কোন বিষয়ে বুঝাতে হবে ?
চিকিৎসার জন্যে আমি তাকে দেশের বাইরে নিয়ে যেতে চাই। সে যাবে না। হিমুভাই প্লিজ, আপনি তাকে রাজি করিয়ে দিন। যদি আপনি এটা করে দিতে পারেন তাহলে বাকি জীবন আমি আপনার মতাে হলুদ পাঞ্জাবি পরে কাটাব। পায়ে জুতা-স্যান্ডেল কিছুই থাকবে না। প্লিজ প্লিজ।
ফরিদা আমাদের কথা শুনছে কিন্তু তার মুখের হাসি যাচ্ছে না। আমি তার বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালাম। ফরিদা বলল, হিমুভাই, গত রাতে আমি আপনাকে স্বপ্নে দেখেছি। মানুষ কখনাে হাসির কোনাে ঘটনা স্বপ্নে দেখে না। আমি এমন একটা হাসির স্বপ্ন দেখেছি যে হাসতে হাসতে আমার ঘুম ভেঙেছে। যতবারই আমার স্বপ্নের কথাটা মনে হচ্ছে ততবারই আমি হাসছি।
স্বপ্নটা কী ?
স্বপ্নটা কী আমি বলব। তার আগে চেয়ারটায় আপনি বসুন। আসল কথাটা মন দিয়ে শুনুন।
আসল কথাটা কী ?
সে আসে ধীরে খন্ড-২২
ফরিদা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, আমি অন্যের টাকায় চিকিৎসা করাব না। ইমরুলের বাবা মনে কষ্ট পাবে। এই কষ্ট আমি তাকে দেব না।
তুমি মরে গেলে ইমরুলের বাবা কষ্ট পাবে না ? পাবে। দু‘টা কষ্ট দু‘রকম। রাশেদুল করিম সাহেবের টাকায় তুমি চিকিত্সা করাবে না ?
না।
তােমার মৃত্যুর মাস ছয়েকের মধ্যে ইমরুলের বাবা আরেকটা বিয়ে করবে, তারপরেও না ?
সত্য ইমরুলকে নানানভাবে কষ্ট দেবে, তারপরেও না ? তুমি কি প্রমাণ করতে চাইছ— স্বামীর প্রতি তােমার গভীর প্রেম ?
আমি কোনাে কিছু প্রমাণ করতে চাইছি না। আমি ইমরুলের বাবার মনে কষ্ট দিতে চাচ্ছি না।
ঠিক আছে, মামলা ডিসমিস।।
আমি রাশেদুল করিমের দিকে তাকালাম। বেচারার মুখ শুকনা হয়ে গেছে। সে তাকিয়ে আছে হতাশ চোখে। সে কী করবে বুঝতে পারছে না। হাসপাতালের কেবিন ঘরে একটাই চেয়ার। সেই চেয়ার আমি দখল করে আছি । তাকে বসতে হলে ফরিদার পাশে খাটে বসতে হয়।
এই কাজটা সে করতে পারছে না। আবার সে দাড়িয়ে থাকতেও পারছে না। সে ফরিদার দিকে তাকিয়ে বলল, ফরিদা আমি চলে যাই। ফরিদা বলল, আচ্ছা। তারপরেও সে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে রইল। সম্ভবত আশা করল ফরিদা তাকে আরাে কিছু বলবে। ফরিদা কিছুই বলল না। কঠিন চোখে কেবিন ঘরের ধবধবে সাদা সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রইল।
সে আসে ধীরে খন্ড-২২
ঘরে আমি এবং ফরিদা। রাশেদুল করিম চলে গিয়েছে। ফরিদার মুখে আগের কাঠিন্য নেই। কিছুক্ষণ আগে নার্স এসে একগাদা ওষুধ খাইয়ে গেছে। নার্সের সঙ্গে সে হেসে হেসে কথা বলেছে। সেই হাসির রেশ এখনাে ঠোটের কোনায় ধরা আছে।
হিমুভাই। বলাে।
আপনি একটু আগে জিজ্ঞেস করেছিলেন স্বামীর প্রতি ভালােবাসা দেখাতে চাই বলেই কি বিদেশে যেতে চাচ্ছি না ? আমি এখন প্রশ্নটার জবাব দেব। জবাব শুনে আপনি চমকে যাবেন।
জবাবটা কী ? ফরিদা বলল, ওর প্রতি আমার কোনাে ভালােবাসা নেই। কখনাে ছিল ।… আপনি আমার কথা শুনে খুবই চমকে গেছেন। তাই না হিমুভাই ?
আমি সহজে চমকাই না।
তারপরেও আপনি চমকে গেছেন। আমি আপনার মুখ দেখে বুঝতে পারছি। হিমুভাই শুনুন, যাকে একটু আগে আপনি দেখেছেন, কিশােরী বয়সে তার প্রেমে পড়েছিলাম। মেয়েরা যে কত আবেগ নিয়ে ভালােবাসতে পারে তা আপনারা পুরুষরা কখনাে বুঝতে পারবেন না।
পুরুষরা ভালােবাসতে পারে না ?
আর পারলেও তার মাত্রা অনেক নিচে। পুরুষের হচ্ছে ভালােবাসা ভালােবাসা খেলা। মেয়েদের ব্যাপার অন্যরকম, তাদের কাছে ভালােবাসার সঙ্গে খেলার সম্পর্ক নেই। একটা মেয়ে যখন ভালােবাসে তখন সেই ভালােবাসার সঙ্গে অনেক স্বপ্ন যুক্ত হয়ে যায়। সংসারের স্বপ্ন। সংসারের সঙ্গে শিশুর স্বপ্ন।
একটা পুরুষ যখন প্রেমে পড়ে তখন সে শুধু তার প্রেমিকাকেই দেখে। প্রেমিকার সঙ্গে সঙ্গে নতুন একটি শিশুর স্বপ্ন দেখে না।
তুমি নিজে এইসব ভেবে ভেবে বের করেছ ?
জি, আমার তাে শুধু শুয়ে থাকা। হাসপাতালের বিছানায় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত শুয়ে শুয়ে আমি শুধু ভাবি। ভেবে ভেবে অনেক কিছু বের করে ফেলেছি।
সে আসে ধীরে খন্ড-২২
ভালাে তাে। অনেক জ্ঞান পেয়ে গেলে। জ্ঞান পেয়ে হবে কী ? আমি তাে মরেই যাচ্ছি।
আইনস্টাইনও অনেক জ্ঞান পেয়েছিলেন। তিনিও কিন্তু তার জ্ঞান নিয়ে মরে গেছেন।
হিমুভাই প্লিজ, আপনার সঙ্গে তর্ক করতে চাচ্ছি না। এক সময় আমি তর্ক করতে খুব ভালােবাসতাম। এখন তর্ক করতে ভালাে লাগে না। কেউ তর্ক করতে এলে আগেভাগে হার মেনে নেই। শুরুতেই বলে দেই— তাল গাছ আমার না। তাল গাছ তােমার। এখন তর্ক বন্ধ কর।
তােমার সঙ্গে হাসপাতালে নিশ্চয়ই কেউ তর্ক করতে আসে না।
আসবে না কেন? আসে। আপনিও তাে কিছুক্ষণ তর্ক করেছেন। করেন নি?
আমার বেলায় তুমি কিন্তু বলে নি যে তালগাছ আপনার। প্লিজ হিমুভাই, চুপ করুন তাে। চুপ করলাম। আমি কি চলে যাব ? , আপনি চলে যাবেন না। আমার ব্যাপারটা আমি আপনাকে বলব। আমি তাে মরেই যাচ্ছি। মরার আগে গােপন কথাটা কাউকে না কাউকে বলতে ইচ্ছা করছে।
লাভ কী ?
জানি না লাভ কী, আমার বলতে ইচ্ছা করছে আমি বলব । বেশ বলল।
Read More