• শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২০

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-৫)

আনিস বলল, ‘শেয়ালের মতাে খিদেটা কী রকম জিনিস? 

অর্থাৎ মুরগি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। মঞ্জিল হােহো করে হেসে ফেলল।শ্যামল ছায়ানৌকা থেকে বেরিয়ে এসে দেখি চাঁদ ডুবে গেছে। কিন্তু খুব পরিষ্কার আকাশ। অসংখ্য তারা ঝিকমিক করছে। নক্ষত্রের আলােয় আবছাভাবে সৰ নজরে আসে। আনিস বলল, ‘দশ মাইল হাঁটা সহজ কর্ম না। হুমায়ূন ভাই অনুমতি দিলে আরেক দফা চা হােক, কী বলেন? 

বেশ তো, চা চড়াও। ‘হাসান আলি, আদা আছে তােমার কাছে? একটু আদাচা হােক, গলাটা খুসখুস করছে। জাফর, তুমিও খাবে নাকি হাফ কাপ 

না, চা খেলে ঘুম হয় না আমার।‘ঘুমুবার অবসরটা পাচ্ছ কই? 

ঘুমুবার অবসর সত্যি নেই। তবু অভ্যেসটা তাে আছে। হুমায়ূন ভাই দেখি নৌকার ছাদে উঠে বসেছেন। গুনগুন করছেন নিজ মনে। কোন গানটা টিউন করছেন, কে জানে। ঠিক ধরতে পারছি না। আহ্, চমঙ্কার লাগছে। আড়াল থেকে শুনতে বেশ লাগে। অনুরােধ করতে গেলেই সেরেছে। গাইবেন না কিছুতেই। তাঁর কাছ থেকে গান শােনবার সবচেয়ে ভালাে উপায় হচ্ছে, এমন একটা ভাব দেখান যে, তিনি কী করছেন তার দিকে তােমার একটুও নজর নেই। হ্যা, এইবার গান শােনা যাচ্ছে— 

শ্যামল ছায়ায় নাইবা গেলে 

না না নাইবা গেলে 

না না বলবার সময় বেশ কায়দা করে গলা ভাঙছে তাে। শুনতে খুব ভালো লাগছে। শান্ত হয়ে আছে বিল। বিলের পানি দেখাচ্ছে কালাে আয়নার মতাে। কালাে আয়নাটা আবার কী? কি জানি কী! তবে কালাে আয়নার কথা মনে হয়। আকাশে অসংখ্যা তারা উঠেছে। তারাগুলির জলে ছায়া পড়া উচিত। কী আশ্চর্য, ছায়া পড়ছে 

তাে! আকাশে যখন খুব তারা ওঠে, তখন নাকি দেশে আকাল আসে। মজিদ বলল, “সাংঘাতিক খিদে লেগেছে। খালি পেটে চা খাওয়াটা কি ঠিক? | হুমায়ুন ভাই গান থামিয়ে বললেন, ‘খালি পেটে চা না খেতে চাইলে গােটা দুই ডিগবাজি খেয়ে নাও মজিদ। এ ছাড়া আর কোনাে খাদ্যদ্রব্য নেই| আনিস আবার এই শুনেই ফ্যাফ্যা করে হাসতে শুরু করেছে। এর মধ্যে এত হাসির কী আছে? হুমায়ুন ভাই আবার গুনগুন শুরু করেছেন। তাঁর বােধহয় মনটন বিশেষ ভালাে নেই। কারাে সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন না। এমনি তিনি অবশ্যি খুব ফুর্তিবাজ ছেলে। আমার উপর রাগ করেছেন কি? | আজ ভােরে তার সঙ্গে আমার খানিকটা মন কষাকষি হয়েছেকিন্তু আমি অন্যায় কিছু বলি নি। শুধু বলেছি, মেথিকান্দার এ অপারেশনের দায়িত্ব হুমায়ুন ভাইয়ের নিয়ে কাজ নেই। এতে কী মনে করেছেন তিনি। তাঁর প্রতি আস্থা নেই আমার? তিনি ঠিকই মনে করেছেন। এমন দুর্বল লােকের এরকম এ্যাসাইনমেন্টের নেতৃত্ব পাওয়া ঠিক নয়। কিন্তু আমাদেরসাবসেক্টরে সেকেণ্ডইন-কমাণ্ড কী মনে করে এটা করলেন কে জানে। 

দালাল হাজী মারার ব্যাপারটাই দেখি না কেন। এই লােক কম করে হ৫ে গােটা ত্রিশেক মানুষ মারিয়েছে। হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে একাকার করেছে। মিলিটারি ক্যাপ্টেনের পিছে পিছে কুকুরের মতাে ঘুরে বেড়িয়েছে। সে যখন হলদিয়ার বাজারে ধরা পড়ল আমাদের হাতে, আমি বললাম, “গাছের সঙ্গে বেঁধে বেয়ােনেট দিয়ে শেষ করে দিগ্রামের লােকদের একটা শিক্ষা হােক, ভবিষ্যতে আর কেউ দালালী করবার সাহস পাবে না। হুমায়ূন ভাই মাথা নাড়েন। ক্যাম্পে নিয়ে যেতে চান এ্যারেস্ট করে। পাগল নাকি। সেই শেষ পর্যন্ত গুলী করে মারতে হল। হুমায়ুন ভাই সেই দৃশ্যও দেখবেন না। তিনি নদীর পাড়ে চুপচাপ বসে রইলেন। আরে বাবা, তুমি তাে মেয়েমানুষ নও। নাচতে নেমেছ, এখন আবার ঘােমটা কিসের?

Related Posts

Leave A Comment