেছিলাম ।  কী ফিচার ?

ফিচারের শিরোনাম হচ্ছে- একজন পুলিশ সার্জেন্টের দিনরাত্রি।সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে কী করতে হয় তাই ছিল বিষয় । অবশ্যি এক ফাঁকে খুব ড্যামেজিং কয়েকটা লাইন ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম ।

যেমন ?  বলেছিলাম, এই পুলিশ সার্জেন্ট তার একটি কর্মমুখর দিনে তিন প্যাকেট বেনসন অ্যান্ড হেজেস পান করেন ।তিনি জানিয়েছিলেন, টেনশন দূর করতে এটা তার প্রয়োজন । অবশ্যই তিনি খুব টেনশনের জীবনযাপন করেন । এই বাজারে দিনে তিন প্যাকেট করে বেনসন খেলে মাসে ছ-হাজার তিনশ টাকার প্রয়োজন । আমাদের জিজ্ঞাস্য- তার বেতন কত ?

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২

ওসি সাহেব ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন । আমি হাসিমুখে বললাম, তবে শেষের লাইন তিনটা ছাপা হয়নি । এডিটর সাহেব কেটে দিয়েছিলেন। পুলিশের বিরুদ্ধে কেউ কিছু ছাপাতে চায় না । ওসি সাহেব শুকনো গলায় বললেন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী ?

আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম । যাক, আপনি করে বলছে । সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়া গেল । এখন চাইলে এক কাপ চা-ও চলে  আসতে পারে । পুলিশরা উঁচুদরের আসামিদের ভালো খাতির করে । চা-সিগারেট খাওয়ায়। আপনি প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না । আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী ? অভিযোগ যে কী তা আমি নিজেই জানি না । ওরা অভিযোগ করলে তারপর জানা যাবে । নারী অপহরণের অভিযোগ হতে পারে ।

নারী অপহরণ ?  জি । জাস্টিস সাহেবের স্ত্রী এবং কন্যাকে নিয়ে ওদের গাড়িতেই পালাতে চেষ্টা করেছিলাম । মাছের তেলে মাছ ভাজা বলতে পারেন । ওসি সাহেব থমথমে গলায় বললেন, আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করার চেষ্টা করছেন? দয়া করে করবেন না । আমি আপনার চেয়েও বেশি রসিক, কাজেই অসুবিধা হবে ।

জি আচ্ছা, রসিকতা করব না । আপনি কোনার দিকের ঐ বেঞ্চিতে বসে থাকুন ।

হাজতে পাঠাচ্ছেন না ?  ফাইনাল অভিযোগ আসুক, তারপর পাঠাব । হাজত তো পালিয়ে যাচ্ছে না। এক কাপ চা কি পেতে পারি।এটা কোন রেস্টুরেন্ট না ।

ওসি সাহেব গম্ভীর মুখে আমার ব্যাগের জিনিসপএ দেখতে লাগলেন । নোটবইয়ের পাতা ওলটাচ্ছেন । আমি বললাম, ওটা আমার কবিতার খাতা । মাঝেমধ্যে কবিতা লিখি । তার মুখের কাঠিন্য তাতে একটুও কমল না । কবি শুনে মেয়েরা খানিকটা দ্রবীভূত হয় । পুলিশ কখনো হয় না ।পুলিশের সঙ্গে কবিতার নিশ্চয়ই বড় ধরনের কোনো বিরোধ আছে ।

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২

চুপচাপ বসে থাকা অনেকের জন্যেই খুব কষ্টকর । আমার জন্য ডালভাত । শুধু  হেলান দেবার একটু জায়গা পেলে আরাম করে শরীরটা ছেড়ে দিয়ে ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা বসে থাকতে পারি । বেঞ্চিতে হেলান দেয়ার ব্যবস্থা থাকে না বলে একটু অসুবিধা হচ্ছে, তবে সেই অসুবিধাও অসহনীয় নয় ।এইরকম পরিস্থিতিতে আমি আমার নদী-টা বের করে ফেলি । তখন অসুবিধা হয় না । নদী বের করার কথাটা আপনাদের কাছে পরিষ্কার হয়নি । একটু ব্যাখ্যা করলেই পরিষ্কার হবে ।   ছোটবেলার কথা । ক্লাস সিক্সে পড়ি । জিওগ্রাফি পড়ান মফিজ স্যার । তিনি ক্লাসে ঢুকলে চেয়ার- টেবিলগুলিপর্যন্ত ভয়ে কাপে । স্যার মানুষটা ছোটখাটো কিন্ত্ত হাতের থাবাটা বিশাল । আমাদের ধারণা, ছাত্রদের গালে চড় বসানোর জন্য আল্লাহতালা স্পেশালভাবে স্যারের এই হাত তৈরী করে দিয়েছেন । স্যারের চড়েরও নানা নাম ছিল- রাম চড়, শ্যাম চড়, যদু চড়, মধু চড় । এর মধ্যে সবচে’ কঠিন চড় হচ্ছে রাম চড়, সবচে’ নরমটা হচ্ছে মধু চড় ।

স্যার সেদিন পড়াচ্ছের-বাংলাদেশের নদ-নদী । ক্লাসে ঢুকেই আমার দিকে আমার দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললেন, এই, একটা নদীর নাম বল তো । চট করে বল ।  মফিজ স্যার কোনো প্রশ্ন করলে কিছুক্ষণের জন্যে আমার মাথাটা পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায় । কান ভোঁ ভোঁ করতে থাকে । মনে হয়, মাথার খুলির ভেতরে জমে-থাকা কিছু বাতাস কানের পরদা ফাটিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে।

কী ব্যাপার, চুপ করে আছিস কেন ? নাম বল ।

আমি ক্ষীণস্বরে বললাম, আড়িয়াল খাঁ ।

স্যার এগিয়ে এসে প্রচন্ড চড় বসিয়ে দিলেন । খুব সম্ভব রাম চড় । হুংকার দিয়ে বললেন এত সুন্দর সুন্দর নাম থাকতে তোর মনে এল আড়িয়াল খাঁ ? সবসময় ফাজলামি ? কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাক ।

আমি কানে ধরে সারাটা ক্লাস দাঁড়িয়ে রইলাম । ঘন্টার পর মিনিট পাঁচেক আগে পড়ানো শেষ করে স্যার চেয়ারে গিয়ে বসলেন । আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কাছে আয় ।

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২

আরেকটা চড় খাওয়ার জন্য আমি ভয়ে ভয়ে স্যারের কাছে এগিয়ে গেলাম । তিনি বিষন্ন গলায় বললেন, এখনো কানে ধরে আছিস কেন ? হাত নামা । আমি হাত নামালাম । স্যার ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, তোকে শাস্তি দেয়াটা আমার অন্যায় হয়েছে । খুবই অন্যায়, তোকে নদীর নাম বলতে বলেছি, তুই বলেছিস । আয়, আরো কাছে আয়, তোকে আদর করে দেই । স্যার এমন ভঙ্গিতে মাথায় এবং পিঠে হাত বুলাতে লাগলেন যে আমার চোখে পানি এসে গেল । স্যার বিব্রত গলায় তোর কাছ থেকে সুন্দর একটা নদীর নাম শুনতে চেয়ছিলাম, আর তুই বললি আড়িয়াল খাঁ । আমার মেজাজটা গেল খারাপ হয়ে । আচ্ছা, এখন সুন্দর একটা নদীর নাম বল ।

আমির্ শার্টের হাতায় চোখ মুছতে মুছতে বললাম, ময়ূরাক্ষী ।

ময়ূরাক্ষী? এই নাম তো শুনি নি । কোথাকার নদী?

জানি না স্যার ।

এই নামে আসলেই কি কোনো নদী আছে ? তাও জানি না, স্যার ।

স্যার হালকা গলায় বললেন, আচ্ছা থাক ।না থাকলে নেই । এটা হচ্ছে তোর নদী ।যা জায়গায় গিয়ে বোস ।

এমনিতেই তোকে শাস্তি দিয়ে আমার মনটা খারাপ হয়েছে ।

তুই তো দেখি কেঁদে কেঁদে আমার মন-খারাপটা বাড়াচ্ছিস । আর কাঁদি স না ।

এই ঘটনার প্রায় বছর তিন পর ক্যান্সারে দীর্ঘদিন রোগভোগের পর মফিজ স্যার মারা যান । মৃত্যুর কয়েকদিন আগে স্যারকে দেখতে গিয়েছি । নোংরা একটা ঘরে নোংরা একটা বিছানায় শুয়ে আছেন । মানুষ না- যেন কফিন থেকে বের করা মিশরের মমী । স্যার আমাকে দেখে খুব খুশি হলেন । উচু গলায় তার স্ত্রীকে ডাকলেন, ওগো, এই ছেলেটাকে দেখে যাও ।এই ছেলের একটা নদী আছে । নদীর নাম ময়ূরাক্ষী ।

Read more

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- 3

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *