বলা যেতে পারে আমি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।
মীরু বলল, মৃত্যুর মুখ থেকে পুরােপুরি ফিরে এসেছ, এমন বলা ঠিক হবে না। তেমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি এখনও মৃত্যুর মুখে বাস করছ ।
আমরা সবাই তাই করছি মীরু। আমরা সবাই মৃত্যুর মুখে বাস করছি। ফিলসফি কপচাবে না।।
বারসাত হাসতে হাসতে বলল, ফিলসফি তাে কপচাতেই হবে। মীরু তুমি ভুলে গেছ আমি ফিলসফির ছাত্র । খুবই খারাপ ছাত্র। তাকে কি? বিষয় তাে ফিলসফি।
তােমার স্বাস্থ্য যে কতটা খারাপ হয়েছে তাকি তুমি জানাে? তােমাকে টুথপিকের মত দেখাচ্ছে। শরীর কি এখন ঠিক হয়েছে?
দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের পাতা কেউ নামিয়ে নিচ্ছে।
এটা যেন একটা খেলা, চোখের পাতা যে আগে নামিয়ে নেবে সে হেরে যাবে।
পরাজিত হল বারসাত। সে চোখ নামিয়ে নিয়ে কোমল গলায় বলল, কেমন আছ ‘ঐ’?
ঐ মানে? ঐন্দ্রিলাকে সংক্ষেপ করে ঐ বললাম।
মীরু বলল, তােমার কি হয়েছে? তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি এইডস–এর রুগী। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে মারা যাবে। এত দিন কোথায়
ছিলে?
| বারসাত বলল, বাহ তুমি তাে অবিকল বনলতা সেনের মত প্রশ্ন করলে– ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?‘ এতদিন আমি ছিলাম বিম্বিষার
অশােকের ধূসর জগতে।
মীরু বিরক্ত গলায় বলল, ধোঁয়াটে ভাবে কথা বলা বন্ধ কর। সরাসরি কথা বল। তুমি কোথায় ছিলে?
বারসাত সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, সিকোয়েন্স বাই সিকোয়েন্স বলি। সিকোয়েন্স ওয়ান— কাজীর অফিস থেকে আমি চলে গেলাম মামার বাগান বাড়িতে। বাগান বাড়িটা কালিয়াকৈরে। বাগানবাড়ির নাম পদ্ম।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৩)
আমার তাে মনে হয় না তােমার শরীর ঠিক হয়েছে। তুমি সিগারেট ধরিয়ে দুটা টান দিয়ে সিগারেট ফেলে দিলে। শরীর ঠিক থাকলে সিগারেট ফেলে দিতে না। তুমি নিঃশ্বাস নিচ্ছ হা করে । একমাত্র মাছেরাই ডাঙ্গায় এইভাবে নিঃশ্বাস নেয়। তুমি তাে মাছ না।
বারসাত হাসল।
মীরু বলল, তােমার হাসিও বদলে গেছে। হাসির মধ্যেও অসুস্থ ভাব চলে এসেছে। হাসিতে কোন প্রাণ নেই।
বারসাত বলল, চা খাবে?
মীরু বলল, হ্যা খাব। | বারসাত বলল, আমার চৌকির নিচে কেরােসিনের চুলা আছে । চিনি, চা পাতা সবই আছে। শুধু দুধ নেই। দু’কাপ লিকার চা বানাও। লিকার চায়ে না কি এন্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। শরীরে এন্টি-অক্সিডেন্ট ঢুকিয়ে দেখি কিছু করা যায় কি-না।
মীরু চা বানাতে বসল। বারসাত দেয়ালে হেলান দিয়ে চৌকিতে পা ছড়িয়ে বসেছে। সে কৌতুহলী চোখে মীরুর চা বানানাে দেখছে।
মীরু বলল, ঐ দিন আমি কেন যথাসময়ে উপস্থিত হইনি তা কি তুমি জানতে চাও না?
জানতে চাও না কেন? বারসাত শান্ত গলায় বলল, জানতে ইচ্ছা করছে না। ইচ্ছা করছে না কেন?
ইচ্ছা করছে না কারণ আমি জানি তুমি কেন আসনি এটা শােনার পর আমার মন খারাপ হয়ে যাবে। এম্নিতেই শরীর খারাপ তার সঙ্গে মন খারাপ যুক্ত হলে আর দেখতে হবে না।
মীরু বলল, তােমার ধারণা আমি কি জন্যে আসিনি? তুমি আসনি কারণ শেষ মুহূর্তে তােমার মনে হয়েছে কাজটা ঠিক হচ্ছে। । বিয়ে কোন ছেলেখেলা ব্যাপার না। হুট করে বারসাত আলিকে বিয়ে করা যায় না। বিয়ের পর স্ত্রীকে কোথায় নিয়ে তুলবে যে লােক এটা জানে
তাকে বিয়ে করা শাস্তিযােগ্য অপরাধ। | মীরুর চা বানানাে হয়ে গেছে। সে এক কাপ চা বারসাতকে দিয়ে নিজে এক কাপ নিয়ে খাটের উপর আরাম করে বসতে বসতে বলল, এ রকম কিছু যদি আমার মনে আসত তাহলে তােমাকে জানাতাম। না জানিয়ে ডুব দিতাম না। আমার স্বভাবের মধ্যে ডুব দেয়া ব্যাপারটা নেই।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৩)
বারসাত চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, এটা ঠিক । তুমি ডুবুরি কন্যা না । তুমি ভাসন্ত কন্যা।
মীরু বলল, আমি ঐ দিন সময় মত আসিনি কারণ বাবা অসুস্থ ছিলেন। তাঁর হার্ট এটাক হয়েছিল। তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলাম। তবে আমি বিকেল সাড়ে পাঁচটায় কাজি অফিসে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে তােমার মেসে গিয়েছিলাম।
সত্যি ?
হ্যা সত্যি। তুমি খুব ভাল করেই জানাে এটা সত্যি। আমি তােমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম কখনাে তােমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলব না।
সব সময় সত্যি কথা বললে জীবন হয়ে যাবে ডিসটিলড ওয়াটারের মত। সিদ্ধ করা পানি টেস্টলেস।
হােক টেস্টলেস। প্রতিজ্ঞা যখন করেছি প্রতিজ্ঞা রাখব।
বারসাত গম্ভীর গলায় বলল, প্রতিজ্ঞাবতী নাম আজ আমি তােমাকে দিলাম।
মীরু উঠে দাঁড়াল। বারসাত বলল, তুমি চলে যাচ্ছ না কি?
মীরু বলল, হ্যা যাচ্ছি। বিশেষ কিছু বলতে চাইলে পাঁচ মিনিটের জন্যে বসতে পারি। বিশেষ কিছু বলার আছে?
আছে। বল । আমি বসলাম।
বারসাত বলল, আগামীকাল তােমার সময় হবে? বেশিক্ষণ লাগবে না এই ধর আধঘণ্টার বেশি হলে পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
না আগামীকাল সময় হবে না। সারাদিন আমি গাজীপুরে থাকব ।
Read more