অপেক্ষা পর্ব (১১)- হুমায়ূন আহমেদ

শুধু ইমন হাত দিয়ে ছুলেই এমন করে । যেন তার হাতে হাসির কোন ওষুধ আছে। ইমন নিজে যখন সুপ্রভার মত ছােট ছিল তখন সেও কি এরকম করতাে ? মা’কে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছে কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছে না। ছােট চাচাকে জিজ্ঞেস করতে হবে । 

অপেক্ষা

ইমন।’ ‘জ্বি মা। 

স্কুলে পড়াশােনা কেমন হচ্ছে ? ভাল।’ আকাশ ইংরেজী কি ? স্কাই। বানান কর।’ ‘এস কে ওয়াই। ‘আকাশ নীল ইংরেজী কি ? ‘দ্যা স্কাই ইজ ব্লু। 

মাঝে মাঝে যে আমি তােমার উপর খুব রাগ করি তখন কি মন খারাপ হয়? 

না।’ 

‘মিথ্যা কথা বলছ কেন ? যদি মন খারাপ হয় বলবে, মন খারাপ হয়। কি হয় ? 

হা হয়।’ ‘শােন, আমি নিজে নানান দুঃখ কষ্টে থাকিতাে এই জন্য এমন ব্যবহার করি । আদর করা কি জিনিস ভুলে গেছি। যে আদর পায় না, সে আদর করতেও পারে না। বুঝতে পারছ ? 

‘তােমার বাবাও কিন্তু আদর করতে পারত না। সব মানুষ সব কিছু পারে । তােমার বাবা কি ভাবে তােমাকে আদর করত মনে আছে ? 

না।’ ‘সে অফিস থেকে এসে তােমাকে কোলে নিয়ে পাঁচ মিনিট হাঁটাহাঁটি করত— এইটাই তার আদর। চুমু খাওয়া, কিংবা উপহার কিনে দেয়া 

এইসব তার স্বভাবে ছিল না। তুমি বড় হয়ে কার মত হবে তােমার বাবার মত হবে ? 

না। ‘তাহলে কার মত হবে ? ‘ছােট চাচার মত। 

অপেক্ষা পর্ব (১১)- হুমায়ূন আহমেদ

‘কেউ কারাে মত হতে পারে না। সবাই হয় তার নিজের মত । তুমি হাজার চেষ্টা করেও তােমার ছােট চাচার মত হতে পারবে না, কিংবা তােমার বাবার মত হতে পারবে না। সব মানুষই আলাদা। 

কচ্ছপ, কচ্ছপরাও কি আলাদা ? ‘হঠাৎ কচ্ছপের কথা এল কেন ? আর কোন কথা না, ঘুমাও। ‘আচ্ছা।’ 

‘ও ভালকথা, তােমার ছােট চাচা তােমাকে নিয়ে দেশের বাড়িতে বেড়াতে যেতে চায়। তুমি কি যেতে চাও? 

আনন্দে ইমনের কথা বন্ধ হয়ে গেল। তার ইচ্ছা করছে চিৎকার করে কেঁদে উঠতে। এমন চিঙ্কার যেন সুপ্রভারও ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভয় পেয়ে সেও যেন কাদতে থাকে। 

কথা বলছ না কেন, যেতে চাও না? চাই।’ 

একা একা যেতে ভয় লাগবে না?’ 

‘আমাকে ফেলে রেখে যাবে কষ্ট হবে না ? 

‘সেকি আমাকে, সুপ্রভাকে ফেলে চলে যাচ্ছ, কষ্ট হবে না ? ‘সুপ্রভার জন্যে হবে। ‘সুপ্রভাকে তােমার আদর লাগে ? 

“আচ্ছা অনেক কথা হয়েছে, এখন ঘুমাও। না-কি একটা গল্প শুনতে চাও ? 

ইমন গল্প শুনতে চাচ্ছে না, কিন্তু বুঝতে পারছে কোন একটা অদ্ভুত কারণে তার মা’র মন খুব ভাল। মা গল্প বলতে চাচ্ছেন। সেই অদ্ভুত কারণটা কি ? 

‘গল্প শুনতে চাও?’ ‘চাই।’ 

‘একদেশে ছিল এক রাজ কন্যা। রাজকন্যা ছিল বন্দিনী। তার জীবনটা কাটছিল চারদেয়ালের মধ্যে। তার মুক্তির একটাই পথ যদি কোন সাহসী রাজপুত্র বাঘের চোখ দিয়ে মালা গেঁথে রাজকন্যার গলায় পরিয়ে দেয় তবেই রাজকন্যা মুক্তি পাবে। গল্পটা কেমন লাগছে ইমন ? 

অপেক্ষা পর্ব (১১)- হুমায়ূন আহমেদ

ইমন ফিস ফিস করে বলল, “খুব ভাল লাগছে। আসলে গল্পটা তার মােটেই ভাল লাগছে না। বাঘের চোখের মালার কথা ভাবতেই তার ঘেন্না লাগছে। সে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে—অনেকগুলি বাঘ গভীর জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এদের কারােরই চোখ নেই। ভয়ংকর এক রাজপুত্র তাদের চোখ উপড়ে নিয়েছে । অন্ধ বাঘের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

ঘুমিয়ে পড়েছ ? না।’ 

তাহলে শােন-বন্দিনী রাজকন্যাকে উদ্ধারের জন্যে এক রাজপুত্র বের হল বাঘের সন্ধানে। তার খুব সাহস। সে দেখতেও খুব সুন্দর।’ 

‘মা তার নাম কি ? 

ও আচ্ছা, তার নামতাে বলা হয়নি। রাজপুত্র যেমন সুন্দর তার নামটাও খুব সুন্দর রাজপুত্রের নাম ইমন কুমার । নামটা সুন্দর না।’ 

ইমনের খুব লজ্জা লাগছে । রাজপুত্রের নাম আর তার নাম একই। ইমনের খুব ইচ্ছা করছে মা’র গায়ে হাত রেখে শুয়ে থাকতে। সেটা সম্ভব না মাঝখানে সুপ্রভা শুয়ে আছে । 

ইমন। 

বাবা ঘুমাও। আমার গল্প বলতে আর ভাল লাগছে না । 

সুরাইয়ার শুধু যে ভাল লাগছে না তা না, তার মনটাই খারাপ হয়ে গেছে। সে পুরােপুরি নিশ্চিত ছিল গল্পের মাঝখানে ইমন বলবে- মা, এই গল্পটা আমি জানি। তুমি অন্য গল্প বল । এই গল্প ইমনের বাবা ইমনকে বলেছিলেন। ছেলের সেই গল্পের কথা মনে নেই। বাবাকে এত দ্রুত সে ভুলে যাচ্ছে। এত দ্রুত ? 

অপেক্ষা পর্ব (১১)- হুমায়ূন আহমেদ

নিজেকে ইমনের খুব বড় মনে হচ্ছে। যেন হুট করে একদিনে অনেক বড় হয়ে গেছে। সে সবাইকে রেখে একা একা গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে। ছােট চাচা অবশ্যি সঙ্গে যাচ্ছেন তারপরেও সে একা একা যাচ্ছে—এটা ভাবা যায় ! ইমনের হাতে ছােট্ট ব্যাগ। ব্যাগে জামা কাপড় । টুথপেষ্ট, টুথব্রাস। একটা চিরুনী।

সুরাইয়া ছেলের হাতে দু’টা দশ টাকার নােট দিল । ইমন সেই নােট দুটা গম্ভীর ভঙ্গিতে সার্টের পকেটে নিল। সুরাইয়া বলল, খুব সাবধানে থাকবে। 

ইমন মাথা কাত করল। 

‘গ্রামে অনেক পুকুর-টুকুর আছে। সাবধান, একা একা পুকুরে যাবে না। জঙ্গল টঙ্গলেও যাবে না, সাপ খােপ আছে। মনে থাকবে? 

‘আচ্ছা তাহলে যাও। রাতে ছােট চাচার সঙ্গে থাকবে। বাথরুম পেলে তাকে জাগাবে গ্রামের বাথরুম দূরে হয় 

‘আচ্ছা।’ 

‘বাহ, আমাদের ইমন কুমারকেতাে খুব স্মার্ট লাগছে। কাছে এসাে কপালে চুমু খেয়ে দি। 

ইমন কাছে গেল। মা যখন কপালে চুমু খেলেন তখন হঠাৎ তার মনে হল- মা কে ছেড়ে সে থাকতে পারবে না। গ্রামের বাড়িতে না গেলেই সবচে ভাল হয়। ইচ্ছাটা হল খুব অল্প সময়ের জন্যে 

ট্রেনে উঠে ইমনের মনে হল সে শুধু বড় না, অনেক বড় হয়ে গেছে কারণ ছােট চাচা তার ট্রেনের টিকেট তার হাতে দিয়েছেন। টিকিট দেয়ার সময় বলেছেন- “হারাবি না, হারালে টিকেট চেকার ফাইন করে দেবে।” ইমনকে ছােট চাচার কোলে বসতে হল না। তার জন্যে জানালার কাছে আলাদা সীট। ছােট চাচা চা খেলেন, সেও খেলাে। ঠিক বড়দের মত আলাদা কাপে। ট্রেনের জানালা দিয়ে দৃশ্য দেখতে তার কি যে ভাল লাগছিল।

অপেক্ষা পর্ব (১১)- হুমায়ূন আহমেদ

মনে হচ্ছিল সে সারাজীবন ট্রেনে কাটিয়ে দিতে পারবে। এরমধ্যে ছােট চাচা বললেন- এই যে মিষ্টার হার্ড নাট । আমার ঘুম পাচ্ছে আমি ঘুমাব। তাের দায়িত্ব হচ্ছে ষ্টেশনের নাম পড়তে পড়তে যাওয়া । যখন দেখবি ষ্টেশনের নাম নান্দাইল রােড তখন আমাকে ডেকে তুলবি। ট্রেন স্টেশনে ঢুকতেই জানালা দিয়ে মাথা বের করে ষ্টেশনের নাম পড়া কি রােমাঞ্চকর ব্যাপার। 

গ্রামের বাড়ি দেখে ইমন আনন্দে অভিভূত হল। কি অদ্ভুত বাড়ি। টিনের চাল। ছােট ছােট জানালা। চারদিকে এত গাছপালা যেন মনে হয় জঙ্গলের ভেতর বাড়ি। একটা কুমড়াে গাছ বাড়িটার চালে উঠে গেছে। সেই গাছ ভর্তি কুমড়াে। উঠোনে সত্যিকার একটা মা ভেড়া চারটা বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। ইমন যখন তার সামনে দাঁড়াল ভেড়াটা একটুও ভয় পেল না। বাচ্চা ভেড়াদের একটা আবার এসে ইমনের গা শুকতে শুরু করল। 

বিষ্ময়ের উপর বিষ্ময় বাড়িতে দু’টা রাজ হাঁস । তারা গলা উঁচু করে কি গম্ভীর ভাবে হাঁটছে। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। ছােট চাচা অবশ্যি বললেন, রাজ হাঁস দু’টা খুবই ত্যাদড়। খবরদার কাছে যাবি না। কামড় দেয় । কি অদ্ভুত কথা, হাঁস আবার মানুষকে কামড় দেয়। হাঁস কি কুকুর না-কি যে কামড়াবে ? 

আকলিমা বেগম নাতীকে দেখে ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করলেন। কাদেন আর একটু পর পর বলেন, আমার ইমইন্যা আইছে।

Leave a comment

Your email address will not be published.