মেয়ে তাকে চা বানিয়ে দিচ্ছে এতে খুশি হবার কিছু নেই। এটা মেয়ের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ছে।
তিনি একবার জিজ্ঞেসও করবেন না এত ভােরে তার মেয়ে জেগে আছে কেন? তার কি কোনাে সমস্যা? মীরু চায়ের পানি গরম করেছে। একটা জিনিস সে বুঝতে পারছে না । তার বাবা চা–টা কখন খান, সূরা আর রাহমান পাঠ করার আগে না পড়ে?
রান্না ঘরে শব্দ করে কে?
বাবার গলা। গলাটা যেন কেমন অন্যরকম। অসুস্থ মানুষের চিকন গলা। দীর্ঘ বাক্য শেষ করার মতাে দমও যেন নেই।
মীরু বলল, বাবা আমি। চা খাবে? চা বানিয়ে আনি?
আজফল সাহেব হাঁপানি রােগীর মতাে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, মা একটু এদিকে আয়।।
মীরু বাবার শােবার ঘরে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেল। বাবা জায়নামাজে আড়াআড়িভাবে শুয়ে আছেন। তার মুখ দিয়ে ফেনার মতাে কি যেন বের হচ্ছে। ডান হাত একটু পরে পরে কেঁপে কেঁপে উঠছে। মীরু হতভম্ব হয়ে বলল, কী হয়েছে বাবা?
আফজল সাহেব থেমে থেমে বললেন, মারা যাচ্ছিগাে মা। মারা যাচ্ছি । বুকে ব্যথা। বুকে প্রচণ্ড ব্যথা। তিনি কথা শেষ করতে পারলেন না। গােঙাতে লাগলেন।
মীরু এখন কী করবে? জিতু মিয়া ছাড়া বাসায় পুরুষ মানুষ কেউ নেই। একতলায় বাড়িওয়ালা থাকেন। তারা দলবেঁধে আজমির শরিফ গিয়েছেন। বাড়িওয়ালার এক ভাগ্নেকে রেখে গেছেন বাড়ি পাহারা দেবার জন্যে। সেই ভাগ্নে আধপাগল। সারাদিন বারান্দায় মাথা নিচু করে বসে থাকে। মেঝের দিকে তাকিয়ে ফিকফিক করে হাসে। মীরু দৌড়ে টেলিফোন রিসিভার কানে নিল। ডায়াল টোন নেই। একটু আগেই সে কথা বলেছে আর এখন ডায়াল টোন নেই— এর মানে কি?
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৬)
মীরু টেলিফোন রেখে বাবার কাছে গেল। আফজাল সাহেব বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। মীরু বলল, বাবা খুব খারাপ লাগছে?
খুট করে শব্দ হল। মীরুর বাবা দরজা খুলেছেন।
মীরু চট করে টেলিফোন রেখে দিল। বাবা যদি দেখেন সে টেলিফোনে কথা বলছে তাহলে গজব হয়ে যাবে। মীরু তাকাল ঘড়ির দিকে। চারটা একুশ বাজে। ফজরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। আফজল সাহেব বাথরুমে যাবেন। অজু করবেন। ফজরের নামাজ শেষ করে সূরা আর রাহমান পড়বেন। তারপর আবার ঘুমুতে চলে যাবেন। ঘুমুতে যাবার আগে এক কাপ আদা চা খাবেন। একটা টোস্ট বিসকিট খাবেন। এই চা তাকে বানিয়ে দেবেন মীরুর মা জাহেদা বানু।।
আজ আফজল সাহেবের চা হবে না। কারণ জাহেদা বানু বাসায় নেই । তিনি ফুলবাড়িয়াতে গিয়েছেন। তার এক চাচাতাে বােনের বিয়ে। বিয়ে
সেরে ফিরতে ফিরতে আরাে দুই-এক দিন লাগবে । | মীরু ঠিক করল সে যখন জেগেই আছে তখন আর বাবার রুটিনের ব্যতিক্রম করাবে না। এক কাপ চা নিজেই বানিয়ে দেবে। বাবা নিশ্চয়ই অবাক হবেন। খানিকটা খুশিও হয়তাে হবেন। তবে তিনি তা প্রকাশ
তিনি জবাব দিলেন না। মীরু বাবাকে ফেলে রেখে আবার টেলিফোনের কাছে গেল।
এমন তাে হতে পারে হঠাৎ টেলিফোন ঠিক হয়ে গেছে। যে টেলিফোন কোনাে কারণ ছাড়া হঠাৎ নষ্ট হয় সেই টেলিফোন কোনাে কারণ ছাড়া হঠাৎ কি ঠিকও হতে পারে না? মীরু ছুটে গিয়ে টেলিফোন রিসিভার কানে দিল। পোঁ পোঁ শব্দ হবার বদলে কেমন যেন ঝড়-তুফানের শব্দ হচ্ছে। শো শো আওয়াজ। বৃষ্টির শব্দ। মীরু অনেকক্ষণ বুঝতেই পারল না যে বৃষ্টি-বাদলার শব্দ টেলিফোন রিসিভার থেকে আসছে না। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। সেই শব্দ। শ্রাবণ মাস বৃষ্টি-বাদলারই সময়।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৬)
বারসাত আনন্দমাখা গলায় বলল, বৃষ্টি দেখেছেন? কেমন ঝুম ঝুমান্তি নেমেছে। শ্রাবণ মাসে টিপটিপ বৃষ্টি হয় । ঝুম বৃষ্টি হয় না। আবহাওয়া আসলেই বদলে যাচ্ছে । ওজোন স্কেয়ার ফুটো হয়ে গেছে। বারসাত জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। ফুটো হওয়া ওজোন স্কেয়ার দেখার জন্যে কি না কে জানে। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে সে ফুটো দেখতে পাচ্ছে।
নীলুফার কৌতুহলী হয়ে বারসাতকে দেখছে। মানুষটার আনন্দ আনন্দ ভাব তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। আজ বারসাতের বিয়ের দিন । আনন্দ ভাব থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বিয়ের কনের দেখা নেই। এগারােটার মধ্যে মেয়ের আসার কথা। এখন বাজছে একটা। নীলুফারের মনে হচ্ছে কনের দেখা শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাবে না। অথচ বারসাতের মধ্যে এ নিয়ে কোনােরকম টেনশান দেখা যাচ্ছে না। বরং তাকে আনন্দিত মনে হচ্ছে। এই আনন্দ নিশ্চিয়ই লােক দেখানাে আনন্দ—Fake happyness.
বারসাত বলল, বৃষ্টির ফোঁটার সাইজ ম্যাক্সিমাম কত বড় হতে পারে জানেন ভাবি?
নীলুফার না-সূচক মাথা নাড়ল ।
Read more