বড় রাস্তায় দুটি চায়ের দোকান ভোলা পাওয়া গেল। একটিতে ইংরেজি গানের ক্যাসেট বাজানো হচ্ছে। জলিল সাহেব গানের দোকানটিতেই বসলেন। চা খাওয়া শেষ হওয়ার পরও বসে রইলেন। সোবাহান বলল, যাবেন না? আরে বসেন না, গান শুনি। বাড়িতে গিয়ে তো সেই ঘুমাবেন। ভালোই লাগছে তো গান শুনতে। লাগছে না?
সোবাহান কিছু বলল না।বেঁচে থাকতে হলে আনন্দ দরকার। চা খাবেন আরেক কাপ? জি-না।দৈ খাবেন? খান, পয়সা আমি দেব।জি-না। আমি উঠব, ঘুম পাচ্ছে। আপনি কি আরও কিছুক্ষণ বসবেন? বসি কিছু সময়। ঘরে গিয়ে করবটা কী? জলিল সাহেব আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে গানের তালে মাথা নাড়তে লাগলেন। যেন খুব মজা পাচ্ছেন।
সোবাহানের মনে হলো–বেচারাকে ফেলে আসাটা ঠিক হয়নি। আরও খানিকক্ষণ বসলেই হতো। ঘরে গিয়ে তো ঘুমানো যাবে না। দরজা খুলবার জন্যে জেগে থাকতে হবে। তিনি কখন আসবেন তারও ঠিক নেই। দোকান বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত বসে থাকবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই।নামাজঘরটি ফরিদ আলির পছন্দ হয়েছে।একটি মাত্র দরজার গোলাকার ছোট্ট ঘর। মেঝে মোজাইক করার ইচ্ছা ছিল—টাকার টান পড়ে গেল। তাতে ক্ষতি হয়নি। কালো সিমেন্টের প্রলেপে ভালোই লাগছে দেখতে।
ঘরের ভেতরটা দিনের বেলাতেও অন্ধকার। অন্ধকার বলেই রহস্যময়। উপাসনার ঘর রহস্যময় হওয়াই তো উচিত। বসতবাড়ি থেকে পঞ্চাশ গজের মতো দূরে। এটাও ভালো। সংসারের কোলাহল থেকে দূরে থাকাই ভালো।ফরিদ আলি সমস্ত দুপুর সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে ঘরের মেঝে পরিষ্কার করলেন। তার বাড়ির কামলা রোস্তম বলল, আমি সাফ কইরা দেই বড় মিয়া? ফরিদ আলি বললেন, না। এই ঘরে আমি ছাড়া কেউ ঢুকবে না।রোস্তম তাকাল অবাক হয়ে।নির্জনে আল্লাহ খোদার নাম নিতে চাই রোস্তম। নির্জনেই আল্লাহকে ডাকা উচিত। উচিত না?
জি উচিত।সন্ধ্যাবেলা ফরিদ আলি ভেতরবাড়িতে অজু করতে গেলেন। অজুর পানি দিতে দিতে পারুল বলল, আপনের সাথে আমার কথা আছে।ফরিদ আলির কপালে ভাঁজ পড়ল। পারুল তাকে তুমি করে বলত। এখন আপনি করে বলছে। রোজই ভাবেন জিজ্ঞেস করবেন–এর কারণটি কী? জিজ্ঞেস করা হয় না। লজ্জা লাগে। ফরিদ আলি অজু শেষ করে বললেন, বলো কী বলবে?
নামাজ শেষ কইরা আসেন তারপর বলি।না, এখনই বলো। নামাজ শেষ করে আমি আজ আর বাড়ি ফিরব না। রাত কাটাব নামাজঘরে।কেন? ইবাদত বন্দেগি করব। ঘর তো সেজন্যেই বানালাম।ভিতরের বাড়িতে ইবাদত বন্দেগি করা যায় না? গণ্ডগোল হয়। মনে বসে না। বলো, তুমি কী বলতে চাও?
অন্যদিন বলব। আপনের নামাজের সময় হইছে। নামাজ পড়তে যান।ফরিদ আলি বাংলাঘরে গিয়ে দেখেন নামাজ পড়ার জন্যে অনেকেই বসে আছে। তিনি বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, আজ থেকে একা একা আল্লাহকে ডাকবেন।সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।আপনারা কিছু মনে করবেন না।জি-না জি-না। তবে আপনার দু’একটা কথা শুনতে বড় ভালো লাগে। মনে শান্তি হয়।প্রতি বৃহস্পতিবার মাগরেবের পর আপনাদের সাথে কথা বলব।
জি আচ্ছা। জি আচ্ছা।আর বলবই বা কী বলেন? আমি কী জানি? কিছুই জানি না। বোকার মতো যা মনে আসে বলি। আল্লাহর কাছে গুনাগার হই।সমবেত মুসল্লিরা অভিভূত হয়ে পড়ে। তারা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। ফরিদ আলি নামাজঘরে ঢুকে পড়েন। ঘরের রহস্যময় আলো-আঁধার তাঁর বড় ভালো লাগে।ভেতরবাড়িতে ফিরতে ফিরতে তাঁর রাত দশটা বেজে যায়।
পারুল ভাত বেড়ে দেয়। তরকারি গরম করে আনে। ভাত মাখতে মাখতে ফরিদ আলি নিচুস্বরে কথা বলেন, কী যেন বলতে চেয়েছিলে?তেমন কিছু না। আপনে ভাত খান। ডাইল নেন।বলার থাকলে বলো।পারুল অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, আপনে আরেকটা বিয়া করেন। সংসারে ছেলেপুলে আসলে মনে শান্তি আসে।আমার মনে শান্তি আছে।না, শান্তি থাকলে মানুষ এই রকম করে না।কী করলাম আমি?
বিষয়সম্পত্তি বিক্রি করতেছেন। এইসব আপনের একার না। সোবাহানের অংশও আছে।সোবাহানকে জিজ্ঞেস করেছি।আপনে জিজ্ঞাস করলে সে না বলবে না। তবু এইটা উচিত না।ফরিদ আলি গম্ভীর মুখে বললেন, আমি ধর্মকর্ম করি এটা চাও না তুমি? ধর্মকর্ম নিয়া আপনি বাড়াবাড়ি করেন এইটা ঠিক না। মানুষের সংসারি হওয়া লাগে। আপনার উপর দায়িত্ব আছে।কী দায়িত্ব?
সোবাহানের বিয়া দিবেন না?
তার বিয়ে ঠিক করে এসেছি। ওই নিয়ে চিন্তা করবার কিছু নাই। সব ঠিক আছে।
পারুল বিস্মিত হয়ে বলল, কোন জায়গায় ঠিক করলেন?
ঢাকায়। মেয়ের নাম যূথি। ভালো মেয়ে।
সোবাহান মেয়ে দেখছে? সে রাজি আছে?
রাজি অরাজির কী আছে? আল্লাহর ইচ্ছা থাকলে ওইখানে বিয়ে হবে। ইচ্ছা না থাকলে হবে না।
ওই মেয়ের কথা তো আমাকে কিছু বলেন নাই।
এই তো বললাম। আর কী জানতে চাও?
ফরিদ আলি উঠে পড়ে শান্তস্বরে বললেন, আজ রাতটা আমি নামাজঘরে কাটাব।ওইখানেই ঘুমাবেন? না, ঘুমাব না। এবাদত বন্দেগি করব।রাতে আর ফিরবেন না? ফজরের নামাজের শেষে ফিরব। আমাকে একটা পান দাও।পারুল পান এনে দিল। ফরিদ আলি বিছানায় আধশোয়া হয়ে পান খেলেন। পারুল কিছুই বলল না।নামাজঘরে ঢোকবার আগে ফরিদ আলি সোবাহানকে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখলেন।
তাঁর মনে আজ খুব আনন্দ। চিঠি লিখতে লিখতে তাঁর গভীর আবেগ উপস্থিত হলো। বেশ কয়েকবার তাঁকে চোখ মুছতে দেখা গেল। পারুল তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে। দীর্ঘ দিনের চেনা লোক কত দ্রুতই না অচেনা হয়ে যাচ্ছে! ফরিদ আলি চোখ তুলে তাকালেন। শান্তস্বরে বললেন, কী দেখছ? না, কিছু না।একটা চিঠি দিলাম সোবাহানকে। বিয়ের কথাটা লিখলাম। ওর বিয়ে হয়ে গেলে আমার একটা দায়িত্ব শেষ হয়। অজুর পানি দাও। অজু করে চলে যাব।রাতে আসবেন?
না।ফরিদ আলি উঠানে বসে অনেক সময় নিয়ে অজু করলেন। উঠানে ফকফকা জ্যোৎস্না। দেখতে খুব ভালো লাগে। পারুল দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখে। তাকে নতুন বিয়ে হওয়া কিশোরীর মতো লাগে।প্রায় চৌদ্দ বছর হলো তাদের বিয়ে হয়েছে। পনেরোও হতে পারে। এত দীর্ঘ সময় তারা একসঙ্গে আছে এটা মনেই থাকে না। পারুলকে এখনো অচেনা লাগে।
বেলা এগারোটায় সোবাহান বুলুদের বাসার কড়া নাড়ল। আজ যে ছুটির দিন এটা সোবাহানের মনে ছিল না। বেকার যুবকরা দিনের হিসাব ঠিকমতো রাখতে পারে না। ছুটির দিনে বুলুদের বাসায় গেলে বুলু খুব রাগে। আজও নির্ঘাৎ রাগবে। দরজা খুললেন বুলুর মামা। ভদ্রলোক মিউনিসিপ্যালিটিতে কেরানিগিরি করেন। এত অল্প বেতনের চাকরিতেও তিনি কী করে এমন বিশাল একটি শরীর বানিয়েছেন কে জানে। বাংলাদেশী কিংকং। পালোয়ানদের মতো মাথাটা পর্যন্ত কামানো। সোবাহান কাঁচুমাচু মুখে বলল, বুলু আছে?
আছে। কেন?
একটু দরকার ছিল।
মামা বিরক্ত স্বরে ডাকতে লাগলেন, এই বুলু! বুলু!
বুলুর সাড়া পাওয়া গেল না।
ওর জ্বর, শুয়ে আছে বোধহয়। অন্য আরেকদিন এসো। নাকি কোনো বিশেষ দরকার? বিশেষ দরকার। একটা চাকরির ব্যাপারে।আর চাকরি–ওর কপালে চাকরি ফাঁকরি নাই। যাও ভেতরে চলে যাও। বুলুর ঘর চেনো তো? চিনি।বুলু চাঁদর গায়ে বিছানায় পড়ে ছিল। দাড়ি গোঁফ গজিয়ে সন্ন্যাসীর মতো লাগছে। সে বিরক্ত গলায় বলল, কতদিন বলেছি ছুটির দিনে আসবি না।
তোর কী হয়েছে? জন্ডিস।কতদিন হলো? তা দিয়ে কী করবি? ওইদিন অসুখ শরীরে খবর দিয়ে এলাম–তুই একটা খোঁজ তো নিবি! কী ব্যাপার! কী ব্যাপার? বুলু জবাব দিল না। গম্ভীর হয়ে রইল।সোবাহান সিগারেট বের করল। বুলু বিরক্ত মুখে বলল, সিগারেট ধরাস না।কেন? মামা রাগ করে।রাগ করার কী আছে? বত্রিশ বছর বয়স হয়েছে এখনো সিগারেট খেতে পারবি না?
আস্তে কথা বল। সিগারেট খেতে হলে বাইরে গিয়ে খেয়ে আয়।আমি উঠলাম। যেদিন মামা থাকবে না সেদিন আসব।আরে বস বস। কথা আছে। চায়ের কথা বলে আসি।সোবাহান চমকাল। এটা নতুন কথা। বুলু কাউকে চা খেতে বলে না। মোড়ের চায়ের দোকানে নিয়ে যায়। বুলু ফিরে এসেই শুয়ে পড়ল। নিস্পৃহ গলায় বলল, চা আসছে। মামিকে বলে এসেছি।ব্যাপার কী? রাজার হালে আছিস মনে হয়। চাকরি হয়েছে নাকি?
এখনো হয় নাই। হবে। শিগগিরই হবে।
বলিস কী! কোথায়?
পিডিবিতে।
ম্যানেজ করলি কীভাবে?
ঘুষ। সাত হাজার দিয়েছি। দশ হাজার চেয়েছিল।
পেলি কোথায় এত টাকা? মাই গড!
বুলু গম্ভীর হয়ে গেল। চা দিয়ে গেল ওদের কাজের মেয়ে। কাপে কাঁচা মাছের গন্ধ। এক চুমুক খেয়েই সোবাহান কাপ নামিয়ে রাখল। বমি আসছে।
চা খাবি না?
না, মাছের গন্ধ।
বুলু কিছু বলল না। তার মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। চোখের বর্ণ হলুদ। মাথার চুলও মনে হয় পড়ে গেছে। ফাঁকা ফাঁকা লাগছে মাথা।তোর কি টাক পড়ে যাচ্ছে নাকি?
হুঁ। বাবার টাক ছিল। পৈতৃকসূত্রে পাওয়া। টাকাপয়সা কিছু পাই নাই। এটাই পেয়েছি।ঘুষের টাকা জোগাড় করলি কীভাবে? বুলু গলার স্বর দুধাপ নামিয়ে ফেলে বলল, রেশমা দিয়েছে।বলিস কী? হুঁ। চার হাজার টাকা সোনার ভরি। তিন গাছি চুড়ি দিয়েছে। একেকটা একেক ভরি। ভরিতে পাঁচ আনা করে খাদ কেটে ন’হাজার টাকা হয়েছে।
বাকি দু’হাজার টাকা কী করলি?
করব আবার কী, আমার কাছেই আছে।
তোর মামা এসব জানে না?
নাহ।
রেশমার কাছে টাকা চাইতে লজ্জা লাগল না? নাহ্। তুই এখন যা সোবাহান। মাথা ঘুরছে। শুয়ে থাকব খানিকক্ষণ।সোবাহান তবুও বসে রইল। বুলুর এখানে আসা হয় না। অনেকটা দূর। এসেই চট করে চলে গেলে পোষায় না। একটার দিকে সোবাহান বলল, চায়ের দোকানে যাবি নাকি?
আরে না। আমার উঠার শক্তি নাই। তুই এখন যা। নাকি পয়সার দরকার? লজ্জা করিস না, বল।না।দরকার থাকলে বল। ওই দু’হাজার টাকা থেকে দেব। এক মাসের মধ্যে ফেরত দিতে হবে। ওটা আমার বিয়ের টাকা। চাকরি হলেই বিয়ে করব।চাকরি হবে কবে নাগাদ?
বারো তারিখে ইন্টারভ্যু। সামনের মাসের এক তারিখে জয়েন করতে হবে।
বিয়ে কি সামনের মাসেই হবে?
হুঁ। কি, তোর লাগবে কিছু?
নাহ্।
লজ্জা করিস না।
রেশমা আছে কেমন?
ভালোই আছে।
তোর অসুখের খবর জানে?
নাহ্।
যদি চাস তো খবর দিয়ে আসতে পারি।
কী হবে খবর দিয়ে। খামাখা দুশ্চিন্তা করবে। সোবাহান, আজ তুই বাড়ি যা, কথা বলতে ভালো লাগছে না।
বাড়ি কোথায় যে যাব?
অন্য কোথাও যা। অন্যদের বিরক্ত কর।
ঘরের ভেতর থেকে মামার হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। ঝনঝন করে কিছু একটা ভাঙল। বাচ্চা একটা মেয়ে কাঁদতে শুরু করল। বুলু মৃদুস্বরে বলল, মামার রাগ উঠে যাচ্ছে। উঠ সোবাহান, আর না। আবার ঝন ঝন করে কিছু একটা ছুঁড়ে ফেলা হলো। মামার গলা শোনা গেল–সব কয়টাকে খুন করে ফেলব। পাগল বানাতে বাকি রেখেছে। উফ! সোবাহান নিচুস্বরে বলল, এরকম রোজ হয় নাকি?
রোজ হয় না, মাঝে মাঝে হয়। আমি বাজারে যেতে পারছি না। তাই রাগ উঠে গেছে।রাগ কতক্ষণ থাকবে? কিছু একটা না-ভাঙা পর্যন্ত থাকবে। তুই এখন উঠ প্লিজ।চিকিৎসা করাচ্ছিস, না শুয়ে আছিস শুধু? শুয়েই আছি। জণ্ডিসের কোনো চিকিৎসা নেই।অড়হড়ের পাতা সিদ্ধ করে রস খা।অড়হড়ের পাতা পাব কোথায়! যত ফালতু বাত। উঠ তো।
বুলু রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এল। ক্লান্তস্বরে বলল, আর যাব না। হাঁটতে পারছি না। তুই এক কাজ কর, এই দুপুরে না খেয়ে যাবি কী। হোটেলে ভাত খেয়ে যা। পয়সা দিতে হবে না। বাকিতে খা, আমি পরে দিয়ে দেব।দরকার নাই।
দরকার আছে। তুই যা। খাসির মাথা আর ডাল আছে। খারাপ না, ভালোই। আয় আমার সাথে, আমি বলে দেই–বিসমিল্লাহ হোটেল।বুলু সোবাহানকে হোটেলে বসিয়ে চলে গেল। এই হোটেলে বুলু প্রায়ই খায়। বাসা ফেলে তাকে হোটেলে কেন খেতে হয় কে জানে! সোবাহান দু’টার দিকে হোটেল থেকে বেরুল। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। ছুটির দিন অফিস টফিস বন্ধ, নয়তো যে সব বন্ধুরা ঢাকায় চাকরি বাকরি করছে তাদের কাছে যাওয়া যেত।
উত্তরা ব্যাংকের নিউ মার্কেট ব্রাঞ্চে আছে সফিক। তার কাছে গেলেই সে চা নাশতা খাওয়াবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফেরার পথে জোর করে পাঁচ টাকার একটা নোট পকেটে ঢুকিয়ে দেয়–এটা নাকি তাকে দেখতে আসার ফি। সফিক এটা যে শুধু সোবাহানের জন্যে করে তাই না, সবার জন্যে করে। সব বেকার বন্ধুদের জন্যে এই ব্যবস্থা। এ জন্যেই সফিকের কাছে যেতে ইচ্ছে করে না।আবার উল্টো ধরনের চরিত্রও আছে। মতিঝিলের করিম।
যে বেশ কিছুদিন ধরেই অফিস ম্যানেজার না কী যেন হয়ে বসে আছে। গরমের মধ্যে তাকে সার্ট ও টাই পরতে হয়। করিম এদের কাউকে দেখলেই বিরক্ত হয়ে বলে–কতদিন বলেছি অফিসটাইমে কেউ গল্প করতে আসে? তোদের কি মাথা টাথা খারাপ? অফিসটাইম ছাড়া তোকে পাব কোথায়? এখন যা, এখন যা। আমার কাজ আছে।কী কাজ? সদরঘাট যেতে হবে। একটা মাল ডেলিভারি নিতে হবে।তোকে তো ধরে রাখছি না। তুই যা, আমরা ঠান্ডা ঘরে বসি খানিকক্ষণ। আড্ডা দেই। তুই তোর মাল নিয়ে আয়।
অফিস আড্ডা দেওয়ার জায়গা নাকি?
করিম রাগে চিড়বিড় করতে থাকে।
করিমের হতাশ মুখ দেখতে বড় ভালো লাগে সবার। অ্যাশট্রেতে ছাই না ফেলে ওরা ইচ্ছা করে মেঝেতে ছাই ফেলে। হো হো করে হাসে। করিমের অফিসের সুন্দরী স্টেনোটি হেডমিস্ট্রেসের মতো চোখে তাকায়।ছুটির দিনে এদের কারও কাছেই যাওয়া যায় না। বেকার বন্ধুদের কাছেও যাওয়া যায় না। ওদের সেদিন নানান কাজ থাকে। সপ্তাহের বাজার করতে হয়। এর বাড়ি ওর বাড়ি যেতে হয়। বুলুর কথাই ঠিক–ছুটির দিনে যে সবচেয়ে ব্যস্ত থাকে সে হচ্ছে একজন বেকার।
রোদ মরে আসছে। সোবাহান আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ। আকাশ বিবর্ণ হতে শুরু করেছে। জোর বৃষ্টি হবে। সোবাহানের মন হঠাৎ ভালো হয়ে গেল। বুলু এই কথাটিও ঠিক বলে–আকাশে মেঘ দেখলে সবচেয়ে খুশি হয় বেকার যুবকেরা।সোবাহান একটা পান কিনল। এবং ঝট করেই দেড় টাকা খরচ করে একটা ফাইভ ফাইভ কিনে ফেলল। মাঝে মাঝে বিলাসী হতে ইচ্ছা করে। অকারণে দেড় টাকা ছাই করে ফেলার মধ্যে একধরনের আনন্দ আছে।
বিকাল পাঁচটার দিকে বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির আগে আগে সোবাহান চলে গেল মালিবাগে। রেশমা মালিবাগে থাকে। তবে তাকে পাওয়া যাবে কিনা কে জানে? তাকে কখনো পাওয়া যায় না। সবসময় তার ডিউটি পড়ে অসময়ে। গত বছরই ডিটটি পড়ল ঈদের দিন।
রেশমার বাবা দরজা খুলে দিলেন।
রেশমা আছে?
হ্যাঁ আছে। বসেন।
আমাকে চিনেছেন?
জি। আপনি বুলবুলের বন্ধু। বসেন।
আপনার শরীর কেমন?
ভালো না। বসেন রেশমাকে ডাকি।
ঝড়ের আশঙ্কায় জানালা-টানালা সব বন্ধ। ঘরের ভেতরে গুমোট। হাওয়া ভারী হয়ে আছে। সোবাহান জানালা খুলে দিতেই রঙিন পর্দা পালের মতো উড়তে লাগল। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের ছাদ। ঝমঝম করে শব্দ হচ্ছে। অপূর্ব।সোবাহান ভাই, কেমন আছেন? রেশমা গোসল করে এসেছে। চুলে গামছা জড়ানো। জলের সঙ্গে মেয়েদের কোনো একটা সম্পর্ক হয়তো আছে। গা-ভেজা সব মেয়েকেই জলকন্যার মতো লাগে।
আপনি এখানে এলেন প্রায় দু’মাস পর।সোবাহান হাসল। মেয়েরা দিন-ক্ষণের হিসাব খুব ভালো রাখে।আপনার বন্ধু বলছিল আপনি নাকি এক বুড়োর সঙ্গে থাকতে থাকতে বুড়োদের মতো হয়ে গেছেন। কথা টথা কম বলেন।বুড়োরা কথা কম বলে নাকি? আমার তো ধারণা ওরা কথা বলে সবচেয়ে বেশি।কথা বেশি বলে রোগীরা। বকবক করে মাথা ধরিয়ে দেয়।
সোবাহানের ভয় হলো রেশমা হয়তো হাসপাতালের গল্প শুরু করবে। নার্সরা। রোগীদের গল্প খুব আগ্রহ নিয়ে বলে। সে গল্পে সবকিছুই থাকে–রোগীর বয়স, তার বাড়ি, তার ছেলেমেয়ে; কিন্তু রোগের কথা থাকে না। রোগের যন্ত্রণার প্রসঙ্গ একবারও আসে না। সোবাহান কথার মোড় ঘোরাবার জন্যে বলল, বুলুর কাছে গিয়েছিলাম।
কেমন আছে আপনার বন্ধু?
বেশি ভালো না, জণ্ডিস হয়েছে।
কী ধরনের জণ্ডিস? ইনফেকটাস হেপাটাইটিস?
তা তো জানি না।
বিলরুবিন টেস্ট করিয়েছে?
জানি না। খুব সম্ভব না।
রেশমা হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গে চলে এল। হাসিমুখে বলল, চায়ের সঙ্গে কী খাবেন? কী আছে? কিছুই নাই। আনাব। মুড়ি ভেজে দেই? দাও।আপনি বসে বসে ঝড়বৃষ্টি দেখেন। আমি চা নিয়ে আসছি। দেরি হবে না।রেশমা, একটা সিগারেটও আনতে বলবে।
Read more
