অনীশ-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

অনীশ

আমার স্বামী বিরক্ত গলায় বললেন, ‘কী হল? এরকম করছ কেন? 

আমি নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করি। তিনি তিক্ত গলায় বলেন, ‘এইসব ঢং কবে বন্ধ করবে ? আর তাে সহ্য হয় না। মানুষের সহ্যের একটা সীমা আছে। 

জ্বিলা, সবুজ দেখা যায়। সবুজ জিনিস, চলন্ত অবস্থায় যেমন সবুজ, ধামন্ত অবস্থায়ও সবুজ! এইটা হইল আপনার সাধারণ কথা। 

মিসির আলি চিন্তিত মুখে বললেন, ‘সাধারণ ব্যাপারেও মাঝেমাঝে কিছু অসাধারণ জিনিস থাকে বজলু। সেই অসাধারণ জিনিস খুঁজে বের করতে আমার ভালাে লাগে। সারা জীবন তাই খুঁজেছি। কখনাে পেয়েছি কখনাে পাইনি। চলন্ত ট্রেন তােমাকে দেখতে বললাম কেন জান? 

‘জ্বি না।’ 

‘আমি লক্ষ করেছি উড়ন্ত টিয়া পাখি কালো দেখা যায়।

সবুজ রঙ গতির কারণে কালাে হয়ে যায় কি না, সেটাই আমার দেখার ইচ্ছা ছিল।’ 

‘উড়ন্ত টিয়া পাখি কালাে দেখা যায়, জানতাম না স্যার। 

‘আমিও জানতাম না। দেখে অবাক হয়েছি। আচ্ছা বজলু তুমি যাও, আমি এখন জরুরি একটা কাজ করছি। একটি মেয়ের সমস্যা নিয়ে ভাবছি। 

বজলু বলল, গৌরীপুর থাইক্যা ডাক্তার সাহেব আসছেন। আপনেরে দেখতে চান। 

এখন দেখা হবে না।’ আপনার মাথাধরার বিষয়ে কথা বলতে চান। এখন কথাও বলতে পারব না। আমি বাস্তু। অসম্ভব বস্তু। 

বজলু মানুষটার মধ্যে ব্যস্ততার কিছু দেখল না। কাত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। হাতে একটা খাতা। এর নাম ব্যস্ততা? বজলু মাথা চুলকে বলল, রাতে কী খাবেন স্যার? 

অনীশ-পর্ব-(১০)

‘চা খাব।’ 

‘ভাততরকারির কথা বলতে ছিলাম। হাঁস খাইবেন স্যার? অবশ্য বর্ষাকালে হাঁসের মাংসে কোনাে টেস্ট থাকে না। হাঁস খেতে হয় শীতকালে। নতুন ধান উঠার পরে। নতুন ধান খাওয়ার কারণে হাঁসের শরীরে হয় চর্বি~~~ 

‘তুমি এখন যাও বজলু। মিসির আলি খাতা খুললেন। 

আমার স্বামী এম এস ডিগ্রী করার জন্যে আজ সকালে টেক্সাস চলে গেলেন। টিচিং অ্যাসিস্টেন্টশিপ নিয়ে গেলেন। যাবার টিকিট আমি করে দিলাম। তিনি বললেন, ‘আমি ছ মাসের মধ্যে তােমাকে নিয়ে যাব। তুমি পাসপাের্ট করে রাখ। 

আমি বললাম, আমাকে নিতে হবে না। আমি ঢাকা ছেড়ে কোথাও যাব না।’ ‘ঢাকা ছেড়ে যাওয়াই তোমার উচিত।’ 

কোনটা আমার উচিত, কোনটা উচিত নয় তা আমি বুঝব।” তােমার হাজব্যান্ড হিসেবে আমারও বােঝা উচিত। অনেক বুঝেছি, আর না।’ ‘তুমি কি বলতে চাচ্ছ স্পষ্ট করে বল

যা বলতে চেয়েছি স্পষ্ট করেই বলেছি।’ ‘তুমি কি আমার সঙ্গে বাস করওে চাও না? 

আমি একটু সময় নিলাম। খুব বেশি না, কয়েক সেকেন্ড। এই কয়েক সেকেন্ডকেই মনে হল অনন্তকাল। তারপর তার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বললাম, ‘না।’ ‘কি বললে?’ বললাম, না। ‘ও, আচ্ছা।’ 

আমার স্বামীভদ্রলােক অনেকক্ষণ তাঁর মুখে বিস্ময়ের ভাব ধরে রাখলাে। তারপর আবার বললাে, ‘ও আচ্ছা। 

আমি বললাম, ‘আমি যে তােমার সঙ্গে বাস করতে চাচ্ছি না, তা কি তুমি বুঝতে পার নি? 

না, পারি নি।’ | আমি হাসলাম। তিনি বললাে, তােমার টাকাটা আমি পৌছেই পাঠিয়ে দেব। দেরি করব না।’ | ‘দেরি করলেও অসুবিধা নেই। নাপাঠালেও ক্ষতি নেই। আমার যা আছে তা 

আমার জন্যে যথেষ্ট। 

“তুমি কি আবার বিয়ে করবে? 

জানি না, করতেও পারি। করার সম্ভাবনাই বেশি। ‘যদি বিয়ে করবে বলে ঠিক করতাহলে অবশ্যই সেই ভদ্রলােককে আগেভাগে জানিয়ে দিও যে তােমার মাথার ঠিক নেই। তুমি অসুস্থ একজন মানুষ। 

অনীশ-পর্ব-(১০)

‘আমি জানাব।’ 

ঊনি চলে যাবার পর আমি পুরােপুরি একা হয়ে গেলাম। নিজেকে ব্যস্ত রাখার অনেক চেষ্টা করলাম। পুরনাে বন্ধুদের খুঁজে বের করে আড্ডা দিই। মহিলা সমিতিতে নাটক দেখি, বই পড়ি, রাতে কড়া ঘুমের অষুধ খেয়ে ঘুমুতে যাই। 

এক রাতের কথা, বিশ মিলিগ্রাম “ইউনেকট্রিন’ খেয়ে ঘুমিয়েছি। ঘুমের মধ্যেই মনে হল আমার ছেলেটা আমার পাশে শুয়ে আছে। তার গায়ের গন্ধ পাচ্ছি। সেই অদ্ভুত গন্ধ, যা শুধু শিশুদের গায়েই থাকে। একেকজনের গায়ে একক রকম গন্ধ, যা শুধু মায়েরাই আলাদা করতে পারেন। আমি ছেলেমাথায় হাত রাখলাম। মাথাভর্তি চুল।। রেশমের মতাে নরম কোঁকড়ানাে চুল।। | ঘুম ভেঙে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কোথাও কেউ নেই, থাকার কথাও নয়। স্বপ্ন তাে স্বপ্নই।

কিন্তু সেই স্বপ্ন এত স্পষ্ট। সত্যের এত কাছাকাছি? তৃষ্ণা পেয়েছিল। ঠাণ্ডা পানির জন্যে খাবার ঘরে গিয়েছি, ফ্রীজের দরজায় হাত রেখেছিআর ঠিক তখন শুনলাম আমার ছেলে আমাকে ডাকছেমা, মা।। | এতদিন শুধু কান্নার শব্দ শুনেছি। আজ প্রথম তাকে কিছু বলতে শুনলাম। আমার সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে গেল। মনে হল মাথা ঘুরে পড়ে যাবঅনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় ডাকলাম, ও খােকা। খােকা! তুই কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস? 

কী আশ্চর্য কাণ্ড, আমার ছেলে জবাব দিল! স্পষ্ট বলল, ভু। “তুই কোথায় খোকা? উ ‘ ‘খােকা তুই কোথায়? 

‘তুই কোথায়? আরেক বার আমাকে ডাকতাে! আর মাত্র একবা। আমার ছেলে আমাকে ডাকল“মা, মা। আমি সয্য করতে পারলাম না। অচেতন হয়ে পড়ে গেলাম। 

অনীশ-পর্ব-(১০)

আমি জানি এর সবটাই মায়া। একধরনের বিভ্রম। আমার মাথা এলােমেলাে হয়ে আছে। দুঃখেকষ্টেযন্ত্রণায় আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে পাগলা গারদে ঢুকিয়ে দেবে। একটা নির্জন ঘরে আটকা খাক। নিজের মনে হাস, কাঁদব। গায়ের কাপড়ের কোনাে ঠিক থাকবে না। অ্যাটেনডেন্টদের কেউ-কেউ আমার গায়ে হাত দিয়ে আনন্দ পাবে। আমার কিছুই করার থাকবে না। | এই সময় আমার এক বান্ধবী রেনুকা বলল, ‘বুড়ি, তুই ছবি করবি? আমার মামা ছবি বানাচ্ছেন। অল্পবয়সী সুন্দরী নায়িকা খুঁজছেন। তােকে দেখলে হাতে আকাশের চাঁদ পাবেন। তুই এত সুন্দর। 

আমি বললাম, ‘তাের ধারণা আমি সুন্দর?| সে বলল, ‘পৃথিবীর চারজন রূপবতীর মধ্যে তুই একজন। সেই চারজনের নাম শুনবি? তুই, তারপর হেলেন অব ট্রয়, কুইন অব সেবা, ক্লিওপেট্রা। তুই রাজি থাকলে মামাকে বলে দেখি।’ 

‘আমি তাে অভিনয় জানি না। 

বাংলাদেশি ছবিতে অভিনয় করার প্রথম এবং একমাত্র যােগ্যতা হচ্ছে অভিনয় নাজানা। তুই অভিনয় জানিস না শুনলে মামা আনন্দে লাফাতে থাকবে। করবি অভিনয় ? কর। ‘চল, এখনই তােকে মামার কাছে নিয়ে যাই। 

অনীশ-পর্ব-(১০)

প্রথম ছবি হিট করল। দ্বিতীয় ছবি হিট করল। তৃতীয়টা হল সুপার হিট। ছবি করা তাে কিছু না নিজেকে ব্যস্ত রাখা। ডাবল শিফট কাজ করি, অমানুষিক পরিশ্রম। রাতে ঘুমের অষুধ খেয়ে মড়ার মতাে ঘুমাই। অনেক দিন ছেলের কান্না শুনি না। কথা শুনি না, মনে হল আমার মনের অসুখটা কেটে গেছে। এতে আনন্দিত হবার কথা। তা হই না। আমার ছেলের গলা শােনার জন্যে তৃষিত হয়ে থাকি। তারপর একদিন তার কথা শুনলাম। ‘জায়া জননী’ ছবির ডাবিং হচ্ছে।

পর্দায় ঠোঁট নাড়া দেখে ভয়েস দেওয়া। একটা বাক্য কিছুতেই মেলাতে পারছি নাক্লোজআপে ধরা আছে বলে ফাঁকি দেবার উপায় নেই। ঠোঁট মেলানাের চেষ্টা করতে-করতে মহা বিরক্ত বােধ করছি। ডিরেক্টর বললেন, কিছুক্ষণ রেস্ট নাও রূপা, চা খাও। দশ মিনিট টী ব্রেক।’ | আমি আমার ঘরে চলে এলাম। নায়িকাদের জন্যে আলাদা একটা ঘর থাকে। সেখানে কারাে প্রবেশাধিকার নেই। আমি একাএকা চা খাচ্ছি। হঠাৎ আমাছেলের গলা শুনলাম। প্রায় দু’ বছর পর শুনছি, কিন্তু এত স্পষ্ট! এত তীব! আমার শরীর ঝনঝন করে উঠল। 

 

Read more

অনীশ-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *