আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই পর্ব:৪ হুমায়ূন আহমেদ

আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই পর্ব:৪

আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই পর্ব:৪

সে উঠে চলে গেল। রান্নাঘরে বাতি জ্বললো। কিছুদূর লিখলাম। না, ভাল হচ্ছে না। মতিকে আমি নিজে যে ভাবে দেখছি সেভাবে লিখতে পারছি না। নিজের উপর রাগ লাগছে, সেই সঙ্গে আশেপাশের সবার উপর রাগ লাগছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মনে হল, পৃথিবীর কুৎসিততম চায়ে চুমুক দিলাম। না হয়েছে লিকার, না হয়েছে মিষ্টি। নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম, “এটা কি বানিয়েছো?” ছোট ছেলে নুহাশের ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুম ভাঙলেই সে খানিকক্ষণ কাঁদে। সে কাদছে। আমি বিরক্ত হয়ে গুলতেকিনকে বললাম, “দাড়িয়ে দেখছো কি? কান্নাটা থামাও না।”

গুলতেকিন কান্না থামাতে গেল। সে কান্না থামাতে পারছে না। কান্না আরাে বাড়ছে। কাঁদতে কাঁদতেই নুহাশ দু’বার ডাকলো, “বাবা! বাবা!” সে নতুন কথা শিখেছে। কি সুন্দর লাগে তার কথা ! আমার উচিত উঠে গিয়ে তাকে কোলে নিয়ে আদর করা। ইচ্ছা করছে না। বরং রাগে শরীর জ্বলছে। মনে হচ্ছে, এরা সবাই মিলে প্রাণপণ চেষ্টা করছে যেন আমি লিখতে না পারি। আমি ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত গলায় বললাম, “সামান্য একটা কান্নাও থামাতে পারছো না। তুমি কি করো ?”

গুলতেকিন ছেলে কেলে নিয়ে দরজা খুলে বাইরে যাচ্ছে। খােলা বারান্দায় খানিকক্ষণ হাঁটবে। নুহাশ আমাকে দেখে আবারও কাঁদতে কাঁদতে ডাকলো, “বাবা, বাবা!” আমি বিচলিত হলাম না। আমার সামনে মতি। কিছুক্ষণের মধ্যে মতির চোখ উপড়ে ফেলা হবে। এমন ভয়াবহ সময়ে ছেলের কান্না কোন ব্যাপারই না। বাচ্চার অকারণেই কাদে। আবার অকারণেই তাদের কান্না থেমে যায়। এর কান্না থামবে। এর দুঃখের অবসান হবে কিন্তু মতি মিয়ার কি হবে ।

ছেলের কান্না থেমেছে। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার মা তাকে বিছানায় শুইয়ে নিজে মাথার কাছে মূর্তির মত বসে আছে। আমার এখন খারাপ লাগতে শুরু করেছে। আমার মনে পড়েছে, নুহাশের সকাল থেকে জ্বর। তার মা তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছেলো। আমি নিয়ে যাইনি। ডাক্তারের চেম্বারে তিন ঘণ্টা বসে থেকে নষ্ট করার মত সময় আমার নেই। তা ছাড়া অসুখ-বিসুখ আমার ভাল লাগে না। একগাদা রােগীর মাঝখানে বসে থাকা ! হাতে নম্বর ধরিয়ে দেয়া বিয়াল্লিশ। ডাক্তার সাহেব দেখছেন সাত নাম্বার। কখন বিয়াল্লিশ আসবে কে জানে?

ডাক্তার নিয়ে যা করার গুলতেকিন করবে। আমি এর মধ্যে নেই। বাজারে যেতে হবে? নােংরা মাছ বাজারে থলি হাতে ঘােরা এবং প্রতিটি আইটেমে ঠকে আসা আমাকে দিয়ে হবে না। সেও গুলতেকিনের ডিপার্টমেন্ট। বাচ্চা কাচ্চাদের পড়াশােনা দেখা ? অসম্ভব ব্যাপার। নিজের পড়া নিয়েই কুল পাচ্ছি না। এদের পড়া কখন দেখব? যা হবার হবে। সংসার জলে ভেসে যাচ্ছে? যাক ভেসে।খুব স্বার্থপরের মত কথা। আমি অবশ্যই স্বার্থপর। নিজেরটাই দেখি – আর কিছু না। টিভিতে নাটক চলছে আমার সমস্ত মমত নাটকের জন্যে। রেকর্ডিং থেকে রাত বারটা-একটায় ফিরি। কোন রকম ক্লান্তি বােধ করি না। বাসার সবাই যে না খেয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে তা আমার চোখে পড়ে না। নাটক ছাড়া তখন মাথায় আর কিছুই ঢুকে না। এই মুহুর্তে নটিক ছাড়া আমার ভুবনে আর কিছু নেই।

মেয়ের জন্মদিন হবে। সে তার সব বান্ধবীকে দাওয়াত দিয়েছে। না, আমি তাে থাকতে পারবো না। নাটকের রিহার্সেল আছে। জন্মদিন প্রতি বছর একবার করে আসবে। রিহার্সেল তাে প্রতি বছর একবার করে আসবে না। এরা বুঝতে পারে না – নাটকের রিহার্সেল আমার জন্যে এত জরুরি কেন। আমি বুঝতে পারি না জন্মদিন ওদের এত জরুরি কেন? ক্রমে ক্রমেই আমরা দূরে সরে যাই। আমরা ব্যথিত হই। সেই ব্যথা কেউ কাউকে বুঝাতে পারি না।

অন্যসব ছেলেদের মত আমারও ইচ্ছা ছিল নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবো। অন্য দশজনের মত হলে আমার চলবে না। আমাকে আলাদা হতে হবে চারপাশের মানুষদের মধ্যে যা কিছু ভাল গুণ দেখেছি তাই নিজের মধ্যে আনার চেষ্টা করেছি – চেষ্টা পর্যন্তই, লাভ কিছু হয়নি। মানুষ পরিবেশ দিয়ে পরিচালিত হয় না, মানুষের চালিকাশক্তি তার ডি এন এ। যা সে জন্মসূত্রে নিয়ে এসেছে। তার চারপাশের জগৎ তাকে সামান্যই প্রভাবিত করে। আমি আমার ডি এন এ অণুর গঠন কি জানি না। আমাদের জ্ঞান সেই পর্যন্ত পৌছেনি। একদিন পৌছবে, তখন সবার ডি এন এ অণুর প্রিন্টআউট তাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হবে। তা দেখেই সে বুঝবে সে কেমন। অন্যরাও বুঝবে। সব রকম অস্পষ্টতার অবসান হবে।

মায়েরা তখন বাচ্চার রেজাল্ট কেন খারাপ হয়েছে এ নিয়ে বাচ্চাকে বকা-ঝকা করবেন না, কারণ তারা ডি এন এ প্রিন্ট আউট দেখেই বুঝবেন এ পরীক্ষায় কখনােই তেমন ভাল করবে না। প্রতিদিন একটা করে প্রাইভেট টিউটর খুলে খাইয়ে দিলেও লাভ হবে না। সেই সময় একটি শিশুর জন্মের পর পরই সবাই জানবে, বড় হয়ে এ হবে অন্যদের চয়ে একটু আলাদা। সে জােছনা দেখলে অভিভূত হবে, বৃষ্টি দেখলে অভিভূত হবে, সারাক্ষণ তার মাথায় খেলা করবে অন্য এক বােধ।

ব্যাপারটা হয়তো খুব সুখকর হবে না, কারণ তখন মানুষের ভেতর রহস্য বলে কিছু থাকবে না। একজন অন্য একজনকে পড়ে ফেলবে খেলা বইয়ের মত। মানুষের সবচেয়ে বড় অহংকার হল, সে বই নয়। তাকে কখনাে পড়া যায় না। তারপরেও মানুষকে বই ভাবতে আমার ভাল লাগে। একেকজন মানুষ যেন একেকটা বই। কোন বই সহজ তড়তড় করে পড়া যায়। কোন বই অসম্ভব জটিল। আবার কোন কোন বইয়ের হরফ অজানা। সেই বই পড়তে হলে আগে হরফ বুঝতে হবে। আবার কিছু কিছু বই আছে যার পাতাগুলি শাদা। কিছু সেখানে লেখা নেই। বড়ই রহস্যময় সে বই।

আমার নিজের বইটা কেমন ? খুব জটিল নয় বলেই আমার ধারণা। সরল ভাষায় বইটি লেখা। যে কেউ পড়েই বুঝতে পারবে। কিন্তু সত্যি কি পারবে? সারল্যের ভেতরেও তাে থাকে ভয়াবহ জটিলতা। যেখানে আমি নিজেই নিজেকে বুঝতে পারি না সেখানে বাইরের কেউ আমাকে কি করে বুঝবে? আমার নিজের অনেকটাই আমার কাছে অজানা। কিছু কিছু কাজ আমি করি কেন করি নিজেই জানি না। অন্য কেউ আমাকে দিয়ে করিয়ে নেয় বলে মাঝে মাঝে মনে হয়। আমার এই স্বীকারোক্তি থেকে কেউ মনে না করেন যে, আমি আমার কর্মকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব অন্য কোন অজানা শক্তির উপর ফেলে দেবার চেষ্টা করছি। আমি ভাল করেই জানি, আমার প্রতিটি কর্ম কাণ্ডের দায়দায়িত্ব আমার। অন্যের নয়।

লেখালেখির ব্যাপারটাই ধরা যাক। অনেকবার আমার মনে হয়েছে, লেখালেখির পুরো ব্যাপারটা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কেউ। যার নিয়ন্ত্রণ কঠিন। যে নিয়ন্ত্রণের আওতা থেকে বের হওয়ার কোন ক্ষমতা আমার নেই । নিজের একটা লেখা থেকে উদাহরণ দেই – ‘কৃষ্ণপক্ষ।’ মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস লিখবো – এই ভেবে শুরু করলাম। শুরুটা হল এই ভাবে “নােটটা বদলাইয়া দেন আফা, ছিড়া নোট।”

প্রথম বাক্যটি লিখেই পুরাে গল্প মাথায় সাজিয়ে নিলাম। সমস্যা দেখা দিল তখন। দ্বিতীয় বাক্যটি আর লিখতে পারি না। কত পৃষ্ঠা যে নষ্ট করলাম। প্রতিটিতে একটা বাক্য লেখা – “নোটটা বদলাইয়া দেন আফা, ছিড়া নােট।” বাসার সবাই অস্থির – হচ্ছে কি এসব? তাদের চেয়েও বেশি অস্থির আমি। পুরাে গল্প আমি সাজিয়ে বসে আছি, অথচ লিখতে পারছি না। এ কী যন্ত্রণা। শেষে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ঠিক করুলাম, যা হবার হবে। আগে থেকে ঠিকঠাক করা গল্প লিখবো না। যা আসে আসুক।শুরু হল লেখা। পাতার পর পাতা লেখা হতে লাগল। এমন এক গল্প । আনি লিখতে চাই নি। উপন্যাসের নায়কের ভাগ্য যেন পূর্ব-নির্ধারিত। লেখক হিসেবে তা বদলানাের কোন রকম ক্ষমতা আমাকে দেয়া হয়নি। আমি একজন কপিরাইটার। কপি করছি, এর বেশি কিছু না। কে করাচ্ছে কপি? আমার ডিএনএ অণু, না অন্য কিছু? আমি জানি না। মাঝে মাঝে এই ভেবে কষ্ট পাই – নিজের সম্পর্কে আমরা এত কম জানি কেন? প্রকৃতি কি চায় না আমরা নিজেকে জানি?

এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলি। সন্ধ্যা থেকেই কাজ করছি। খাটের পাশে।ছােট্ট টেবিল নিয়ে মাথা গুজে লিখে যাচ্ছি। এক মুহূর্তের জন্যেও মাথা তুলছি না। হঠাৎ কি যেন হল। মনে হল কিছু একটা হয়েছে। অদ্ভুত কিছু ঘটে গেছে। বিরাট কোন ঘটনা, আর আমি তাতে অংশগ্রহণ না করে বােকার মত মাথা গুজে লিখে যাচ্ছি। লেখার খাতা বন্ধ করে উঠে পড়লাম, কিন্তু বুঝতে পারলাম না ব্যাপারটা কি। অস্থিরতা খুব বাড়লো। একবার মনে হল, এইসব মাথা খারাপের পূর্ব লক্ষণ।

মাথা খারাপের আগে আগে নিশ্চয়ই মানুষের এমন ভয়ংকর অস্থিৰতা হয়। বারান্দায় এসে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে অস্থিরতার কারণ স্পষ্ট হল – আজ পূর্ণিমা। আকাশভরা জোছনা। প্রকৃতির এই অসাধারণ সৌন্দর্য উপেক্ষা করে আমি কি-না ঘরের অন্ধকার কোণে বসে আছি? অনেকেই বলবেন, এটা এমন কোন অস্বাভাবিক ঘটনা না। যেহেতু জোছনা আমার প্রিয়, আমার অবচেতন মন খেয়াল রাখছে কবে জোছনা।

সেই অবচেতন মনই মনে করিয়ে দিচ্ছে। আর কিছু নয়। অবচেতন মনের উপর দিয়ে অনেক কিছু আমরা পার করে দেই। ডাক্তারদের যেমন ‘এলার্জি’, মনােবিজ্ঞানীদের তেমনি ‘অবচেতন মন’। যখন রােগ ধরতে পারেন না তখন ডাক্তাররা গম্ভীর মুখে বলেন ‘এলার্জি’, মনােবিজ্ঞানী যখন সমস্যা ধরতে পারেন না, তখন বিজ্ঞের মত মাথা ঝাঁকিয়ে বলেন – ‘অবচেতন মনের কারসাজি। আর কিছুই না।’

সেই অবচেতন মনটাই বা কি? কতটুক তার ক্ষমতা? লেখকদের লেখালেখি কি অবচেতন মন নামক সমুদ্রে ভেসে উঠে? সেখান থেকে চলে আসে চেতন জগতে? ইপ্রিয় অগ্রাহ্য জগত থেকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে তার আগমন ? সেই ইন্দ্রীয় অগ্রাহ্য জগতটি আমার জানতে ইচ্ছে করে, বুঝতে ইচ্ছে করে।অনার্স ক্লাসে আমি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা পড়াই। আমাকে পড়াতে হয় ভাবনার হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র। আমি বলি শােন ছেলেমেয়ে, কোন বস্তুর অবস্থান ও গতি একই সময়ে নির্ণয় করা যায় না! এই দুয়ের ভেতর সবসময় থাকে এক অনিশ্চয়তা। তুমি অবস্থান পুবােপুরি জানলে গতিতে অনিশ্চয়তা চলে আসবে। আবার গতি জানলে অনিশ্চয়তা চলে আসবে অবস্থানে। ছাত্ররা প্রশ্ন করে, “স্যার কেন?”

আমি নির্বিকার থাকার চেষ্টা করতে করতে বলি – এটা প্রকৃতির বেঁধে দেয়া নিয়ম। প্রতি চায় না আমরা গতি ও অবস্থান ঠিকঠাক জানি। জ্ঞানের অনেকখানি। প্রকৃতি নিজের কাছে রেখে দেয়। প্রকাশ করে না।

“কেন স্যার?”

“জানি না।”

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের অনেক প্রশ্নের উত্তরে আমাকে বলতে হয় -“জানি না।” জ্ঞানের তীব্র পিপাসা দিয়ে মানুষকে যিনি পঠিয়েছেন তিনিই আবার জ্ঞানের একটি অংশ মানুষের কাছ থেকে সরিয়ে রেখেছেন।

“কেনো?”

“উত্তর জানা নেই।”

এই মহাবিশ্বের বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তরই আমাদের জানা নেই। আমরা জানতে চেষ্টা করছি। যতই জানছি ততই বিচলিত হচ্ছি। আরো নতুন সব প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা নিদারুণ আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ্য করছেন তাদের সামনে কঠিন কালাে পর্দা। যা কোনদিনই উঠানাে সম্ভব হবে না। কি আছে এই পর্দার আড়ালে তা জানা যাবে না। আমার যাবতীয় রচনায় আমি ঐ কালে পর্দাটির প্রতি ইংগিত করি। আমি জানি না আমার পাঠক-পাঠিকারা সেই ইংগিত কি ধরতে পারেন, নাকি তার গল্প পড়েই তৃপ্তি পান। উদাহরণ দেই।

কৃষ্ণপক্ষ উপন্যসের নায়ক মুহিবের বিয়ের দিন। একটা কটকটে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি পরে এসেছিল। সবাই তাই নিয়ে খুব হাসাহাসি করলো। ছেলেটি মারা গেল।বিয়ের পর দিন। তার স্ত্রী অরুর বিয়ে হল অন্য এক জায়গায়। কোটে গেল দীর্ঘ কুড়ি বছর। কুড়ি বছর পর সেই অরুর মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। বাড়িতে তুমুল উত্তেজনা। বর এসেছে, বর এসেছে। অরু আগ্রহ করে নিজেও তার কন্যার বর দেখতে গেলেন। ছেলেকে দেখেই তিনি চমকে উঠলেন। তার গায়েও কটকটে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি। যেন এই ছেলে কুড়ি বছর আগের মুহিবের পাঞ্জাবিটা পরে চলে এসেছে।

অনেকেই আমাকে বলেছেন, কৃষ্ণপক্ষ উপন্যাস থেকে হলুদ পাঞ্জাবির অংশটা বাদ দিলে উপন্যাসটা সুন্দর হত। উপন্যাসে এই অংশটুকুই দুর্বল। হিন্দী ছবির মত মেলোড্রামা। অথচ উপন্যাসটা লেখাই হয়েছে হলুদ পাঞ্জাবির ব্যাপারটির জন্যে। আমি কি আমার বােধ পাঠকদের কাছে ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হচ্ছি? এরা হিমুর বাইরের রূপটি দেখে। তার উদ্ভট কাণ্ডকারখানায় মজা পায় কিন্তু এর বাইরেও তো হিমুর অনেক কিছু বলার আছে। হিমু ক্রমাগত বলেও যাচ্ছে । কেন কেউ এ ধরতে পারছে না? লেখক হিসেবে এরচেয়ে বড় ব্যর্থতা আবে কি হতে পারে ?

আমি আমার গল্পটা লিখে শেষ করেছি। মতির চোখ উপড়ে ফেলার গল্প। সাধারণত গল্পগুলি আমি গভীর রাতে শেষ করি। এই প্রথম শেষ করলাম বিকেলে। আনন্দে চোখে পানি এসে গেল। চোখ মুছে শােবার ঘরে এসে দেখি, আমার মেয়েরা সবাই সাজ-পােশাক পরছে। একেকজনকে পরীর মত দেখাচ্ছে।

আমি বললাম, “ব্যাপার কি ?”

ওরা ঝলমল করতে করতে বললো, “তুমি কাপড় পরে নাও। দেরি করছ কেন? আমরা বিয়েতে যাব না?”

ওদের মা বললো, “তাের বাবার চোখ দেখে বুঝতে পারছিস না, সে যাবে না? সে ঘরে চুপচাপ একা একা বসে থাকবে।”

বড় মেয়ে দুঃখীত গলায় বললো, “বাবা তুমি যাবে না?”

আমি বললাম, “অবশ্যই যাব। কে বলেছে যাব না?”

শার্ট-প্যান্ট ইস্ত্রি করা নিয়ে অতিরিক্ত রকম ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বিয়েবাড়িতেও সবার সঙ্গে খুব হৈ-চৈ করলাম। গল্পগুজব, রসিকতা। সবাই ভাবলো, বাহ লােকটা বেশ মজার তো। কেউ আমার নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারলো না। শুধু এক ফাকে গুলতেকিন এসে বললো, “তোমার কি হয়েছে?” আমি জবাব দিলাম না। আমার কি হয়েছে আমি নিজেই কি ছাই জানি? শুধু জানি, মতি মিয়ার গল্প লিখে শেষ করেছি। মতি মিয়া এখন আর আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কাতর অনুনয় করবে না – ‘স্যার, আমার ব্যাপারটা লিখে ফেলুন।’

জীবনের গভীরতম ব্যাথাকে আমি অনুভব করতে পারি। জোছনার অপূর্ব ফুলকে আমি দেখতে পাই – কিন্তু তারা অন্তরের এতই গভীরে যে, আমি তুলে আনতে পারি না। বার বার হাত ফসকে যায়। দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী জেগে আমি অপেক্ষা করি। কোন দিন কি পারবো সেই মহান বােধকে স্পর্শ করতে? নিজেকে বােঝাই – ভাগ্যে যা আছে তা হবে।

Every man’s fate

We have fastened

On his own neck

(সুরা বনি ইস্রায়িল)

আমরা কি করবো, না করবো সবই পূর্ব নির্ধারিত। কি হবে চিন্তা করে ? নিয়তির হাতে সব ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে অপেক্ষা করাই ভাল।আমি অপেক্ষা করি।

কবি সাহেব

ভোরবেলা ঘুম ভেঙেই যদি শুনি–কেউ একজন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, চুপচাপ বসার ঘরে বসে আছে, তখন সঙ্গত কারণেই মেজাজ খারাপ হয়। ভোরবেলাটা মানুষের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করার জন্যে আদর্শ সময় না। ভোরবেলার নিজস্ব চরিত্র আছে, আছে কিছু আলাদা নীতিমালা। ভোরবেলার নীতিমালা হলো, ঘুম থেকে উঠে নিজের মতো থাকবে, কোনোরকম টেনশন রাখবে না। হাত-পা ছড়িয়ে চা খাবে। খবরের কাগজ পড়বে। মেজাজ ভালো থাকলে গান শোনা যেতে পারে। মেজাজ খারাপ থাকলে গান শোনারও দরকার নেই। ভোরবেলায় যা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ তা হচ্ছে–অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা। এই সময়ে কথা বলতে হবে শুধু পরিচিত এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে।

আমার কপাল মন্দ। যারা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তারা ভোরবেলায় আসেন। যারা আসেন তারা সহজে যেতে চান না। ইশারা-ইঙ্গিতে অনেকভাবে তাঁদের বুঝানোর চেষ্টা করি দয়া করে এখন উঠুন। আমার ইশারা-ইঙ্গিত হয় তারা বুঝেন না, নয় বুঝেও না বোঝার ভান করে।আজ যিনি এসেছেন তাঁকেও আমি বিদেয়-হতে-না-চাওয়া লোকদের দলে ফেললাম এবং মোটামুটি হতাশ হয়েই তার সামনে বসলাম। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের উপর। হালকা পাতলা গড়নের ছোটখাটো মানুষ। গায়ের রঙ ধবধবে সাদা।

গায়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে মাথার চুলও সাদা। কোলের উপর কালো চামড়ার হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। তাঁকে দেখেই মনে হচ্ছে, কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকতেই তিনি অভ্যস্ত। আমি বললাম, আপনি কি কোনো কাজে এসেছেন? তিনি মৃদু গলায় বললেন, না।আমি আঁতকে উঠলাম। যারা সরাসরি বলেন, কোনো কাজে আসেন নি, তাঁরা সাধারণত অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে থাকেন। দুপুরের আগে তাদের বিদেয় করা যায় না।আমি বললাম, কী জন্যে এসেছেন আমি কি জানতে পারি?

জি পারেন।

দয়া করে বলুন।

আমি মফস্বলে থাকি। শহরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ কম। বড় শহর আমার ভালো লাগে না।আমি ভদ্রলোকের কথার ধরন ঠিক বুঝতে পারছি না। শহর প্রসঙ্গে তার বিতৃষ্ণা আমাকে শোনানোর কারণও আমার কাছে ঠিক স্পষ্ট হলো না। আমি মনের বিরক্তি চেপে সিগারেট ধরালাম।শহর পছন্দ করি না, তবু নানা কাজকর্মে শহরে আসতে হয়।তা হয়। পছন্দ না করলেও এই জীবনে আমরা অনেক কিছু সহ্য করি। আপনি কি চা খাবেন?

জি-না। আমার সামান্য কিছু কথা আছে। কথাগুলো বলে আমি চলে যাব।আমি আশান্বিত হয়ে বললাম, বলুন। কথা বলে যদি উনি চলে যান তাহলে কথাগুলো শুনে নেওয়াই ভালো। সামান্য কথা বলছেন, তা-ও আশার ব্যাপার, হয়ত, ঘণ্টাখানিকের মধ্যে উদ্ধার পাওয়া যাবে।আমার বড়কন্যা-বিষয়ে একটি গল্প শোনাব।

শোনান।আমি অনেক রাত জেগে পড়াশোনা এবং লেখালেখি করি–একরাতে লেখালেখি করছি হঠাৎ শুনি আমার কন্যা খিলখিল করে হাসছে। কিছুক্ষণ থামে, আবার হাসে। আবার থামে, আবার হাসে। আমি বিরক্ত হলাম। তাকে বললাম, হাসছ কেন মা? সে বলল, গল্পের বই পড়ে হাসছি বাবা। আমি বললাম, হাসির গল্প? সে বলল, না দুঃখের গল্প।

কিন্তু মাঝে মাঝে হাসির কথা। আমি বললাম, নিয়ে আস। আমার মেয়ে নিয়ে এল। আমি সেই বই পড়লাম। আপনার লেখা বই। আমি আগে কখনো আপনার নাম শুনি নি। এই প্রথম শুনলাম।এইটা কি আপনার গল্প।জি।আপনার গল্প শুনে খুশি হয়েছি। আপনি যে আমার একটি বই পড়েছেন সেটা জেনেও ভালো লাগল।আমার কথা একটু বাকি আছে।জি বলুন।ভদ্রলোক নিচু গলায় বললেন, আমি নিজে একটি গল্পগ্রন্থ রচনা করেছি। সেই গ্রন্থটি নিয়ে এসেছি।

 

Read more

আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই পর্ব:৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *