অচিনপুর পর্ব (১২)- হুমায়ূন আহমেদ

আমরা সবাই তাঁর ঘরের সামনে ভিড় করে দাঁড়ালামপরিপাটি বিছানা পাতাবালিশের চাদর পর্যন্ত একটুও কোঁচকায় নিবড় নানিজান সেই পরিপাটি বিছানায় শক্ত হয়ে পড়ে আছেন

অচিনপুর

ইদুর কিংবা অন্য কোনাে কিছু তাঁর ঠোট আর একটি চোখ খেয়ে গিয়েছেবিকট হাঁ করা সেই মূর্তি দেখে সফুরা খালা মাগাে মাগাে বলে কাঁদতে লাগলেনলাল মামী সফুরা খালার হাত ধরে তাঁকে নিচে নামিয়ে নিয়ে গেলেন। 

নানাজানের জন্যে কেনা কাফনের কাপড়ে তাঁর কাফন হলনানাজানের জন্যে ঠিক করে রাখা জায়গায় কবর হল তাঁরযেইট নানাজান নিজের জন্যে 

আনিয়েছিলেন, সেই ইট দিয়ে কবর বাধিয়ে দেওয়া হল। 

সপ্তাহখানেকের মধ্যে আমরা সবাই বড়াে নানিজানের কথা ভুলে গেলামআগের মতাে ঝগড়া, রংতামাশা চলতে লাগলবড়াে নানিজানের ঘর থেকে তাঁর সমস্ত জিনিস সরিয়ে ফেলে সংসারের প্রয়ােজনীয় পেঁয়াজরসুন রাখা হল গাদা করে। 

দিন কেটে যেতে লাগলএকঘেয়ে বৈচিত্র্যহীন জীবনসেই একা একা হাঁটতে হাঁটতে সােনাখালি চলে যাওয়াপুকুরঘাটে রাতের বেলা চুপচাপ বসে থাকাএর বাইরে যেন আমার জানা কোনাে জগৎ নেইসমস্ত বাসনাকামনা এইটুকুতেই কেন্দ্রীভূতএর মধ্যে এক দিন নানাজান আমাকে তাঁর ঘরে ডেকে নিয়ে গেছেনবলেছেন, তােমার বড়াে নানিজান তাঁর নিজের সম্পত্তি তােমাকে আর লিলিকে দিয়ে গিয়েছেন দানপত্র করে। 

অচিনপুর পর্ব (১২)- হুমায়ূন আহমেদ

বড়াে নানিজান তার বাবার কাছ থেকে প্রচুর সম্পত্তি পেয়েছিলেন জানতামতার পরিমাণ যে কত তা কেউই জানত নানানাজান বললেন, অনেক জায়গা জমি, লিলির আসা দরকারকিন্তু তার ঠিকানাই তাে জানা নেই। 

রাজশাহী থেকে খবর এল, স্কুল ফাইনাল দিয়েই নবু মামা কাউকে কিছু না বলে কোলকাতা চলে গেছেননানাজানের মুখ গম্ভীর হলনানিজানের কেন জানি ধারণা, নবু মামা আর কখনাে ফিরবে নাতিনি গানের মতাে সুরে যখন কাঁদতে থাকেন, তখন বলেন, এক মেয়ে পাগল, এক ছেলে বিবাগী, এক বউ বাঁজা। 

শুনলে হাসি পায়, আবার দুঃখ লাগেবাদশা মামা মাঝেমধ্যে গিয়ে নানিজানকে ধমক দেন, কি মা, আপনি সব সময় বাজা বউ বাঁজা বউ করেন

নালিজান ক্ষেপে গিয়ে বলেন, বাঁজা বউরে আমি আর কী বলে ডাকব? আহা, এলাচি মনে কষ্ট পায়নানিজান কপালে করাঘাত করেন আর বলেন, হা রে বউ, তুই কি যাদুটাই করলি

বাদশা মামা চিন্তিত, বিরক্ত আর ক্লান্তমুখে চলে আসেন। 

নবু মামা হঠাৎ করে কোলকাতা চলে যাওয়ায় খুশি মনে হয় শুধু সফুরা খালাকেআমাকে ডেকে বলেন, আমি ছেলে হলে নবুর মতাে কাউকে না বলে আমিও চলে যেতাম। 

অচিনপুর পর্ব (১২)- হুমায়ূন আহমেদ

আটদশ দিন পর নবু মামা কোলকাতা থেকে টাকা চেয়ে পাঠালনানাজান লােক মারফত টাকা পাঠালেননির্দেশ রইল, ঘাড় ধরে যেন তাকে নিয়ে আসা হয়বাড়িতে সিদ্ধান্ত নেয়া হল নবু মামাকে বিয়ে দেওয়া হবেনানাজান মেয়ে দেখতে লাগলেননানিজান মহা খুশিলাল মামীকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছেন, নতুন বউয়ের এক বৎসরের ভেতর ছেলে হবে, আমি স্বপ্ন দেখেছি। 

টাকা নিয়ে লােক যাওয়ার কয়েক দিন পরই নবু মামা এসে পড়লেনসরাসরি এসে বাড়িতে তিনি উঠলেন না, লােক মারফত খবর পাঠালেন কাউকে কিছু না বলে আমি যেন আজিজ খাঁর বাড়িতে চলে আসি। 

আজিজ খাঁর বাইরের ঘরের চেয়ারে নবু মামা গম্ভীর হয়ে বসে ছিলেনমাথায় বেড়েছেন কিছুগায়ের রং ফর্সা হয়েছেআমাকে দেখে রহস্যময় হাসি হাসলেন, বাড়িতে কেউ জানে না তাে আমি এসেছি যে

নাগুড‘  

কী ব্যাপার নবু মামা

একটা প্ল্যান করেছি রঞ্জু। লাল ভাবীকে একেবারে চমকে দেবগ্রামােফোন কিনেছি একটাদেখ টেবিলে। 

আমি হাঁ করে টেবিলে রেখে দেওয়া বিচিত্র যন্ত্রটি তাকিয়ে দেখিনবু মামা হাসিমুখে বলেন, পাঁচটা রেকর্ডও আছেএক ’ পনের টাকা দাম

অচিনপুর পর্ব (১২)- হুমায়ূন আহমেদ

নবু মামার প্ল্যান শুনে আমার সাহের সীমা থাকে নারাতের বেলা সবাই ঘুমিয়ে পড়লে নবু মামা গ্রামােফোন নিয়ে চুপি চুপি যাবেনযেঘরটায় আমি আর নবু মামা থাকি সেই ঘরটায় চুপি চুপি এসে গ্রামােফোন বাজার ব্যবস্থা করা হবেগান শুনে হকচকিয়ে বেরিয়ে আসবেন লাল মামীঅবাক হয়ে বলবেন, ‘রজু, কীহয়েছে রে, গান হয় কোথায়

তখন হাে হাে করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসবেন নবু মামাউৎসাহে নবু মামা টগবগ করছেনআমি বললাম, নবু মামা, এখন একটা গান শুনি

নবু মামা হাঁহাঁ করে ওঠেন, নানা, এখন নাপরে শুনবিফার্স্টে কোনটা বাজাব বল তাে

কি করে বলব, কোনটা

সেদিন সন্ধ্যার আগেভাগেই ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামলসে কী বৃষ্টিঘরদোর, ভাসিয়ে নিয়ে যায়রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুহু করে ঝড়াে হাওয়া বইতে লাগলনবু মামা বিরক্ত মুখে বসে রইলেনরাতের খাওয়াদাওয়া আজিজ খাঁর ওখানেই হলরাত যখন অনেক হয়েছে, লােকজন শুয়ে পড়েছে সবখানে, তখন আমরা উঠলামবৃষ্টি থামে নি, গুড়ি গুড়ি পড়ছেইমাথায় ছাতা ধরে আধভেজা হয়ে বাড়িতে উঠলামকাদায় পানিতে মাখামাখিবাড়িতে জেগে নেই কেউশুধু নানাজানের ঘরে আলাে দেখা যাচ্ছেদুজনে নিঃশব্দে দোতলায় উঠে এলামদরজা খােলা হল অত্যন্ত সাবধানেএকটু কাঁচ শব্দ হলেই দু জনে চমকে উঠছি। 

Leave a comment

Your email address will not be published.