অরণ্য পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

অরণ্য পর্ব – ৭

সোবাহান বসে রইল একা একা। বসার ঘরটা ছোট হলেও বেশ গোছানো। সুন্দর। একটা শোকেস আছে। যার নিচের তাকে বেশ কিছু গল্প-উপন্যাসের বই। বইগুলির একটিও মলিন নয়। ঝকঝক করছে। রেশমা বই পড়ে মলাট লাগিয়ে। পড়া হলেই মলাট খুলে শোকেসে তালা লাগিয়ে দেয়। বুলু একবার কী একটা বই নিয়ে তরকারির সরুয়া ভরিয়ে ফেরত দিল। রেশমা রাগে তিনদিন কথা বলল না।

ঘর অন্ধকার হয়ে আসছে। বাতি জ্বালাতে ইচ্ছে করছে না। জ্বালাতে গেলে হয়তো। দেখা যাবে কারেন্ট নেই। সোবাহান নিচু হয়ে বসে বইগুলির নাম পড়তে চেষ্টা করল। গল্পের বই-টই অনেকদিন পড়া হয় না। কী হবে গল্পের বই পড়ে? একজন বানানো মানুষের কথা পড়ে কী লাভ? সেই বানানো মানুষটি প্রেম করে হাসে কাঁদে। কী আসে যায় তাতে? কিছুই আসে যায় না।

সোবাহান ভাই, চা নেন। ঘর অন্ধকার করে বসে আছেন কেন? এই নেন সিগারেট।কাগজে মোড়া দুটো সিগারেট রেশমা বাড়িয়ে দিল।একটার কথা বলেছিলাম, দুটো আনলে কেন? মেয়েরা কোনো জিনিস একটা দেয় না।চা কিন্তু এক কাপ দিয়েছ।রেশমা হেসে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, আপনার বন্ধু কি গয়না প্রসঙ্গে কোনো কথা বলেছে?

বলেছে।আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল কাউকে বলবে না। এখন আমার মনে হয় সবার কাছেই বলে বেড়াচ্ছে। এটা ঠিক না।প্রতিজ্ঞা করা হয় প্রতিজ্ঞা ভাঙার জন্যেই। এটাই নিয়ম।রেশমা কিছু বলল না, গম্ভীর হয়ে রইল। সোবাহান বলল, ওর চাকরিটা খুব দরকার। কিছু না হলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে।আপনার দরকার নাই?

আমারও দরকার। তবে ওর যেমন চাকরি পেলেই বিয়ে করার প্ল্যান আমার তো তেমন কিছু নেই। রেশমা বলল, ওর অসুখ কি খুব বেশি? খুব বেশি না। আমার সঙ্গে তো হোটেল পর্যন্ত এল।আপনার অসুখের কী অবস্থা? আমার আবার কী অসুখ?

ও বলছিল রাতে নাকি আপনি ঘুমাতে পারেন না। শুধু মনে হয় কানের কাছে মশা পিন পিন করছে।বুলু বলেছে না? হ্যাঁ। তাছাড়া আপনার স্বাস্থ্যও অনেক খারাপ হয়েছে। দাড়ি কামান না কেন? যেদিন ইন্টারভ্যু থাকে সেদিন সকালে কামাই। আজ কোনো ইন্টারভ্যু ছিল না।ও বলছিল আপনার নাকি একটা চাকরি হবে হবে করছে।

জানি না।

সোবাহান উঠে দাঁড়াল।

এই বৃষ্টির মধ্যে যাবেন কোথায়?

আমার ভিজে অভ্যাস আছে। কিছু হবে না।

রেশমার বাবা বসে আছেন বারান্দায়। তিনি যন্ত্রের মতো বললেন, আবার আসবেন।রেশমার বিয়ের পর এই ভদ্রলোক কোথায় থাকবেন? মেয়ে জামাইয়ের সঙ্গে থাকতে তার কেমন লাগবে? তাঁকে অবশ্যি থাকতেই হবে। তার জায়গা নেই। এজন্যেই কি রেশমার কাছে যারা আসে তাদের সঙ্গে তিনি এত ভদ্র ব্যবহার করেন? বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় মুড়ি কিনতে যান?

জলিল সাহেব অফিস থেকে একটা সিলিং ফ্যান নিয়ে রাত ন’টার দিকে ফিরলেন। সিলিং ফ্যানের পাখাগুলি একত্র করে বাঁধা। বডিটি বাজারের চটের ব্যাগে লুকানো। জলিল সাহেবের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই সিলিং ফ্যানে কোনো রহস্য আছে।

রহস্য বোঝা গেল রাত দশটার দিকে। ফ্যানটা অফিসের। দারোয়ান সাড়ে তিনশ টাকার বিনিময়ে প্যাক করে দিয়েছে।সোবাহান সাহেব।জি।কাজটা খারাপ হলো নাকি? মনটা খচখচ করছে।সোবাহান কিছু বলল না।খারাপ হলেও কিছু করার নাই। গরমে মরব নাকি? তাছাড়া দারোয়ান ব্যাটা আমাকে না পেলে অন্য কাউকে বিক্রি করত।তা করত।

গরম সহ্য হয় না রে ভাই। এখন ফ্যান খুলে নাক ডাকিয়ে ঘুমাবেন। এক ঘুমে রাত কাবার। হা হা হা।সেই রাতেই তিনি ফ্যান লাগাবার মিস্ত্রি নিয়ে এলেন। তার উৎসাহের সীমা রইল। রাত এগারোটার দিকে ফ্যান ঝুলানো হলো। রেগুলেটর বসানো হলো। কিন্তু পাখা ঘুরল না। মিস্ত্রি বিরসমুখে বলল, মটর নষ্ট। কয়েল পুড়ে গেছে। এই পাখা ঘুরবে না।

জলিল সাহেবের মুখ অনেকখানি লম্বা হয়ে গেল। সোবাহান বলল, ফ্যান ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে আসেন।টাকা আর ফেরত পাব? কী যে বলেন! বেশ্যার ধন সাত ভূতে খায়। আমার টাকাপয়সা হচ্ছে বেশ্যার টাকাপয়সার মতো। সাত ভূতে খাবে। লুটেপুটে খাবে।নতুন কয়েল লাগালে চলবে বোধহয়।আরে চলবে না।জলিল সাহেব বারান্দায় বসে রইলেন। সান্ত্বনার কথা কিছু বলা দরকার বোধহয়। এতগুলি টাকা। সোবাহান চেয়ার টেনে এনে বারান্দায় বসল।সোবাহান সাহেব।জি।

সাত ভুতে লুটে খেয়েছে বুঝলেন? দরিদ্র মানুষ টাকাপয়সা যা জমিয়েছি এইভাবে গেছে। পাঁচ হাজার টাকা জমিয়েছিলাম ব্যাংকে। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জন্যে একজনকে দিলাম টাকাটা। সে নারিকেল ছোবড়া কিনে এনে ঢাকায় বেচবে, যা লাভ তার চল্লিশ ভাগ তার। ষাট ভাগ আমার। পাঁচ বছর আগের কথা। এখনো সেই ছোবড়া এসে পৌঁছায়নি।এখন আর এসব চিন্তা করে কী করবেন?

বুড়ো বয়সে খাব কী বলেন? ছেলে নাই যে ছেলে খাওয়াবে। বিষয়সম্পত্তি নাই। ভিক্ষা করতে বলেন? এত দূরের কথা এখনি ভাবার দরকার কী? দূর? দূর কোথায় দেখলেন। সাত বছর আছে চাকরি। কেঁদে টেদে পড়লে বছরখানিকের এক্সটেনশন হতে পারে। ব্যস।চলেন চা খেয়ে আসি।না, চা-টা কিছু খাব না। আপনি যান। আমি ঠিক করেছি দারোয়ান শালাকে খুন করে ফাঁসিতে ঝুলব।খুনটা করবেন কীভাবে?

ফ্যানের ডাণ্ডাটা খুলে কাল অফিসে নিয়ে যাব।সোবাহান শব্দ করে হেসে উঠল। আরও কিছুক্ষণ পর দেখা গেল দু’জনে চায়ের দোকানের দিকে যাচ্ছে। রাস্তায় নেমেই সোবাহান হালকা স্বরে বলল, শুধু চা না। আজ চায়ের সাথে দৈ মিষ্টি।কেন? বুলুর চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে।তাতে আপনি মিষ্টি খাওয়াবেন কেন? বুলু খাওয়ালে খাওয়াবে। আপনি কে?

ও আমার খুব প্রিয় মানুষ। বড় কষ্ট করেছে।জলিল সাহেব টেনে টেনে বললেন, বন্ধু, বান্ধবের চাকরিতে এত খুশি হওয়ার কিছু নাই। এখন আপনাকে সে পুছবেও না।না পুছলেও কিছু যায় আসে না।বড় বড় কথা বলা সহজ। দুদিন পরে দেখবেন বলতে পারছেন না। দুনিয়াটা নিজের, অন্যের না। বুঝলেন ভাই।সোবাহান কিছু বলল না। জলিল সাহেব বললেন, বেতন কত দিয়েছে?

এখনো জানে না। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পায় নাই।

বুঝল কী করে চাকরি হয়েছে?

ঘুষ দিয়েছে সাত হাজার টাকা।

টাকাও গেল, চাকরিও গেল।

জলিল সাহেবকে প্রথম উৎসাহিত হতে দেখা গেল। তিনি চোখমুখ উজ্জ্বল করে বললেন, বুলু সাহেব এই চাকরি পেলে আমি আপনার গু চেটে খাব। টাকা গেছে যেই পথে চাকরি গেছে সেই পথে। হা হা হা। বুলু সাহেব খুব কাঁচা কাজ করেছে।

পরপর দু’কাপ চা খাওয়ার পর জলিল সাহেব দৈ মিষ্টি খেলেন। তারপর তার ঠান্ডা কিছু খাবার ইচ্ছা হলো। তিনি ইতস্তত করে বললেন, একটা ফান্টা কিনে দুজনে ভাগ করে খাই, কি বলেন? আমি খাব না। আপনি খান।আরে ভাই খান না। গরমের মধ্যে ভালোই লাগবে। এই, ঠান্ডা দেখে একটা ফান্টা। দাও।

ফান্টা খেয়ে শেষ করতে করতে বারোটা বেজে গেল। জলিল সাহেব অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালেন। পথে নেমেই বললেন, তালের রস খাবেন নাকি? তাড়ি যার নাম। খাঁটি। বাংলাদেশী জিনিস।জি-না।চলেন যাই এক গ্লাস করে খেয়ে আসি। এক টাকা করে গ্লাস। বেশি দূর যেতে হবে না।না, শুয়ে পড়ব।শুয়ে পড়লে লাভ তো কিছু হবে না। গরমের মধ্যে ঘুমাবেন কীভাবে? চলেন যাই। যাব আর আসব। জিনিসটা ভালো। চেখে দেখেন।না আজ না। আরেকদিন দেখব।

জলিল সাহেব বিমর্ষ মুখে বাসার দিকে রওনা হলেন। ঘরে ঢুকলেন না, বসে রইলেন বারান্দায়। তার নাকি ফ্যানটার দিকে তাকালেই মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে। সোবাহান শুয়ে শুয়ে শুনল, জলিল সাহেব নিজের মনে কথা বলছেন, কষ্টের পয়সা। খেয়ে না-খেয়ে জমানো পয়সা কীভাবে যায়! সোবাহান গলা উঁচিয়ে ডাকল, কত রাত পর্যন্ত বসে থাকবেন? আসেন শুয়ে পড়ি।জলিল সাহেব কোনো জবাব দিলেন না। কতক্ষণ এভাবে বসে কাটাবেন কে জানে।রহমান সাহেব আজও অফিসে আসেননি।

সোবাহান চরম ধৈর্যের পরিচয় দিল। লাঞ্চ আওয়ার পর্যন্ত বসে রইল একভাবে। ডান পায়ে ঝিঁঝি ধরে গেল। তবু নড়ল না। বাথরুমে যাওয়া দরকার তাও গেল না। একভাবে বসে থেকে নিজেকে কষ্ট দেওয়া। এর পেছনে উদ্দেশ্য আছে। সোবাহান। দেখেছে খুব কষ্টের পর একটা কিছু ভালো ঘটে যায়।

আজও হয়তো এরকম হবে। হঠাৎ দেখা যাবে লাঞ্চের পর এস. রহমান সাহেব এসে পড়েছেন। সোবাহানকে দেখে বললেন–ও আপনি! আসুন, উপরে চলে আসুন। কাজের ঝামেলায় ব্যস্ত ছিলাম দেখা হয়নি। তার জন্যে অত্যন্ত লজ্জিত। আজ যত কাজই থাকুক আপনারটা আগে শেষ করব। কিছু খাবেন? ঠান্ডা কিছু?

বাস্তবে সেরকম কিছু ঘটল না। লাঞ্চ আওয়ারে সবাই খেতে টেতে গেল। আবার ঘণ্টাখানিক পর ফিরে এল। রহমান সাহেবের দেখা নাই। রিসিপশনিস্ট মেয়েটি আজ তাকে দেখেও দেখছে না। নাকি ভুলে গেছে? কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়—আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন? আমি শ্যামলীতে থাকি, সোবাহান। রহমান সাহেবের পি.এর সঙ্গে একবার কথা কাটাকাটি হয়েছিল? মনে আছে আমাকে?

মনে থাকার ব্যাপারটি বিচিত্র। কাউকে কাউকে একবার দেখলেই সারা জীবন মনে থাকে। আবার এমন লোকও আছে যাদের সঙ্গে বারবার দেখা হয় তবু তাদের কথা মনে থাকে না। প্রতিবারই তাদের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করতে হয়। যেমন বুলু। বুলু বলে, দেশের বাড়িতে পাঁচ-সাত দিন থেকে ঢাকায় এলে তার মামা নাকি তাকে চিনতে পারেন না।

বুলুকে মাথা নিচু করে বলতে হয়–আমি বুলবুল। বুলুর ধারণা সব মানুষের চেহারার সঙ্গে কারও-না-কারও মিল থাকে। পরিচিত কাউকে সে মনে করিয়ে দেয়। এ জন্যেই কোনো মানুষকেই কখনো পুরোপুরি অচেনা লাগে না। বুলুকে লাগে। সে নাকি কাউকে মনে করিয়ে দেয় না।

সোবাহান সাহেব!সোবাহান চমকে তাকাল। রিসিপশনিস্ট মেয়েটি তাকে ডাকছে। নাম তাহলে মনে। আছে। সোবাহান এগিয়ে গেল। পায়ে ঝিঁঝি ধরেছে। হাঁটতে হচ্ছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে। মেয়েটি হাসিমুখে তাই দেখছে।আমাকে কিছু বলছেন? হ্যাঁ। রহমান সাহেব টেলিফোন করেছেন তিনি সাড়ে তিনটার দিকে আসবেন। আপনি কি বসবেন এতক্ষণ?

হ্যাঁ বসব।অফিস ইউনিয়নের সঙ্গে তার একটা মিটিং আছে। মিটিং শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে।লাগুক যতক্ষণ লাগে। আমি বসে থাকব। বাইরে রোদে ঘোরাঘুরি করার চেয়ে এখানে বসে থাকায় আরাম আছে।মেয়েটি হাসিমুখে বলল, ইউনিয়নের সঙ্গে মিটিংয়ের পর স্যারের মেজাজ খুব খারাপ থাকে। আপনার যাওয়া উচিত যখন তার মেজাজ থাকে ভালো।

মেজাজের ওপর তো চাকরি হবে না। চাকরি হওয়া না-হওয়ায় মেজাজটা কোনো ডিটারমিনিং ফেক্টর নয়।যেভাবে কথা বলছেন তাতে মনে হয় ডিটারমিনিং ফেক্টরগুলি আপনার পক্ষে।আমি এখনো জানি না। একজন ভদ্রমহিলা আমাকে একটা চিঠি দিয়ে এখানে পাঠিয়েছেন। ভদ্রমহিলার ধারণা চিঠি দেখানো মাত্র আমার চাকরি হবে।

দেখিয়েছিলেন?

হ্যাঁ।

কী বললেন চিঠি পড়ে।

পরে দেখা করতে বললেন।

মেয়েটি ইতস্তত করে বলল, কী লেখা ছিল সেই চিঠিতে জানেন?

খামের চিঠি, আমি পড়ে দেখিনি।

আপনার পায়ের ঝিঁঝি এখনো কমে নাই?

জি-না। কমতে অনেক সময় লাগছে।

শেষ প্রশ্নটিতে সোবাহান বেশ অবাক হলো।

আপনি তো সারা দুপুর কিছু খাননি? আমাদের এখানকার স্টাফদের জন্যে ক্যান্টিন আছে। দুপুরে রুটি-গোশত পাওয়া যায়। আপনি ইচ্ছে করলে সেখানে খেতে পারেন। বেশ সস্তা।আমি তো স্টাফ না।

একদিন হয়তো হবেন। আসেন আমার সঙ্গে, আমি বলে দিচ্ছি। আমিও না হয় আপনার সঙ্গে চা খাব এক কাপ।সোবাহানের বুক শুকিয়ে গেল। পকেটে টাকা আছে ছ’টি। রুটি-গোশত খেতে কত লাগবে কে জানে। একটি মেয়ের সামনে কখনো বলা যায় না–ভাই, আমার তো দু’টি টাকা কম পড়েছে। কাল এসে দিয়ে যাব। কিছু মনে করবেন না।না খেয়েই বসে থাকবেন, না যাবেন?

আজ আর অপেক্ষা করব না। বাসায় চলে যাব। কাল পরশু একবার আসব।সোবাহান মেয়েটিকে দ্বিতীয় কথা বলার সুযোগ না দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এল।বাসে করে শ্যামলী এসে পৌঁছাতে লাগল পঁয়তাল্লিশ মিনিট। ফাঁকা বাস। ফাঁকা বাসে উঠে বসলে আপনাতেই মন ভালো হয়ে যায়। সিগারেট ধরিয়ে মুখ ভর্তি করে ধোয়া ছাড়তে ইচ্ছা করে।

মন ভালো ভাবটি বাসায় পৌঁছেও বজায় রইল। সোবাহান দেখল চারটি চিঠি এসেছে তার নামে। একটি খুলে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। খামের আকৃতি ও রঙ দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা একটা রিগ্রেট লেটার। উপরের ঠিকানাটা যেহেতু বাংলায় ভেতরের চিঠিটিও বাংলাতেই লেখা। লেখার ধরনটাও বলে দেওয়া যায়। জনাব, আপনাকে অত্যন্ত দুঃখের সহিত জানাইতেছি যে, বর্তমানে আমাদের সংস্থায় কোনো কর্মখালি নাই।

ভবিষ্যতে কোনো শূন্য পদ সৃষ্টি হইলে আপনার সহিত যোগাযোগ করা হইবে। আর এই বিষয়ে কোনো অনুসন্ধান করিবার প্রয়োজন নাই।ভেতরের লেখা কী হবে জেনেই এই খামটিই সোবাহান আগে খুলল। যা ভাবা গিয়েছে তা নয়। চোখ দান করার জন্যে অনুরোধ করে লেখা। ছাপানো চিঠি। শেষ লাইনে লেখা–মৃত্যুর পরও আপনার চোখ অনেকদিন বেঁচে থাকবে। এর চেয়ে চমকার ব্যাপার আর কী হতে পারে?

মৃত্যুর পর চোখ বেঁচে থাকার মধ্যে চমকারের কী আছে? যদি কিছু থেকেও থাকে তবে তা অনুভব করার মানুষটি কোথায়? সোবহান চিঠিটি ড্রয়ারে ভরে রাখল। ঠিকানা জোগাড় করে চিঠি দিয়েছে সেই কারণেই দুটি চোখ দিয়ে দেওয়া দরকার। মৃত্যুর পর চোখ বেঁচে থাকবে সে-জন্যে নয়।দেশ থেকে এসেছে দু’টি চিঠি। একটি ভাবির, অন্যটি ফরিদ আলির। এ চিঠি দুটি রাতে খাওয়াদাওয়া শেষ করে আরাম করে পড়তে হবে।

চতুর্থ চিঠিটির হাতের লেখা অপরিচিত। কে হতে পারে? পুরনো বন্ধুদের কেউ? তারাপদ নয় তো? আইএসসি পাশ করে কীভাবে চলে গেল জার্মানি, তারপর আর। খোঁজখবর নেই। হয়তো দেশে ফিরে ঠিকানা বের করে লিখেছে। তারাপদের কথা খুব মনে হয়।

চিঠি তারাপদের নয়। চিঠিটি মিলির লেখা। বিরাট এক কাগজে চার-পাঁচ লাইনের ছোট্ট চিঠি।

সোবাহান ভাই,

আম্মা চাকরির জন্যে যে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন আপনি কি তার সঙ্গে দেখা করেছেন? আম্মা তা জানতে চান। এখনো দেখা না করে থাকলে খুব অন্যায় করেছেন। দেখা করবেন, ফলাফল জানাবেন।

মিলি

সোবাহান হাতমুখ ধুয়ে অবেলায় হোটেলে খেতে গেল। এখন ভাত খাওয়ার কোনো অর্থ। হয় না। গরম গরম সিঙ্গারা ভাজা হচ্ছে। দুটি সিঙ্গারা এক কাপ চা খেয়ে বাসায় ফিরে দেখে, মনসুর সাহেব বারান্দায় ইজিচেয়ার পেতে শুয়ে আছেন।স্নামালিকুম। আপনার কি শরীর খারাপ? না ভাই, শরীর ঠিকই আছে। আপনারা আছেন কেমন? ভালোই আছি।ফ্যান কিনেছেন দেখলাম। ভালোই করেছেন। যা গরম। বাইরে একটা চেয়ার এনে বসেন না গল্প করি।

সোবাহান চেয়ার এনে বসল। মনসুর সাহেব হাসিমুখে বললেন, আজই আপনার ভাইয়ের একটি চিঠি পেয়েছি। বিয়ের ব্যাপার আষাঢ় মাসের মধ্যে সেরে ফেলতে চান। আমাদের আপত্তি আছে কি না জানতে চেয়েছেন।সোবাহান কিছুই বলল না।আমাদের তরফ থেকে কোনোই আপত্তি নাই। শুভ কাজ। যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভালো। আপনাকে জানিয়ে দিলাম। আপনার ভাইকেও আজকালের মধ্যে চিঠি লিখব।ভদ্রলোক পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট বের করলেন।

নেন, সিগারেট নেন। যূথিকে চা দিতে বলেছিলাম। আপনার জন্যেও দিতে বলি। আর ভাই শোনেন, ওকে নিয়ে যদি বাইরে টাইরে যেতে চান–চিড়িয়াখানা পার্ক এসব। আর কী, তাহলে যাবেন। অসুবিধা কিছু নাই। বিয়ের আগে চেনা থাকা দরকার। বৃথি! যূথি! যূথি বের হয় এল। সোবাহানকে দেখে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে পড়ল।দাও, তোমার সোবাহান ভাইকে চা দাও।

মেয়েটির মাথা আরও নিচু হয়ে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল উল্টোদিকে। মনসুর সাহেব বললেন, আপনি আর জলিল সাহেব পরশু রাতে আমার এখানে চারটা ডালভাত খাবেন।সোবাহান নিচুস্বরে বলল, তার কোনো দরকার নেই।আছে দরকার আছে। রোজ রোজ হোটেলে খান। মাঝে মধ্যে ঘরের খাওয়াদাওয়া দরকার। যূথি, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? চা দিতে বললাম না? নাকি কানে আজকাল শুনতে পাও না।

যুঁথি দ্রুত ঘরের ভেতরে ঢুকতে গিয়ে কপালের সঙ্গে ধাক্কা খেল। মনসুর সাহেব অস্ফুট স্বরে বললেন, সংয়ের মতো চলাফেরা, অসহ্য! মনসুর সাহেবের মন ভালো নেই। তাঁর স্ত্রী আজ অন্যদিনের চেয়েও বেশি বিরক্ত করছে।বুলু চিঁচি করে বলল, আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেন।বুলুর মামা হুদা সাহেব বললেন, হাসপাতাল কেন? আমার অবস্থা সুবিধার না।তুই বুঝলি কী করে? বোঝা যায়, অবস্থা খারাপ হলে ডাক্তারের আগে টের পায় রোগী।

 

Read more

অরণ্য পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.