অচিনপুর পর্ব (১৫)- হুমায়ূন আহমেদ

সমস্ত দিন কেটে গেলসফুরা খালা কাঁদতে লাগলেন! কী বিশ্রী অবস্থা! বাদশা মা নৌকা করে চলে গিয়েছেন শ্রীপুরলাল মামীর মাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন একেবারে

অচিনপুর

কানাবিবি বারবার বলে, বউয়ের কোনাে খারাপ বাতাস লেগেছে, না হলে এমন হয়! মুকুন্দ ওঝাকে খবর দেও না এক বার। 

লাল মামীর মা খবর পেয়েই এসে পড়লেনলা মামী বলল না, আমি কিছুতেই খাব নাবাড়িতে কিছু খাব না আমিনানাজান বললেন, আচ্ছা, মেয়েকে না হয় নিয়েই যানদিন থেকে সুস্থ হয়ে আসুক‘ 

ধরাধরি করে লাল মামীকে নৌকায় তােলা হলনৌকার পাটাতন বাদশা মামা তাঁর সুটকেস নিয়ে আগে থেকেই বসে আছেনলাল মামী বাদশা মামাকে দেখেই জ্বলে উঠলেন, গেলে আমি যাব নাআল্লাহর কসম, আমি যাব না| বাদশা মামী চুপচাপ নেমে পড়ে দাঁড়িয়ে বােকার মতাে সবার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলেনযেন কিছুই হয় নিতাঁর কাণ্ড দেখে আমার চোখে পানি এসে গেল। 

বু মামার বিয়ের জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সবাইমেয়ে তাে আগেই ঠিক করা ছিল, এবার কথাবার্তা এগুতে লাগলনানাজান অনেক রকম মিষ্টি, হলুদ রংয়ের শাড়ি কানের দুল নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়ে দেখতে গেলেনসঙ্গে গেলেনহেডমাষ্টার সাহেব, আজিজ খাঁ সাহেবআমিও গেলাম তাঁদের সঙ্গেকী মিষ্টি মেয়ে, শ্যামলা রং, বড়াে বড়াে চোখএকনজর দেখলেই মন ভরে ওঠেদেখে আমার বড়াে ভালাে লাগলপৌষ মাসের মাঝামাঝি দিন ফেলে নানাজান উঠে এলেন। 

অচিনপুর পর্ব (১৫)- হুমায়ূন আহমেদ

বাড়িতে একটি চাপা আনন্দের স্রোত বইতে লাগলসবচেয়ে খুশি সফুরা খালাহাসিহাসি মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছেনসবার সঙ্গে বিয়ে নিয়ে গল্প। নবু মামার কিন্তু ভাবান্তর নেইকী হচ্ছে নাহচ্ছে, তা নিয়ে মাথাব্যথাও নেইমাছ ধরতে যানকোথাও যাত্রাটাত্রার খবর পেলে যাত্রা শুনতে যান। 

গ্রামের মাঠে ফুটবল নেমে গেছেসারা বিকাল কাটান ফুটবল খেলেসেন্টার ফরােয়ার্ডে তিনি দাঁড়ালে প্রতিপক্ষ তটস্থ হয়ে থাকেশীল্ডের অনেক খেলা শুরু হয়ে গেছেগ্রামের টীম খুব শক্তফাইনালে উঠে যাবে সন্দেহ নেইনবু মামা প্রাণপণে খেলেনমরণপণ খেলাবল নিয়ে দৌড়ে যাবার সময় তাঁর মাথার লম্বা চুল বাতাসে থরথরিয়ে কাঁপেমাঠের বাইরে বসে বসে মুগ্ধ নয়নে আমি তাই দেখিরাতের বেলা গরম পানি করে আনি, নবু মামা গরম পানিতে পা ডুবিয়ে অন্যমনস্কভাবে নানা গল্প করেনলাল মামী প্রসঙ্গে কোনাে আলাপ হয় না

তিনি সেই যে গিয়েছেন আর ফেরার নাম নেইবাদশা মামা প্রতি হাটবারে নৌকা নিয়ে চলে যানআবার সেই দিনই ফিরে আসেনলাল মামীর ঘরেই বাকি সময়টা কাটে তীরআমি বুঝতে পারি কোথায়ও সুর কেটে গিয়েছেভালাে লাগে নাকবে লিলির চিঠি আসবে, কবে আমি চলে যেতে পারব, তাই ভাবিতখন আমি অনেক রকম স্বপ্ন দেখতে শিখেছিপরগাছা হয়ে বেঁচে থাকতে ঘেন্না বােধ হচ্ছে, অথচ বেরিয়েও আসতে পারছি নাবড়াে নানিজান অনেক সম্পত্তি নাকি আমাকে আর লিলিকে দিয়ে গিয়েছেনকিন্তু তাতে আমার অবস্থার কোনাে পরিবর্তন হয় নি। 

অচিনপুর পর্ব (১৫)- হুমায়ূন আহমেদ

তাছাড়া সেসময়ে মি প্রেমেও পড়েছিলামঅচিনপুরের এই কাহিনীতে যে প্রেমের উল্লেখ না করলেও চলে, কারণ তার কোনাে ভূমিকা নেই এখানেতবে প্রচণ্ড পরিবর্তন হচ্ছিল আমার মধ্যেএইটুকু বলা আবশ্যক। 

নবু মামার স্কুল ফাইনালের রেজাল্ট হল তখনখুবই ভালাে রেজাল্টডিষ্ট্রিক্ট স্কলারশিপ বলে কীএকটা স্কলারশিপ পেলেনকলেজে ভর্তি হবার জন্যে টাকা পয়সা নিয়ে নবু মামা রওনা হলেননানাজানের ইচ্ছে ছিল, নবু মামা যেন আনন্দমােহন কলেজে ভর্তি হনকিন্তু নবু মামার ইচ্ছে প্রেসিডেন্সি কলেজ। 

নবু মামার বিয়ের তারিখ ঠিকই থাকলনবু মামা নিজেও এক দিন মেয়ে দেখে এলেনসফুরা খালা যখন বললেন, মেয়ে পছন্দ হয়েছে? নবু মামা ঘাড় নেড়ে সায় দিয়েছে। 

বারােই ভাদ্র তারিখে নবু মামা চলে গেলেনআর তেরই ভাদ্র বাদশা মামা শ্রীপুর থেকে আধপাগল হয়ে ফিরে এলেনআমি ভাসা ভাসা ভাবে শুনলাম, লাল মামী শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাবার নাম করে নবু মামার সঙ্গে চলে গিয়েছেন। 

কেউ যেন জানতে না পারে, সেই জন্যে বাদশা মামাকে ঘরে বন্ধ করে রাখাহলতাঁমাথার ঠিক নেই, কখন কাকে কী বলে বসেনছােট নানিজানের ফিটের ব্যারাম হয়ে গেলসফুরা খালাকে দেখে কোনাে পরিবর্তন নজরে পড়ে না, শুধু তাঁর চোখে কালি পড়েছেমুখ শুকিয়ে তাঁকে দেখায় বাচ্চা ছেলেদের মতাে। 

অচিনপুর পর্ব (১৫)- হুমায়ূন আহমেদ

নানাজান সেই বৎসরেই হজ করতে গেলেনযাওয়ার আগে সব সম্পত্তির বিলিবন্দোবস্ত হলবাদশা মামাকে সব লিখেপড়ে দিয়ে গেলেন। 

একটি প্রকাণ্ড প্রাচীন বটগাছ যেন চোখের সামনে শুকিয়ে উঠেছেসবুজ পাতা ঝরে যাচ্ছে, কাণ্ড হয়েছে অশক্তআমি তাই দেখছি তাকিয়ে তাকিয়েশৈশবের যে অবুঝ ভালােবাসায় নানাজানের বাড়িটিকে আমি ঘিরে রেখেছিলাম, সেই ভালােবাসা করুণ নয়নে চেয়ে আছে আমার দিকেকিন্তু আমি তাে এখানের কেউ নইএক দিন চুপচাপ চলে যাবকেউ জানতেও পারবে না, রঞ্জু নামের আবেগপ্রবণ ছেলেটি হঠাৎ কোথায় চলে গেল। 

এত বড়াে বাড়ি, অথচ এই জন মাত্র মানুষ আমরারাতের বেলা গা ছমছম করেমােহরের মা মাঝেমধ্যে চমকে ওঠে, ওটা কি গাে, মা, ভূত নাকি? গাছের পাতায় বাতাস লেগে সরসর শব্দ হয়| বাড়ির সব কিছুই বদলে গেছেলাল ফেজটুপিপরা নানাজান সূর্য ওঠার আগেই উঠোনের চেয়ারে এসে আর বসেন নাফাবিয়ায়ে আলা রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবানঘুমঘুম চোখে অর্ধজাগ্রত কানে কত বার শুনেছি এই সুরএখন সকালটা বড়াে চুপচাপ। 

অচিনপুর পর্ব (১৫)- হুমায়ূন আহমেদ

ভােরের আলােয় মনের সব গ্লানি কেটে যায়আমি চাই বাড়ির সবার মনের গ্লানি কেটে যাকনবু মামা ফিরে এসে আগের মতাে জোছনা দেখে উল্লাসে চিৎকার করুক : কী জোছনা, খেতে ইচ্ছে করে! সফুরা খালা ঠিক আগের মতাে লাঠি হাতে পাখি উড়ে গেলবলে সংসারের যাবতীয় দুঃখকষ্ট উড়িয়ে দিকবাদশা মামা তার সাজপােশাক পরে হিরণ্য রাজার পার্ট করুককিন্তু তা আর হবে না, তা হবার নয়আমি সংসারের মন্থর স্রোতে গা এলিয়ে দিলামকারাে সঙ্গেই আজ আমার যােগ নেইদিন কেটে যেতে লাগল

Leave a comment

Your email address will not be published.