এসে দেখি তালাবন্ধ। তালার সঙ্গের চিঠিখানা পড়ে দেয়াশলাই কিনতে গিয়েছি, আর তুমি এসেছ।‘ | ‘আপনাকে বসাই কোথায়––আসেন, চা খান এক কাপ।
না। আমার ডায়াবেটিস, চা থাক। তুমি এই মেয়েটিকে এই চকোলেটগুলি দিয়ে দিও, আচ্ছা? ভদ্রলােক কালাে ব্যাগ খুলে চকোলেট বের করতে লাগলেন।
‘বিদেশে থাকাকালীন প্রায়ই মনে হত, মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায় নি তাে? হলে কোথায় হল ?
‘না, বিয়ে হয় নি এখনাে। ‘আচ্ছা তাহলে যাই, কেমন? রাবেয়া বেশ মেয়ে তাে। পথের লােকজনদের সঙ্গে ছােট বয়সেই কেমন খাতির জমিয়েছে। এমন খাতির যে একেবারে বিদেশ থেকে চকোলেট এনেছেন তিনি। চকোলেট–খাওয়া মেয়েটি এত বড়াে হয়েছে জানলে আর চকোলেট আনতেন না নিশ্চয়ই।
রাবেয়ার এমন আরাে কয়েক জন বন্ধু আছে। এক জন ছিল আবুর মা। কী যে ভালােবাসত রাবেয়াকে! রােজ এক বার খোঁজ নেওয়া চাই। রাবেয়ার যে–বার অসুখ হল, টাইফয়েড, আবুর মা তার ঘরসংসার নিয়ে আমাদের বারান্দায় উঠে এল। পনের দিনের মতাে ছিল অসুখ, সেই ক’দিন বুড়ি এখানেই ছিল। মা ভারি বিরক্ত হয়েছিলেন। মেয়ের অমঙ্গল হবে ভেবে তাড়িয়েও দিতে পারেন নি।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-১২
হঠাৎ একদিন আবুর মা আসা বন্ধ করে দিল। হয়তাে চলে গিয়েছিল অন্য কোথাও, কিংবা মারা–টারা গিয়েছে গাড়িচাপা পড়ে। রাবেয়াকে ঠাট্টা করে সবাই আবুর মার সখী’ ডাকত। বাবা ডাকতেন ‘আবুর নানী’। রাবেয়া রাগত না মােটেই। আবুর মার সঙ্গে রাবেয়া হেসে হেসে কথা কইছে, ছবির মতাে ভাসে চোখে।
‘ও বুড়ি, আজ কত পেয়েছ?
‘দুই সের চাইল, আর চাইর আনা পয়সা। এই কাপড়টা দিছে পুরানা পল্টনের এক বেগম সায়েব।
দেখি কী কাপড়। রাবেয়া গম্ভীর হয়ে কাপড় দেখত, ভালাে কাপড়। ‘ছাপটা বালা? ‘হ্যাঁ হ্যা, খুব ভালাে ছাপ। রাবেয়াটা বেশ পাগলাটে। ছােট বয়স থেকেই।
‘ও! ইনি আবিদ হােসেন।
রাবেয়া হাসিমুখে বলল। চকোলেটের প্যাকেট পেয়ে সে খুব খুশি হয়েছে।
কোথায় দেখা হয়েছে তাঁর সাথে?
বাসায় এসেছিলেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলাপ হল। ছােটবেলা তােকে নাকি লিফট দিতেন গাড়িতে?
‘হ্যাঁ। স্কুলটা অনেক দূরে পড়ে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় বাবা সঙ্গে যেতেন, আসবার সময় প্রায়ই এই ভদ্রলােকের সঙ্গে দেখা হত। আমাদের দুজনের মধ্যে খুব খাতির হয়েছিল। দাঁড়া, সবটা বলি। চা বানিয়ে আনি আগে।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-১২
ঘরে আলাে জ্বলছিল না। বাইরে ভীষণ দুর্যোগ। অল্প একটু ঝড়–বাদলা হলেই এখানকার কারেন্ট চলে যায়। ঘরে যে একটিমাত্র হ্যারিকেন ছিল, সেটি জ্বালিয়ে লুডু খেলা হচ্ছে। বাবাও খেলছেন বেশ সাড়াশব্দ করেই। রুনুর গলা সবচেয়ে উচুতে।
সে কি বাবা, তােমার চার হয়েছে, পাঁচ চাললে যে? পাঁচই তাে উঠল। ‘ই, আমার বুঝি চোখ নাই। এবার থেকে তােমার দান আমি মেরে দেব।”
অন্ধকার ঘরে বসে বৃষ্টি পড়া দেখছি। দেখতে দেখতে বর্ষা এসে গেল। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামছে। টিনের চালে বাজনার মতাে বৃষ্টি, অপূর্ব লাগে। রাবেয়া চা। নিয়ে খাটে উঠে এল। দু‘ জনে চাদর গায়ে মুখােমুখি বসলাম। রাবেয়া বলল ‘গােড়া থেকে বলি?
‘বল।”
‘থ্রিতে পড়ি তখন। মর্ণিং স্কুল। এগারােটায় ছুটি হয়ে গেছে। আমি আর উকিল সাহেবের মেয়ে রাহেলা বাসায় ফিরছি, এমন সময় ঐ ভদ্রলােক কী মনে করে লম্বা পা ফেলে আমাদের কাছে এলেন। আমাকে বললেন, ‘তােমরা কোথায় যাবে? চল তােমাদের পৌছে দিই। গাড়ি আছে আমার। ঐ দেখ, দাঁড় করিয়ে রেখেছি।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-১২
রাহেলা বলল, ‘আমরা হেঁটে যেতে পারব।‘
‘না–না, হেঁটে যাবে কেন? এস এস, গাড়িতে এস। মিষ্টি খাবে তােমরা? নিশ্চয়ই খাবে। কি বল ?
ভদ্রলােক আমাদের দিকে না তাকিয়ে ড্রাইভারকে বললেন, ‘তুমি নেমে যাও, একটা রিকশা করে জিনিসগুলি নিয়ে যাও, আমি বাচ্চাদের নিয়ে একটু ঘুরে আসি।‘
আমরা কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। গাড়িতে চড়ার লােভ ষােলআনা আছে। আবার ভয়–ভয়ও করছে। রাহেলা ফিসফিস্ করে বলল, ও কে রে ভাই?
আমি মিথ্যা করে বললাম, ‘আমাদের এক জন চেনা লোক, চল বেড়িয়ে আসি।
রাহেলা বলল, ‘ছেলেধরা না
Read More