সে টেলিফোনে বলবে— এইমাত্র খবর এসেছে মীরু রােড একসিডেন্টে মারা গেছে। তার গায়ের উপর দিয়ে সাতটনি একটা ট্রাক চলে গেছে। তার ডেডবডি কোথায় আছে এক্ষুণি আপনাকে জানাচ্ছি— টেলিফোন লাইনটা দয়া করে খােলা রাখবেন । এই বলেই খট করে টেলিফোন রেখে দিতে হবে। বাসায় শুরু হবে কান্নাকাটি। আধঘণ্টা পর টেলিফোন করে জানাতে হবে সংবাদটা ভুল। আসলে মীরু মারা যায়নি। সে কাজীর অফিসে গিয়ে থার্ড ক্লাস টাইপ এক ছেলেকে বিয়ে করেছে। মৃত্যু সংবাদের পরে এই ধরনের সংবাদে সবাই আনন্দে অভিভূত হবে। বাবা–মা দুজনই গদগদ গলায় বলবেন— যাকে বিয়ে করেছিস তাকে নিয়ে এক্ষুণি বাসায় আয় । তুই
যে বেঁচে আছিস এতেই আমরা খুশি।
বারসাত বলছে, আমার প্রেসক্রিপশান মত যদি কাজ করতে পার তাহলে তুমি কিন্তু তােমার বাবা মার কাছে আমাকে হজম করিয়ে ফেলতে পারবে। হজমি বড়ি লাগবে না।
মীরুর ধারণা তা না। সে খুব ভাল করেই জানে বারসাতের তাদের বাড়িতে এন্ট্রি হবে না। কোনাে ভাবেই না।
মীরুদের পরিবারে প্রেম নােংরা ব্যাপার। টেলিভিশনে এইসব নােংরা ব্যাপার দেখানাে হয় বলে আফজল সাহেব টেলিভিশন দেখেন না। মাঝেমধ্যে টিভির খবর দেখেন এবং কিছুক্ষণ পর পর ভুরু কুঁচকে বলেন— ‘সব মিথ্যা কথা।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৩)
মীরুর মা জাহেদা আদর্শ মধ্যবিত্ত মা। স্বামী যা করে তাকেও তাই করতে হবে। তিনিও শুধু খবর দেখেন এবং স্বামীর মতাে ভুরু কুঁচকে বলেন–— এত মিথ্যা কথা কীভাবে বলে? মুখে আটকায় না। আশ্চর্য!
মীরুর বড় বােন রুনি পছন্দ করে একটি ছেলেকে বিয়ে করেছিল বলে তার এই বাড়িতে ঢােকার অনুমতি নেই। তার বিয়েটা ভাল হয়নি। ছ’ মাসের মধ্যে ঝামেলা লেগে গেল। নয় মাসের মধ্যে ডিভাের্স। রুনি কাঁদতে কাঁদতে স্যুটকেস হাতে বাড়িতে উঠে এসেছিল। আফজল সাহেব স্যুটকেস হাতেই তাকে বিদেয় করে দেন। সে এখন আছে তার বড় খালার সঙ্গে। | মীরুর দুই ফুপু হজ করে এসেছেন। তারা বােরকা পরেন। সেই বােরকাও কঠিন বােরকা। দুই ফুপুর একজন (ছােট ফুপু সুলতানা বেগম) তাবিজ বিশেষজ্ঞ। তিনি মাঝে মধ্যে তাবিজ নিয়ে আসেন। সুতা পড়া আনেন। তাঁর কাছ থেকে তাবিজ পড়া সুতা পড়া অত্যন্ত ভক্তিসহকারে গ্রহণ করতে হয় । ফুপুর দেয়া একটা তাবিজ এখনাে মীরুর গলায় ঝুলছে। এই তাবিজের বিশেষত্ব হচ্ছে, এই তাবিজ পরা থাকলে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে
না।।
মীরুর দুঃস্বপ্ন দেখার রােগ আছে। এর মধ্যে একটা দুঃস্বপ্ন ভয়াবহ। এই দুঃস্বপ্নে মীরু ইউনিভার্সিটির ক্লাসে বসে থাকে। হঠাৎ সে লক্ষ্য করে তার গায়ে কোনাে কাপড় নেই। সে সম্পূর্ণ নগ্ন। তখন টিচার তার দিকে তাকিয়ে বলেন, ঐন্দ্রিলা এসাে বাের্ডে এসাে। জিনিসটা বুঝিয়ে দাও। মীরু বাের্ডে যায়। ছাত্রছাত্রীরা সবাই তার দিকে তাকিয়ে ফিকফিক করে হাসতে থাকে। স্যারও হাসতে থাকেন। ছােট ফুপুর তাবিজ গলায় পরার পর এই ভয়ংকর স্বপ্নটা মীরু দেখছে না। এটা তাবিজের গুণ, না কি দুঃস্বপ্ন দেখা রােগ মীরুর সেরে গেছে কে জানে। মীরু ঠিক করে রেখেছে বিয়ের পর যেদিন থেকে সে বারসাতের সঙ্গে ঘুমুতে যাবে সেদিনই সে তাবিজ ছিড়ে কুয়ায় ফেলে দেবে। (তাবিজ যেখানে–সেখানে ফেলা যায় না। স্রোতহীন পানিতে ফেলতে হয়)।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৩)
আগের দিন গায়ে হলুদ মাখতে চায়। কাজী সাহেবের সামনে বউ সেজে কে উপস্থিত হবে? তবে আগামীকাল মীরু সুন্দর করেই সাজবে । একটা জর্জেট শাড়ি ঠিক করা আছে। সাদা জমিনে হালকা সবুজ কাজ। সবুজের ফাকে ফাকে হঠাৎ হঠাৎ লাল ছােপ। লাল হল সবুজের কনটেম্পরারি কালার। একটা রঙ আরেকটাকে উজ্জ্বল করবে। মীরুর ধারণা শাড়িটাতে তাকে খুব মানাবে।
সাজগােছ নিয়ে বারসাতের অবশ্যি কোনাে মাথাব্যথা নেই। আজ পর্যন্ত সে মীরুকে বলেনি— বাহ্ এই শাড়িটাতে তাে তােমাকে সুন্দর মানিয়েছে! কিংবা বাহ আজ তাে তােমাকে অদ্ভুত লাগছে! কপালের টিপটা নিজে হাতে এঁকে দিয়েছ? সুন্দর তাে! মাঝে মাঝে মীরুর মনে হয় সুন্দর-অসুন্দরের কোনাে বােধই বারাসাতের নেই। অথচ বারসাত নিজে সুন্দর সুন্দর শার্ট-প্যান্ট পরে। সব সময় তার চুল আঁচড়ানাে থাকে। পকেটে চিরুনি থাকে। মুখ ভর্তি খোচা খোচা দাড়ি— এরকম তাকে মীরু কখনাে দেখেনি। সব সময় ক্লিন শেভ।
বারাসাতের সঙ্গে বাবা–মা এবং ফুপুদের একটা ইন্টারভুর ব্যবস্থা করলে কেমন হয়? চাকরির ইন্টারভ্যর মতাে ইন্টারভু। বাবা ইন্টারভ্য বাের্ডের চেয়ারম্যান। দুই ফুপু মেম্বার। মা সেক্রেটারি। মা’র হাতে কোনাে ক্ষমতা নেই। তিনি শুধু কথাবার্তা নােট করবেন। প্রশ্ন করবেন বাবা এবং ফুপুরা। মার কাজ হবে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকা । বাবা হাসলে তিনি হাসবেন। বাবার মুখ গম্ভীর হলে তিনি মুখ গম্ভীর করবেন। বাবা রাগ করলে তিনি রাগ করবেন। হিজ মাস্টারস ভয়েস।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৩)
মীরু কল্পনায় ইন্টারভু বাের্ডটা দেখতে পাচ্ছে এবং মনে মনে আশা করছে এই ইন্টারভ্য বাের্ড দেখতে দেখতে তার ঘুম পেয়ে যাবে এবং খুব ভালাে ঘুম হবে। ঘুম ভাঙবে সকাল দশটার দিকে। তখন তাড়াহুড়া করে সে তৈরি হবে। কাজী অফিসে উপস্থিত হতে হবে সকাল এগারােটায়। হাতে একেবারেই সময় থাকবে না। তাকে গােসল করতে হবে। তাদের বাসায় হিটার নেই। গােসলের জন্য পানি গরম করতে হবে। আচ্ছা কাল কি হবে তা কাল দেখা যাবে। এখন বরং ইন্টারভ বাের্ডে কী হচ্ছে তা দেখা যাক।
মীরু খুব ভালাে করে জানে তাদের কঠিন পরিবারের কাছে বারাসাতকে হজম করানাে কোনােক্রমেই সম্ভব না। কাজীর অফিসে গিয়ে বিয়ের কারণ এই একটাই। বাংলাদেশের কোনাে মেয়ে কাজীর অফিসে বিয়ে করতে চায় না। সব মেয়ে বিয়ের দিনে বউ সাজতে চায়। বিয়ের
তামার নাম? স্যার আমার নাম বারসাত আলি। বারসাত আবার কেমন নাম?
আমার নানাজান রেখেছিলেন। নামের অর্থ বৃষ্টি। আমি হচ্ছি বৃষ্টি আলি ।।
পড়াশােনা কী? এম. এ. পাস করেছি। সেকেন্ড ক্লাস ফোর্থ হয়েছিলাম । বিষয়? ফিলসফি।
Read more