স্যার স্ত্রী আমার প্রতি কোনোরকম আগ্রহ দেখালেন না । মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলেন । স্যার সেই অনাদর পুষিয়ে দিলেন । দুর্বল হাতে টেনে তার পাশে বসালেন ।
বললেন, তোর নদীটা কেমন বল তো ? আমি নিচু গলায় বললাম, আমি স্যার কিছু জানি না । দেখিনি কখনো । তবু বল শুনি । বানিয়ে বানিয়ে বল । আমি লাজুক গলায় বললাম, নদীটা খুব সুন্দর । আরে গাধা, নদী তো সুন্দর হবেই । অসুন্দর নদী বলে কিছু নেই । আরো কিছু বল । আমি বলার মতো কিছু পেলাম না । চুপচাপ বসে রইলাম । স্যার যেদিন মারা যান সেই রাত্রিতেই আমি প্রথম ময়ূরাক্ষী স্বপ্নে দেখি । ছোট্ট একটা নদী । তার পানি কাচের মতো স্বচ্ছ । নিচের বালিগুলি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায় ।নদীর দুধারে দূর্বাঘাস গুলি কী সবুজ! কী কোমল! নদীর ঐ পাড়ে বিশাল ছায়াময় একটা পাকুড় গাছ । সেই গাছে বিষণ্ণ গলায় একটা ঘুঘু ডাকছে । সেই ডাকে একধরনের কান্না মিশে আছে ।
নদীর ধার ঘেঁঘে পানি ছিটাতে ছিটাতে ডোরাকাটা সবুজ শাড়ি পরা একটি মেয়ে ছুটে যাচ্ছে । আমি শুধু এক ঝলক তার মুখটা দেখতে পেলাম । স্বপ্লের মধ্যেই তাকে খুব চেনা, খুব আপন মনে হলো । যেন কত দীর্ঘ শতাব্দী এই মেয়েটির সঙ্গে কাটিয়েছি । ময়ূরাক্ষী নদীকে একবারই আমি স্বপ্নে দেখই । নদীটা আমার মনের ভেতর পুরোপুরি গাঁথা হয়ে যায় । এরপর অবাক হয়ে লক্ষ্য করি কোথাও বসে একটু চেষ্টা করলেই নদীটা আমি দেখতে পাই । তার জন্য আমাকে কোনো কষ্ট করতে হয় না, চোখ বন্ধ করতে হয় না, কিছু না । একবার নদীটা বের করে আনতে পারলে সময় কাটানো কোনো সমস্যা নয় । ঘন্টার-পর-ঘন্টা আমি নদীর তীরে হাঁটিনদীর । হিমশীতল জলে পা ডুবিয়ে বসি । শরীর জুড়িয়ে যায় । ঘুঘুর ডাকে চোখ ভিজে ওঠে ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৩
ঘুমুচ্ছেন নাকি ?
আমি চোখ মেললাম । চারদিকে অন্ধাকার । আরে সর্বনাশ! এতক্ষণ পার করেছি । ওসি সাহেব বললেন, যান, চলে যান । জাস্টিস সাহেবের বাসা থেকে টেলিফোন করেছিল । ওরা কোনো চার্জ আনবে না । you are free to go. জাস্টিস সাহেব নিজেই টেলিফোন করেছিলেন ? না, তার মেয়ে । মেয়েটি কী বলল, দয়া করে বলবেন ? বলল, ধমক-ধামক দিয়ে ছেড়ে দিতে । তাহলে দয়া করে ধমক- ধামক দিন । তারপর যাই । ওসি সাহেব হেসে ফেললেন । পুলিশের যে একেবারেই রসবোধ নেই সেটা ঠিক না ।
আমি উঠে দাঁড়াতেদাঁড়াতে বললাম , মেয়েটি তার নাম আপনাকে বলেছে ? হ্যাঁ বলেছে । মীরা কিংবা মীরু এই জাতীয় কিছু । আপনি কি নিশ্চিত যে সে জাস্টিস এম.সোবহান সাহেবের মেয়ে ? অন্যকেউও তো হতে পারে । আপনি উড়ো টেলিফোন পেয়ে আমাকে ছেড়ে দিলেন,তারপর জাস্টিস সাহেব ধরবেন আপনাকে, আইনের প্যাচে ফেলে অবস্থা কাহিল করে দেবেন । ভাই, আপনি যান তো । আর শুনেন, একটা উপদেশ দেই । পুলিশের সঙ্গে এত মিথ্যা কথা বলবেন না । মিথ্যা বলবেন ভালো মানুষের কাছে । যা বলবেন তারা তাই বিশ্বাস করবে । পুলিশ কোনোকিছুই বিশ্বাস করে না । খোঁজখবর করে ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৩
আপনি আমার সম্পর্কে খোঁজখবর করেছেন ? হ্যাঁ সংবাদপত্রের অফিসগুলিতে খোঁজ নিয়েছি । জেনেছি, টুটুল চৌধুরী নামের কোনো ফ্রি ল্যান্স সাংবাদিক নেই । আপনি কি আমার মুচলেকা-ফুচলেকা এইসব কিছু নেবেন না ? না । এখন দয়া করে বিদায় হোন । আপনারা গাড়ি করে আমাকে নিয়ে এসেছিলেন । আমি কি আশা করতে পারি না আবার গাড়ি করে নামিয়ে দিয়ে আসবেন ? কোথায় যাবেন ? ফার্মগেট । চলুন, নামিয়ে দেব । আমি হাসিমুখে বললাম, আপনার এই ভদ্রতার কারণে কোনো একদিন হয়তো আমি আপনাকে ময়ূরাক্ষীর তীরে নিমন্ত্রণ করব । ওসি সাহেব আপনি কি বললেন আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না । ঐটা বাদ দিন । সবকিছু বুঝে ফেললে তো মুসকিল । ভালো কথা, আপনি ডেইলি ক-প্যাকেট সিগারেট খান তাকি জানতে পারি ? ওসি সাহেব বললেন, আপনি লোকটা তো ভালো ত্যাদড় আছেন । দুই থেকে আড়াই প্যাকেট লাগে ।
বড়ফুপুর বাসায় দুপুরে যাবার কথা । উপস্থিত হলাম রাত আটটায় । কেউ অবাক হলো না । ফুপুর বড়ছেলে বাদল আমাকে দেখে উল্লসিত গলায় বলল, হিমুদা এসেছে? থ্যাংকস । অনেক কথা আছে, আজ থাকবে কিন্ত্ত । আই নিউ ইওর হেল্প । বাদল এবার ইন্টারমিডিয়েট দেবে । এর আগেও তিনবার দিয়েছে । সে পড়াশোনায় খুবই ভালো । এস.এস.সি তে বেশ কয়েকটা লেটার এবং স্টার মার্কস পেয়েছে । সমস্যা হয়েছে ইন্টারমিডিয়েটে । পরীক্ষা শেষপর্যন্ত দিতে পারে না । মাঝামাঝি জায়গায় তার একধরনের নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়ে যায় । তার কাছে মনে হয় পরীক্ষার হল হঠাৎ ছোট হতে শুরু করে ঘরটা ছোট হয় । পরীক্ষার্থীরাও ছোট হয় । চেয়ার-টেবিল সব ছোট হতে থাকে । তখন সে ভয়ে চিৎকার দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । বাইরে আসামাত্রই সব স্বাভাবিক । তখন সে আর পরীক্ষার হলে ঢোকে না । চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি চলে আসে ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৩
দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেবার সময় অনেক ডাক্তার দেখানো হলো । অষুধপত্র খাওয়ানো হলো । সেবারও একই অবস্থা । এখন আবার পরীক্ষা দেবে । এবারে ডাক্তারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পীর ফকির । বাদলের গলায়, হাতে, কোমরে নানান মাপের তাবিজ ঝুলছে । এর মধ্যে একটা তাবিজ না-কি জিন-কে দিয়ে কোহকাফ নগর থেকে আনানো । কোহকাফ নগরীতে না-কি জিন এবং পরীরা থাকে । আমার বড়ফুপা ঘোর নাস্তিক ধরনের মানুষ এবং বেশ ভালো ডাক্তার । তিনিও কিছু বলছেন না । বাদলেরও দেখি আমার মতো অবস্থা দাড়ি-গোঁফ গজিয়ে হুলস্হূল । লম্বা লম্বা চুল । সে খুশি-খুশি গলায় বলল, হিমুদা, আমি পড়াশোনা করছি । খাওয়াদাওয়া শেষ করে আমার ঘরে চলে আসবে । পড়াশোনা হচ্ছে কেমন ? হেভি হচ্ছে ।
একই জিনিস তিন-চার বছর ধরে পড়ছি তো, একেবারে ঝাড়া ঝাড়া হয়ে গেছে । হিমুভাই, তুমি এমন ডার্ক হলুদ পাঞ্জাবী কোথায় পেলে ? গাউছিয়ায় । ফাইন দেখাচ্ছে । সন্নাসী-সন্নাসী লাগছে – সন্নাসী উপগুপ্ত, মথুরাপুরীর প্রাচীরের নীচে একদা ছিলেন সুপ্ত । যা, পড়াশোনা কর । আমি আসছি । কী আর পড়াশোনা করব । সব তো ভাজা ভাজা । তবু আরেকবার ভেজে ফেল । কড়া ভাজা হবে । বাদল শব্দ করে হেসে উঠল । সেই হাসি হেচকির মতো চলতেই থাকল । আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম । এই ছেলের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে । এতক্ষণ ধরে কেউ হাসে ? ফুপু গম্ভীরমুখে খাবার এগিয়ে দিচ্ছেন । মনে হচ্ছে দুপুরে প্রচুর আয়োজন ছিল । সেই সব গরম করে দেয়া হচ্ছে । পোলাওয়ে টক-টক গন্ধ । নষ্ট হয়ে গেছে কিনা কে জানে? আমার পেটে অবশ্যি সবই হজম হয়ে যায় । পোলাওটা মনে হচ্ছে হবে না ।
কষ্ট দেবে । ফুপু বললেন, রোষ্ট আরেক পিস দেব ? দাও । এত খাবারদাবারের আয়োজন কী জন্যে একবার জিজ্ঞেস করলি না ? আমি খাওয়া বন্ধ করে বললাম, কী জন্যে ?
Read more
হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-4
