তার এই তীব্র প্রতিবাদে ব্রিত হয়ে মা বলে, তাহলে পছন্দটা হবে কি করে বল! সে আমল নেই জানি। কিন্তু এখনও তাে সেই আগের রীতিই চলছে।
ঝমরে উঠল যশােধরা, কেন চলবে? কেন চলতে দিচ্ছে তােমরা? ফটো দেখুক, কোয়লিফিকেশন জেনে নিক, তেমন দরকার পড়লে আড়ার থেকে পথে-ঘাটেও দেখে নিতে পারে। সেজেগুজে সামনে গিয়ে বসতে হবে কেন?
ধর না, আমাদের বাড়িতে বেড়াতেও তাে আসে কত লােক। এও তেমনি পাড়া-প্রতিবেশীদের মতোই। আর সাজগােজ না করতে চাস করিস না। তাের আবার সাজের দরকার হয় নাকি?
খুব অয়েলিং শিখেছাে! ওসবে আমি ভূলছি না। যদি ওরা পাত্রী দেখে, তােমরাও পাত্র খেতে চাইবে। | ওমা চাইবাে না কেন? তাের বাপ জ্যাঠা ছাড়বার পাত্র কিনা। এখনও সেই জমিদারি নার আছে । খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে। হিউস্টনে ট্রাক কল করে অলককে বলা হয়েছে পাত্রের খোঁজ খবর নিতে ।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২১
যশােধরার যে বিয়ের ইচ্ছে নেই তা নয়। তবে বিয়ের সঙ্গে জড়িত অবমাননাকর কিছুই সে মানতে রাছি নয়। আমেরিকার পাত্র বলে ঢলে পড়বার মতাে গ্যালাও সে নয়। যশােধরা জানে সে দারুণ সূত্ৰী। তাদের জমিদারি গেছে বটে, কিন্তু লুকানাে পেটিকায় যেমন পুরােনাে মােহর আর সাবেক গয়না কিছু এখনও রয়ে গেছে, রয়ে গেছে কিছু চালচলন, তেমনি তাদের বংশের সকলের চেহারাতেই রয়ে গেছে সেই অভিজাত্যের কিছু নির্ভুল ছাপ। যশােধরা জানে সে সহজ সুন্দরী নয়, একটু ভাস্কর্যের আভাসও আছে তার চেহারায়।
সুতরাং বিবাহ-বৈতরণী পার হতে তার কোনও কষ্ট হবে না। আর ওরকম পাত্রও তার মেলা জুটবে। তর বাপ জ্যাঠার খুব নাক উঁচু। যেমন তেমন পাত্রকে তারা পাত্তা দেবে না। অনেক বেছে ঋছে এই পাত্রটিকে আমন্ত্রণ জানানাে হয়েছে। পাত্রের চেয়েও যশােধরার বাপ-জ্যাঠার বেশী পছন্দ পাত্রের পরিবারটি। বেশ বনেদী পরিবার। পাত্রের বাবা বরাবর ভাল চাকরি করতেন। কলকাতায় বিশাল বাগানওলা বাড়ি।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২১
পয়সা আছে, কচি আছে, বনেদিয়ানা আছে, লায়াবিলিটিজ নেই। জ্যাঠামশাইয়ের এক বন্ধুর বন্ধু হলেন দ্রলােক। কিন্তু যশােধর নিজের পছন্দ-অছন্দের কিছু ব্যাপার আছে। তর পছন্দ লম্বা পুরুষ। পুরুষালি পুরুষ । একটু আনমনা হবে আর বেশ উদার একদম কিপটে হবে না। স্ত্রৈণ হবে না।
ওদের বাড়িটা কেমন তা অবশ্য যশােধরা জানে না। ব্যানার কুঠীঘাটে তাদের বাড়িটা কিন্তু বিশাল বড়। এখনও তাদের যৌথ পিরবার। সামনে ফুলের বাগান, বাগানের মাঝখানে একটা ফোয়ারা, বাগানের তিন দিক ঘিরে দোতলা বাড়ি। সামনে পিছনে টানা চওড়া বারন্দা আছে। বাড়ির পেছন দিকেই গঙ্গা। আগে বাড়ি থেকে গঙ্গায় নামবার সিঁড়ি ছিল। এখন সিড়ি তেঙে গেছে। পিছন দিকে ফলের বাগান। আর পাম গাছের সারি। ঘাটে একটা বজরা বাধা থাকত। আগে। সে বজরা কবে ভেঙে গেছে। যশােধর বজৱা দেখেনি। তবে এ তাদের আসল বাড়ি নয়। পূর্ব বঙ্গের জমিদাররা কলকাতায় একটা করে বাড়ি করে রাখতেতন, কালােতঐে এল থাকবার জন্য। এ হল সেই বাড়ি । তাদের আসল বাড়ি ছিল ময়মনসিংহে! যশােধরা শিশুকাল থেকে সেই বাড়ির গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছে। সেইসব গল্পের মধ্যে অবশ্য অনেক দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে। কিন্তু যশােধরার কোনও দুঃখ নেই। এ বাড়িতেই সে জন্মেছে, এই বাড়িই তার ভাল লাগে। এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে খুব খারাপ লাগবে।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২১
আজকের দিনটা অন্য দিনের মতাে নয়। আজ অন্যরকম একটা দিন। মনের মধ্যে বিদ্রোহটা আছে ঠিকই, উত্তেজনা আছে, বুক কাঁপা আছে, আবার মাঝে মাঝে শিউরে উঠছে গা। দাঁতে ব্রাশ নিয়ে পিছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গঙ্গার দিকে চেয়ে রইল একটু যশােধরা। বারান্দায় অনেক পাখির খাঁচা। এখন আর সব কটাতে পাখি নেই। মােট তিনটে বাঁচা আর দুটো দাঁড়ে পাখি আছে। দাঁড়ে বুড়ো একটা কাকাতুয়া, আর একটা টিয়া! খাঁচায় ময়না, বুলবুলি আর চশমা। ভােরের আলো দেখে পাখিরা কিছু চঞ্চল এবং মুখর। খাঁচা খুলে, শিকলি কেটে আজ কেন পাখিদের উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে তার?
গঙ্গার উদাস হাওয়া এসে বিলি কেটে যায় চুলে। রােজকার বাতাস, তবু মনে হয় আজ যেন বিদেশী বাতাস! দাতে ব্রাশ চালাতে ইচ্ছে করে না আজ। আজ শুধু ভােরের দিকে চেয়ে ইচ্ছে করে।
কিন্তু বাড়িতে আজ সাজো-সাজো রব । ও ঘরে জ্যাঠাইমা আর পিসিমপিসতুতাে বােন,জ্যাঠতুতাে বােনের বুম থেকে উঠে পড়ে হুড়ােহুড়ি লাগিয়েছে। গ্যারাজ থেকে তাদের বহু পুরােনাে অনি অফ ইংল্যান্ডখানা বের করা হয়েছে সামনের রাস্তায়, সেটাকে স্টার্ট দিয়ে পরীক্ষা করছে বুড়ো ড্রাইবার মাইমদা। তারা সবাই মিলে দক্ষিণেশ্বর যাবে পূজো দিতে। আজ শুভ দিন, মেয়ে যাতে সসম্মানে আফকের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তার জন্যেই পূজো দিতে যাওয়া।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২১
মুখ-টুখ ধুয়ে এসে সাজতে সাজতে যশােধর বলর, মা, আমরা তাে নৌকাতেও যেতে পারতুম! কাছেও হত ।
নৌকো! দূর পাগলী, নৌকো করে আবার আমরা কবে যাই! সেই আগের আমলে নৌকো করে যাওয়া হত । আমার ভয় ভয় করত বাবী।
নৌকোয় যাওয়া কত থ্রিলিং বলাে তাে! এতগুলাে লােক শেষে নৌকো উস্টে জলে পড়ি আর কি। একটা শুভ কাজে যাচ্ছি। শুভকাজে গঙ্গা ছুঁয়ে যাওয়া কি ভাল নয় মা! তােমাদের কোনও ইমাজিনেশন নেই। তাের মাথায় সব কিছু আইডিয়া খেলে।
মা, আমার মাথায় প্র্যাকট্যিাল আইটিই খেলে। পেট্রল না পুড়িয়ে নৌকোয় গেলে তাড়াতাড়ি হত, পণ্য সঞ্চয় করতে পারতে। একটা গরিব মাঝি কিছু রােজগার করত এবং যাওয়াটা হত দারুণ। সুন্দর ।
সনয়নী আর কথা খুঁজে পেলেন না। শুধু বললেন, ওরে, তাড়াতড়ি কর।
লালপেড়ে গরদের শড়িতে যশােধরার রূপ আজ যেন ফেটে পড়ছে । অঢেল চুল চালচিত্রের মতাে খােলা রয়েছে পিছনে। কপালে মস্ত লাল টিপ। মুখে রূপটান নেই। মেয়ের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছেন না সুনয়নী। তিনি নিজে কম সুশ্রী ছিলেন না। যশােধরা তার চেয়েও সুন্দরী। তাঁর চেহারায় উগ্রত ছিল। যশােধরা স্নিগ্ধ ।
হৃদয়বৃত্তান্ত-পর্ব-২১
চুলগুলাে আর একবার পাট করতে করতে যশােধরা আনমনে বলে, আমি তাে তােমার একটা মাত্র মেয়ে মা। একটাই সন্তান ।
তাই তাে! তবু সেই আমাকেই বিয়ে করার জন্যে তােমার এত ব্যস্ততা কেন?
সুনয়নী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলন, ব্যস্ততার কী দেখলি! তাের বাইশ বছ বয়স হল না? আর দেরী করলে নিলে হবে। এ বংশে এত দেরীতে বিয়ে হয় নাকি? আমি তাে এলুম ষােলােয়। দিদি। এসেছে তোেেয়। সতেরাে না পুরুতেই ভাসুরঠাকুর তার দুই মেয়ের বিয়ে দিলেন। আমরা তাে অনেক দেরী করে ফেলেছি সে তুলনায়।
তুমি এখনও অনেক পিছেয়ে আছ মা। অনেক। আর বেশী এগােতে পারব না বাবা। সবাই এগিয়ে গিয়ে যা খেলা দেখাচ্ছে! পাত্রটি সম্পর্কেও তােমরা কিন্তু তেমন কিছু জানাে না মা।
কী জানব? মদ বা সিগারেট খায় কিনা, চরিত্র কেমন, কোনও ক্রনিক অসুখ আছে কিনা। ওরে বাবা, সেসব খোঁজ না নিয়েই বিয়ে দেবাে নাকি? মেয়ে দেখানাের আগেই কিন্তু খোঁজ নেওয়াটা উচিত লি।
Read More