আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৪ হুমায়ূন আহমেদ

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৪

জমির আলী বলল, নাআমার শইল জুইত নাইশইল ঠিক করনের জন্যে উপাস দিবশইল ঠিক করনের জন্যে উপাসের উপরে কোনাে ওষুধ নাইপােলাওকোরমা খাইতে কেমন হইছে

আসমানী বলল, অইত্যাধিক ভালাে হইছেকই আমার মা জামদানী তাে কিছু বলে নাজামি, খাদ্য কেমন হইছে

জামদানীর মুখ ভর্তি খাবার। তার কথা বলার উপায় নেইমুখে খাবার না থাকলেও সে কথা বলতে পারত নাখুব আনন্দের সময় সে কথা বলতে পারে , তার চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়েজমির বলল, আরাম কইরা খাও গাে কইন্যারাখাওয়া একটা ইবাদতযত আরাম কইরা খাইবা ইবাদত তত শক্ত হইবআল্লাহ সােয়াব দিয়া ভাসাইয়া দিব। 

আসমানী বলল, তুমি কিছু খাইবা না এইটা কেমন কথা ? এক মুঠ হইলেও খাওদেই মুখে তুইল্যা

জমির আলী উদাস গলায় বলল, দেআসমানী বাবার মুখে এক মুঠ খাবার তুলে দিল। কন্যাদের সঙ্গে নিয়ে এটাই ছিল জমির আলীর শেষ খাওয়াপরদিনই সে স্ত্রীর সন্ধানে দুর্গাপুর চলে যায়সেখানে খবর পায় আছিয়া, আরাে দুটা মেয়ের সঙ্গে বর্ডার পার হয়ে ইন্ডিয়া চলে গেছেজমির আলীও রাতের অন্ধকারে বর্ডার পার হয়সেও নিখোঁজ হয়ে যায়। 

জমির আলীর চেহারায় সুফি সুফি ভাব চলে এসেছেদাড়ি অনেক লম্বা হয়েছেদাড়ির সঙ্গে চুলও লম্বা হয়েছেমুখ ভর্তি দাড়ি, ঘাড় পর্যন্ত বাবরি চুলদেখেই মনে হয় সাধক মানুষতাকে সবাই ডাকছে সাধুজীজমির আলী আছে জেলেপ্রথম ছিল বারাসতের জেলে, সেখান থেকে এসেছে আলীপুরেতার দুই বছরের কয়েদ হয়েছেজেলখানায় লম্বা চুল দাড়ি রাখা নিষেধসে বিশেষ বিবেচনায় মাফ পেয়েছেসাধু সন্ত মানুষ হিসেবে সবাই তাকে বিশেষ খাতির করে

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৪

তার ডিউটি রসুই খানায়প্রথম কিছুদিন সে হেড বাবুর্চির অ্যাসিসটেন্ট ছিলএখন সেমূল বাবুর্চিতার কাজে সবাই সন্তুষ্টসন্ধ্যাবেলায় শেষ গুণতির পর কয়েদিদের ভেতর যে আসর বসে সেই আসরে তাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়সে গাঁজা সিগারেট কিছুই খায় নাঅতি উচ্চশ্রেণীর ভাবের কথা বলেনেশাগ্রস্ত অবস্থায় ভাবের কথা শুনতে অন্যদের ভালােই লাগে। 

জেলখানায় জমির আলীর কয়েকজন অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধুও তৈরি হয়েছেএদের একজনের নাম বলরামখুনের মামলায় যাবজ্জীবন হয়েছে। তের বছর পার হয়েছেআর মাত্র দুই আড়াই বছর কাটিয়ে দিতে পারলে জেলখাটা শেষ হবেজেলের যাবজ্জীবন মানে আঠারাে বছরভালাে আচারব্যবহারের জন্যে কিছু মাফ পাওয়া যায়বলরাম তাকে গােপনে বলেছে জেল থেকে বের হয়ে সে তার স্ত্রীকে খুন করবে

সব কাজই তিনবার করতে হয়দানে দানে তিনদানজগতের এই নিয়মআগে খুন করেছে দুটাপ্রথমটায় কেউ কিছু ধরতে পারে নিসাজা হয়েছে দ্বিতীয়টার জন্যেসে আশা করছে তৃতীয়টাও কেউ কিছু বুঝতে পারবে নাতৃতীয় কর্মটি সমাধা করতে পারলে দানে দানে তিনদানের ঝামেলা মিটবে। বলরাম জমির আলীর অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধুবলরাম বলেছে জমির আলীর স্ত্রীকে খুঁজে বের করা মাত্র দশ দিনের মামলা

কোনাে একটা খারাপ পাড়ায় সে আছেকোথায় আছে পাত্তা লাগানাে কোনাে ব্যাপারই নাঅবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে মনে হচ্ছে দুজন এক সঙ্গেই ছাড়া পাবেজেল থেকে বের হয়েই বলরামের প্রথম কাজ হবে বন্ধু পত্নীকে খুঁজে বের করাদ্বিতীয় কাজ নিজের স্ত্রীকে খুন করাবলরাম এই বিষয়ে ওয়াদাবদ্ধসে পরিষ্কার বলেছে, সাধুজী এটা তুমি আমার উপরে ছেড়ে দাওদশ দিনে যদি পাত্তা বের করতে না পারি বাটখারা দিয়ে মেপে আড়াইশ গ্রাম কাচা গু খাব

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৪

যে লােক এমন কঠিন প্রতিজ্ঞা করতে পারে তার উপর ভরসা করা যায়জমির আলী ভরসা করে আছে এবং মােটামুটি নিশ্চিন্ত আছেতার তিনকন্যাকে নিয়ে যে দুঃশ্চিন্তা তাও বলরাম বহুলাংশে দূর করেছেবলরামের বিশেষ ক্ষমতা আছে তার নাম নখদর্পণবুড়াে আঙুলের নখে তিমির তেল মাখিয়ে সে যদি এক ধ্যানে সেদিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে নখ আয়নার মতাে হয়ে যায়যাকে দেখতে ইচ্ছা করে তাকেই আয়নায় দেখা যায়

জেলের সবাই যদিও বলে এটা বলরামের ভাওতাবাজিটাকা কামাবার ফন্দি(এক একবার নখদর্পণে বলরামকে এক প্যাকেট সিগারেট কিংবা দুই পুরিয়া গাজা দিতে হয়তারপরেও প্রায়ই কয়েদিরা তার কাছে আসে নখদর্পণে তাদের পরিবার পরিজনদের খবর নেয়জমির আলীর কাছ থেকে বলরাম কিছুই নেয় নাজমির আলী অন্যদের মতাে বলরামকে অবিশ্বাসও করে নাবানিয়ে বানিয়ে একটা লােক তার কাছে শুধু শুধু মিথ্যা বলবে কেন

জমির আলী যখনই তিন কন্যার বিষয়ে জানতে চায় তখনি বলরাম ধ্যানে বসে এবং অতি অল্পসময়ে ফল পাওয়া যায় দুইজনরে দেখতেছিআরেকজন গেল কই ? দাদা, কোন দুইজন ? বড় দুইজন। বুঝেছি আসমানী আর জামদানীসর্বনাশ হয়েছে, ছােটটাকে কই রেখেছে ? বড় দুই বােন করতেছে কী

বুঝতেছি না— ছবি স্পষ্ট নাদাদা, আরেকটু নজর করে দেখেনএখন দেখা যাইতেছেপরিষ্কার ? আয়নার মতাে পরিষ্কারদুই বােন করতেছে কী

একজনের হাতে একটা নারিকেল । বুঝেছিসরকারবাড়ির ছেলের বউ দিয়েছেঅতি ভালাে মহিলাপ্রায়ইএটা সেটা দেয়আল্লাহ এই মহিলাকে বেহেশত নসিব করুকদাদা, ছােটটারে দেখতেছেন ?

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৪

নাভালাে যন্ত্রণায় পড়লামপয়সারে তারা কার কাছে দিল ? পেয়েছিছােটটাকে পেয়েছিকোথায় আছে ? শুয়ে আছেহাতপা নাড়তেছেদুইবােন কি আশেপাশে নাই ? থাকলেও ধরা পড়তেছে নাছােটজন কোথায় শুয়ে আছে ? খাটে না উঠানে ? ধরতে পারতেছি নাশরীর স্বাস্থ্য কি ঠিক আছে ? ঠিক আছেহাসিখুশিহাতপা নাড়তেছেঅতিরিক্ত নাড়তেছে। 

কারেক্ট ধরেছেন দাদাজন্মের পর থেকে ছােটটার হাতপা নাড়ার অভ্যাসঅতিরিক্ত চঞ্চল হয়েছেদুঃশ্চিন্তা এই জন্যেই বেশি। দেখা বন্ধ করে দেই, মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। আচ্ছা বন্ধ করেন। আপনার অশেষ মেহেরবানীবড় দুইজনের শরীর স্বাস্থ্য কেমন দেখেছেন

ভালােতবে একজনের মনটা মনে হলাে সামান্য খারাপ । বুঝেছি আর বলতে হবে নামেজো জনঅল্পতেই মন খারাপ করেসে আবার পােলাও খাওয়ার যমদিন রাত পােলাও পােলাও করেতিন মেয়ে আর তার মাকে নিয়ে আপনার বাড়ি থেকে বেড়ায়ে যাব ঠিক করেছিবাকি আল্লাপাকের ইচ্ছা। 

বলরাম যে শুধু নখদর্পণের মাধ্যমেই তাকে সাহায্য করছে তানাদেশে চিঠি পাঠাবার ব্যাপারেও সাহায্য করেমাসে দুটা চিঠি জেল থেকে পাঠাবার নিয়ম আছে। চিঠি লিখে ঠিকানাসহ জেল অফিসে জমা দিতে হয়জেলের রাইটার চিঠি পড়ে পাঠাবার যােগ্য বিবেচনা করলে চিঠি পাঠায়সেইসব চিঠি কি কখনাে প্রাপকের কাছে পৌছে নাবলরামের ব্যবস্থা ভিন্ন, সে চিঠি 

পাচার করে দেয়তার মাধ্যমে প্রতি মাসে দুটা করে চিঠি জমির আলী দেশে পাঠাচ্ছেএকটা চিঠি যাচ্ছে তিন মেয়ের কাছেআরেকটা যাচ্ছে ইয়াকুব সাহেবের কাছেইয়াকুব সাহেবের কাছে সে খােলাখুলি সব বৃত্তান্ত লিখছেউনি ভদ্রলােক এবং জ্ঞানী মানুষউনার কাছে কিছু লিখলে তিনি ঢােল পিটিয়ে প্রচার করবেন নামেয়েদের কাছে মিথ্যা করে লিখতে হচ্ছে

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৪

বাবা জেলে আছেএই ব্যাপারটা তারা নিতে পারবে নাভাববে চুরিডাকাতি করে জেলে গেছেতাদের কাছে মিথ্যা বলাই ভালােনিজের মেয়েদের কাছে মিথ্যা বলারকারণে বিরাট পাপ হচ্ছেরােজহাশরে বিরাট বিপদে পড়বেভরসা একটাই নবিজিকে স্বপ্নে দেখেছেনবিজি নিশ্চয়ই সাফায়াত করে কোনােরকমে তাকে পার করে নিয়ে যাবেনপ্রতি চিঠিতেই সে মেয়েদেরকে লিখছে— 

আমার আদরের তিন মা ময়না সােনা, হলদী পক্ষীপর সমাচার আমি ভালাে আছিতােমার মায়ের সন্ধান উড়া উড়া পাইয়াছিনিশ্চিত পাই নাইযেহেতু নবি করিমের নামে ওয়াদা করিয়াছি তােমার মাকে না নিয়া ফিরিব না সেহেতু কিঞ্চিত বিলম্ব হইতেছেতবে দুঃশ্চিন্তা করিও না, অবশ্যই তােমার মাতাকে সঙ্গে নিয়া ফিরিবতােমাদের কাছে এই আমার ওয়াদাতােমাদের আল্লাহপাকের কাছে সােপর্দ করিয়া দিয়া নিশ্চিন্ত আছি

অবশ্যই আল্লাহপাক তােমাদের দেখভালের ব্যবস্থা নিবেনতিনি বড়ই দয়াময় বলিয়াই তাহার নাম রহমান রহিমসর্বঅবস্থায় সর্ববিষয়ে আল্লাহপাকের উপর ভরসা রাখিবেমাঝে মাঝে আমাকে পত্র দিবে। কীভাবে পত্র দিবে তাহা বলিয়া দিতেছিএনজিও ইয়াকুব সাহেবকে গিয়া বলিবেপিতার নিকট পত্র দিতে চাইএই বার্তা বলিতে চাইতখন তিনি বাকি ব্যবস্থা করিবেনআমার ঠিকানা উনার নিকট আছেদোয়াগাে। 

তােমাদের পিতা জমির আলী ইয়াকুব সাহেবের কাছে সে বিস্তারিত লিখছেকীভাবে জেলে ঢুকে গেল সেই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেকোনাে কিছুই বাদ দেয় নাইসম্পূর্ণ বিনা কারণে তার যে দীর্ঘদিনের জেল হয়েছে এই নিয়ে সে কোনাে দুঃখ বা ক্ষোভ প্রকাশ করে নাইকারণ সে জানে সবই আল্লাহপাকের খেলাতার হুকুম ছাড়া কিছুই হয় না

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৪

এর পেছনেও তাঁর হুকুম আছেএবং সে নিশ্চিত যে জেলবাসের পিছনে কোনাে মঙ্গলও আছেআল্লাহপাকের প্রতিটি কাজের পিছনে মঙ্গল থাকেবােকা মানুষ তা বুঝতে পারে নাজমির আলী মঙ্গলের ব্যাপারটা এখনই বুঝতে পারছে না, তবে কিছুদিনের মধ্যে সে অবশ্যই বুঝতে পারবেসর্বশেষ চিঠিতে সে ইয়াকুব সাহেবকে লিখল— 

জনাব ইয়াকুব সাহেবপর সমাচার এই যে আমি আমার তিন কন্যার দেখভালের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আপনার হাতে দিয়া দিলামউপরে আল্লাহপাক, নিচে আপনিআল্লাহপাক উসিলা বিনা কাজ করেন নাআপনি উসিলাজনাব, মেয়ে তিনটির জন্যে বড় মনকষ্টে আছিসর্বক্ষণ তাহাদের কথা মনে হয় এবং কলিজায় ব্যথা পাইএখন আপনি নাদানের ভরসাআমি আপনার পাক কদম চুম্বন করিআপনি দয়া না করিলে আমার তিন আদরিণীর বড়ই বিপদ

আমি যে জেলে আছি, কয়েদ খাটিতেছিএই সংবাদ আমার কন্যাদের দয়া করিয়া দিবেন নাতাহারা মনে কষ্ট পাইবেএম্নিতেই তাহারা কষ্টের মধ্যে আছেতাহাদের কষ্ট আর বৃদ্ধি করতে চাই নাসুখে দুঃখে আমার দিন গুজরান হইতেছেআমি আল্লাহপাকের খেলার মধ্যে পড়িয়াছিতাহার খেলা বুঝিবার সাধ্য আমার নাইরাত্রি নিশাকালে যখন নয়নে নিদ্রা আসে না তখন আল্লাহকে ডাকিয়া বলি, মাবুদে এলাহিতুমি বান্দাকে নিয়া আর কী খেলা খেলিবে

আপনার গােলাম জমির আলী  আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময়ে আল্লাহ জমির আলীকে নিয়ে আরেকটি খেলা খেললেনতখন রসুই খানায় রান্না হচ্ছেবিশাল দুটা পিতলের ডেকচিতে লপসি রান্না হচ্ছেজমির আলী প্রবল বেগে হাতা ঘুরাচ্ছেচুলায় গানে আগুনহাতা ঘুরানাে বন্ধ হলে লপসি ধরে যাবেপােড়া গন্ধ চলে আসবেপাশের চুলায় হাতা ঘুরাচ্ছে কৃষ্ণজব্বলপুরের ছেলেজমির আলীর বিশেষ ভক্তহঠাৎ সে হাতা ঘুরানাে বন্ধ করে ভীত গলায় বলল, সাধুজী, ডেগ মে কিয়াচুচুড়া!

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৪

কৃষ্ণ হাতায় করে জিনিসটা তুললসিদ্ধ হয়ে সাদা হয়ে যাওয়া একটা মরা চিকাতার লম্বা লেজ হাতের বাইরে কিলবিল করছে। কৃষ্ণ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, রাম রামকিছুক্ষণ আগেই সে এই হাড়ির লাপসির লবণ দেখেছেতার নাড়িভুড়ি উল্টে বমি আসছেহেড বাবুর্চি এবং রসুই মাস্টারকে খবর দেয়া হলােরসুই মাস্টার ঠাণ্ডা গলায় বললএটা কোনাে ব্যাপার নাচিকা নর্দমায় ফেলে দাও

চিকা গরমে সিদ্ধ হয়ে গেছে, কাজেই লাপসি নষ্ট হয় নাইআরাে কিছুক্ষণ শক্ত করে জ্বাল দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবেঘটনা যেন প্রকাশ না হয়ঘটনা যদি প্রকাশ হয়এইখানে যারা কাজ করছে তাদের প্রত্যেককে সাতদিনের জন্যে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হবেজমির আলী বলল, ওস্তাদ কাজটা উচিত হবে না। রসুই মাস্টার ক্ষিপ্ত গলায় বলল, দাড়িওয়ালা বান্দর আমাকে উচিত অনুচিত শিখায়তােরে আমি মরা ইঁদুর খাওয়ায়ে দিবখবরদার কেউ যেন কিছু না জানে। 

এত সাবধানতার পরেও ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেললপসির সঙ্গে কয়েকটা মরা ইঁদুর আছে এই রকম গুজব দ্রুত রটে গেলখেতে বসা কয়েদিরা ধুন্ধুমার কাণ্ড লাগিয়ে দিলমুহূর্তের মধ্যে পুরাে অঞ্চল রণক্ষেত্রপাগলা ঘণ্টি বাজছেএকজন সেন্ট্রির মাথা ফুটন্ত ডালের কড়াইয়ে ডুবিয়ে দেয়া হলাে। বিভৎস অবস্থাকাঁদুনে গ্যাস, রবার বুলেট, সবশেষে সত্যিকার বুলেটে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাে

দেখা গেল মারা গেছে দুজনদুজনই ডিউটির সেন্ট্রিআহত হয়েছে আঠারাে জনএই আঠারাে জনের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতরচারজনই গুলি খেয়েছেবাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণগােলাগুলিতে জমির আলীর তেমন কিছু হয় নিছােটাছুটি করতে গিয়ে উল্টে পড়ে তার শুধু দুটা দাঁত ভেঙ্গেছেপায়ের একটা নখ উল্টে গেছেতাকে হাসপাতালে নেয়া হলাে নাপায়ে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে নির্জন সেলে পাঠিয়ে দেয়া হলাে

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৪

মিথ্যা গুজব রটিয়ে জেলে রায়ট সৃষ্টি করা, সেন্ট্রি এবং কয়েদি সংঘর্ষে যুক্ত থাকা, সেন্ট্রি হত্যাধরনের চারটি আলাদা আলাদা মামলায় তার এবং বাবুর্চির হেল্পার কৃষ্ণের সাত বছর করে সাজা হয়ে গেলবলরামের হলাে ফাঁসির হুকুমসে একাই একজন সেন্ট্রির মাথা ফুটন্ত ডালে চুবিয়ে রেখেছিল

আলীপুর জেল থেকে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হলাে পাটনা জেলেবলরামের সঙ্গে শেষ দেখার দিন বলরাম নখদর্পণের মাধ্যমে শেষবারের মতাে জমিরের তিন মেয়ের খবর দিলবলরাম স্পষ্ট দেখলতিনটি মেয়েই ভালাে আছেসুস্থ আছেবড় মেয়েটির গায়ে লাল রঙের নতুন একটা জামাসবচে ছােটটির মাথায় সাদা রঙের উলের টুপি। 

গরমের সময় মেয়েটার মাথায় উলের টুপি কেন পরিয়ে রেখেছে এই নিয়ে জমির আলী অত্যন্ত চিন্তিত বােধ করলগরমের মধ্যে গরম টুপিকী সর্বনাশের কথামাথা ঘামবেশিশুদের মাথা ঘামলে দ্রুত ঠাণ্ডা লাগেজমির আলী দুঃখিত গলায় বলল, কেউ খুশি হয়ে টুপিটা দিয়েছেদুইবােন আদর করে টুপি পরিয়ে দিয়েছেএরাও তাে বাচ্চা মানুষএরা কি আর জানে কোনটায় শিশুর ক্ষতি হয়কোনটায় হয় না। 

 

Read more

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *