আশ্চর্য প্রদীপ (২য় পর্ব) – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আশ্চর্য প্রদীপ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

প্রায় আধঘণ্টা গেল ধস্তাধস্তিতে। অনিকেত মেয়েটাকে কিছুতেই বাগে আনতে পারে না। মেয়েটার দু-খানা লম্বা হাত, হাতে নখ, দু-খানা পায়ে হরিণের গতি, অসম্ভব দম—এসবই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বারদুই ধরতে পেরেছিল সে মেয়েটিকে, কিন্তু কিছু করার আগেই ছিটকে বেরিয়ে গেল মেয়েটি। অনিকেত তীব্র পিপাসায় ছটফট করে। এমন তীব্র নারীদেহের তৃষ্ণা সে আগে কখনও টের পায়নি। কিন্তু তার বয়স প্রায় চল্লিশ, শরীর আগের মতো সতেজ নেই, দম কমে এসেছে। সে তাই হাঁফায় জিভ বের করা কুকুরের মতো।

তারপর প্রদীপ দত্ত আসে।………..—সরি মিস্টার বোস।……অনিকেত মুখ তুলে তাকায়। তার একটু লজ্জা করে। সে একটু মাথা নেড়ে জানাল, সে পারেনি।…..প্রদীপ দত্ত একবার ‘হু’ বলে একটু ভাবে। তারপর হঠাৎ কোথা থেকে একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জে ওষুধ জাতীয় কিছু নিয়ে আসে। মেয়েটিকে সে অনায়াসে ধরে ফেলে এক হাতে, তারপর ঝাঁকুনি দিয়ে ডিভানে শুইয়ে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে তার পিঠ, তারপর ইঞ্জেকশনের নির্দয় ছুঁচে তার হাতে ওষুধ ঢুকিয়ে দিয়ে অনিকেতকে বলে—এবার যা খুশি করুন।

মেয়েটি আর বাধা দেয় না, নিস্ক্রিয় পুতুলের মতো শুয়ে থাকে এক ঘোর আচ্ছন্নতায়। অনিকেত তার এতকালের অতৃপ্ত কামনা-বাসনা নিয়ে মেয়েটিকে গ্রহণ করার সময়ে টের পায়, মেয়েটি সম্পূর্ণ কুমারী ছিল।

অনিকেত নির্জীব হয়ে যখন উঠে এল তখন প্রদীপ দত্ত ঘরে আসে। একটু হেসে বলে— ওকে?…………অনিকেত অনেক রাত পর্যন্ত মদ খেল বসে। বারংবার মেয়েটির শরীর আক্রমণ করল গিয়ে। কোনওবারই তৃপ্ত হল না। আরও আগুন জ্বলে ওঠে শরীরে। ভোর রাতে সে প্রদীপ দত্তকে ডেকে বলল—আরও মেয়ে। প্রতিদিন নতুন।

প্রদীপ দত্ত মাথা ঝাঁকিয়ে বলে—ব্যবস্থা হবে মিস্টার বোস।………অনেক কাল থেকে চেপে রাখা বহু ইচ্ছে অনিকেতের চিন্তায় নানা রঙের বর্ণালি সৃষ্টি করত। প্রতিদিন চাকরিতে যাওয়ার সময়ে মনে হত হায় রে, যদি ছুটি পেতাম অনন্ত! বড়লোকদের পাড়ায় চমৎকার সব বাড়ি দেখলে মনে হত—এরকম বাড়ি যদি আমার হত! সুন্দরী মেয়ে দেখলে ভাবত—এ যদি হত আমার প্রেমিকা! এরকম ইচ্ছে আর ইচ্ছে।

প্রায় সব ইচ্ছাই পূর্ণ হল অনিকেতের। ছুটি, বাড়ি, আর সুন্দরী মেয়েরা। অবশ্য মেয়েরা যে সবাই তার প্রেমিকা হয়েছে তা নয়। কিন্তু ক্রমে-ক্রমে বশীভূত হয়েছে। কলকাতায় অন্তত দশ বারোখানা অ্যাপার্টমেন্ট কেনা হয়েছে অনিকেতের নামে। সেরা সুন্দরীরা সেখানে থাকে। যোধপুর পার্কের বাড়িতে বড় একটা যাওয়া হয় না অনিকেতের। এইসব অ্যাপার্টমেন্টেই তার। দিন কাটে। প্রদীপ দত্ত ছায়ার মতো তার সঙ্গে আছে, কোনও গোলমাল হলেই এসে হাজির হয়।

অনিকেত এখন কয়েকটা মস্ত মস্ত প্ল্যান্টের মালিক, বিরাট ব্যাবসা তার। অবশ্য সেসব তাকে দেখতে হয় না, প্রদীপ দত্তই সব দেখাশোনা করে। এখন সে দেশের একজন অগ্রগণ্য লোক। অনেকগুলো সংস্থার সভাপতি, চেয়ারম্যান। বিপুল প্রতিপত্তি তার। খবরের কাগজে তার নাম। ওঠে। অনিকেত কয়েকবারই ঘুরে এল লন্ডন, নিউইয়র্ক, প্যারিস, টোকিও।

গেল হাওয়াই দ্বীপে ফুর্তি করতে, মোনাকোতে গিয়ে জুয়া খেলল, প্যারিসে মহিলা প্রেমে রইল ডুবে। জীবনটা কানায়-কানায় ভরে উঠেছে, তার কোনও অভাব নেই। কেবল মনে হয়, তাকে যদি ঈশ্বর আরও একটু কামের ক্ষমতা দিতেন, আরও ক্ষুধা-তৃষ্ণা দিতেন তাহলে বড় ভালো হত। পৃথিবী ভরতি সুন্দরী মেয়ে, কত মহার্ঘ সুস্বাদু খাবার, কত চমৎকার পানীয়। কিন্তু একটিমাত্র শরীরে কত ভোগ করা যাবে?

খুব ভোরবেলায় অনিকেতকে উঠতে হয়। খাটো প্যান্ট আর গেঞ্জি, শীতকাল হলে পুলওভার পরে গাড়ি করে ময়দানে যায়। ময়দানে অনেকক্ষণ দৌড়োয় সে। ঠিক দৌড় নয়, প্রদীপ দত্ত বলে, জগিং। দৌড়তে হয় আস্তে-আস্তে, অনেকক্ষণ ধরে। সঙ্গে সবসময়ে প্রদীপ দত্ত থাকে। দৌড়ে ফিরে এলে ব্যায়াম শিক্ষক আসে, তারপর যোগব্যায়ামের শিক্ষক। ব্রেকফাস্ট। প্রদীপ দত্ত এই সময়ে অনেক কাগজপত্রে সই করায়। দশটা বাজতে-না-বাজতেই লোকজন আসে, কনফারেন্স থাকে, আসে খোশামুদরা। প্ল্যান্টে যেতে হয় মাঝে-মাঝে।

টেলিফোনে কথা বলতে হয়। বিকেলে ক্লাব রেস্টুরেন্ট কখনও বা মিটিং থাকে। সন্ধের পর থাকে মেয়েরা, ড্রিংকস, কখনও বা বন্ধুবান্ধব জাতীয় কিছু লোকের সঙ্গে থাকে পার্টি। অবশ্য এসব ফেলে রেখে অনিকেত যে-কোনও সময়ে দেশভ্রমণেও বেরিয়ে পড়তে পারে। ভারতের সব বড় শহর, স্বাস্থ্যনিবাস বা সুন্দর জায়গায় তার বাড়ি আছে।

বাড়ি আছে লন্ডন, নিউইয়র্ক বা টোকিওতেও। কোথাও কোনও অভাব রাখেনি প্রদীপের দৈত্য ওরফে প্রদীপ দত্ত। নিরাপদ এবং নিশ্চিন্ত তার আরাম। যেদিন তার কথা বলতে ইচ্ছে করে না বা কাজ করতে ইচ্ছে করে না সেদিন প্রদীপ দত্তই সব সামলায়, কোথাও আটকায় না।

মাসে চারবার তার শরীরের চেক আপ হয়। ডাক্তাররা রক্তচাপ মাপে, চোখ-দাঁত দেখে, কান নাক পরীক্ষা করে, রক্তে চিনির পরিমাণ মাপে, ই সি জি হয়, এক্স-রে হয়। কোথাও একটু খুঁত পেলেই সঙ্গে-সঙ্গে মেরামত করা হচ্ছে, অনিকেতের জীবন বড় নিশ্চিন্ত।

খুব ভোরে অনিকেত দৌড়াচ্ছে মাঠে। শীতকাল। একটা ভারী কুয়াশা চারদিকে ভূতুড়ে করে রেখেছে। সূর্য উঠতে অনেক দেরি। চারদিক আবছায়ার ঘোর। গায়ে যথেষ্ট মোটা একটা পুলওভার, কান-মুখ মাফলারে ঢাকা, পায়ে দৌড়ের জুতো। বেশ লাগছিল অনিকেতের। একটু হাঁফ ধরে আসছিল বটে, কিন্তু সে গতরাতের হ্যাংওভারও হতে পারে।

.

প্রদীপ দত্ত দৌড় বজায় রেখেই বলল—একচল্লিশ বছর তিন মাস তেরো দিন। আজকের দিনটা নিয়ে।……অনিকেত একটু থমকে গিয়ে বলে—চল্লিশ হয়ে গেল এর মধ্যে! কত বললে? একচল্লিশ? এই তো সেদিন আটত্রিশ ছিলাম।

প্রদীপ দত্ত হেসে বলে–ইয়েস স্যার, ম্যাট্রিক সার্টিফিকেটে এখনও আপনার চল্লিশ হয়নি। কিন্তু আসল বয়স—……….দৌড় থামিয়ে অনিকেত কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে-হাঁফাতে বলে—একচল্লিশ ইজ টু মাচ।

—কিছু করার নেই মিস্টার বোস। প্রদীপ দত্ত হতাশভাবে বলে।………..আজকাল অনিকেতের মাঝে-মাঝে রাগ হয় প্রদীপ দত্তর ওপর। এখন ওকে সে ‘তুমি’ করে বলে, ধমকায়। ওর কাছে আজকাল কিছু চাইতে আর লজ্জা বোধ করে না অনিকেত। মাঝে মাঝে এমনও ভাবে সে—লোকটা কোনও কাজের নয়। সব দিচ্ছে তবু কোথায় ফাঁকি রাখছে। যেন!

অনিকেত বলল—প্রদীপ দত্ত, তোমার বয়স কত?……প্রশ্ন শুনে প্রদীপ দত্ত একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলে—আমার বয়স? সে অনেক। আমি ভারচুয়ালি এজলেস।………..—তবু বলো।

প্রদীপ দত্ত একটু হেসে বলে—আমি এই পৃথিবীর সমান বয়সি।……….—মিথ্যে কথা প্রদীপ দত্ত।…….—মাপ করবেন স্যার, আমার জন্ম কবে হয়েছিল আমার তা জানা নেই।…..–তোমার কখনও অসুখ করে না? বুড়ো হওয়ার ভয় ধরে না তোমাকে?মৃত্যুচিন্তা হয় না?…………প্রদীপ দত্ত বলল–না।

অনিকেত একটা শ্বাস ছাড়ে। তারপর শ্লথ গতিতে আবার দৌড়োয় সে। পিছনে নিঃশব্দ ছায়ার মতো প্রদীপ দত্ত। দৌড়োতে-দৌড়োতে অনিকেত হঠাৎ বলে—প্রদীপ দত্ত, আমি হাঁফিয়ে পড়ছি কেন? খুব বেশি দৌড়োইনি আজ, তবু কেন আমার হাঁফ ধরছে?……..—একটু বিশ্রাম করুন, ঠিক হয়ে যাবে।

—তুমি হাঁফাওনি?………প্রদীপ দত্ত ম্লান একটু হেসে বলে—না। হাঁফিয়ে পড়লে আমার চলে না।….নিজের মার্সিডিস বেনজ গাড়িতে ময়দান থেকে ফিরবার সময়েও অনিকেত বারবার জিগ্যেস করল—আমি আজ হাঁফিয়ে পড়লাম কেন বলো তোর……..প্রদীপ দত্ত গম্ভীর বিনয়ের সঙ্গে বলে কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে।………….–কল দি ডক্টরস।

ডাক্তাররা এল। আগাপাশতলা পরীক্ষা করল তাকে। না, কিছু হয়নি, হার্ট ঠিক আছে, প্রেসার স্বাভাবিক, রক্তে চিনি নেই, লাংস ভালো।………….—তবে? প্রশ্ন করে অনিকেত।

প্রদীপ দত্ত তার কানে-কানে আস্তে করে বলে—বয়স! চল্লিশের পর একটু ডিজিনেস আসে। কিছু না। এ-বয়সের যে-কোনও লোকের চেয়ে আপনার হেলথ অনেক ভালো।

অবহেলার সঙ্গে একবার প্রদীপ দত্তকে দেখে নিয়ে অনিকেত বলে—দেখো, হেলথ যেন আর গড়বড় না করে।………………………….–চেষ্টা করব স্যার। সব রকম ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা হবে।

অনিকেত একটু গম্ভীর হয়ে গেল। আজ কোনও কাজ করল না অনিকেত। কেবল ছাদের বাগানে ঘুরে-ঘুরে অজস্র বিরল ফুলের সৌন্দর্য দেখল। তারপর এক সময়ে উত্তেজিত হয়ে ডাকাল—প্রদীপ দত্ত! প্রদীপ দত্ত!

প্রদীপ দত্ত দৌড়ে উঠে আসে ছাদে।……………অনিকেত একটা বসরাই গোলাপ গাছে শুকনো ফুল দেখিয়ে বলে—এটা কী? এটা এখানে কেন? জানোনা আমি মরা ফুল দেখতে পারি না!

—দুঃখিত মিস্টার বোস। এক্ষুনি তুলে ফেলে দিচ্ছি।…………………………প্রদীপ দত্ত ফুলটা তুলতে যাচ্ছিল অনিকেত বাধা দিয়ে বলল—থাক, থাক। তুলো না।……….কী কারণে যেন প্রদীপ দত্ত একটু হাসল।

অনিকেত ঘরে ফিরে আয়নায় নিজেকে দেখতে-দেখতে আপন মনে বলল—একচল্লিশ! একচল্লিশ!………………আয়নায় ছায়া ফেলে প্রদীপ দত্ত কাছে এসে বলল—এমন কিছু নয় স্যার, চল্লিশে যৌবন শুরু।…………অনিকেত একটু হেসে বলে—ইফ ফর্টি কামস, ক্যান ফিফটি বি ফার বিহাইন্ড?

কী কারণে যেন প্রদীপ দত্ত আবার একটু হাসল।…………কে আমাকে ভালোবাসে? হঠাৎ এই প্রশ্ন মাঝরাতে চাবুকের মতো তার সমস্ত শরীরের চমকে দিল। ঘুম ভেঙে উঠে বসে অনিকেত। প্রশ্নটাকে অসম্ভব জরুরি বলে মনে হয়। যে মেয়েটি তার বিছানায় শুয়ে আছে সে-ই প্রথম দিন খিমচে দিয়েছিল তার গালে। এখন ভীষণ বাধ্য হয়ে গেছে।

অনিকেত ডাকল—মিলি, মিলি!……….সঙ্গে-সঙ্গে উঠে বসল মিলি। গায়ের আবরণ সরাতে-সরাতে কটাক্ষ করে হাসল একটু।…………অনিকেত মেয়েটির দিকে চেয়ে থাকে। ও কি ভালোবাসে আমাকে?………………অনিকেত বলল—মিলি, তুমি একটু গান গাইবে?….—নিশ্চয়ই। কী গান গাইতে হবে?…………..—যা খুশি। আনন্দের গান গাও, প্রেমের গান।

—মিলি গাইতে লাগল।……….অনিকেত মাথা নেড়ে বলেনা, গান নয়। এসো, দুজনে নাচি।………..দুজনে নাচল। নাচতে নাচতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল।…………..–হচ্ছে না। অনিকেত বলে।

–কী?………………—কিছু নয়। মিলি, আমাকে একটু জড়িয়ে ধরে থাকো, তোমার শ্বাসে আমার শ্বাস মিশে যাক, আমি তোমাকে কিছুক্ষণ অনুভব করি।

মিলি আশ্লেষে জড়িয়ে ধরল তাকে। নিঝুম হয়ে খানিকক্ষণ অনুভব করে অনিকেত। মিলিকে। সে যা করতে বলে তাই করে সে। নইলে প্রদীপ দত্ত আসবে, ভয়ঙ্কর শাস্তি দেবে মিলিকে। অনিকেত মিলির বুকের হৃৎস্পন্দন শুনল। জোরে চলছে হৃৎপিণ্ড। এর হৃৎপিণ্ড ভয়ের বাস, লোভের আস্তানা।

ঘোর রাতে গাড়ি বের করতে হুকুম দিলেন অনিকেত। প্রদীপ দত্তকে ডাকতে হয় না, সে আপনিই নিঃশব্দে সঙ্গ নেয়। বিভিন্ন পোষা মেয়েমানুষের কাছে ঘুরে বেড়ায় অনিকেত, নিজের বউ আর ছেলের কাছেও যায়। কিন্তু কোথাও যেন কোনও নিশ্চয়তা পায় না। সবাই বাধ্য, বিনীত, ভদ্র, হুকুমমাত্র যাকে দিয়ে যা খুশি করাতে পারে অনিকেত। তবু কেমন এক অনিশ্চয়তা। এই গভীর রাতে সে সকলের কাছে গিয়ে-গিয়ে ঘুম ভাঙাল। কেউ বিরক্ত হল না, বরং তটস্থ হল, আপ্যায়ন করল, ভালোবাসা প্রকাশ করল। এমনকী ঝুমুরও।

—আশ্চর্য! অনিকেত গাড়িতে ফিরে আসবার সময়ে বলল।……….একটু যেন লজ্জিত হয়ে প্রদীপ দত্ত বলে—আপনি যেমন চেয়েছিলেন ঠিক তেমনই সব অ্যারেঞ্জমেন্ট করা আছে মিস্টার বোস। আপনি কোনও ত্রুটি পাচ্ছেন না তো?………..—পাচ্ছি প্রদীপ দত্ত। আমি একটা মানুষকেও অর্জন করতে পারিনি।

—কেউ বেয়াদবি করেনি তো স্যার? প্রদীপ দত্ত উদ্বিগ্ন হয়ে বলে।……—না। আর সেইটেই তো বেয়াদপি। এরা কেউ বেয়াদবি করছে না, রাগ করছে না আমার ওপর, অভিমান করছে না, অবাধ্য হচ্ছে না। যে আমাকে ভালোবাসবে সে তো কখনও-কখনও একটু অবাধ্য হবে, অভিমানটান করবে প্রদীপ দত্ত? তাই না?………….প্রদীপ দত্ত গম্ভীর হয়ে বলে—ওসব অ্যাবস্ট্রাক্ট জিনিস মিস্টার বোস। আমার এক্তিয়ারের বাইরে।

তুমি কোনও কাজের নও। অনিকেত রেগে গিয়ে বলে।………প্রদীপ দত্ত একটু গুম হয়ে থেকে বলে ঠিক আছে স্যার, আপনি যেমন চাইছেন ওরা এবার থেকে ঠিক সেরকমই বিহেভ করবে। আপনার রিকোয়ারমেন্টগুলো বলুন, আমি টুকে রাখছি— বলে প্রদীপ দত্ত তার নোটবই বের করে গাড়ির ড্যাশ বোর্ডের আলোয় লিখতে-লিখতে আপন মনে বলে রাগ, অভিমান, মাঝে-মাঝে একটুআধটু নন-অ্যাগ্রেসিভ অবাধ্যতা—আর কি বলবেন স্যার?……………অনিকেত হাত বাড়িয়ে নোটবইটা কেড়ে নিয়ে বলে—চুপ করো। আমি কিছু চাইছি না। আমি এখন একটু একা থাকতে চাই। আমার যদি কোনও ফাঁকা অ্যাপার্টমেন্ট থাকে তো সেখানে আমাকে নিয়ে চলো।

—আছে স্যার। একটা দশতলা অ্যাপার্টমেন্ট হাউস আপনার অর্ডার মতো কেনা হয়েছিল, তাতে কোনও ভাড়াটে নেই। আপনার আদেশ মতো বাড়িটার চল্লিশটা ফার্নিশড ফ্ল্যাট ফাঁকা। পড়ে আছে।

দশতলার ফাঁকা কিন্তু চমক্কার সাজানো অ্যাপার্টমেন্ট স্বয়ংক্রিয় লিফটে উঠে এল অনিকেত। ক্লান্তভাবে একটা কৌচে বসে রইল নিঝুম হয়ে।…………কেউ কোথাও নেই, শুধু কপাটের আড়ালে উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করছে প্রদীপ দত্ত।

—প্রদীপ দত্ত! অনিকেত ডাকে।……..—বলুন স্যার। নিঃশব্দে সুপুরুষ দৈত্য ঘরে এসে দাঁড়ায়।…………..—ভগবান বলে কে একজন আছে না? আমি তার সঙ্গে আধ ঘণ্টার ইন্টারভিউ চাই। অ্যারেঞ্জ করো।

প্রদীপ দৈত্য ভ্রূ কুঁচকে চিন্তা করে বলে—অ্যাবস্ট্রাকশন। আমার এরিয়া নয় মিস্টার বোস। তবে—এই বলে প্রদীপ দত্ত পকেট থেকে একটা ট্যাবলেটের স্ট্রিপ বের করে বলে—একটা ট্যাবলেট খেয়ে নিন, নিজেকেই ভগবান বলে মনে হবে। সত্যি কথা বলতে কি আপনার ক্ষমতা ঈশ্বরের চেয়ে খুব কম নয়।

ট্যাবলেটটা হাতে নিয়ে চেয়ে থাকে অনিকেত, বলে—আর যখন এর নেশা কেটে যাবে, তখন?…….—দেয়ার উইল বি মোর ট্যাবলেটস।

ট্যাবলেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে অনিকেত বলে—প্রদীপ দত্ত, তুমি অপদার্থ। তুমি আমার বয়স হওয়া ঠেকাতে পারোনি, তুমি এমন একটাও মানুষ বা মেয়েমানুষ জোগাড় করতে পারোনি যে আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসে, তুমি ভগবানের সঙ্গে মাত্র আধ ঘণ্টার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট অ্যারেঞ্জ করতে পারোনি। নিজের কান ধরে দাঁড়াও প্রদীপ দত্ত।

প্রদীপ দত্ত দু-হাতে নিজের কান ধরে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে রইল।……….অনিকেত বলল—মানুষের সব চাহিদাই কেন তুমি পূরণ করতে পারো না? তোমার জানা উচিত এত ভোগ্য সামগ্রী উপভোগ করতে হলে মানুষের অনেক আয়ু চাই, অনেক ভালোবাসা চাই, ফর সিকিউরিটি তার একজন ভগবানও দরকার। তুমি যে সব দিতে পারোনি। কান ধরে ওঠবোস কর প্রদীপ দত্ত।

প্রদীপ দত্ত ওঠবোস করতে লাগল। করতেই লাগল। হাঁফিয়ে গেল না, ঘামল না, কোনও কষ্টের শব্দ করল না। ওর অনন্ত ওঠবোস দেখতে-দেখতে ক্লান্ত হয়ে অনিকেত বলল—তোমার ক্লান্তি নেই? বিশ্রাম নেই?

–না।…………—মৃত্যু?…………—তাও নেই।……….হাহা করে হাসল, অনিকেত, বলল—মিথ্যেবাদী। ঠিক আছে, ওই জানলা দিয়ে লাফিয়ে পড়ো প্রদীপ দত্ত। আমি তোমার শেষ দেখতে চাই।

প্রদীপ দত্ত স্মার্ট পদক্ষেপে গিয়ে জানলার পাল্লা খুলে বিনা ভূমিকায় লাফ দিল নীচে। জানলার কাছে গিয়ে অনিকেত উঁকি মেরে দেখল ফুটপাথে পড়ে আছে প্রদীপ দত্ত।………..হাহা করে হাসল অনিকেত। ঘরের মধ্যে ফিরে এসে হুইস্কি নিয়ে বসল। সামান্য নেশা হল তার। একটু ভুলভাল হচ্ছিল। সেই বিভ্রমেই হঠাৎ ডাকল—প্রদীপ দত্ত! তারপর নিজের মনেই বলল–না, না, ও তো মরে গেছে।

কিন্তু নিঃশব্দে, প্রদীপ দত্ত ঘরে এসে বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বলল—ইয়েস মিস্টার বোস।……..তুমি মরোনি? অনিকেত অবাক।

প্রদীপ দত্ত মৃদু হেসে বলে—আই অ্যাম আনপেরিশেবল স্যার। ডেথলেস।………..ক্লান্ত অনিকেত বলল—আজ আমার বয়স কত হল বলো তো?………………….প্রদীপ দত্ত বলল—একচল্লিশ বছর চার মাস দুদিন। আজকের দিনটা নিয়ে।

চমকে উঠে অনিকেত বলে—এই তো সেদিন বললে তিন মাস তেরো দিন। এর মধ্যে আরও উনিশ দিন বেড়ে গেল?…………………….—উনিশটা দিন এর মধ্যে কেটে গেছে মিস্টার বোস।

—তোমার কাটেনি? তোমার বাড়েনি উনিশ দিনের বয়স?…………—না। আমি অনন্ত আয়ু। এজলেস।…………..—তবে আমার কেন বাড়বে প্রদীপ দত্ত?…………….—প্রকৃতির নিয়ম স্যার।

আচমকা হুইস্কির গ্লাসটা ছুড়ে মারে অনিকেত। প্রদীপ দত্তর মুখে গিয়ে সেটা ফটাস করে ভাঙে। কাচ ছড়িয়ে পড়ে চারধারে। একটুও কাটে না বা লাগে না ওর, রক্তপাত হয় না। প্রদীপ। দত্ত নীচু হয়ে কাচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিতে থাকে।

বিপজ্জনক নীচু স্বরে অনিকেত বলে—স্কাউন্ট্রেল! ইউ স্কাউন্ট্রেল! বলে তড়িতে উঠে গিয়ে টেবিল থেকে কাগজকাটা একটা ছুরি তুলে নেয়। তারপর চকিতে এগিয়ে গিয়ে বারংবার প্রদীপ দত্তর পিঠে, বুকে পেটে ছুরিটা বসিয়ে দিতে থাকে।

বিনীতভাবে প্রদীপ দত্ত অপেক্ষা করে। অনিকেত ক্লান্ত হয়ে গেলে প্রদীপ দত্ত ছুরিটা নিয়ে টেবিলে রেখে দেয় ফের। নরম স্বরে বলে—একটু ঘুমিয়ে থাকুন। টেক এভরিথিং ইজি।……….ক্লান্ত অনিকেত বলে—চলে যাও, প্রদীপ দত্ত, চিরদিনের মতো চলে যাও। আমি আর তোমাকে চাই না।

প্রদীপ দত্ত কেমন যেন একটু হাসে। অত্যন্ত ভদ্র গলায় বলে—গুড নাইট স্যার, টিল ইউ কল মি এগেন।……………………………—আই ওনট কল ইউ বাস্টার্ড। গো অ্যাওয়ে। ডাই।

কিন্তু পরদিনই ঘুম ভেঙে অনিকেত ডাকে—প্রদীপ দত্ত! প্রদীপ দত্ত!………………প্রদীপ দত্ত সামনে আসে। খুব যত্নে তাকে বিছানা থেকে তোলে। বাথরুমে পৌঁছে দেয়। বলে সব ঠিক আছে স্যার।

বাথরুমের শার্সি দিয়ে অনিকেত দেখতে পায় নীচে একটা রেইন ট্রি থেকে হলুদ পাতা ঝরে যাচ্ছে। দৃশ্যটা সহ্য হয় না তার। একটা নতুন টুথপেস্টের টিউব আয়নার সামনে থেকে তুলে নেয় অনিকেত। নতুন টিউব, পেস্টে ভরা। অনিকেত কিছু না ভেবেই টিউবটা টিপে ধরে। সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে পেস্ট বেরোতে থাকে।

সারা বাথরুমের মেঝে জুড়ে অনিকেত পেস্ট ছড়ায়। পেস্ট দিয়েই সে মেঝেয় লেখে—আমি চাই অনন্ত আয়ু, আমি চাই অনন্ত ভালোবাসা, হায়—পেস্ট ফুরিয়ে যায় এখানে। টিউবটা ছুড়ে ফেলে দেয় অনিকেত। চিৎকার করে ডাকে প্রদীপ দত্ত, কেন টিউবের পেস্ট ফুরোবে? আমি এমন টিউব চাই যার পেস্ট কখনও ফুরোবে না। যাও, নিয়ে এসো।

প্রদীপ দত্ত অনেকগুলো জায়ান্ট সাইজ টিউব এনে দেয়, কিন্তু সেগুলো আর ফিরেও দেখে না। অনিকেত। সে বলে—প্রদীপ দত্ত তুমি কবে আমাকে ছেড়ে যাবে?…………—আমি ছেড়ে যেতে পারি না মিস্টার বোস। আমাকে আপনার মৃত্যু পর্যন্ত থাকতে হবে।

—আমার মৃত্যু কবে হবে প্রদীপ দত্ত।……….–যথাসময়ে। অপেক্ষা করুন।………—কিন্তু আমি তোমাকে সহ্য করতে পারছি না। কোনও নশ্বর মানুষ সহ্য করতে পারে এক মৃত্যুহীন মানুষকে? বলো প্রদীপ দত্ত, পারে কেউ?…….—দুঃখিত মিস্টার বোস। কিন্তু আমি তো আপনাকে খুশি করার প্রাণপণ চেষ্টা করছি।

অনিকেত খুব ক্লান্তস্বরে বলল—আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। তুমি আমাকে আর খুশি করতে পারো না। আমাকে অনন্ত আয়ু দাও প্রদীপ দত্ত, অনন্ত কাম দাও, অনন্ত ক্ষুধা আর তৃষ্ণা। দাও! একটা নশ্বর শরীর আর-এক জীবনের আয়ু নিয়ে কী করে পথিবীতে ভোগ করা যাবে। প্রদীপ দত্ত! দয়া করো।

চিন্তিত প্রদীপ দত্ত মৃদুস্বরে বলে—অ্যাবস্ট্রাক্ট মিস্টার বোস, আমি দুঃখিত।……..—তবে এই মুহূর্তে আমাকে মৃত্যু দাও প্রদীপ দত্ত। আমি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে পারব। যাও, আমার জন্য যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর ব্যবস্থা করো।

প্রদীপ দত্ত কেমন একরকম হাসে। বলে—মৃত্যু?মৃত্যুও অ্যাবস্ট্রাক্ট মিস্টার বোস। আমি তা দিতে পারি না। যথাসময়ে তা ঘটবে। আপনাকে অপেক্ষা করতেই হবে।………হতাশায় ভরে যায় অনিকেত। বলে—তবে যা দিয়েছ তা সব ফিরিয়ে নাও প্রদীপ দত্ত।

–লাভ কী? আপনি ইচ্ছে করলেই আবার সব ফিরে পাবেন।…………–প্রদীপটা যদি নষ্ট করে ফেলি প্রদীপ দত্ত?……………—ওটা নষ্ট হওয়ার নয়। প্রদীপটা আনপেরিশেবল, শক রেজিস্ট্যান্ট, করোশন প্রভড, ফায়ার রেজিস্ট্যান্ট, অ্যান্ড গ্যারান্টিড ফর ইটারনিটি।

—যদি কাউকে দিয়ে দিই?………………প্রদীপ দত্ত একটু হেসে বলে–লাভ নেই মিস্টার বোস। তখন প্রদীপটার জন্য শোকে আপনি পাগল হয়ে যাবেন। যতক্ষণ এটা আপনার কাছে আছে ততক্ষণ আপনি বুঝতে পারছেন না প্রদীপকে আপনার কী ভীষণ দরকার!

ঠিক। খুবই ঠিক কথা। অনিকেত বুঝল। বুঝে একটু শিউরে উঠল ভয়ে, অনিশ্চতায়। বলল —না, না, কাউকে দেব না।……………….—সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বলে কেমন একটু হাসল প্রদীপ দত্ত।

হাসিটা চেয়ে দেখল অনিকেত। তারপর হঠাৎ সে-ও ঠিক ওইরকম একটু হাসল। খুব বুঝদারের হাসি। হাসতে-হাসতে কখন হঠাৎ চোখে জল এসে গেল তার। প্রদীপের দৈত্য বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে রইল সামনে। পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায়।

 

Read more

পুঁই মাচা – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

Leave a comment

Your email address will not be published.