আমি এবং আমরা পর্ব:০৬ হুমায়ূন আহমেদ

আমি এবং আমরা পর্ব:০৬

মিসির আলির জ্ঞান কতদিন পর ফিরল তা তিনি জানেন না। চোখ মেলে দেখলেন প্রশস্ত একটি ঘরে তিনি শুয়ে আছেন। বিছানা অপরিচিত। চারপাশের পরিবেশ অপরিচিত। পায়ের কাছে মস্ত কাচের জানালা। জানালা বন্ধ। কাচের ভেতর দিয়ে রোদ এসে তাঁর পায়ে পড়েছে। খুব আরাম লাগছে। তাঁর গায়ে সুন্দর একটা কম্বল। কম্বল থেকে ওষুধের গন্ধ আসছে। তিনি প্রচণ্ড ক্ষুধাও বোধ করছেন। মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন কিছু খাচ্ছেন না। মিসির আলি চোখ বন্ধ করলেন। ঘরে প্রচুর আলো। এত কড়া আলোতে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না।কেমন আছেন মিসির আলি সাহেব?

জি ভালো।আপনার জ্বর পুরোপুরি রেমিশন হয়েছে। আপনি আমাদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন।মিসির আলি চোখ খুললেন। আলো এখন আর আগের মতো চোখে লাগছে না। তার বিছানার পাশে যে মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন তিনি একজন ডাক্তার। গলায় ষ্টেথিসকোপ ঝুলানো দেখে তাই মনে হয়। নার্স্যরাও ষ্টেথিসকোপ ব্যবহার করে, তবে তারা কখনো গলায় পরে না।মিসির আলি বললেন, আমি প্রচণ্ড খিদে বোধ করছি।আপনি খিদে বোধ করছেন। এটা খুবই সুলক্ষণ। হালকা কিছু খাবার দিতে ।এটা কি হাসপাতাল? হাসপাতাল তো বটেই। তবে প্রাইভেট হাসপাতাল।আমি কতদিন ধরে আছি?

আজ হচ্ছে ফিফথ ডে। আপনার অবস্থা এমন ছিল যে আমরা ধরেই নিয়েছিলাম। আপনি কমায় চলে যাচ্ছেন।মিসির আলি সহজ গলায় বললেন, কমা-সেমিকেলনে আমি যাব না। যদি যেতে হয় সরাসরি ফুস্টপে চলে যাব।ডাক্তার হাসলেন। মিসির আলির মনে হল বেশিরভাগ ডাক্তার হাসেন না। তবে যারা হাসেন তারা খুব সুন্দর করে হাসেন।মিসির আলি সাহেব! জি।আপনি বিশ্রাম করুন! চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাকুন। আমি আপনার খাবারের ব্যবস্থা করছি।আজকের একটি খবরের কাগজ কি পেতে পারি?

অবশ্যই পেতে পারেন। তবে আমার মনে হয় খবরের কাগজ পড়ার চেয়ে বিশ্রাম আপনার জন্যে অনেক জরুরি। নাশতা খেয়ে লম্বা একটা ঘুম দিন। চোখ বন্ধ করে ফেলুন।মিসির আলি চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর অনেক কিছু জানার ছিল। কে তাঁকে এমন এক আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিল? ঘরের যা সাজসজ্জা তাতে মনে হয় হাজারখানেক টাকা হবে দৈনিক ভাড়া। দেয়ালে ছোট্ট বারো ইঞ্চি টিভি দেখা যাচ্ছে। রোগীর বিনোদনের ব্যবস্থা। ঘরের দেয়াল, মেঝে সবই ঝকঝকি করছে। কোথাও কোনো ঘড়ি নেই। টিভির চেয়েও ঘড়ির প্রয়োজন ছিল বেশি।

কোন এক বিচিত্র কারণে অসুস্থ হলেই ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে করে।নার্স নাশতা নিয়ে এল। এক স্নাইস রুটি। ডিম পোচ, একটা কমলা। গরম এক কাপ চা।মিসির আলি বললেন, সিগারেট কি খাওয়া যাবে সিস্টার? না, সিগারেট খাওয়া যাবে না। এটা হাসপাতাল, ধূমপান মুক্ত এলাকা।গরম চায়ের সঙ্গে একটা সিগারেট খেতে পারলে আমার অসুখ পুরোপুরি সেরে যেত বলে আমার ধারণা।এখানকার ডাক্তারদের সে রকম ধারণা না। কাজেই সিগারেট খেতে পারবেন না। নাশতা খেয়ে নিন। আপনার গা আমি স্পঞ্জ করে দেব।এই রুমটার ভাড়া কত?

প্ৰতিদিন পনের শ টাকা।মিসির আলির মুখ শুকিয়ে গেল। তিনি হাজার টাকায় তিনি এবং বদু সারা মাস চালান। তার মধ্যে বাড়িভাড়া ধরা আছে।নার্স কঠিন মুখ করে বলল, বড়লোকদের চিকিৎসার খুব ভালো ব্যবস্থা বাংলাদেশে আছে।মিসির আলি বললেন, অবশ্যই আছে। তবে মজার ব্যাপার কি জানেন সিস্টার–এত করেও বড়লোকরা কিন্তু মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পান না। গরিবরা যেভাবে মরে তাদেরও ঠিক একইভাবে মরতে হয়।এখন হয়, একদিন হয়তো হবে না। দেখা যাবে অমর হবার ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। ত্ৰিশ লক্ষ চল্লিশ লক্ষ টাকা দাম। শুধু বড়লোকরা সেই ওষুধ কিনতে পারছে।মিসির আলি তার গোছানো কথায় চমৎকৃত হলেন। অধিকাংশ মানুষই আজকাল গুছিয়ে কথা বলতে পারে না। চিন্তা এলোমেলো থাকে বলে কথাবার্তাও থাকে এলোমেলে।

সিস্টার, আপনার সঙ্গে খুব জরুরি কিছু কথা আছে। আমি আপনার পরামর্শ ও সাহায্য চাচ্ছি। আমার পক্ষে প্রতিদিন পনের শ টাকা ভাড়া দিয়ে এখানে থাকা সম্ভব নয়। আমি দরিদ্র মানুষ। একদিনের ভাড়া কী করে দেব তাই বুঝতে পারছি না। আমি আজই এখান থেকে বিদেয় হতে চাই। সেটা কী করে সম্ভব তা আপনি দয়া করে বলে দেবেন। যে টাকা আপনার পান তাও একসঙ্গে আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। আমাকে ভাগে ভাগে দিতে হবে। তার একটা এ্যারেঞ্জমেন্টও করতে হবে।স্যার, আপনাকে এসব নিয়ে মোটেই ভাবতে হবে না। আমাদের হাসপাতালের নিয়ম হচ্ছে—ভর্তি হবার সময়ই পুরো টাকা দিতে হয়। আপনার বেলাতেও তাই হয়েছে। কেউ-একজন নিশ্চয়ই পুরো টাকা দিয়েছেন।সেই কেউ-একজনটা কে?

আমি তো স্যার বলতে পারব না। আপনি চাইলে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারি।দয়া করে খোঁজ নিয়ে দেখুন।নার্স কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এল। তার হাতে একটি বই, একটি মুখ বন্ধ খাম।স্যার, যিনি আপনাকে এখানে ভর্তি করিয়ে গেছেন, তার নাম মুশফেকুর রহমান। তিনি আপনার জন্যে বইটা রেখে গেছেন। চিঠিও রেখে গেছেন। আর স্যার আমি খোঁজ নিয়েছি–আপনার জন্যে পনের দিনের রুম পেমেন্ট করা আছে। তার আগেই যদি আপনি চলে যান তা হলে টাকাটা রিফান্ড করা হবে।মিসির আলি চিঠি পড়লেন। সুন্দর হাতের লেখা। এই লেখা দেখে আগেও একবার মুগ্ধ হয়েছিলেন, আজো হলেন।

শ্ৰদ্ধেয় স্যার,

আপনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমি আপনাকে এই প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে এসেছি। আপনার বিনা অনুমতিতেই এটা করতে হল। কারণ অনুমতি দেওয়ার মতো অবস্থা আপনার ছিল না।আপনার পাখি দুটি আমি আমার নিজের কাছে নিয়ে রেখেছি। আপনার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা আমি চালিয়ে নিতে চেষ্টা করছি। ফলাফল এখন পর্যন্ত শূন্য। দুটি পাখিই খাচ্ছে। আমি আরো কয়েকদিন দেখব।আপনি অসুস্থ অবস্থায় নীলু। নীলু বলে ডাকছিলেন। ভদ্রমহিলার ঠিকানা জানার জন্যে আমি আপনার কিছু কাগজপত্র ঘাটাঘাঁটি করেছি। এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আপনার অবস্থা দেখে আমি খুবই শঙ্কিত বোধ করছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল। ঐ মহিলাকে যেভাবেই হোক খুঁজে বের করা দরকার।

আমি তাকে খুঁজে পেয়েছি। তবে এখনো আপনার কোনো খবর তাকে দেওয়া হয় নি। আপনি চাইলেই দেওয়া হবে। পাখিবিষয়ক আরেকটি গ্রন্থ আপনাকে পাঠালাম-Mysteries of Migratory Birds. আমি বইটি পড়ে আনন্দ পেয়েছি-আপনিও পাবেন বলেই আমার ধারণা।

বিনীত

ম. রহমান

মিসির আলি পরপর তিনবার চিঠি পড়লেন। সব দীর্ঘ চিঠিতেই অপ্রকাশ্য কিছু কথা থাকে। যে কথা পত্ৰলেখকের মনে আছে, কিন্তু তা তিনি জানাতে চান না। সেই অপ্ৰকাশ্য কথা পত্ৰলেখকের অজান্তে ধরা পড়ে। এখানেও কি ধরা পড়েছে? না, পড়ে নি। এই চিঠি খুব সাবধানে লেখা হয়েছে।পাখির ওপর লেখা বইটিতে মিসির আলিকে উদ্দেশ্য করে দুটা লাইন লেখা : দ্রুত সেরে উঠুন। এই শুভ কামনা

তন্ময়।

একটি বিষয় লক্ষণীয়-সে দুটি নাম ব্যবহার করেছে। এর থেকে কি কিছু দাঁড় করানো যায়? না, যায় না। এত সহজে কিছু দাঁড় করানো সম্ভব নয়। তথ্যের পাহাড় যোগাড় করতে হয়। সেই অসংখ্য তথ্যের ভেতর থেকে বেছে বেছে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো নিয়ে ঘর বানাতে হয়। একটা নয়–বেশ কয়েকটা তার থেকে বেছে নিতে হয় মূল প্রাসাদ…কঠিন কাজ।নার্স মেয়েটি গামলা ভর্তি গরম পানি এবং একটা তোয়ালে নিয়ে এসেছে। পা স্পঞ্জ করবে। মিসির আলি বললেন, আমি কি আরেক পেয়ালা চা খেতে পারি? জি না স্যার। চা, একটা উত্তেজক পানীয়। ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস না করে। আপনাকে দেওয়া যাবে না।আপনার নাম কী?

আমার নাম জাহেদা।শুনুন জাহেদা, আপনি যদি আমাকে খুব গরম এক কাপ চা না খাওয়ান তা হলে আমি আপনাকে গা স্পঞ্জ করতে দেব না।জাহেদা চলে গেল। মিসির আলি খুশি মনে অপেক্ষা করছেন। মেয়েটির মোরালিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যখন ফিরে আসবে তখন তাকে বলা হবে-শুনুন জাহেদা, আপনি আমাকে একটা সিগারেট এনে দিন। আমাকে একটা সিগারেট না খাওয়ালে আমি ওষুধ খাব না। গোপনে এনে দিন। আমি বাথরুমে বসে খেয়ে নেব। কেউ কিছুই বুঝতে পারবে না।

জাহেদা ফিরে এল। কঠিন পলায় বলল, ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি নিষেধ করেছেন। কাজেই চা হবে না। আপনি শার্ট খুলুন।মিসির আলি লক্ষ করলেন, তার নিজের মোরালিটিই ভেঙে যাচ্ছে। শার্ট খুলে ফেলাই ভালো।মিসির আলি ভেবেছিলেন তিনি পুরোপুরি সেরে গেছেন। দুপুরে শুয়ে শুয়ে পাখিবিষয়ক বইটি পড়তে পড়তেই তার মাথা ধরল। সন্ধ্যাবেলা আবার জ্বর এল। দেখতে দেখতে জ্বর বেড়ে গেল। পুরো রাত কাটল জুরের ঘোরে। সকালে আবার ভালো। ডাক্তার যখন দেখতে এলেন তখন পায়ে জ্বর নেই। শরীর ঝরঝরে লাগছে। পরপর তিনদিন একই ব্যাপার। মিসির আলি ডাক্তারকে বললেন, কী ব্যাপার ডাক্তার সাহেব? আমার হয়েছে কী? ডাক্তার সাহেব বললেন, এখনো বলতে পারছি না। টেস্ট করা হচ্ছে।কদিন থাকতে হবে?

তাও বলা যাচ্ছে না।মিসির আলি শঙ্কিত বোধ করছেন। হাসপাতালের আকাশছোঁয়া বিল অন্য একজন দিয়ে দেবে তা হয় না। পুরো বিল তিনিই দেবেন। কিছু টাকা তিনি আলাদা করে রেখেছিলেন-ভয়াবহ দুঃসময়ের জন্যে। সেই টাকায় হাত দিতে হবে। রাজকীয় চিকিৎসা তার জন্যে না। সরকারি হাসপাতালে যাওয়া দরকার। এই হাসপাতাল ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না। প্রতিদিন ভোরকেলা অনেকখানি রোদ এসে তার পায়ে পড়ে। এই দৃশ্যটি তাঁর অসাধারণ লাগে। অন্য কোনো হাসপাতালে এরকম হবে না। রোদে পা মেলে দিয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকার এই আনন্দ থেকে তিনি নিজেকে বঞ্চিত করতে চান না। একজন মানুষের জীবন হচ্ছে ক্ষুদ্র আনন্দের সঞ্চয়।

একেক জন মানুষের আনন্দ একেক রকম। তাঁরটা হয়তোবা কিছুটা অদ্ভুত।তিনি আজো রোদে পা মেলে শুয়ে আছেন। চোখ বন্ধ। হাসপাতালের নার্স ভঁাকে জানিয়েছে-আজ তাকে বাড়তি এক কাপ চা দেওয়া হবে। শুধু তাই না, সিগারেটও দেওয়া হবে। তবে সিগারেট খেতে পারবেন না। হাতে নিয়ে বসে থাকবেন। তাই-বা কম কী। তামাকের গন্ধ নেওয়া হবে।কেমন আছেন স্যার? মিসির আলি চোখ না মেলেই বললেন, ভালো।আমাকে চিনতে পেরেছেন?

পেরেছি। আপনি মুশফেকুর রহমান। বসুন।চেয়ার টানার শব্দ হল। মিসির আলি ফুলের গন্ধ পেলেন। মুশফেকুর রহমান তাঁর জন্যে ফুল নিয়ে এসেছে। টেবিলে ভারী কিছু রাখার শব্দ হল। ফুল নয়-অন্যকিছু। ফল হতে পারে। কী ফল? কমলা হবে না। কমলার ঘ্রাণ তীব্র। তিনি গন্ধ পাচ্ছেন না। সম্ভবত আপেল এবং কলা। না, কলা হবে না। আপেল এবং কলা এক ঠোঙায় আনা হবে না। তিনি একটি ঠোঙা রাখার শব্দ শুনেছেন। হয়তো আপেল। না, আপেলও হবে না। তিনি যে শব্দ শুনেছেন তাতে মনে হয়েছে শক্ত কিছু রাখা হয়েছে, যেমন ডাব। তবে ডাব হবে না। ডাব কেউ টেবিলে রাখবে না। মেঝেতে রাখবে–তা হলে কী?

মিসির আলি চোখ মেললেন, তবে টেবিলের দিকে তাকালেন না। তাকালেন। মুশফেকুর রহমানের দিকে। তিনি এক ধরনের বিস্ময়বোধে আক্রান্ত হলেন। কোলের উপর হাত রেখে শািন্ত, ভদ্র ও বিনয়ী একটা ছেলে বসে আছে।তিনি মুশফেকুর রহমানকে দিনের আলোয় কখনো দেখেন নি। একজন মানুষকে দিনের আলোয় এক রকম দেখাবে, রাতে অন্য রকম তা তো হয় না। ছেলেটির মধ্যে মেয়েলি ভাব অত্যন্ত প্রবল। এ ব্যাপারটি তিনি আগে কেন লক্ষ করেন নি? ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ। লাল ঠোঁট, বেশ লাল, চোখের মণি ঘন কালো এবং ছলোছালো। ইংরেজি উপন্যাসে চোখের বর্ণনায় পাওয়া যায়-Liquid eyes, এরও তাই। চোখের পল্লবও মেয়েদের চোখের মতো দীর্ঘ। বয়সও খুব বেশি নয়। পঁচিশ থেকে পঁয়ত্ৰিশের মতো হবে। তাঁর ধারণা ছিল মুশফেকুর রহমানের বয়স চল্লিশের বেশি।

মিসির আলি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ছেলেটি কথা বলছে এমনভাবে যে জিহ্বা দেখা যাচ্ছে না। তবু মিসির আলি লক্ষ করলেন ছেলেটির জিহ্বা কালো নয়। অন্য দশজনের মতোই।মুশফেকুর রহমান বলল, স্যার, আপনি হেডমাস্টারদের মতো আমাকে দেখছেন। কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন।আপনার জিহ্বার রঙ কালো না।দিনের বেলা রঙ ঠিক থাকে।কেন? আপনি বলুন কেন? আপনি কি কোনো রঙ মাখেন? জি স্যার, মাখি। এক ধরনের এজো ডাই-নাইট্রোজেন ঘটিত জৈব রঙ। দিনের বেলা লোকজনের সামনে কালো জিব নিয়ে বেরুতে ইচ্ছা করে না।আপনার বয়স কত? তেত্রিশ। স্যার, আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন।বেশ বলব।আপনাকে আজ আর বিরক্ত করব না। শরীর সারুক। আমি সব সময় খোঁজ রাখছি।থাংক ইউ।পাখিবিষয়ক বইটি কি নেড়েচেড়ে দেখেছেন? আমি গোড়া থেকেই পড়ছি-পঞ্চাশ পৃষ্ঠার মতো পড়া হয়েছে।বই পড়তে কষ্ট হয় না?

না। তবে সন্ধ্যার পর কিছু পড়তে পারি না। তখন চোখ জ্বালা করে, মাথায় যন্ত্রণা হয়।মুসফেকুর রহমান উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, স্যার, আমি আমার কিছু ঘটনা লিখে এনেছি। পড়তে যাতে আপনার কষ্ট না হয় সে জন্যে ভাগ ভাগ করে লিখেছি। প্রতিটি চ্যাপ্টারের শেষে আমি আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টাও করেছি। আপনার ইচ্ছা না হলে ব্যাখ্যাগুলো পড়ার দরকার নেই।মিসির আলি বললেন, কী ধরনের ব্যাখ্যা? একজন মনোবিজ্ঞানীর ব্যাখ্যা।মনোবিজ্ঞানে তোমার কী কিছু পড়াশোনা আছে? মুশফেকুর রহমান বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল, সামান্য আছে। আমি মনোবিজ্ঞানের ছাত্র। এই বিষয়ে এম. এ. করেছি।কোন সনের ছাত্র? বলতে চাচ্ছি না, স্যার।মিসির আলি বললেন, তুমি কি কখনো আমার ছাত্র ছিলে?

জি ছিলাম। গোড়া থেকে এই কারণেই আপনাকে স্যার ডাকছি। আপনার কাছে আসার আমার কারণও এইটিই। স্যার, আজ আমি উঠি?তোমার ঐ ঠোঙায় কী আছে? কিছু বেদানা নিয়ে এসেছি। টাইম পত্রিকায় পড়েছিলাম–বেদানায় আছে ভিটামিন K, রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরিতে ভিটামিন কে খুব কাজ করে। নার্সকে বলে। দিয়েছি, ও বেদানার রস তৈরি করে আপনাকে দেবে। স্যার যাই।মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন। হালকা নীল শার্ট পরা, মাথাভর্তি কুচকুচে কালো চুলের এই যুবকটিকে কী সুন্দর লাগছে! কিন্তু সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে! আগেও একবার খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখেছেন। সেবার বাঁদিকে ঝুঁকে হাঁটছিল। এখন হাঁটছে ডানদিকে ঝুঁকে।

শ্রদ্ধেয় স্যার,

স্যারদের নামের আগে শ্ৰদ্ধেয় ব্যবহার করা আমাদের প্রাচীন রীতি। যদিও এই সমাজের বেশিরভাগ শিক্ষকরাই শ্ৰদ্ধেয় বিশেষণ দাবি করেন না। স্কুলে আমাদের একজন অঙ্ক স্যার ছিলেন। তিনি খুব ভালো অঙ্ক জানতেন। ছাত্রদের বুঝাতেনও খুব সুন্দর করে। তিনি আমাকে ডাকতেন–সৰ্প-শিশু! মাঝে মাঝেই মজা করার জন্যে আমাকে বলতেন, এই কর তো! হা করে তোর কুচকুচে কালো জিহাটা নড়াচড়া কর। দেখি কেমন লাগে।আমি তাই করতাম। তিনি মজা পেয়ে হো হো করে হাসতেন। এই শিক্ষককে কি শ্ৰদ্ধেয় বলা ঠিক হবে?

আমি আপনার নামের আগে বহুল-ব্যবহৃত বিশেষণ ব্যবহার করেছি। এর চেয়ে সুন্দর কিছু ব্যবহার করতে পারলে আমার ভালো লাগত। আপনি অল্প কিছুদিন আমাদের ক্লাস নিয়েছেন। পড়াতেন এবনারমাল বিহেভিয়ার। প্রথমদিন ক্লাসে ঢুকেই বললেন, আমি তোমাদের এবনারমাল বিহেভিয়ার পড়াতে এসেছি। পড়ানোর সময় কী করলে আমার আচরণকে তোমরা এবনারমাল বলবে? আমরা কেউ কোনো কথা বললাম না। ছাত্র হিসেবে আমরা আপনাকে যাচাই করে নিতে চাচ্ছিলাম। আপনি বললেন, আচ্ছা, আমি যদি এই টেবিলের উপর উঠে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেই–তা হলে কি তোমরা আমার আচরণকে এবানরমাল বলবে?

একজন ছাত্র বলল, হ্যাঁ।আপনি বললেন, প্রাচীন গ্রিসে কিন্তু ক্লাসরুমে টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেবার প্ৰচলন ছিল। তারা মনে করুত শিক্ষক সবচেয়ে সম্মানিত। তাকে দিতে হবে সবচেয়ে সম্মানের স্থান। তাদের কাছে টেবিলে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়াটাকে অস্বাভাবিক আচরণ মনে হত না। কোনো শিক্ষক যদি মেঝেতে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতেন সেইটা হতো অস্বাভাবিক। কাজেই অস্বাভাবিকের সংজ্ঞা কী? সংজ্ঞা হল-আমরা যা দেখে অভ্যস্ত তার বাইরে কিছু করাটাই অস্বাভাবিক।মজার ব্যাপার হল মানুষ খুব অস্বাভাবিক একটি প্রাণী, অথচ আমরা মানুষের কাছে স্বাভাবিক আচরণ আশা করি। আচ্ছা, তোমরা একজন কেউ বল তো, মানুষ অস্বাভাবিক প্রাণী কেন?

ক্লাসের কেউ কথা বলল না। আপনি হাসিমুখে বললেন, মানুষ অস্বাভাবিক তার কারণ মানুষের মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্ক একই সঙ্গে লজিক এবং এন্টি-লজিক নিয়ে কাজ করে। প্রতিটি প্রশ্নের দুটি উত্তর সে সমান গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে-একটি হ্যাঁ, অন্যটি না। সে মনে করে দুটি উত্তরই সত্য। তা হয় না।

প্রশ্ন : ঈশ্বর বলে কি কিছু আছেন? উদাহরণ দেই।

উত্তর : হ্যাঁ এবং না।

প্রশ্ন : আমরা কি শূন্য থেকে এসেছি?

উত্তর : হ্যাঁ এবং না।

প্রশ্ন : আমরা কি শূন্যতে মিশে যাব?

উত্তর : হ্যাঁ এবং না।

স্যার, আপনি ঝড়ের গতিতে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন এবং নিজেই উত্তর দিচ্ছেন-হ্যাঁ এবং না। আমরা মুগ্ধ ও বিস্মিত। ক্লাসের শেষে আপনার নাম হয়ে গেল হ্যাঁ-না স্যার। বিশ্বাস করুন স্যার, এই নাম আমরা কখনো ব্যঙ্গার্থে ব্যবহার করি নি। এই নাম উচ্চারণ করেছি। শ্রদ্ধা ও ভালবাসায়।লজিক ব্যবহার করার আপনার অস্বাভাবিক ক্ষমতার সঙ্গে আমাদের অল্প সময়ের ভেতর পরিচয় হল। শার্লক হোমস-এর সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। কোনান ডায়ালের উপন্যাসের মাধ্যমে। শার্লক হোমস কল্পনার চরিত্র। আমরা বাস্তবের একজন সাধারণ মানুষকে দেখলাম যার চিন্তাশক্তি এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতা অতিমানব পৰ্যায়ের।

Leave a comment

Your email address will not be published.