শিরিন সুলতানা নামের উনিশ বছরের একটি মেয়ে সূর্য ওঠার আগে ছাদে বসে হারমােনিয়ামে গলা সাধত ঘড়ির কাঁটার মতাে নিয়মে। সাতটার দিকে গানের মাষ্টার শৈলেন পােদ্দার আসতেন গান শেখাতে। তিনি আধঘন্টা থাকতেন। এই সমস্ত সময়টা আজহার হােসেন নামের একটা গরিব আশ্রিত ছেলে কান পেতে অপেক্ষা করত।
ছাদের চিলেকোঠার ঘরটায়, সেখানেই সে থাকত। এক দিন মেয়েটি কী একটি গান গাইল যেন, খুব ভালাে লাগল ছেলেটির। বেরিয়ে এসে কুষ্ঠিতভাবে বলল, “আরেক বার গান না। মাত্র এক বার।
শিরিন সুলতানা গান তাে গানই নি, ছাদের গান বন্ধ করে দিয়েছেন তার পর থেকে। লজ্জিত ছেলেটি অপরাধী মুখে আরাে দু বছর কাটিয়ে দিল চিলেকোঠার ঘরটায়। এই দু‘ বছরে শিরিন সুলতানার সঙ্গে তার একটি কথাও হয় নি। শুধু দেখা গেল, দু‘ জনে বিয়ে করে দেড় শ‘ টাকা ভাড়ার একটা ঘুপচি ঘরে এসে উঠেছেন।
কী করে এটা সম্ভব হল, তা আমার কাছে একটি রহস্য। রাবেয়ার কাছে জানতে চাইলে সে বলত, আমি জানি, কিন্তু বলব না।
“কেন?”
এমনি। কী করবি শুনে ? ‘জানতে ইচ্ছে হয় না? “বলব তােকে একদিন। সময় হােক। সেই সময়ও হয় নি। জানাও যায় নি কিছু। অথচ খুব জানতে ইচ্ছে করে।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-১০
ফাস্ট ইয়ারের ছেলেদের সঙ্গে দুপুর বারােটায় একটা ক্লাস ছিল। একটার দিকে শেষ হল। দুপুরে রিকশা পাওয়ার আশা কম। সব রিকশাওয়ালা একসঙ্গে খেতে যায় কি না কে জানে? অল্প হাঁটতেই ঘামে শার্ট ভিজে ওঠার যােগাড়। ভীষণ রােদ। রাস্তার পিচ গলে স্যাণ্ডেলের সঙ্গে আঠার মতাে এঁটে যাচ্ছিল। ছায়ায় দাড়িয়ে রিকশার জন্যে অপেক্ষা করব কি না যখন ভাবছি, তখনি মেয়েলি গলা শােনা গেল, ‘খােকা ভাই, ও খােকা ভাই।
তাকিয়ে দেখি কিটকি। সিনেমা হলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবাইকে সচ–৩ করে বেশ জোরেসােরেই ডাকছে। কানে পায়রার ডিমের মতাে দুটো লাল পাথর। চুলগুলাে লম্বা বেণী হয়ে পিঠে ঝুলছে। কামিজ সালােয়ার সবই কড়া হলদে–লাল নকশাকাটা। সুন্দর দেখাচ্ছিল, মুখটা লম্বাটে, পাতলা বিস্তৃত ঠোট। আমি বললাম, ‘কিরে, তুই সিনেমা দেখবি নাকি?
‘হু, ইয়েলাে স্কাই।
একা এসেছিস? ‘না, আমার এক বন্ধু আসবে বলেছিল, এখনাে আসল না। দেড়টা বেজে গেছে, এখুনি শশা শুরু হবে।
‘টিকিট কেটে ফেলেছিস? ‘হ্যাঁ। ‘দে আমার কাছে, বিক্রি করে দি একটা। তুই দেখ একা–একা। ‘আপনি দেখেন না আমার সঙ্গে, আপনার তাে কোনাে কাজ নেই। আসেননা।
‘আরে, পাগল নাকি? বাসায় গিয়ে গােসল করব, ভাত খাব।‘
‘আহা, এক দিন একটু দেরি হলে মরে যাবেন না। একা একা ছবি দেখতে আমার খুব খারাপ লাগে। আসেন না, দেখি। খুব ভালাে ছবি। প্লীজ বলুন, হ্যাঁ।
কিটকির কাণ্ড দেখে হেসে ফেলতে হল। বললাম, চল দেখি, ছবি ভালাে না “লে কিন্তু মাথা ভেঙে ফেলব।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-১০
দু‘ জন সিড়ি দিয়ে উঠছি দোতলায়, কিটকি হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলল, দেখুন তাে, কী মুশকিল হল।‘
‘আবার কি?
আমার বন্ধুটা এসে পড়েছে। ঐ যে নামছে রিকসা থেকে। খাটো করে ঐ মেয়েটি নাকি? লাল ওড়না?’
‘ভালােই হয়েছে। দেখ তােরা দু‘ জনে, আমায় ছেড়ে দে।‘
‘না–না, আসেন এই পােস্টার বাের্ডটার আড়ালে চলে যাই। না দেখলেই চলে যাবে।
তুই যা আড়ালে, আমাকে তাে আর চেনে না। ‘আহা, আসেন না। কোন দিকে গেছে ? ‘দোতলায় খুঁজতে গেছে হয়তাে।
‘কেমন গাধা মেয়ে দেখেছেন? সাড়ে বারােটায় আসতে বলেছি, এসেছে দেড়টায়।
ছবিটা সত্যি ভালাে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জমে গেলাম। তবে ইটালিয়ান ছবি যেমন হয়––করুণ রসের ছড়াছড়ি। ছবির সুপুরুষ ছেলেটি বিয়ে করেছে তার প্রেমিকার বড় বােনকে। খবর পেয়ে প্রেমিকা বিছানায় শুয়ে ফুলে ফুলে কাঁদছে। সেটাই দেখাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে।
হঠাৎ সচকিত হয়ে দেখি কিটকি নিজেই মুখে আধখানা রুমাল গুঁজে কান্নার দুরন্ত বেগ সামলাচ্ছে। চোখের পানিতে চিকচিক করছে গাল। পাশে বসা এক গােবেচারা তরুণ পর্দা ছেড়ে কিটকিকেই দেখছে। অবাক হয়ে। আমি বললাম, কি রে কিটকি, কী ব্যাপার?
‘কিছু না।
‘আয় আয়, ছবি দেখতে হবে না। কী মুশকিল। কান্নার কী হল! তাের তাে কিছু হয় নি।
Read More