অমানুষ পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

অমানুষ পর্ব – ২

মুভিহল অন্ধকার হতেই এতরা চাচা তার কোমর জড়িয়ে ধরলেন। অ্যানি স্তম্ভিত হয়ে লক্ষ করল মাঝে মাঝে সেই হাত নিচে নেমে যাচ্ছে। এইসব কথা কাকে বলবে সে? মাকে? মা নিশ্চয়ই উলটো তার ওপর রাগ করবেন। কারণ এতরা চাচাকে মা খুব পছন্দ করেন। এটাও অ্যানির ভালো লাগে না। এতরা চাচা সময়ে অসময়ে আসে বাড়িতে। মা তাকে নিয়ে দক্ষিণে গেস্টহাউসে চলে যান। গেস্ট হাউসে গিয়ে দরজা বন্ধ করার কী মানে? এমন কী কথা তার সঙ্গে যা দরজা বন্ধ করে বলতে হয়?

ভিকি দেখল অ্যানি গম্ভীর হয়ে বসে আছে। সে হালকা স্বরে বলল, আমার মামণি এত গম্ভীর কেন? অ্যানি চাপাস্বরে বলল, এখানে চুপচাপ বসে থাকতে আমার ভালো লাগছে না বাবা। আমি স্কুলে যেতে চাই।খুব শিগ্‌গিরই যাবে মা।কবে? তোমার মা চাচ্ছেন তোমার জন্যে একজন বডিগার্ড রাখতে। এই ব্যাপারটি নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করছি। যদি না রাখলে চলে তা হলে তুমি এই হপ্তা থেকে যেতে পারবে। আর যদি রাখতে হয় তা হলে একটু দেরি হবে।

অ্যানি মুখ উজ্জ্বল করে বলল, বডিগার্ড রাখলে খুব মজা হবে বাবা।মজা কিসের? ঐ লোকটি কেমন বন্দুক-টন্দুক হাতে নিয়ে থাকবে। ভাবতেই আমার মজা লাগছে, বাবা।মামণি, এর মধ্যে মজার কিছু নেই। সমস্ত ব্যাপারটি হাস্যকর। খুবই হাস্যকর।আমার কাছে তো বেশ লাগছে বাবা। ভিকি কিছু বলল না। অ্যানি বলল, তুমি কি চা খাবে? চা আনব তোমার জন্যে? চা বানাতে পার তুমি?

হুঁ, খুব পারি।বেশ তো, খাওয়া যাক এক কাপ চা।অ্যানি হাসিমুখে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল। ভিকির একটু মন-খারাপ হল। অ্যানি এখানে খুব নিঃসঙ্গ। ভিকি তাকে সময় দিতে পারে না। রুনও পারে না। মেয়েটির কোনো সঙ্গীসাথি নেই।চা ভালো হয়েছে বাবা?

অমানুষ পর্ব – ২

চমৎকার হয়েছে।মনে হচ্ছে একটু বেশি কড়া হয়েছে।আমার কড়া চা পছন্দ।অ্যানি হাসিমুখে বলল, আমি যদি বলতাম চা বেশি হালকা হয়েছে তা হলে তুমি বলতে আমার হালকা চা পছন্দ–ঠিক না বাবা? তা ঠিক। ভিকি, অ্যানি দুজনেই গলা ছেড়ে হেসে উঠল।রেস্টুরেন্টটি ছোট কিন্তু শহরের নামী রেস্টুরেন্টগুলির মধ্যে এটি একটি। এতরা ইতালি শহরে সবচে ভালো প্রসকিউটু (কচি বছরের গোশত) রান্না করে–এ ধরনের একটা কথা চালু আছে।

ভিকি প্রসকিঊটু পছন্দ করে না, কিন্তু তবু এখানে এসেছে। কারণ এ রেস্টুরেন্টটি এতরার খুব প্রিয়, সে প্রায় রোজই এখানে লাঞ্চ খেতে আসে।ভিকি বেশ খানিকক্ষণ বসে থাকবার পর এতরা এসে উপস্থিত। চমৎকার একটা নীল রঙের শার্টের উপর হালকা গোলাপি একটা টাই পরেছে এতরা। কে বলবে এই লোকটির বয়স চল্লিশের ওপর।

দেরি করে ফেললাম নাকি, ভিকি?

না, খুব দেরি না।

লাঞ্চের অর্ডার দিয়েছ?

এখনও দিইনি। কী খেতে চাও তুমি?

এতরা হাসিমুখে বলল, আমরা বাধা মেনু ভিটেলো টনাটু, প্রসকিউটু এবং এক বোতল বারগুল্ডি।বারগুভির গ্লাসে চুমুক দিয়ে এতরা ফুর্তিবাজের ভঙ্গিতে বলল, এখন বলো, তোমার সমস্যাটা কী? ভিকি ইতস্তত করতে লাগল। নিজের সমস্যা অন্যের কাছে বলতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু এতরার যত দোষই থাকুক, ওর মাথাটা খুব পরিষ্কার। তা ছাড়া, ওর ভালো কানেকশন আছে। প্রচুর লোকজনের সঙ্গে ওর চেনাজানা।

অমানুষ পর্ব – ২

কী ব্যাপার, চুপ করে আছ যে? বলো।

তুমি বোধহয় জান না আমার ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ যাচ্ছে।

ঠিক জানি না বললে ভুল হবে। তবে কতটা খারাপ তা জানি না।

বেশ খারাপ।

এত খারাপ হল কী করে?

ভিকি জবাব দিল না।

এতরা বলল, আমার কাছে ঠিক কী পরামর্শ তুমি চাও?

আমার যা দরকার তা হচ্ছে মোটা অঙ্কের কিছু টাকা

মোটা অঙ্কের টাকা জোগাড় করা তোমার জন্যে কঠিন হবার কথা নয়। তোমার স্ত্রীর প্রচুর টাকা আছে।আমি ওর কাছে হাত পাততে চাই না।

বুঝলাম। স্ত্রীর কাছে হাত না পাতাই ভালো, তাতে দাম কমে যায়।এতরা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি ব্যাংকে চেষ্টা করেছ? তোমার যা নামডাক তাতে ব্যাংক থেকে সহজেই মোটা টাকা লোন পাবে। ভরাডুবি না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংক তোমাকে টাকা দেবে। তুমিও সেটা জান, জান না? ভিকি উত্তর দিল না। এতরা বলল, তুমি কি চেষ্টা করেছ?

বিশেষভাবে করিনি।তা হলে করো। টাকার সমস্যা কোনো সমস্যা নয়। অন্তত তোমার জন্যে নয়। তুমি চাইলে আমি দুএকজন ব্যাংকারের সাথে কথা বলতে পারি। অবিশ্যি আমি তার কোনো প্রয়োজন দেখি না। তোমাকে সবাই চেনে।আমাকে না। আমার বাবাকে চেনে।একই কথা। তোমার বাবাকে চিনলেই তোমাকে চেনা হয়। এখন বলো, তোমার আসল প্রবলেম কী? তোমার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে তোমার মনে আরোকিছু আছে।ভিকি আরেকটা বারগুরি অর্ডার দিয়ে চুপ করে রইল। যেন ভাবছে সমস্যাটি বলা ঠিক হবে কি না?

চুপ করে আছ কেন, বলে ফ্যালো।ভিকি দীর্ঘ সময় নিয়ে বডিগার্ডসংক্রান্ত সমসাটি বলল। এতরা হাসিহাসি মুখে শুনল। তার ভাব দেখে মনে হল, সে খুব মজা পাচ্ছে। ভিকি বলল, এখন বলো, আমার কী করা উচিত।একটা বডিগার্ড রাখো। এই একমাত্র সমাধান।

অমানুষ পর্ব – ২

ভিকি বড় বিরক্ত হল। এতরা এই কথা বলবে সে ভাবেনি। তার ধারণা ছিল বডিগার্ড রাখার হাস্যকর দিকটি এতরার চোখে পড়বে। এতরা একটি সিগারেট ধরিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, বডিগার্ডের ব্যাপারটি এখন রুনের একটি প্রেস্টিজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুনকে আমি যতটুকু জানি তাতে মনে হচ্ছে বডিগার্ড না রাখা পর্যন্ত সে শান্ত হবে না। একজন বুদ্ধিমান স্বামীর প্রধান কাজ হচ্ছে স্ত্রীকে শান্ত রাখা।কিন্তু এত টাকা আমি পাব কোথায়?

রীতিমতো প্রফেশনাল লোক রাখলে অনেক টাকা লাগবে, বলাই বাহুল্য। কিন্তু তোমার তো আর প্রথম সারির লোকের প্রয়োজন নেই, ঠিক না? ঠিক।কাজেই কোনোরকম একজন কাউকে কয়েক মাসের জন্যে রেখে দাও। রুন শান্ত হলেই ছাড়িয়ে দাও, ব্যস চুকে গেল।এরকম লোক কোথায় পাওয়া যায়?

এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করলেই পাওয়া যাবে। আমার ওপর ছেড়ে যাও। আমি জোগাড় করে দেব। আগামী হপ্তায় তুমি তোমার বডিগার্ড পাবে। ঠিক আছে? ভিকি কিছু বলল না। এতরা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আর কোনো সমস্যা আছে? থাকলে বলে ফেলো।না, আরকিছু নেই।

তা হলে এই কথা রইল। সোমবার তুমি বডিগার্ড পাবে। এখন তা হলে উঠি। চমৎকার লাঞ্চের জন্যে ধন্যবাদ। আর শোনো ভিকি, তুমি মুখ এমন হাঁড়ির মতো করে রাখবে না। একটু হাসো। তোমাকে দেখে মনে হয় তুমি গভীর সমুদ্রে পড়েছ।এতরা বেরিয়ে গেল। ভিকি নিজের মনে বলল, আমি গভীর সমুদ্রেই পড়েছি। অতলান্তিক জলে।এতরা তার কথা রাখল। হপ্তা শেষ হবার আগেই একজন বিদেশী মানুষ এসে হাজির।তোমার সঙ্গে বন্দুক আছে?

হ্যাঁ।

দেখাতে পার?

লোকটি জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা ছোট রিভলভার বের করল। ভিকি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল সেটার দিকে।

কী নাম এটির?

বেরেটা ৪৮।

ভিকি শিশুর মতো আগ্রহে রিভলবারটি হাতে তুলে নিল। কী সুন্দর। ছিমছাম! ছোট্ট একটি জিনিস।

এর লাইসেন্স আছে?

আছে।

এর মধ্যে কি গুলি ভরা আছে?

আছে।

তুমি এইজাতীয় রিভলভার আগে ব্যবহার করেছ?

করেছি।

কী সর্বনাশ! তুমি আগে বলবে তো?

অমানুষ পর্ব – ২

ভিকি সাবধানে রিভলভারটি নামিয়ে রাখল। শুকনো গলায় বলল, তোমার কাগজপত্র কী আছে দেখি।লোকটি কাগজপত্রের একটা চামড়া-বাঁধানো ফাইল নামিয়ে রাখল। ভিকি প্রথমবারের মতো পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল লোকটির দিকে।লোকটি ইতালিয়ান নয়। বিদেশী। গায়ের চামড়া কালো। পুরু ঠোঁট। বড় বড় চোখ। অদ্ভুত একধরনের কাঠিন্য আছে। কোথায় সে কাঠিন্যটি তা ধরা যাচ্ছে না। ভিকি নিচুস্বরে বলল, তুমি কি কখনো মানুষ মেরেছ?

হা।

ভিকির গা শিরশির করে উঠল।

কতজন মানুষ মেরেছ?

এর উত্তর জানা কি সত্যি প্রয়োজন?

না-না, উত্তর না দিলেও হবে। এমনি জিজ্ঞেস করলাম।

ভিকি ফাইল খুলল। নাম : জামশেদ হোসেন। বয়স : ৫৫

ভিকি অনেকক্ষণ নামটির দিকে তাকিয়ে রইল। কী অদ্ভুত নাম।

তোমার দেশ কোথায়?

ফাইলে লেখা আছে। ফাইল খুললেই পাবে।

হ্যাঁ লেখা আছে ফাইলে। পরিষ্কার সব লেখা। লোকটি কথাবার্তা বেশি বলতে চায় না। এটা ভালো। বডিগার্ড এরকমই হওয়া উচিত। ভিকি পড়তে শুরু করল।জাতীয়তা : বাংলাদেশী।সেটি আবার কোন দেশ? ইন্ডিয়া ও বার্মার মাঝামাঝি ছোট্ট একটা দেশ।তোমার পাসপোর্ট আছে? ইতালিতে যে আছ তার কাগজপত্র আছে? আছে।কী ধরনের কাগজপত্র

লোকটি গম্ভীর স্বরে বলল, আমি ফ্রেঞ্চ লিজিওনে দীর্ঘদিন ছিলাম। তারপর কিছুদিন ছিলাম ইতালিয়ানদের সঙ্গে জিরাল্ডায়, আলজিয়ার্সে। আমার কাগজপত্র সেই সূত্রে পাওয়া।ভিকি অবাক হয়ে বলল, আলজিয়ার্সে কিসে ছিলে? ফার্স্ট প্যারাট্রপ রেজিমেন্টে।বল কী! তুমি বাংলাদেশের লোক হয়ে লিজিওনে ঢুকলে কী করে? লোকটি জবাব দিল না। ভিকি বলল, লিজিওনে ঢোকার আগে তুমি কোথায় ছিলে?

অমানুষ পর্ব – ২

অনেক জায়গায় ছিলাম। আমি একজন ভাড়াটে সৈনিক, মিঃ ভিকি। যে পয়সা দিয়েছে আমি তার জন্যেই যুদ্ধ করেছি। আমি কোথায় ছিলাম, কী ছিলাম সেসব জিজ্ঞেস করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আমাকে যদি তোমার পছন্দ হয় তা হলে রাখতে পার। পছন্দ না হলে বিদেয় হব।

ভিকি অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। এতরা এই লোকটিকে পাঠিয়েছে। কিন্তু মনে হচ্ছে ঠিক লোক পাঠায়নি। অবস্থা যা তাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এই লোক খাঁটি পেশাদার লোক।ভিকি নিঃশব্দে কাগজপত্র পড়তে লাগল।অসাধারণ লিজিওনারি হিসেবে তাকে পরপর দুবার অর্ডার অব ভেলর দেয়া হয়।

ভিকি বড়ই অবাক হল। এতরা এই লোকটিকে পাঠানোর আগে আরো দুজনকে পাঠিয়েছিল। ভিকি তাদের সঙ্গে একটি কথা বলেই বিদেয় করে দিয়েছে। সে দুজন রাস্তার গুল্ডা ছাড়া কিছুই না। কেউ জীবনে কখনো বন্দুক ধরেছে কি না সে সম্পর্কেও সন্দেহ আছে। বডিগার্ড হিসেবে ওদের রাখলে রুন রেগে আগুন হত, বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই লোকটি অদ্ভুত। ভিকি বলল, তুমি কি কফি খাবে?

না।খাও-না! খাও। ভালো কফি।লোকটি চুপ করে রইল। ভিকি কফি আনতে বলে নিচুস্বরে জানাল, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। কিন্তু একটি কথার জবাব দাও। এত কম টাকায় তুমি কাজ করতে রাজি হচ্ছ কেন? লোকটি কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, মিঃ ভিকি, আমি একজন অ্যালকোহলিক। বডিগার্ড হিসেবে আমার কোনোই মূল্য নেই এখন। বয়স হয়েছে। শরীর নষ্ট হয়ে গেছে।ভিকি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।মিঃ এতরা আমাকে বলেছেন তোমার যেনতেন একজন লোক হলেই চলে। প্রফেশনাল লাগবে না।

অমানুষ পর্ব – ২

তা ঠিক। আসলে আমার স্ত্রীর চাপে পড়েই একজন বডিগার্ড রাখতে হচ্ছে। আমার মেয়েকে কিডন্যাপ করার কোনো কারণ নেই। স্ত্রীদের চাপে পড়ে আমাদের অনেক কিছুই করতে হয়। ভালো কথা, তুমি কি বিবাহিত।না।ভালো, খুব ভালো।লোকটি নিঃশব্দে কফি খেয়ে যাচ্ছে। ভিকি বলল, ইয়ে, তুকি কি বড়রকমের অ্যালকোহলিক?

না।

মাতাল হয়ে যাও?

না।

আরেকটি কথা তোমাকে বলা দরকার। এমন হতে পারে যে তিনমাস পর তোমাক আমার দরকার হবে না। এতরা নিশ্চয়ই তোমাকে বলেছে সেটা? হ্যাঁ, বলেছে।আরেকটি কথা। তোমাকে রাখব কি না সেটি নির্ভর করছে আমার স্ত্রীর ওপর। বুঝতেই পারছ, ওর জন্যেই তোমাকে রাখা।বুঝতে পারছি।চলো, আমার স্ত্রী সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই। অবিশ্যি তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। বেশ পছন্দ হয়েছে। তোমার নামটি যেন কী?

জামশেদ। জামশেদ হোসেন।

অদ্ভুত নাম। এর অর্থ কী?

আমার জানা নাই।

 

Read more

অমানুষ পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.