মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ইকবাল টেলিফোন করে খাস ময়মনসিংহের উচ্চারণে. বললাে—দাদাভাই কেমন আছাে? আমি বললাম, তুই আমার টেলিফোন নাম্বার কোথায় পেলি? ও আমেরিকায় টেলিফোন নাম্বার পাওয়া কোন সমস্যা না। তুমি কেমন আছাে বল?ও তাের কাছে ডলার আছে?
তােমাকে একশ ডলারের একটা ড্রাফট পাঠিয়ে দিয়েছি। আজই পাবে।ও একশ ডলারে হবে না। তুই আমাকে একটা টিকিট কেটে দে আমি দেশে চলে যাবাে।আমার কথায় সে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলাে না। সহজ গলায় বললাে, যেতে চাও কোনাে অসুবিধা নেই টিকিট কেটে দেবো। কয়েকটা দিন যাক। একটু ঘুরে ফিরে দেখো। এখানে বাংলাদেশী ছেলে নেই?
ও বাংলাদেশী ছেলের আমার কোনাে দরকার নেই। তুই টিকিট কেটে পাঠা।ও আচ্ছা পাঠাবাে। তুমি কি পৌছার সংবাদ দেশে দিয়েছাে? ভাবীকে চিঠি লিখেছাে? ৪ চিঠি লেখার দরকার কি আমি নিজেই তো যাচ্ছি।
হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৬
বু লিখে দাও। যেতে যেতেও তো সময় লাগবে। আজই লিখে ফ্যালাে। আর শােনাে, তোমার যে খুব খারাপ লাগছে দেশে চলে যেতে চাচ্ছাে এইসব না লিখলেই ভালাে হয়।
আমি চুপ করে রইলাম। ইকবাল কললাে, রাতে তােমাকে আবার টেলিফোন করবো। আর আমি তােমাদের ফরেন স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজারকেও ফোন করে বলে দিচ্ছি যাতে তিনি বাংলাদেশী ছেলেদের সঙ্গে তোমার যােগাযােগ করিয়ে দেন।
সেই সময় ফর্গো শহরে আর একজন মাত্র বাঙালী ছিলেন—সুফী সাহেব। তিনি এসেছেন এগ্রোনমিতে পিএইচ-ডি করতে। তাঁর সঙ্গে আমার কোনাে রকম যােগাযােগ হলো না। দিনের বেলাটা ইউনিভার্সিটিতে খানিকক্ষণ ঘুরলাম। চারদিকে বড় বেশি ঝকঝকে, তকতকে। বড় বেশি গােছানাে। বিশ্ববিদ্যালয় সামারের বন্ধ থাকলেও কিছু কিছু ক্লাস হচ্ছে।
একটা ক্লাস রুমে উকি দিয়ে দেখি অনেক ছেলেমেয়ের হাতে কফির কাপ কিংবা কোল্ড ড্রিংকের বােতল। আরাম করে খাওয়া-দাওয়া করতে করতে অধ্যাপকদের বক্তৃতা শুনছে। পৃথিবীতে দুধরনের মানুষ আছে। এক ধরনের কাছে বিদেশের সব কিছুই ভালাে লাগে, অন্যদের কিছুইভালাে লাগে না। আমি দ্বিতীয় দলের। আমার কাছে কিছুই ভালো লাগে না। যা দেখি তাতেই বিবক্ত হই।
রাতে আবার খেতে গেলাম বীফ এণ্ড বানে। সেই পুরাতন খাবার। ফ্রেঞ্চ টোস্ট। রুটিনটি হলো এ-রকম ঃ সকালবেলা ইউনিভার্সিটি এলাকায় যাই। একা একা হাঁটাহাঁটি করি—যা দেখি তাই খারাপ লাগে। সন্ধ্যায় হােটেলে ফেরত আসি। রাতে খেতে যাই বীফ এড বানে। ফ্রেঞ্চ টোস্টের অর্ডার দেই। অন্য কিছু খেতে ইচ্ছে করে না। ডলারের অভাব এখন আর আমার নেই। ইউনিভার্সিটি আমাকে চারশ ডলার অগ্রিম দিয়েছে। সিয়াটল থেকে পাঠানাে ছােট ভাইয়ের চেকটাও ভাঙিয়েছি। টাকার অভাব নেই।
হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৬
বীফ এন্ড বানে খাবারেরও অভাব নেই। কিন্তু কোনাে খাবারই খেতে ইচ্ছা করে না। খেতে গেলেই চোখের সামনে ভাসে এক প্লেট ধবধবে সাদা ভাত–একটা বাটিতে সর্ষেবাটা দিয়ে রাঁধা ইলিশ। ছোট্ট পিরিচে কাঁচা লংকা, আধখান কাগজী লেবু। আমার প্রাণ হু-হু করে। ওয়েট্রেস যখন অর্ডার নিতে আসে, আমি বলি ফ্রেঞ্চ টোস্ট। সে অবাক হয়ে তাকায়। হয়তাে ইতিমধ্যে এই রেস্টুরেন্টে আমার নামই হয়ে গেছে ‘ফ্রেঞ্চ টোস্ট‘। আমি লক্ষ্য করছি আমাকে দেখলেই ওয়েট্রেসর নিজেদের মধ্যে চাওয়া-চাওয়ি করে এবং এক সময় এসে কোমল গলায় বলে, সে-ই খাবার ?
আমি বলি, ইয়েস।
ছটি দীর্ঘ রজনী কেটে গেলাে। তারপর চমৎকার একটা ঘটনা আমার জীবনে ঘটলো। ঘটনাটা বিশদভাবে বলা দরকার। এই ঘটনা না ঘটলে হয়তাে আমি আমেরিকায় থাকতে পারতাম না। সব ছেড়েছুঁড়ে চলে আসতাম।
যথারীতি রাতে খাবার খেতে গিয়েছি। ওয়েট্রেস অর্ডার নিতে আমার কাছে আর আসছে না। আমার কেন জানি মনে হলাে দুর থেকে সবাই কৌতুহলী ভঙ্গিতে অামাকে দেখছে। ফিসফাস করছে। তাদের দোষ দিচ্ছি না। দিনের পর দিন ফ্রেঞ্চ টেস্ট খেয়ে-খেয়ে আমিই এই অবস্থাটা তেরি করেছি। একা অনেকক্ষণ বসে থাকবার পর অর্ডার নিতে একটি মেয়ে এলাে।
