হুমায়ূন আহমেদের লেখা শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-১০

শিরিন সুলতানা নামের উনিশ বছরের একটি মেয়ে সূর্য ওঠার আগে ছাদে বসে হারমােনিয়ামে গলা সাধত ঘড়ির কাঁটার মতাে নিয়মে। সাতটার দিকে গানের মাষ্টার শৈলেন পােদ্দার আসতেন গান শেখাতেতিনি আধঘন্টা থাকতেনএই সমস্ত সময়টা আজহার হােসেন নামের একটা গরিব আশ্রিত ছেলে কান পেতে অপেক্ষা করত

ছাদের চিলেকোঠার ঘরটায়, সেখানেই সে থাকতএক দিন মেয়েটি কী একটি গান গাইল যেন, খুব ভালাে লাগল ছেলেটিরবেরিয়ে এসে কুষ্ঠিতভাবে বলল, আরেক বার গান নামাত্র এক বার।শঙ্খনীল কারাগার 

শিরিন সুলতানা গান তাে গানই নি, ছাদের গান বন্ধ করে দিয়েছেন তার পর থেকেলজ্জিত ছেলেটি অপরাধী মুখে আরাে দু বছর কাটিয়ে দিল চিলেকোঠার ঘরটায়এই দুবছরে শিরিন সুলতানার সঙ্গে তার একটি কথাও হয় নিশুধু দেখা গেল, দুজনে বিয়ে করে দেড় ‘ টাকা ভাড়ার একটা ঘুপচি ঘরে এসে উঠেছেন। 

কী করে এটা সম্ভব হল, তা আমার কাছে একটি রহস্যরাবেয়ার কাছে জানতে চাইলে সে বলত, আমি জানি, কিন্তু বলব না। 

কেন?” 

এমনিকী করবি শুনে ? জানতে ইচ্ছে হয় না? বলব তােকে একদিন। সময় হােকসেই সময়ও হয় নিজানাও যায় নি কিছুঅথচ খুব জানতে ইচ্ছে করে। 

শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-১০

ফাস্ট ইয়ারের ছেলেদের সঙ্গে দুপুর বারােটায় একটা ক্লাস ছিলএকটার দিকে শেষ হলদুপুরে রিকশা পাওয়ার আশা কমসব রিকশাওয়ালা একসঙ্গে খেতে যায় কি না কে জানে? অল্প হাঁটতেই ঘামে শার্ট ভিজে ওঠার যােগাড়ভীষণ রােদরাস্তার পিচ গলে স্যাণ্ডেলের সঙ্গে আঠার মতাে এঁটে যাচ্ছিলছায়ায় দাড়িয়ে রিকশার জন্যে অপেক্ষা করব কি না যখন ভাবছি, তখনি মেয়েলি গলা শােনা গেল, খােকা ভাই, খােকা ভাই। 

তাকিয়ে দেখি কিটকিসিনেমা হলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবাইকে সচকরে বেশ জোরেসােরেই ডাকছেকানে পায়রার ডিমের মতাে দুটো লাল পাথরচুলগুলাে লম্বা বেণী হয়ে পিঠে ঝুলছেকামিজ সালােয়ার সবই কড়া হলদেলাল নকশাকাটাসুন্দর দেখাচ্ছিল, মুখটা লম্বাটে, পাতলা বিস্তৃত ঠোটআমি বললাম, কিরে, তুই সিনেমা দেখবি নাকি

হু, ইয়েলাে স্কাই। 

একা এসেছিস? না, আমার এক বন্ধু আসবে বলেছিল, এখনাে আসল না। দেড়টা বেজে গেছে, এখুনি শশা শুরু হবে। 

টিকিট কেটে ফেলেছিস? হ্যাঁদে আমার কাছে, বিক্রি করে দি একটাতুই দেখ একাএকাআপনি দেখেন না আমার সঙ্গে, আপনার তাে কোনাে কাজ নেইআসেননা। 

আরে, পাগল নাকি? বাসায় গিয়ে গােসল করব, ভাত খাব।‘ 

আহা, এক দিন একটু দেরি হলে মরে যাবেন নাএকা একা ছবি দেখতে আমার খুব খারাপ লাগেআসেন না, দেখিখুব ভালাে ছবিপ্লীজ বলুন, হ্যাঁ। 

কিটকির কাণ্ড দেখে হেসে ফেলতে হলবললাম, চল দেখি, ছবি ভালাে না লে কিন্তু মাথা ভেঙে ফেলব। 

শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-১০

দুজন সিড়ি দিয়ে উঠছি দোতলায়, কিটকি হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলল, দেখুন তাে, কী মুশকিল হল‘ 

আবার কি

আমার বন্ধুটা এসে পড়েছেযে নামছে রিকসা থেকেখাটো করে মেয়েটি নাকি? লাল ওড়না?’ 

ভালােই হয়েছেদেখ তােরা দুজনে, আমায় ছেড়ে দে‘ 

নানা, আসেন এই পােস্টার বাের্ডটার আড়ালে চলে যাইনা দেখলেই চলে যাবে। 

তুই যা আড়ালে, আমাকে তাে আর চেনে নাআহা, আসেন নাকোন দিকে গেছে ? দোতলায় খুঁজতে গেছে হয়তাে। 

কেমন গাধা মেয়ে দেখেছেন? সাড়ে বারােটায় আসতে বলেছি, এসেছে দেড়টায়। 

ছবিটা সত্যি ভালােকিছুক্ষণের মধ্যেই জমে গেলামতবে ইটালিয়ান ছবি যেমন হয়করুণ রসের ছড়াছড়িছবির সুপুরুষ ছেলেটি বিয়ে করেছে তার প্রেমিকার বড় বােনকেখবর পেয়ে প্রেমিকা বিছানায় শুয়ে ফুলে ফুলে কাঁদছেসেটাই দেখাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে।

হঠাৎ সচকিত হয়ে দেখি কিটকি নিজেই মুখে আধখানা রুমাল গুঁজে কান্নার দুরন্ত বেগ সামলাচ্ছেচোখের পানিতে চিকচিক করছে গালপাশে বসা এক গােবেচারা তরুণ পর্দা ছেড়ে কিটকিকেই দেখছেঅবাক হয়েআমি বললাম, কি রে কিটকি, কী ব্যাপার

কিছু না। 

আয় আয়, ছবি দেখতে হবে নাকী মুশকিলকান্নার কী হল! তাের তাে কিছু হয় নি। 

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-১১

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *