হা হচ্ছে। আপনি আপনার বাবার চিকিৎসার যে ব্যবস্থা করেছেন সেটা চিন্তাই করা যায় না। রাত সাড়ে তিনটার সময় একা ওষুধ কিনতে সােহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে শাহবাগে গিয়েছেন।
আপনি ভুল করেছেন। আমি একা যাইনি আমার সঙ্গে বলশালী একজন পুরুষ মানুষ ছিল। সে আমাকে ভরসা দিয়েছিল যে কোনাে ভয় নেই।
নাসের অবাক হয়ে বলল, পুরুষ মানুষের কথা জানতাম না। কে ছিল আপনার সঙ্গে?
মীরু হাসতে হাসতে বলল, যে রিকশায় করে গিয়েছি সেই রিকশার রিকশাওয়ালা ছিল।
নাসের শব্দ করে হেসে ফেলল। হাসি থামিয়ে বলল, আপনার সেন্স অব হিউমার অসম্ভব ভালাে।
মীরু বলল, এখন আমি যাই করব তাই আপনার কাছে ভালাে লাগবে। কারণটা খুব সহজ। আমাকে না দেখে শুধুমাত্র সুলতানা ফুপুর কথা শুনেই আপনার আমাকে পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। আমার সঙ্গে যখন দেখা হল তখন সেই পছন্দ হওয়াটা কমে না গিয়ে বাড়ল। প্রায় প্রেম পর্যায়ে চলে গেল। এখন যদি আমি শব্দ করে নাক ঝাড়ি এবং নাকের সর্দি আপনার গাড়ির সিট কাভারে মুছে ফেলি সেটাও আপনার কাছে ভালাে লাগবে।
কেন?
ভালাে লাগার জন্যে আপনি কোনাে–না–কোনাে লজিক দাঁড় করিয়ে ফেলবেন। প্রেমিকরা এই কাজটা খুব ভালাে করে ।।
নাসের বলল, সর্দি গাড়ির সিটে মুছবেন। এটা ভালাে লাগবে এরকম লজিক দাঁড় করানাে তাে কঠিন।
খুব ভালাে চা খাওয়াব। তারপর আপনার মাথা ধরা না সারা পর্যন্ত। আপনাকে গাড়িতে নিয়ে ঘুরব ।।
মীরু চোখ বন্ধ করে ফেলল।
কঠিন কিছুই না। তখন আপনি ভাববেন— মেয়েটা স্ট্রেইট ফরােয়ার্ড। তার মধ্যে কোনাে ভনিতা নেই। তার বিষয়ে কে কী ভাবল তা নিয়ে এই মেয়ের কোনাে মাথাব্যথা নেই। কোনাে দিকে না তাকিয়ে এই মেয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে সর্দি গাড়ির সিটে মুছে ফেলেছে। একসেলেন্ট। এ রকম একটা মেয়েই তাে আমি চাচ্ছিলাম ।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১১)
নাসের শব্দ করে হাসছে। মীরু বলল, আপনার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুব মজা পাচ্ছেন।
নাসের বলল, হ্যা মজা পাচ্ছি।
মীরু বলল, আমি যখন মগবাজারে পৌছব তারপর থেকে আপনি আমার আর কোনাে কর্মকাণ্ডে মজা পাবেন না। বরং আমার প্রতিটি কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হবেন। নাসের বিস্মিত হয়ে বলল, কেন বলুন তাে?
মীরু বলল, কারণ আমি যাচ্ছি মগবাজার কাজি অফিসে। সেখানে আমার আজ গােপনে বিয়ে করার কথা। যার সঙ্গে বিয়ে হবার কথা তার নাম বারসাত। আমার যাবার কথা ছিল সকাল এগারােটায় । বাবার শরীর। খারাপের কারণে যেতে পারিনি। আমার মনে হয় না বারসাত এখনাে আমার জন্যে বসে আছে, তারপরেও খোঁজ নেবার জন্যে যাচ্ছি। এখন বলুন আমাকে কি আপনার অসহ্য মনে হচ্ছে?
নাসের বলল, না মনে হচ্ছে না। কিছুক্ষণ আগে আপনাকে যতটা ভালাে লাগছিল— এখন তারচেয়ে বেশি ভালাে লাগছে। সত্যি বলছি। বারসাত সাহেব যদি থাকেন এবং আপনাদের বিয়েটা যদি হয় তাহলে আমি বিয়ের সাক্ষী হিসেবে আমাকে অফার করব।
মীরু কতক্ষণ পরে চোখ মেলল তা সে নিজেও জানে না। তার কাছে মনে হল সে দীর্ঘ ঘুম দিয়ে জেগে উঠেছে। ঘুমের ভেতর নানা ধরনের স্বপ্ন সে দেখে ফেলেছে। স্বপ্নের মধ্যে গা ছমছমানাে বিশেষ স্বপ্নও আছে। সে ক্লাসে বসে আছে, গায়ে শুধু পাতলা একটা চাদর। আর কিছু নেই। এই চাদরটাও আবার হাঁটুর উপর রাখা। স্যার বললেন, এই যে চাদর গায়ে। মেয়ে আজকের ক্লাসের পড়া বুঝেছ?
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১১)
মীরু হঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
তাহলে এক কাজ কর । বাের্ডে চলে এসাে। বাের্ডে এসে সবাইকে বুঝিয়ে দাও।
স্যার আমি বাের্ডে যেতে পারব না। আমার একটু অসুবিধা আছে। কী অসুবিধা? সেটা স্যার বলতে পারব না। কোনাে অজুহাত শুনতে চাচ্ছি না । এসাে বাের্ডে। এসো বলছি।
মীরুর তখন ঘুম ভাঙল। সে দেখল গাড়ি রাস্তার ওপর থেমে আছে। গাড়ির ওপর মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে । নাসের নামের মানুষটা ডাইভারের সিটে ঝিম ধরে বসে আছে। নাসের হাসিমুখে বলল, ঘুম ভেঙেছে?
মীরু বলল, আমরা কোথায়?
নাসের বলল, আমরা রাস্তায়। রাস্তা কাটা ছিল। বৃষ্টির পানিতে পুরাে রাস্তা ঢাকা। বুঝতে পারিনি গাড়ি নিয়ে খাদে পড়ে গেছি। আপনি গভীর ঘুমে ছিলেন কিছু বুঝতে পারেননি।
আমাকে ডাকলেন না কেন? এত আরাম করে ঘুমুচ্ছিলেন, ডাকতে মায়া লাগল । আমি কতক্ষণ ঘুমিয়েছি? এক ঘণ্টা দশ মিনিট। বলেন কি! আপনি এতক্ষণ কী করলেন? ঝিম ধরে বসে থাকলাম। বৃষ্টি দেখলাম। চা খাবেন?
বারসাতকে কাজি অফিসে পাওয়া গেল না। মীরু নাসেরকে সঙ্গে নিয়ে বারসাতের মেস-এ গেল। সেখানেও সে নেই।
নাসের বলল, আপনাকে খুবই ক্লান্ত লাগছে । আসুন এক কাপ চা খাই।
মীরু বলল, চলুন চা খাই। এখন মনে পড়েছে আমি দুপুরেও কিছু খাইনি। ক্ষিধের জন্যেই মাথা ধরেছে।
আমি আপনার মাথা ধরা সারিয়ে দেব। কীভাবে?
এখানে চা কোথায় পাবেন?
আমি মােবাইলে টেলিফোন করে চা আনিয়েছি। ফ্লাস্ক ভর্তি গরম চা এবং সিঙাড়া আছে। চা দেই?
মীরু বলল, দিন। আপনি দেখি খুব গােছানাে মানুষ।
নাসের বলল, আমি অবশ্যই গােছানাে তবে মেয়েরা গােছানাে মানুষ পছন্দ করে না। মেয়েরা পছন্দ করে অগােছালাে মানুষ।
Read more