আজ আমি কোথাও যাব না পর্ব – ৯ হুমায়ূন আহমেদ

আজ আমি কোথাও যাব না পর্ব – ৯

মার রাগ কি এর মধ্যে পড়বে না? অবশ্যই পড়বে। পৃথু মনে মনে বলল, আল্লাহ, মায়ের রাগ কমিয়ে দাও। গত শবেবরাতে মায়ের রাগ কমাবার কথাটা আল্লাহকে বলা দরকার ছিল। শবেবরাতে সে আল্লাহর কাছে অনেক কিছু চেয়েছে শুধু এই জিনিসটা চাইতে ভুলে গেছে। বিরাট ভুল হয়েছে। শবেবরাতে সে আল্লাহর কাছে যে সব জিনিস চেয়েছে তার মধ্যে আছে– একটা ফুটবল (পাম্পারসহ)

একটা পেনসিল বক্স : (ডোনাল্ড ডাকের ছবিওয়ালা। তাদের ক্লাসের একটা মেয়ের আছে। মেয়েটির নাম অমি। মেয়েটা খুব ভালো।)।

বেনানা ইরেজার : (কলার মতো দেখতে ইরেজার। ইরেজারটার গায়ে পাকা কলার গন্ধ। মুস্তাক নামের একটা ছেলের আছে। ছেলেটা খুবই দুষ্ট। সবার সঙ্গে মারামারি করে।

তালাচাবি দেয়া খাতা; (চাবি দিয়ে রাখলে এই খাতা খোলা যায়। শান্তনুর এরকম খাতা আছে। শান্তনু হিন্দু। তার কোনোদিন মুসলমানি হবে না।) দুই পকেটওয়ালা ফুলপ্যান্ট : (তাদের ক্লাসের সিরাজের এরকম প্যান্ট আছে। অনেকগুলি পকেট। প্যান্টের হাঁটুর কাছে জিপার আছে। জিপার খুললে ফুলপ্যান্টটা হাফপ্যান্ট হয়ে যায়।)

একটা পাজেরো জিপগাড়ি; (তাদের ক্লাসের মীরা নামের মেয়েটা এরকম গাড়িতে করে আসে। তাদের গাড়ির রঙ কালো। পৃথু আল্লাহর কাছে লাল রঙের গাড়ি চেয়েছে। মীরা মেয়েটাকে পৃথুর খুবই ভালো লাগে। পৃথু ঠিক করেছে সে কোনোদিন বিয়ে করবে না। তারপরও তাকে যদি বিয়ে করতেই হয় তাহলে সে মীরাকেই বিয়ে করবে। মীরা পৃথুকে পৃথু ডাকে না। ডাকে পৃথিবী। এটাও পৃথুর খুব ভালো লাগে। নাম বদলাবার কোনো ব্যবস্থা থাকলে সে নিজের নাম বদলে পৃথিবী রাখত। মনে হয় এরকম কোনো ব্যবস্থা নেই।)

অনেকক্ষণ হলো দরজার আড়ালে পৃথু দাঁড়িয়ে আছে। তার পানির পিপাসা পেয়েছে, কিন্তু পানি খাবার জন্যে দরজার আড়াল থেকে বের হবার সাহস পাচ্ছে। মা খাটে বসে আছেন। বের হলেই সে সরাসরি মায়ের সামনে পড়ে যাবে। পৃথুর কাছে আলাউদ্দিনের দৈত্যের চেরাগটা থাকলে দৈত্যকে বলত এক গ্লাস পানি এনে দিতে। অলিউদ্দিনের দৈত্যের চেরাগ যাদের কাছে আছে তারা কতই সুখী।

পৃথু! রাহেলার কঠিন গলা শুনে পৃথু শক্ত হয়ে গেল। কান্নাটা থেমে গিয়েছিল, আবার তা ফিরে আসছে বলে মনে হলো। গলার কাছে শক্ত হয়ে গেছে। এটা কান্না আসার লক্ষণ।কথা বলছ না কেন, পৃথু? কী মা! দরজার আড়াল থেকে বের হয়ে আস।পৃথু দরজার আড়াল থেকে বের হয়ে এলো। রাহেলা চাপা-গলায় বলল, কাল এইভাবেই স্কুলে যাবে। মনে থাকবে? পৃথু হাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।স্কুলের সবাই যখন জিজ্ঞেস করবে এই অবস্থা কেন? তখন বলবে আমি প্রতিরাতে বিছানা ভিজিয়ে ফেলি এই জন্যে এটা আমার শাস্তি। বলতে পারবে না?

পৃথু আবারো হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।এখন আমার সামনে থেকে যাও। আমার মাথা ধরেছে, আমি দরজা বন্ধু করে শুয়ে থাকব। খবরদার! প্যান্ট পরবে না। যেভাবে তোমাকে থাকতে বলেছি সেইভাবে থাকবে।পৃথু আবারো মাথা নাড়ল। সে এক হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে আছে। কারণ তার কান্না এসে যাচ্ছে, কান্নাটা আটকানো দরকার। পৃথু চুপিচুপি শামসুদ্দিন সাহেবের ঘরের খাটের নিচে চলে গেল। খাটের নিচে লুকিয়ে বসে থাকলে কেউ তার এই অবস্থাটা দেখবে না।শামসুদ্দিন দেখে ফেললেন। তিনি পৃথুকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না।

নিজের একটা লুঙ্গি ছোট করে পৃথুকে পরিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। পৃথু ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তিনি কিছুই জিজ্ঞেস করছেন না। এটাও পৃথুর খুব ভালো লাগছে। শান্তি শান্তি লাগছে। ঘুম এসে যাচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়লে সে হয়তো এই বিছানাও ভিজিয়ে দেবে। তাতে কোনো অসুবিধা হবে না। বড় মামা তাকে কিছুই বলবেন না। কাউকে জানাবেনও না। বড় মামার বিছানা সে আগেও কয়েকবার ভিজিয়েছে। বড় মামা প্রতিবারই বলেছেন, কাণ্ড দেখেছিস পৃথু রাতে পানি খাবার সময় বিছানায় পানি ফেলে দিয়েছি। মনে হয় তোর প্যান্টও ভিজিয়ে ফেলেছি। যা, তাড়াতাড়ি প্যান্ট বদলে আয়।পৃথু! জি বড় মামা।আজ বিকেলে আমার সঙ্গে বেড়াতে যাবি? কোথায়?

পার্কে খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করব, তারপর যাব দোকানে। তুই যদি কিছু কিনতে চাস কিনে দেব।আচ্ছা।বড় মামা এখনো পিঠে হাত বুলাচ্ছেন। কী যে আরাম লাগছে! কারো কারো হাতে খুব মায়া থাকে। গায়ে হাত বুলালেই মায়ায় শরীর ভরে যায়। পৃথু ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পরেই রাহেলা ছেলের খোঁজে ঘরে ঢুকল। শামসুদ্দিন বললেন, ওকে ডাকিস না। ঘুমাচ্ছে। সামান্য জ্বরও মনে হয় এসেছে। গা গরম।রাহেলা বলল, ও যে আমাকে কী যন্ত্রণা করছে ভাইজান! একটাতেই এই অবস্থা, দুনম্বরটা আসলে কী যে হবে! শামসুদ্দিন বললেন, তুই এই চেয়ারটায় বেসি।রাহেলা বিস্মিত হয়ে বলল, কেন? কিছু বলবে? পৃথুর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি এটা নিয়ে উপদেশমূলক কথা বলবে?

না। আমি কখনো কাউকে উপদেশ দিই না। তুই আরাম করে বোস।রাহেলা বসল। শামসুদ্দিন টেবিলের ড্রয়ার খুলতে খুলতে বললেন, তোর জন্যে সামান্য উপহার এনেছি। এই নে।রাহেলা থমথমে গলায় বলল, এইগুলো কখন কিনেছ? কখন কিনেছি এটা দিয়ে তোর দরকার কী? দরকার আছে। আমার ধারণা তুমি সেন্টের বোতল দুটা গত পরশু কিনেছ।আমার মনে নেই, হতে পারে।হতে পারে-টারে না। অবশ্যই তুমি গত পরশু কিনেছ। কীভাবে বুঝলাম সেটাও তোমাকে বলি। বললে তুমি বিশ্বাস করবে না, তারপরও বলি–আমি স্বপ্নে দেখেছি।শামসুদ্দিন বিস্মিত হয়ে বললেন, স্বপ্নে দেখেছিস?

হুঁ, পরশু রাতে স্বপ্নে দেখেছি। কী স্বপ্ন সেটা তোমাকে বলা ঠিক হবে না।বলা ঠিক না হলে বলতে হবে না।আচ্ছা ঠিক আছে, কী স্বপ্নে দেখেছি তোমাকে বলি। না বললে শান্তি পাব না। আমার কোনো স্বপ্ন ফলে না। এটা কীভাবে ফলল কে জানে। খুবই অবাক লাগছে। ভাইজান, দেখ আমার গায়ে কাঁটা দিয়েছে। চোখে দেখে গায়ের কাটা বোঝা যাবে না। হাত দিয়ে দেখ। আমার গায়ে হাত রাখলে তোমার হাত পচে যাবে না। আমার এইডস হয় নি।

তোর গায়ে যে কাঁটা দিয়েছে এটা খালি চোখেই দেখতে পাচ্ছি। এখন স্বপ্নটা কী বল।স্বপ্নে দেখেছি আমি তোমার সঙ্গে আমেরিকা গিয়েছি। দুজন হাঁটছি। রাস্তার দুপাশে বিশাল বড় বড় দোকান। একেকটা দোকান এত বড় যে আকাশ দেখা যাচ্ছে না। চারদিকে খুব শব্দ হচ্ছে। একটু পরপর মাথার উপর দিয়ে জেট প্লেন উড়ে যাচ্ছে। আমার খুবই ভয় লাগছে। তুমি বললে, আয় একটা দোকানে ঢুকে দেখি এদের দোকানগুলো কেমন। আমি তোমার সঙ্গে দোকানে ঢুকলাম। দোকানটা হলো পারফিউমের। রাজ্যের পারফিউম। কেনার সাধ্যও নাই, এত দাম। দোকানের একজন সেলসগার্ল আমাদের দেখে এগিয়ে এসে বলল, আপনারা কি প্রথম আমাদের দোকানে এসেছেন?

তুমি বললে, হ্যাঁ। সেলসগার্ল বলল, প্রথম যারা আমাদের দোকানে আসে তাদেরকে একটা করে ফ্রি পারফিউম দিই। তোমরা দুজন তোমাদের পছন্দমতো দুটা পারফিউম বেছে নাও। তখন আমি ছুটে গিয়ে দুটা বেছে নিয়ে নিলাম। আমারটাও নিলাম। তোমারটাও নিলাম। এই হলো স্বপ্ন। অদ্ভুত স্বপ্ন না ভাইজান? হুঁ।ভাইজান শোন, তুমি যে আমাকে দুটা পারফিউম কিনে দিয়েছ এটা পৃথুর বাবাকে জানিও না।কেন? সে অন্য কিছু ভেবে বসতে পারে। কী দরকার! অন্য কিছু ভাববে কেন?

ভাবলে আমি কী করব? আমি তো আর অন্যের ভাবনা কনট্রোল করতে পারি না। এই বিষয়ে তুমি পৃথুর বাবার সঙ্গে কোনো কথা বলবে না।আচ্ছা।রাহেলা চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে চাপা গলায় বলল, এত কিছু থাকতে তুমি বেছে বেছে আমার জন্যে পারফিউম কেন কিনেছ বলো তো? আচ্ছা থাক, বলতে হবে না। আমি জানি কেন কিনেছ।শামসুদ্দিন দেখলেন রাহেলার চোখ চকচক করছে। সে মনে হচ্ছে এখনই কেঁদে ফেলবে। শামসুদ্দিনের মনটাই খারাপ হয়ে গেল।পৃথুকে দোকানে নিয়ে গিয়ে শামসুদ্দিন একটা ফুটবল কিনে দিলেন। পৃথু হতভম্ব হয়ে গেল। শবেবরাতে আল্লাহর কাছে তো সে ফুটবলই চেয়েছিল। যা সে চেয়েছিল তাই তো পাচ্ছে। তবে ফুটবলের সঙ্গে সে একটা পাম্পারও চেয়েছিল। পাম্পারটা পাওয়া যায় নি।শামসুদ্দিন বললেন, আর কী লাগবে বল।পৃথু লজ্জিত গলায় বলল, আর কিছু লাগবে না।লজ্জা করিস না, বল।

একটা পেনসিল-বক্স কিনব–ডোনাল ডাকের ছবিওয়ালা।এই দোকানে সে-রকম পেনসিল-বক্স ছিল না। শামসুদ্দিন চার-পাঁচটা দোকান ঘুরে পৃথুর পছন্দের পেনসিল-বক্স কিনলেন। আশ্চর্য ব্যাপার, বেনানা ইরেজারও পাওয়া গেল। শামসুদ্দিন বললেন, আয় তোকে লাল টুকটুক একটা গেঞ্জি কিনে দিই।গেঞ্জি কিনব না মামা। ফুলপ্যান্ট কিনব। হাঁটুর কাছে জিপার থাকে। জিপার খুললে ফুলপ্যান্টটা হাফপ্যান্ট হয়ে যায়।কোথায় পাওয়া যায়? কোথায় পাওয়া যায় আমি জানি না।আয় খুঁজতে থাকি। কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। তুই টায়ার্ড না তো? না।

বিশেষ ধরনের প্যান্ট শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল। পৃথুর এত অবাক লাগছে! শবেবরাতে আল্লাহর কাছে যা যা চাওয়া হয়েছে সবই পাওয়া গেছে, শুধু লাল রঙের পাজেরো জিপটা এখনো পাওয়া যায় নি। তবে পাওয়া নিশ্চয়ই যাবে।রাতে ঘুমোতে যাবার সময় রফিক বলল, রাহেলা তুমি কি গায়ে সেন্ট মেখেছ। নাকি? মিষ্টি গন্ধ আসছে।রাহেলা বলল, গা থেকে মিষ্টি গন্ধ এলে কি তোমার ঘুমের অসুবিধা হবে? অসুবিধা হলে গরম পানি দিয়ে গোসল করে আসি।রফিক বলল, খুবই মিষ্টি গন্ধ। সেন্ট কবে কিনলে? নাকি কেউ উপহার দিয়েছে? এত কিছু বলতে পারব না। গন্ধটা ভালো লাগছে?

হ্যাঁ।আমার কাছে আরেকটা সেন্ট আছে, সেটার গন্ধ এটার চেয়েও ভালো।বলো কী।দুটা সেন্টই আমাকে একজন উপহার দিয়েছে।কে দিয়েছে? ভাইজান দিয়েছেন নাকি? ভাইজান আমাকে সেন্ট দেবেন কেন? আমি কি ভাইজানের প্রেমিকা? হুট করে তুমি ভাইজানকে সন্দেহ করে ফেললে। তোমার লজ্জাও করল না? খালাতো ভাই হলেও তো সে ভাই।সরি।সেন্ট দুটা আমি নিজের টাকায় কিনেছি। কিছু প্রাইজবন্ড ছিল। প্রাইজবন্ড বিক্রি করে কিনেছি।ভালো করেছ।রাহেলা বিছানায় উঠে বসে উৎসাহের সঙ্গে বলল, আমার ঐ সেন্টের গন্ধটা শুঁকে দেখতে চাও?

রফিক বলল, অবশ্যই চাই। এক কাজ কর, আমার শার্টে খানিকটা স্প্রে করে দাও।বোকার মতো কথা বলবে না, মেয়েদের সেন্ট তোমার গায়ে স্প্রে করব কেন? এত দামী একটা জিনিস খামাখা নষ্ট হবে।তাহলে থাক।রাহেলা সেন্টের শিশি বের করে নিয়ে এলো এবং রফিককে বিস্মিত করে তার শার্টে স্প্রে করে দিল। অনেক অনেক দিন পর রাহেলা ঘুমুতে যাবার সময় স্বামীর গায়ে হাত রাখল।দুঃস্বপ্ন দেখে জয়নালের ঘুম ভেঙেছে। সে বিছানায় জবুথবু হয়ে বসে আছে। টিনের চালে ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। ব্যাঙ ডাকছে।

রীতিমতো বর্ষা-পরিবেশ।জয়নাল ঘড়ি দেখল, তিনটা সাত বাজে।পানি খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়া যায়। গায়ে চাদর দিয়ে শুয়ে পড়লে আরামের ঘুম হবে। তার ঘুমোতে যেতে ইচ্ছা করছে না। বরং বৃষ্টির শব্দ শুনতে ইচ্ছা করছে। আমেরিকায় টিনের চালের বৃষ্টি, বৃষ্টির সঙ্গে ব্যাঙের ডাক শোনা যাবে না। একেকটা দেশ একেক রকম। বাংলাদেশ বৃষ্টির দেশ। সকালের বৃষ্টি এক রকম, দুপুরের বৃষ্টি আরেক রকম, আবার নিশিরাতের বৃষ্টি সম্পূর্ণ অন্যরকম। একটা ক্যাসেটে বৃষ্টির শব্দ রেকর্ড করে নিয়ে গেলে কেমন হয়?

আমেরিকায় পৌছানোর পর দেশের জন্যে যদি খুব মন খারাপ লাগে তাহলে ক্যাসেট বাজিয়ে শোনা হবে। ঘটনাটা হয়তো এরকম ঘটবে–সে এবং ইতি ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে রকিং চেয়ারে দোল খাচ্ছে। দুজনের হাতেই কফির মগ। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কারণ বাইরে প্রচণ্ড তুষারপতি হচ্ছে। তাপমাত্রা নেমে গেছে শূন্যের অনেক নিচে। তবে ঘরের ভেতরে ফায়ারপ্লেসের কারণে আরামদায়ক উষ্ণতা? সেই উষ্ণতায় আরামে হাত-পা ছেড়ে তারা দুজন শুনছে বাংলাদেশের বৃষ্টির ক্যাসেট-করা শব্দ। জয়নাল ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। শেষ পর্যন্ত আমেরিকা যাওয়া হবে তো?

দুঃস্বপ্নটা না যাওয়া বিষয়ক। স্বপ্নের শুরুটা ছিল সুন্দর। শুরুটা সুখ-স্বপ্নের। কিছুদূর গিয়েই সুখ-স্বপ্নটা হঠাৎ এবাউট টার্ন করে দুঃস্বপ্ন হয়ে যায়। স্বপ্নের শুরুতে দেখা যায় তারা তিনজন আমেরিকায় যাবার জন্যে এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হয়েছে। সে, শামসুদ্দিন সাহেব এবং ইতি। মালপত্র মাইক্রোবাসে তোলা হচ্ছে। শামসুদ্দিন সাহেব ইতিকে বৌমা বৌমা বলে ডাকছেন। মাইক্রোবাসে উঠে শামসুদ্দিন সাহেব বললেন, বৌমা, একটা পান খাওয়াও তো দেখি, বাংলাদেশে শেষ পানটা খেয়ে যাই। ইতি তাকে একটা পান দিল। তখন জয়নাল বলল, দেখি আমাকেও একটা পান দাও। ইতি পান বানিয়ে জয়নালের হাতে না দিয়ে সরাসরি মুখে ঢুকিয়ে দিল। খুবই অস্বস্তিকর ব্যাপার। শামসুদ্দিন সাহেব আড়চোখে ঘটনাটা দেখলেন। মাইক্রোবাসের ড্রাইভারও ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। স্বপ্নটা এই পর্যন্ত সুখ-স্বপ্ন।

এয়ারপোর্ট পৌঁছেই স্বপ্নটা হয়ে গেল দুঃস্বপ্ন। ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। শামসুদ্দিন সাহেব এবং ইতি ইমিগ্রেশন পার হয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। ইমিগ্রেশনের লোকজন জয়নালকে আটকে রাখল। দাড়িওয়ালা একজন ইমিগ্রেশন অফিসার (যার মুখটা জয়নালের খুবই পরিচিত, কিন্তু পরিচয়টা কিছুতেই মনে আসছে না) বারবার জয়নালের পাসপোর্টের পাতা উল্টাচ্ছেন আর জয়নালের দিকে কঠিন চোখে তাকাচ্ছেন। সব যাত্রী পার হয়ে যাচ্ছে। বিমান থেকে বারবার প্লেনে উঠার তাগিদ দেয়া হচ্ছে। অধৈর্য হয়ে জয়নাল বলল, স্যার, একটু তাড়াতাড়ি করুন। প্লেন ছেড়ে দিচ্ছে। ইমিগ্রেশন অফিসার বললেন, তাড়াতাড়ি করব কীভাবে, আপনার পাসপোর্টে তো ভিসার সিল নেই। জয়নাল বলল, এটা আপনি কী বলছেন?

দেখি পাসপোর্টটা! ইমিগ্রেশন অফিসার পাসপোর্টটা জয়নালের হাতে দিলেন। জয়নাল পাতা উল্টিয়ে দেখে পাসপোর্টের সবগুলো পাতা খালি, কোথাও কোনো লেখা নেই। শুধু শেষ পাতায় canceled সিল মারা।দুঃস্বপ্নের এই জায়গায় জয়নালের ঘুম ভাঙল। ঘুম ভাঙার পরপরই দাড়িওয়ালা ইমিগ্রেশন অফিসারকে সে চিনতে পারল। ভদ্রলোেক তার ছোটচাচা। দুঃস্বপ্নে তিনি ইমিগ্রেশন অফিসার হয়ে ধরা দিয়েছেন। ইতির উপদেশমতো কাজ করায় কিছুটা লাভ হয়েছে। ছোটচাচা আট হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। এবং লিখে পাঠিয়েছেন তাঁর হাত একেবারেই খালি। এই টাকাটা তিনি হাওলাত করে পাঠিয়েছেন।জয়নালের এখন সম্বল হলে সর্বমোট সাড়ে তেরো হাজার টাকা। এই টাকার অনেকটাই এনগেজমেন্টের জিনিসপত্র কেনায় খরচ হয়েছে।

শাড়ি (হালকা সবুজ) – ২,১০০ টাকা (জামদানি)

শাড়ি (সুতি) – ৪০০ টাকা

আংটি – ২,০০০ টাকা

মিষ্টি (এখনো কেনা হয় নি) – ৫০০ টাকা (৪ কেজি)

মোট ৫,০০০ টাকা

বকেয়া তিন মাসের বাড়িভাড়া বাবদ দিতে হবে চার হাজার পাচশ টাকা। নয় হাজার পাঁচশ চলে গেল। হাতে থাকল চার হাজার। এনগেজমেন্টের দিনে যদি সত্যি সত্যিই বিয়ে হয়ে যায় তাহলে বাড়তি টাকা কিছু তো লাগবেই।টিকিটের টাকা পুরোটাই বাকি। শুধু একটা টিকিট হাতে নিয়ে তো আমেরিকায় যাওয়া যায় না। অন্তত এক মাস নিজে নিজে চলার মতো ব্যবস্থা থাকা দরকার। জয়নালের কিছু বন্ধুবান্ধব বিদেশে চলে গেছে। তাদের কারোর ঠিকানা-ই জয়নালের কাছে নেই। ঠিকানা থাকলে তাদেরকে লেখা যেত। তার ছোটবেলার বন্ধু বরকতু ছিল মালয়েশিয়াতে। সেখানে কাগজপত্র না থাকায় কিছুদিন জেলও খেটেছে। জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে এই খবর জয়নালের কাছে আছে। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর সে কোথায়, কেউ জানে না। উড়া খবর সে এখন জাপানে। ইমরান আছে জার্মানিতে।

ইমরানকে জয়নাল চিঠি দিয়েছে। সেই চিঠি ইমরানের কাছে নিশ্চয়ই পৌছায় নি।পুলিশের ভয়ে ইমরান দুদিন পরপর ঠিকানা বদলায়। ভালো ভালো ছেলে বিদেশে গিয়ে চোরের জীবন যাপন করছে। কী আফসোস! ব্যাংক কি এই ব্যাপারে লোন দেবে? ব্যাংকের তো উচিত লোন দেয়া। নানান দুঃখ ধান্দা করে ছেলেরা বিদেশে যাচ্ছে- এদেরকে কি একটু সাহায্য করা উচিত না? এই ছেলেরাই তো বিদেশ থেকে এক সময় অতি মূল্যবান ফরেন কারেন্সি পাঠাতে শুরু করবে। দেশেরই তাতে লাভ।দেশে অনেক পয়সাওয়ালা লোক আছে। এরা স্কুল-কলেজ বানায়, মাদ্রাসা বানায়, এতিমখানা খোলে। তাদের কাছে কি সাহায্য চাওয়া যায় না?

বৃষ্টি থেমে গেছে। জয়নাল বিছানা থেকে নেমে কেরোসিনের চুলা ধরাল। চায়ের পিপাসা পেয়েছে। সিগারেট দিয়ে গরম এক কাপ চা খাবে। মন থেকে সব দুশ্চিন্তা আপাতত ঝেড়ে ফেলতে হবে। আগামীকাল সকাল থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত সে কোনো দুশ্চিন্তা করবে না। আগামীকাল রাতে তার এনগেজমেন্ট। ইতি যেভাবে বলেছে তাতে মনে হয় এনগেজমেন্টের সঙ্গে সঙ্গে কাজি ডাকিয়ে বিয়েও পড়ানো হয়ে যাবে। সেরকম কিছু হলে আগামীকাল তার বিয়ে। জীবনের তিনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিনের একটি। একটা মোবাইল টেলিফোন যদি তার কাছে থাকত ভালো হতো। টেলিফোনে ইতির সঙ্গে কথা বলা যেত।ইতি ঘুম-ঘুম চোখে টেলিফোন ধরে বলত–কে? জয়নাল বলত, আমি এক টেকো-মাথা অধম। তুমি কেমন আছ গো জানপাখি পুটুস-পুটুস?

উফ্, কী যে আপনার কথা! নাইন টেনে পড়া ছেলেরাও এরকম করে কথা বলে না। পুটুস-পুটুস আবার কী? তোমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আনন্দে হৃৎপিণ্ডে পুটুস-পুটুস শব্দ হচ্ছে, এই জন্যে বলছি পুটুস-পুটুস। কেমন আছ গো পিন-পিন? আপনার পায়ে পড়ি, এরকম করে কথা বলবেন না।তোমার পায়ে পড়ি, তুমি আমাকে আপনি করে বলো না। আমাকে যখন আপনি করে বললা তখন নিজেকে অনেক দূরের মানুষ মনে হয়।আপনি তো দূরেরই মানুষ। যখন কাছের হবেন তখন তুমি বলব। ভালো কথা, কাল যে আমাদের পানচিনি, মনে আছে? মনে আছে গো ইটি-মিটি।অনুষ্ঠানটা হবে পানচিনির। সেই অনুষ্ঠানকে বিয়ের অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত করা হবে। এটা মনে আছে?

মনে আছে গো টুন-টুনাং।উফরে আল্লাহ! আপনি কি দয়া করে অং-বং বলা বন্ধ করে স্বাভাবিকভাবে কথা বলবেন? স্বাভাবিকভাবে কথা না বললে আমি কিন্তু এখন টেলিফোন রেখে দেব।আচ্ছা যাও, স্বাভাবিকভাবে কথা বলব।বিয়ের পর আমি যে আপনার গুহায় থাকতে যাব সেটা কি মনে আছে? খাইছে রে আমারে! খাইছে রে আমারে আবার কী ধরনের ভাষা! দয়া করে এই ভাষায় আমার সঙ্গে কথা বলবেন না। আপনি রিকশাওয়ালা না, আর আমিও মাতারী না।আচ্ছা যাও, আর বলব না। তবে শোন, বিয়ের পর আমার সঙ্গে গুহায় থাকতে আসা ঠিক হবে না। বাথরুম সমস্যা। রাতে বাথরুম পেলে তুমি নিশ্চয়ই দারোয়ানদের বাথরুমে যাবে না?

সেটা আপনি দেখবেন। আমি আমার ইচ্ছার কথা জানালাম। আমি দেখে এসেছি আপনার বিছানার চাদর নোংরা। চাদর ধুইয়ে ইস্ত্রি করিয়ে আনবেন।ইয়েস ম্যাডাম।ঘর ফিনাইল দিয়ে মুছবেন।ওকি-ডকি! ওকি-ভকি আবার কী? আমেরিকান স্ল্যাং। আমরা যেমন বলি Ok, আমেরিকানরা বলে ওকি-ডকি।আমার সঙ্গে আমেরিকান স্ল্যাং বলবেন না।ইয়েস ম্যাডাম।আমাকে ম্যাডামও ডাকবেন না।ইয়েস ইতি।আমার সঙ্গে আহ্লাদীও করবেন না। বিয়ের আগে আহ্লাদী করা যায়। বিয়ের পর না।ই ই।ই ই টা আবার কী? ই ই হলো ইয়েস ইতি।

বানিয়ে বানিয়ে ইতির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে খুব মজা লাগছে। চা-টা খেতে ভালো হয়েছে। আজ একটা বিশেষ রাত – হয়তো বা শেষ ব্যাচেলর রাত। আমেরিকায় এই রতি বিশেষভাবে পালন করা হয়। সারারাত গান বাজনা হৈচৈ ফুর্তি চলে। ওরা ফুর্তিবাজ জাতি। ওদের কাণ্ডকারখানাই অন্যরকম।

Leave a comment

Your email address will not be published.