আশ্চর্য প্রদীপ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আশ্চর্য প্রদীপ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

অনিকেত চাকরি করে একটা আধা-বিদেশি ফার্মে, কেটেকুটে নিয়ে মাসে বেতন পায় সাতশো ছাব্বিশ টাকা। তার মধ্যে বাড়ি ভাড়াতে যায় একশো আশি, দুধ পঞ্চান্ন, ঝি পনেরো। খবরের কাগজ, ইলেকট্রিসিটি, ছেলের ইস্কুলের মাইনে এসব বাদ-সাদ গিয়ে হাতে যা থাকে তা দিয়ে বেঁচে থাকা যায়। তার বউ ঝুমুর আবার একটু বড়লোকের মেয়ে।

খুব বড়লোক নয়, তবে কলকাতায় বাড়ি আছে, ওর এক দাদা গাড়িও কিনেছে। ঝুমুর তাই একটু নাক-উঁচু। প্রায়ই বলে —গ্যাসের উনুন কেনো। কিস্তিবন্দিতে একটা ফ্রিজ কেনা যায় না? বাইরের ঘরটায় ভাড়ার টেবিল ফ্যান রেখে মাসে-মাসে টাকা গচ্চা যাচ্ছে, একটা পাখা কিনলেই তো হয়।

ঝুমুর এসব বলে-বলে অনিকেত রাগ করে না। বরঞ্চ তার মনের মধ্যেও ওসব ইচ্ছে হয়। নিজস্ব পাখা, গ্যাসের উনুন, ফ্রিজ এসব আজকাল মধ্যবিত্ত ঘরেও দেখা যায়। তার বন্ধুদেরও অনেকের আছে। একটা তিনশো টাকার ইনক্রিমেন্ট যদি দৈবক্রমে পেয়ে যেত তাহলে বেশ হত। কিন্তু সে আশা নেই। বরং এবছর নাকি বোনাসও কমে যাবে। মনটা নিশপিশ করে। বড্ড গরিবিয়ানামতে তারা থাকে। অনেকদিন ধরে ভালো জামা-প্যান্টও করায় না সে। কত নতুন ধরনের প্যান্ট-জামার কাপড় বেরিয়েছে গত এক বছর ধরে।

পুরোনো বাড়ি ছেড়ে মাসচারেক হল অনিকেত নতুন বাড়িতে এসেছে বন্ডেল গেটে। নতুন বাড়ি বলতে কিন্তু বাড়িটা নতুন নয়। বরং বেশ পুরোনো বাড়ি। দেড়খানা একতলার ঘরের জন্য একশো আশি টাকা গুনতে হয়। এর আগে শেয়ালদার কাছে ছিল, দুখানা ঘরের ভাড়া একশো দশ। কিন্তু ছেলেটাকে সাউথের ভালো স্কুলে ভরতি করার পর থেকেই ঝুমুর সাউথে আসার জন্য। অস্থির। তাই আরও সত্তর টাকা মাসিক গুনাগার দিয়ে চলে আসতে হয়েছে দক্ষিণে। ছেলের ইস্কুলটাই এখন বড় কথা।

বাড়িটা ভালো লাগে না অনিকেতের। বড্ড অন্ধকার। একটা ঘর নীচের তলায়, আর আধখানা ঘর পেয়েছে গ্যারেজের ওপর। গ্যারেজের ওপরকার ঘরটা বড়ই ছিল, বাড়িওয়ালা দেওয়াল তলে সেটাকে দু-টুকরো করে বাকি আধখানা ঘরে তার অনেক পুরোনো জিনিসপত্তর ডাঁই করে রেখেছে। তবু এই ঘরটায় কিছু আলোবাতাস আসে। অনিকেত এটাকেই তার বসার ঘর করেছে, যদিও তার বাসায় লোকজন বড় আসে না। অনিকেতও কাউকে ডাকে না। লোকজন এলে ভদ্রতা-টদ্ৰতা করতে ঝুমুর বড় খুশি হয় না। বউয়ের খুশিটাই তো এখন বড় কথা।

অনিকেত খুব ভাবতে ভালোবাসে। বলতে কি ভাবাটাই হচ্ছে তার সবচেয়ে প্রিয় নেশা। একটা সিনেমা দেখল, কি একটা বই পড়ল, অমনি সিনেমা বা বইয়ের গল্পের সুতো ধরে কত কী চিন্তা তার মাথায় মায়াজাল ছড়িয়ে দেয়। আর সেসব চিন্তার মধ্যে প্রধান হয়ে দাঁড়ায় একটা চিন্তা—আমার যদি অনেক টাকা থাকত!

অফিস থেকে ফিরে এসে প্রায় সময়েই সে একটু রাতের দিকে এই আধখানা ঘরটায় এসে বসে সিগারেট খায় আর ভাবে। ছুটির দুপুরে এখানেই এসে মেঝেয় পড়ে ঘুমোয়।…….গ্রীষ্মকাল পড়ে গেছে। রবিবার। বেলা করে খেয়ে অনিকেত চুপচাপ চলে এল দেড়তলার ঘরখানায়। একাবোকা শুয়ে থাকল মেঝেয় শতরঞ্জি পেতে। একটা সিগারেট শেষ হয়েছে, আর একটা ধরাবে কি না ভাবতে-ভাবতে ঘুমের আমেজ চলে এল। ঘুম আসার এই সময়টা বড় ভালো লাগে অনিকেতের। বাস্তবের সঙ্গে স্বপ্ন কেমন গুলিয়ে যায়। এসব ব্যাপারগুলো আছে। বলেই মানুষের বেঁচে থাকাটা একরকম সওয়া যায়।

ঘুমঘোরে অনিকেত আবোল-তাবোল আধোচেতনায় অনেক হিজিবিজি দেখছিল। এ সময়ে একটা ঠুনঠুন শব্দে চটকা ভাঙল তার। পাশ ফিরে দেখল, একটা ধেড়ে ইঁদুর একটা বেশ বড়সড় প্রদীপের মতো কী একটা জিনিস টেনে এনেছে মেঝেয়। প্রদীপটা তাদের নয়, অনিকেত জানে। বোধহয়, বাড়িওয়ালার গুদামঘরটা থেকেই এনেছে। “যাঃ, যাঃ” বলে তাড়া দিতেই ইঁদুরটা প্রদীপ ফেলে পালিয়ে গেল।

অনিকেতের কাছ থেকে খুব দূরেও নয় প্রদীপটা। সে হাত বাড়িয়েই নাগাল পেল। হাতে তুলে নিয়ে দেখল, বেশ ভারী। ‘সলিড মেটাল! সোনা-টোনা নয়তো!’ বলে হাতলওয়ালা মস্ত প্রদীপটা একটু নাড়াচড়া করল সে। প্রদীপটার গায়ে ময়লা পড়েছে বহুদিনের। এটা যে দীর্ঘকালের ব্যবহার হয়নি তা দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু জিনিসটা সুন্দর।

এখনও বেচে দিলে পাঁচ-দশ টাকা পাওয়া যাবে। অবশ্য বেচবার কথা এমনিই ভাবল সে। বেচবার প্রশ্নও ওঠে না। অন্যের জিনিস। কিছুক্ষণ প্রদীপটা হাতে নিয়ে শুয়ে রইল সে। হঠাৎ মাথায় ভাবনা এল—আচ্ছা, এটা যদি সেই আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হত। যদি এটাতে হাতে ঘষলেই এখন একটা দৈত্য এসে দাঁড়ায় আর বলে—কি চাও বলো, এক্ষুনি এনে দিচ্ছি!

ভাবনা-চিন্তারও একটা শক্তি আছে। অনিকেত উঠে বসল। যদি সত্যিই এরকম কিছু হয়। যদিও বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এসে এসব বিশ্বাস কোনও কাজের নয়, তবু যদি হত! অ্যাঁ! যদি হত?

প্রদীপটা হাতে নিয়ে আঙুলে একটা ঘষা দেয় সে। একা ঘরেও তার হাসি পাচ্ছিল, আর বোকা-বোকা লাগছিল নিজেকে। জানে তো এসব সত্য নয়। এরকম হয় না তবু সে কয়েকবার প্রদীপটার ভিতর দিকে ডান হাতের বুড়ো আঙুল জোরে বারকয়েক ঘষা দিল।

না, কিছুই ঘটল না। কিন্তু হঠাৎ ভেজানো দরজাটার কড়া খুটখুট করে আস্তে নড়ে উঠল। ঝুমুর এল নাকি চা নিয়ে? চট করে হাতের ঘড়িটা দেখে নিল অনিকেত। না, ঝুমুর এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে না। মোটে দুটো পঁচিশ।

–কে?………উত্তর নেই।………..অনিকেত প্রদীপটা রেখে গিয়ে দরজা খুলে অবাক। খুব লম্বাচওড়া আর খুব দামি পোশাকপরা একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত ছ’ফুট তিন-চার ইঞ্চি লম্বা তো হবেই। বিশাল কাঁধ, প্রকাণ্ড বুক, ইয়া চওড়া হাতের কবজি। বিদেশি সিনথেটিক কাপড়ের সাদা স্যুটপরা গলায় টাই, মৃদু একটা ইনটিমেট সেন্টের গন্ধ ছড়াচ্ছে লোকটার গা থেকে। বোধহয় বকসিং বা কুস্তি করে। কিন্তু খুব ফরসা আর সুপুরুষ, মুখে মৃদু বিনীত একটু হাসি।

অনিকেতকে দেখেই দু-হাত জড়ো করে বলল—আমাকে চিনবেন না। আমি প্রদীপের দৈত্য।…………..অনিকেত বলল—প্রদীপ দত্ত? প্রদীপ দত্ত! আপনার সঙ্গে কোথাও কী পরিচয়—?………………লোকটা মাথা নেড়ে বলল—প্রদীপ দত্ত নয়। প্রদীপের দৈত্য! আপনি এক্ষুনি ওই প্রদীপটা ঘষেছিলেন, তাই না?

স্তম্ভিত অনিকেত মাথা নাড়ল—আজ্ঞে হ্যাঁ।………লোকটা বলল—তাই আসতে হল। বলুন, এখন আপনার জন্য কী করতে পারি?……যদিও অনিকেত বিশ্বাস করতে পারছিল না, লোকটাকে, তবু বলল—ভিতরে আসুন।

প্রকাণ্ড এবং সুপুরুষ লোকটা মাথা নীচু করে ঘরে এল। চারিদিকে চেয়ে বলল—ঘরটা— ভীষণ ছোটো আর স্টাফি, এই ঘরে থাকেন কী করে?…………………….—অভ্যেস। তা ছাড়া পাচ্ছিই বা কোথায়?……লোকটা অনিকেতের সোফা সেটে পা ছড়িয়ে বসল, কিন্তু মুখে সেই অতিবিনীত হাসি আর হাবভাবে নম্রতা ছড়িয়ে আছে।

অনিকেত মুখোমুখি বসল, তার সস্তা সিগারেটের প্যাকেটটা লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল—আমরা গল্পে পড়েছি, আশ্চর্য প্রদীপ ঘষলে তার ভিতর থেকে ধোঁয়ার মতো বিশাল চেহারার দৈত্য বেরিয়ে আসত। এই বড়-বড় দাঁত, তালগাছের মতো উঁচু চেহারা!

লোকটা সিগারেট দেখে হাতজোড় করে বলল—ওটা পারব না মিস্টার বোস। এখন থেকে আপনি আমার বস। বসের সামনে ধূমপান করাটা বেয়াদবি।…….অনিকেত খুশিই হল। প্যাকেটে গোনাগুনতি ছ’টা সিগারেট আছে, আজ আর কিনবার কথা নয়। একটা ফালতু খরচ হয়ে গেলে অসুবিধে হত। সকালে চায়ের পরের সিগারেটটায় টান পড়ত।

লোকটা বলল, হ্যাঁ, যে কথা জিগ্যেস করছিলেন। চেহারার কথা তো! সেই ধোঁয়ার মতো বড় নিয়ে দেখা দিলে, আপনিও খুশি হতেন না, পাঁচজনে চেঁচামেচিও করত। তা ছাড়া ইভোলিউশন বা বিবর্তন বলেও তো একটা কথা আছে। তাই যে-যুগের যেমন দরকার, তেমনি হয়েই আমাকে আসতে হয়। ক্লায়েন্টরা ঘাবড়ে গেলে বা হার্টফেল করলে ফায়দা কী? বলে লোকটা হাঁ করে দাঁতগুলো দেখিয়ে বললেন—এই দুপাশে দুটো মস্ত দাঁত ছিল, সব ছোট করে ফেলেছি স্ক্রেপ করিয়ে। এ যুগে ওসব প্রি-হিস্টোরিক দাঁত কি চলে?

অনিকেতের নিজের এখন সিগারেট খাওয়ার কথা নয়। একটু আগেই খেয়েছে। হিসেব করে না চললে!……….লোকটা হেসে বলল—তাই আপনি প্রদীপ ঘষামাত্র আমি প্রদীপ থেকে বেরিয়ে আসিনি, বরং আপনাকে ঘাবড়ে যেতে না দিয়ে খুব ভদ্রভাবে দরজায় নক করেছি।

অনিকেতের বুকটা কাঁপছিল। উত্তেজনায় সিগারেটটা ধরিয়েই বুঝল বেহিসেবি খরচ হয়ে যাচ্ছে। আবার তৎক্ষণাৎ মনে হল—এ লোকটা যদি প্রদীপের দৈত্যই হয়ে থাকে তবে এর কাছে অনায়াসেই তো এক প্যাকেট সিগারেট চাওয়া যায়! একটু ভেবে অনিকেত খুব লাজুক স্বরে বলল —এক প্যাকেট সিগারেট যে এখন কাকে দিয়ে আনাই।

—জাস্ট এ মিনিট। লোকটা টপ করে উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টের পকেট থেকে এক প্যাকেট পাঁচশো পঞ্চান্নর কিং সাইজ কুড়িটার প্যাকেট আর-একটা খুদে গ্যাসলাইটার বের করে সেন্টার টেবিলে রেখে বলল—আমি এটা আগেই আন্দাজ করেছিলাম। ইউ মে নিড এ লট অব সিগারেটস। বলুন, এখন আর কী করতে পারি!

খুবই অবিশ্বাসভরে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা দেখল অনিকেত। তার বুক কাঁপছে, অসম্ভব নার্ভাস লাগছে, ভয় করছে। তবু লোকটার বিনয় আর ভদ্রতা দেখে তার একটু সাহসও হচ্ছিল আস্তে-আস্তে। সে বলল—আমি যা চাই সব দিতে পারবেন?….লোকটা অল্প মাথা নেড়ে বলল—নিশ্চয়ই।

যে-কোনও বস্তুগত জিনিসই আমি আপনাকে দিতে পারি। কিন্তু যদি আপনার মন খারাপ লাগে কখনও, বা যদি গানের গলা না থাকা সত্বেও কখনও আপনার সঠিক সুরে গান গাইতে ইচ্ছে করে তাহলে সেসব ক্ষেত্রে আমার কিছু করার নেই। কিন্তু মন ভালো রাখার জন্য আমি আপনাকে সিনেমার টিকিট, সুন্দরী মেয়ে বা ভালো মদ সাপ্লাই দিতে পারি, গানের জন্য তানপুরা, হারমোনিয়ান বা ভালো ওস্তাদ এনে দিতে পারি।

—যদি অসুখ হয়?……..—তার জন্য ডাক্তার বা ওষুধ এনে দেওয়ার ভার আমার, কিন্তু অসুখ সারানোর দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। বস্তুগত সব জিনিসই আপনি আমার কাছ থেকে পাবেন, বাট নাথিং অ্যাবস্ট্রাক্ট অর ম্যাজিকাল।

অনিকেত মাথা নেড়ে বলে–বুঝেছি।…….লোকটা মিষ্টি হেসে বলল—এ যুগের সঙ্গে আমার ক্ষমতাকেও সীমাবদ্ধ রাখতে হয়েছে।……অনিকেত শ্বাস ফেলে বলল—তাতেই হবে।………..লোকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বলল—ধন্যবাদ। এবার বলুন—….অনিকেতের চাইতে লজ্জা করছিল। একটা লোক তাকে মাগনা মাগনা জিনিসপত্র দেবে ভাবতে কেমন লাগে।

তাই সে সরাসরি কিছু চাইতে পারল না। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল— আমার নাম অনিকেত! এ নামের মানে আপনি কি জানেন?………..লোকটা হেসে বলল—আলবত! অনিকেত মানে যার নিকেত বা নিকেতন অর্থাৎ বাড়ি নেই। মানে গৃহহীন।

অনিকেত মৃদু লাজুক হেসে বলে—আমি সার্থকনামা। আমার বাড়ি নেই।………..—ইট উইল বি অ্যারেঞ্জেড। বলে লোকটা মাথা নেড়ে পকেট থেকে একটা চমৎকার নোটবই আর ডটপেন বের করে বলল—বলুন, কীরকম বাড়ি আপনার দরকার? রিকোয়ারমেন্টগুলো একটু ডিটেলে বলবেন।

অনিকেত ভীষণ সংকোচের সঙ্গে বলে—ছোটখাটো একটা বাড়ি হলেই হবে। যেমন হোক।……—সঙ্কোচ করবেন না মিষ্টার বোস। আমি আপনার যে-কোনও হুকুম তামিল করতে বাধ্য। ডোন্ট বি শাই।

অনিকেত একটু ভেবে বলল—দোতলা। পাঁচ-ছ’খানা ঘর। ভালো বাথরুম-টাথরুম! দক্ষিণে বারান্দা। যদি একটু বাগান—?বলে থামল।……-হুঁ-হুঁ বলুন। ঘরগুলো কত বাই কত?……..—মাঝারি। খুব বড় বা ছোট নয়।

–বুঝেছি। ফার্নিচারের কথা কিছু বলবেন?………..—ফার্নিচার? হ্যাঁ, ফার্নিচার। ধরুন, ডানলোপিলোর সব চেয়ার, সোফা, বার্মা টিক-এর খাট। মানে, সব মর্ডান জিনিস আর কি! আপনি যেমন ভালো বুঝবেন তেমন! আর আমার স্ত্রী একটা ফ্রিজের কথা প্রায়ই বলেন, আর গ্যাস উনুন।

লোকটা নোটবই বন্ধ করে বলল, বাড়িটা কোন এরিয়ায় হলে আপনার পছন্দ?…….—ধরুন, নিউ আলিপুর! না, না, সেখানে বড় নির্জন জায়গা, চাকরেরা দুপুরে বাড়ির গিন্নিকে খুন করে পালানোর কেস কাগজে পড়েছি। তার চেয়ে যোধপুর পার্ক ভালো।

লোকটা মাথা নাড়ল, বলল—ইট উইল বি অ্যারেঞ্জড। ভাববেন না। কাল বেলা এগারোটায় আমি আপনার অফিসে ফোন করব। ততক্ষণে একটা কিছু ব্যবস্থা হবে। আমি আসি তাহলে। বলে লোকটা উঠল।

অনিকেত তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে দিতে বলল—আচ্ছা, আমি আপনাকে কী বলে ডাকব বলুন তো?……………লোকটা একটুও না ভেবে হেসে বলল—ইজি। আপনি যে নামে আমাকে প্রথম ডেকেছিলেন সেই নামে ডাকবেন। প্রদীপ দত্ত।

লোকটা চলে গেল। হঠাৎ অনিকেতের মনে হল কী বোকা আমি! টেলিভিশনের কথাটা বলে দিলাম না! ভেবে পরমুহূর্তেই সে হাসল। ভাবল, দূর! লোকটাকে তো আবার এক্ষুনি ডাকতে পারি। কিন্তু এক্ষুনি আবার ডাকতে লজ্জা করল বলে ডাকল না। কাল তো দেখা হবেই।

প্রদীপটা খুব সাবধানে কাগজে মুড়ে ঘরের বুক-শেলফে একটা ডিকসনারিকে সরিয়ে খুঁজে রাখল। তার কেবলই মনে হচ্ছিল, এটা স্বপ্ন। কিন্তু পাঁচশো পঞ্চান্ন নম্বরের প্যাকেট আর লাইটার। এখনও পড়ে আছে টেবিলে। সে খুব মেজাজে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর ভাবল—এরকম। হা-ভাতের মতো আমি এতকাল বেঁচে ছিলাম কী করে?………….না আচাঁলে বিশ্বাস নেই।

সে ঝুমুরকে কিছু বলল না। কাঁপা বুক আর উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। খেতে পারল না, ঘুমও হল না ভালো করে। আজ তার বারবার মনে হচ্ছিল, ঝুমুর দেখতে নিতান্তই সাদামাটা। এত সাধারণ মেয়ে নিয়ে ঘর করায় কোনও মজা নেই।

পরদিন ঠিক বেলা এগারোটায় ফোন এল। প্রদীপ দত্ত বলল—মিস্টার বোস একটা ট্যাক্সি নিয়ে এক্ষুনি চলে আসুন। আমি আপনার জন্য গড়িয়াহাটের পুব দিকের ফুটপাথে বাসস্টপে অপেক্ষা করছি। অফিস থেকে হাফ ছুটি নিন, আর ট্যাক্সি ফেয়ার আমিই দেব।

তাই হল। যথাস্থানে প্রদীপ দত্ত অপেক্ষা করছিল, ট্যাক্সিতে অনিকেতের পাশে মৃদুতে উঠে বসে অতি সুগন্ধী রুমালে ঘাড় মুখ মুছতে বলল—খুব ভালো বাড়ি পেয়েছি, আপনার যদি পছন্দ হয় তো এ সপ্তাহেই নেগোশিয়েশন হয়ে যাবে।

অনিকেত ভ্রূ তুলে বলল–বাড়িটা কি রাতারাতি তৈরি করলেন?……..প্রদীপ দত্ত হেসে ফেলে বলল—আরে না, না। মিস্টার বোস, আগের দিনে যেমন হত তেমন কি আজকালও হবে? ফাঁকা জায়গারও তো ওনার আছে। তা ছাড়া রাতারাতি বাড়ি উঠলে সবাই এসে চেপে ধরবে আপনাকে। কর্পোরেশন, ট্যাক্স, সি ই এস সি, কে নয়? এখন যা হবে সব গ্রু প্রপার নেগোশিয়েশন। আপনাকে আমি তো বিপদে ফেলতে পারি না।

ট্যাক্সি যেখানে এসে থামল সেটা যোধপুর পার্কের চমৎকার একটা চওড়া রাস্তা। বাড়ি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। সামনে অনেকখানি লন, ফুলের বেড়। অকল্পনীয় সুন্দর নকশার টালি বসানো মেঝে। নীচের তলায় ছ’খানা ঘর, দোতলায় চারখানা। তিনতলায় দুই ঘরের

স্টাডি, রুফ গার্ডেন।………প্রদীপ দত্ত বলল—সদ্য তৈরি হয়েছে বাড়িটা। এখনও কেউ থাকেনি। বাড়ির মালিক শেয়ার মার্কেটে জোর মার খেয়ে বাড়ি বিক্রি করতে চাইছে।………………একটু লজ্জার সঙ্গে অনিকেত বলে কত?…………—ছ’লাখ। ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। দ্যাটস মাই হেডেক।

তবু সঙ্কোচ বোধ করে অনিকেত। টি ভি সেটটার কথা বলতে লজ্জা করে।……কিন্তু প্রদীপ দত্ত যেন তার মনের কথা টের পেয়েই বলল—টি ভি সেট বা মোটরগাড়ির কথা আপনার রিকোয়ারমেন্টসে ছিল না, কিন্তু সেসব অ্যারেঞ্জ করা হয়েছে। এখন আপনার একটা প্রেজেন্টেবল সোর্স অব ইনকাম আর ট্যাক্স রিটার্নগুলো দেখাতে হবে। সে সমস্ত নিয়ে অবশ্য আপনাকে ভাবতে হবে না। লিভ এভরিথিং অন মি। আপনি বরং মিসেসকে নিয়ে এসে বাড়িটা দেখিয়ে দিন।

ঝুমুর! ঝুমুরের কথা অনিকেত ভুলেই গিয়েছিল। এখন অবশ্য ঝুমুরের কথা ভাবতেও তার ভালো লাগছিল না। ইদানীং ঝুমুর বড় মোটা হয়ে গেছে। ভীষণ রাগীও। তা ছাড়া ঝুমুরের মধ্যে রহস্যও নেই আর।…………..অনিচ্ছার সঙ্গে অনিকেত বলল—আচ্ছা।

প্রদীপ দত্ত তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হাসল, বলল—আর যদি আপনি ইন্টারেস্টেড হন তবে ডিভোর্সের মামলা লড়ার জন্য ভালো উকিলের অ্যারেঞ্জমেন্ট করা যেতে পারে। হাই অ্যালিমনি দিলে মিসেসও খুব ঝামেলা করবেন না। যদি রাজি থাকেন তো সেসব আমিই নেগোশিয়েট করতে পারি।

একটু লাল হল অনিকেত। বুকটা নানা আশা-আকাঙ্ক্ষায় গুরগুর করে পাখির ডাক ডাকছে। মাথা নীচু করে সে বলল—তা নয়। ঝুমুরও থাক। ছেলেটাকে ছেড়ে থাকতে পারি না। তবে অন্য মেয়ে–

প্রদীপ দত্ত হঠাৎ গলা নীচু করে বলল—কীরকম মেয়েছেলে চান?………অনিকেত রুমালে মুখ ঢেকে, লাল হয়ে অনেক কষ্টে তার গোপন ইচ্ছের কথা অস্ফুটে বলল —টিনএজার। সুন্দর লাইভলি।

—ওকে।………সাতদিনের মধ্যেই জীবন পালটে গেল অনিকেতের।……ঝুমুর বাড়ি দেখে এত অবাক যে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলতে পারছে না। টুইন গ্যারাজে দু দুটো দামি গাড়ি, ঘরে-ঘরে ভাবা যায় না এমন সব জিনিস চাকর, ঝি, মালি, সফারে বাড়ি গিজগিজ।

পাঁচ-সাতটা ঘর এয়ারকন্ডিশন করা। এসব কি আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের কাণ্ড নাকি?……..কয়েকবারই জিগ্যেস করেছে অনিকেতকে—এসব কী গো?কী করে হল?……–হয়েছে প্রপার নেগোশিয়েশনস। অনিকেত বলে—সব ট্যাক্স পেইড। চিন্তার কিছু নেই। এর বেশি কিছু বলে না অনিকেত।

একদিন প্রদীপ দত্ত ফোন করল—মিস্টার বোস, একটু দেরি হয়ে গেল কিছু মনে করবেন। আপনার রিকোয়ারমেন্টস অনুযায়ী একটি টিনএজার গার্ল পাওয়া গেছে। না, না, চিন্তার কিছু নেই, এসব ব্যাপারের জন্য ক্যামাক স্ট্রিটে একটা ফার্নিশড অ্যাপার্টমেন্ট আপনার নামে কেনা হয়েছে। আজ সন্ধেবেলা চলে আসুন। দিস অ্যাপার্টমেন্ট উইল বি ইওর প্লেজার স্পট। আপনার সফার ঠিকানা জানে।

শুনে অবধি অসম্ভব নার্ভাস লাগছিল অনিকেতের। হৃৎপিণ্ড এত জোরে ধাক্কা দিচ্ছে পাঁজরে যে সেই শব্দ নিজের কানে শুনতে পাচ্ছিল সে!…….তবু গেল। তীব্র উত্তেজনা। এতদিনে সে জীবনকে উপভোগ করতে পারছে। এই তো জীবন।

সফার এক আটতলা বাড়ির সামনে নিয়ে এল অনিকেতকে। লিফটে সাততলায় উঠে কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে বিনীত হাসিমুখে প্রদীপ দত্ত বলল—এভরিথিং সেট। আসুন স্যার।…….অ্যাপার্টমেন্টটা তার নিজের বাড়ির তুলনায় তেমন কিছু নয়। তবু এটাও চূড়ান্ত শৌখিন জায়গা। ঘরজোড়া কার্পেট, সোফা সেট, দুর্দান্ত সব আসবাব। ফ্রিজ, টি ভি সবই আছে। আর আছে ছোট্ট একটা বার, তাতে অন্তত পঞ্চাশ-ষাট রকমের বিলিতি মদ।

অসামান্য সুন্দরী মেয়েটি বসেছিল একদম ভিতরের দিকে একটা ঘরে। দরজার গা-তালায় চাবি ঢুকিয়ে প্রদীপ দত্ত দরজা খুলতে-খুলতে বলল—মেয়েটা অ্যাগ্রেসিভ, ওয়াচ ইয়োর স্টেপস।…….শুনে একটু চমকে যায় অনিকেত। ঘরে ঢুকে সে আর একবার চমকায়। ঘরে একটা ডিভান, একটা ড্রেসিং টেবিল, দুটো ছোট টুল আর-একটা হোয়াট নট ছাড়া বেশি কিছু নেই। এক গোছা রজনীগন্ধা ভাঙা ফুলদানি সহ মেঝেয় ছিটিয়ে পড়ে আছে, জলে ভিজে শপশপ করছে কার্পেটমোড়া মেঝে।

ড্রেসিং টেবিলের আয়না চুরমার, টুলগুলোয় পায়া ভাঙা; ডিভানে কালো পাতলা একটা হাউস কোট পরে মেয়েটি বসে আছে। এত সুন্দর মেয়ে অনিকেত জীবনে দেখেনি। যেমন ক্ষীণকটি, তেমনি উন্নত বুক। মুখ কে যেন ছেনি দিয়ে লক্ষ বছর ধরে কেটে তৈরি করেছে। গায়ের রং গোলাপি আলোয় ভরে দিয়েছে ঘর। তার চুল এলোমেলো, দুটো চোখ বাঘিনীর মতো জ্বলছে। অনিকেতের দিকে একবার রক্তজল করা চোখে তাকাল।

তারপর উঠে চকিত পায়ে দৌড়ে এল দরজার দিকে। অনিকেত যেখানে দাঁড়িয়ে ঠিক সেই দিকে। অনিকেত কিছু বুঝবারও সময় পেল না, মেয়েটা প্রচণ্ড নখে হঠাৎ চিরে ফেলতে লাগল তার মুখ। অনিকেত চিৎকার করে উঠল—প্রদীপ দত্ত! প্রদীপ দত্ত!

বন্ধ দরজা খুলে প্রদীপ দত্ত শান্ত পায়ে ঘরে আসে। একটা হাতে মেয়েটাকে তুলে নেয়। অনায়াসে। ডিভানে প্রায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে অনিকেতকে বলে—আমি ঠিক রিকোয়ারমেন্টস মতো বাছাই করে মেয়েটিকে তুলে এনেছি। কিন্তু আপনার প্রতি ওকে অ্যাট্রাকটেড করে তোলার কোনও উপায় আমার নেই। দ্যাট ইজ ইওর বিজনেস মিস্টার বোস। ট্রাই এগেন।

বলে চলে যায় প্রদীপ দত্ত।……..অনিকেতের গাল ছিঁড়ে রক্ত পড়ছে, আগুনের মতো জ্বালা করছে মুখ। মেয়েটা উপুড় হয়ে ডিভানে পড়ে কাঁদছে।………অনিকেতের মাথায় আগুন জ্বলে গেল। হঠাৎ চিতাবাঘের মতো গিয়ে লাফিয়ে পড়ল ডিভানে।

 

Read more

আশ্চর্য প্রদীপ (২য় পর্ব) – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

 

Leave a comment

Your email address will not be published.