হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৮

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৮

বুড়ো মানুষ মুখের ঘাম মুছতে বলল, বুড়ো মানুষ, মাফ কইরা দেন ।                  

 

টাকাপয়সা কিছু তোমার কাছে নেই ? জ্বে না । কাইলও কোনো টিরিপ পাই নাই, আইজও পাই নাই ।                                                                     

যাচ্ছ কোথায় ?                                                                                      

রায়ের বাজার ।                                                                                           

ঠিক আছে । আমাকে কিছুদূর তোমার গাড়িতে করে নিয়ে যাও । এতে খানিকটা হলেও উসুল হবে ।                                                           

আমি তার গাড়িতে উঠে বসলাম । বৃদ্ধ আমাকে টেনে নিয়ে চলল । পেছন থেকে ঠেলছে তার নাতি কিংবা তার ছেলে । এই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতায় তারা দুজনই মর্মাহত । পৃথিবী যে খুবই অকরুণ জায়গা তা তারা জানে । আমি আরো ভালোভাবে তা জানিয়ে দিচ্ছি । রাস্তায় এক জায়গায় ঠেলাগাড়ি থামিয়ে আমি চা আনিয়ে গাড়িতে বসে বসেই খেলাম । তাকিয়ে দেখি, বাচ্চা ছেলেটির চোখমুখ ত্রেূাধ ও ঘৃণায় কাল হয়ে গেছে । যেকোনো মুহুর্তে সে ঝাপিয়ে পড়বে আমার ওপর । আমি তার ভেতর এই ত্রেূাধ এবং এই ঘৃণা আরো বাড়ুক তাই চাচ্ছি ।

মানুষকে সহ্যের শেষসীমা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সহজ কথা না । সবাই তা পারে না । যে পারে তার ক্ষমতাও হেলাফেলা করার মতো ক্ষমতা না । বুড়ো রাস্তায় উপর বসে গামছায় হাওয়া খাচ্ছে । তার চোখে আগেকার বিস্ময়ের কিছুই আর এখন নেই । একধরনের  নির্লিপ্ততা নিয়ে সে তাকিয়ে আছে । আমি চা শেষ করে বললাম, বুড়ো মিয়া, চল যাওয়া যাক । আমরা আবার রওনা হলাম । মোটামুটি নির্জন একটা জায়গায় এসে বললাম, থামাও, গাড়ি থামাও । এখানে নামব ।    

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৮                                                                                     

 

আমি নামলাম । পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগ বের করলাম । আমার মানিব্যাগ  সবসময়ই খালি থাকে । আজ সেখানে পাচশ টাকার দুটা চকচকে নোট আছে । মজিদের টিউশনির টাকা । মজিদ টাকা হাতে পাওয়ামাত্র খরচ করে ফেলে বলে তার ‍টাকাপয়সার সবটাই থাকে আমার কাছে ।                                                                                                  

বুড়া মিয়া ।                                                                                           

জি ।                                                                                                           

তুমি আমার জীবন রক্ষা করেছ । কাজটা খুব ভালো করনি । যাই হোক, করে ফেলেছ যখন তখন তো আর কিছু করার নাই । তোমাকে ধন্যবাদ । দেখি আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে কেমন লাগে । তোমাকে আমি সামান্য কিছু টাকা দিতে চাই । এই টাকাটা আমার জীবন রক্ষার জন্যে না ।

তুমি যে কষ্ট করে রোদের মধ্যে আমাকে টেনে টেনে এতদূর আনলে তার জন্যে । পাঁচশ তোমার, পাঁচশ এই ছেলেটার । বুড়ো হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল ।  আমি কোমল গলায় বললাম, এই রোদের মধ্যে আজ আর গাড়ি নিয়ে বের হয়ো না । বাসায় চলে যাও। বাসায় গিয়ে বিশ্রাম কর । বুড়োর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে । ব্যাপাটা এরকম ঘটবে আমি তাই আশা করছিলাম । বাচ্ছা ছেলেটির মুখে ত্রেূাধ ও ঘৃণার চিহু এখন আর নেই । তার চােখ এখন অসম্ভব কোমল । আমি বললাম, এই, তোর নাম কী রে ?                                                 

লালটু মিয়া ।                                                                                          

প্যান্টের বোতাম লাগা বেটা । সব দেখা যাচ্ছে । লালটুু মিয়া হাত ‍দিয়ে প্যান্টের ফাকা অংশ ঢাকতে ঢাকতে বলল, বোতাম নাই ।  তাহলে তো সব সমস্যার সমাধান । হাত সরিয়ে ফেল । আলো হাওয়া যাক । লালটু মিয়া হাসছে ।   

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৮                                                                                                     

 

হাসছে বুড়া ঠেলাঅলা । তাদের কাছ এখন আমি তাদেরই একজন । বুড়ো বলল, আব্বাজি আসেন, তিনজন মিল্যা চা খাই । তিয়াশ লাগছে ।  পয়সা দেবে কে ? তুমি ? আমার হাতে কিন্ত্ত আর ‍একটা পয়সাও নেই । বুড়ো আবার হাসল ।                                                                                

আমরা একটা চায়ের দোকানের দিকে রওনা হলাম । নিজেকে সেই সময় মহাপুরুষ বলে মনে হচ্ছিল । আমি মহাপুরুষ নই । কিনত্ত এই ভূমিকায় অভিনয় করতে আমার বড় ভালো লাগে । মাঝে মাঝে এই ভূমিকায় আমি অভিনয় করি, মনে হয় ভালোই করি ।

সত্যিকার মহাপুরুষরাও সম্ভবত এত ভালো করতেন না । আমি অবশ্যি এখন পর্যন্ত কোনো দেখিনি । তাদের চিন্তাভাবনা কাজকর্ম কেমন তাও জানি না । মহাপুরুষদের কিছু জীবনী পড়েছি । সেইসব জীবনীও আমাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি । টলষ্টয় তেরো বছরের একজন বালিকাকে ধর্ষণ করেছিলেন ।

Read more

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৯

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *