ছালাম উঠে এসেছে। তাহের লিলিয়ানের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে দেখেও সে অস্বস্তি বা লজ্জা কোনটাই বােধ করল না। শুকনাে গলায় তাহেরকে বলল, ব্যাটারি আনছি। তাহের তাকিয়ে দেখল ছালাম দু‘টি পেনসিল ব্যাটারি নিয়ে এসেছে।

তাহেরের কেন জানি মনে হল সে এটা নির্বুদ্ধিতার কারণে করে নি। ইচ্ছা করে করেছে।
‘আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যাও।
আর কিছু লাগব ?” “না, আর কিছু লাগবে না।
লিলিয়ান বলল, আজ হঠাৎ তুমি এত গুছিয়ে কথা বলছ কেন? এত লজিক দিয়ে তুমি কখনাে কথা বল না।
‘তা বলি না, আজ বলছি। কারণ আমার মনে হচ্ছে তােমার নিজস্ব জগতে লজিকের স্থান খুব কম। তােমার লজিক ভাল থাকলে কখনাে আমাকে বিয়ে করতে
আর করলেও ভালমত খোজখবর করতে – আমি কে? আমার বাবা–মারা কোথায়, ক’ভাই বােন ... কোন প্রশ্ন না, কোন কৌতূহল না – স্বপ্নে পাওয়া মানুষের মত বলে বসলে – আমি আমার জীবনটা তােমার সঙ্গে কাটাতে চাই।”
‘আমি কি ভুল করেছি ?” | ‘তুমি ভুল করেছ কি–না তা আমি এই মুহূর্তে বলতে পারব না। তুমি নিজেও বুঝবে না। আজ থেকে দশ বা পনের বছর পর ধরতে পারবে।’
‘কিভাবে ধরব ?
‘আমাকে বিয়ে করার সময়, আমার সম্পর্কে তােমার কিছু প্রত্যাশা ছিল। আমি যদি তা মেটাতে পারি তাহলে বুঝতে হবে আমাকে বিয়ে করে তুমি ভুল কর নি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি নিজে এখনাে জানি না কোন প্রত্যাশা নিয়ে তুমি আমাকে বিয়ে করেছ। জানলে মেটাবার চেষ্টা করতাম।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ
‘তােমার প্রতি আমার কোন প্রত্যাশা নেই। আমাকে তােমার পাশে থাকতে হবে –এটা হল নিয়তি।
তাহের সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, নিয়তি হচ্ছে আরেকটা বাজে কথা। যারা দুর্বল মানুষ, অর্থাৎ যারা দুর্বল লজিকের মানুষ – নিয়তি তাদের একটি প্রিয় শব্দ। এই শব্দ আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত। অভিধান থেকে এই শব্দ তুলে দেওয়া। উচিত।
লিলিয়ান কোমল গলায় বলল, পৃথিবীর সব ভাষার অভিধানে কিন্তু এই শব্দটি আছে। নিয়তি বলে কিছু একটা আছে বলেই আছে।।
তাহের রাগী গলায় বলল, তুমি একটা হাস্যকর লজিক দিলে লিলিয়ান। অভিধানে দৈত্য শব্দটাও আছে। পরী আছে, ড্রাগন আছে, মৎস্যকন্যা আছে। তুমি কি কখনাে দৈত্য, পরী বা ড্রাগন দেখেছ? পৃথিবীর কেউ কি দেখেছে?
‘না দেখে নি। এত রেগে যাচ্ছ কেন? চল ঘুমুতে যাই।
তাহের মুখে বলছিল তার ঘুম ছুটে গেছে, বাস্তবে দেখা গেল বিছানায় শােয়ামাত্র তার নাক ডাকতে শুরু করেছে। হারিকেন নিভিয়ে লিলিয়ান এসে পাশে শুয়েছে। তার ঘুম আসছে না। জানালা গলে জোছনা এসে পড়েছে তাদের খাটের এক মাথায়। কি সুন্দর যে লাগছে দেখতে। বাইরের বাগানে পাখি ডাকছে। লিলিয়ান। কোন বইয়েও যেন পড়েছিল রাতে কখনাে পাখি ডাকে না। বইয়ের তথ্য ঠিক না –
আয়নাঘর-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ
অনেক পাখিই ডাকছে। ঝিঝির ডাকের সঙ্গেও বােধহয় পাখির ডাকের এক ধরনের সম্পর্ক আছে। ঝিঝির ডাক যখন থামছে তখনি শুধু পাখি ডাকছে। ঝিঝি এবং
পাখি কখনােই এক সঙ্গে ডাকছে না।
শোবার ঘরের দরজায় খুট করে শব্দ হল। কে যেন দরজায় হাত রেখেছে। এ ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা যায় নি। দরজার ছিটকিনিতে জং পড়েছে। কিছুতেই নড়ান যায় না। কেউ যদি সত্যি সত্যি এসে থাকে সে অল্প ধাক্কা দিয়েই দরজা খুলতে পারবে। আশ্চর্য তাে, দরজা খুলে যাচ্ছে। লিলিয়ান তাহেরের গায়ে হাত রাখল। তাহের ঘুমের মধ্যেই বলল, আহ, কি কর !
লিলিয়ান হাত সরিয়ে নিল। সে খােলা দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কাছে মনে হচ্ছে দরজার ওপাশে কেউ একজন আছে। সে গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছে। লিলিয়ান বলল, কে ?
ফিসফিস করে কেউ কি জবাব দিল? খুব হালকা স্বর যা বাতাসে ভেসে চলে যায়। লিলিয়ান খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামল। এগুলাে দরজার দিকে। তার মােটেও ভয় করছে না। বরং ভাল লাগছে। | না, দরজার ওপাশে কেউ নেই। ফাকা সিড়ি। রেলিং গলে জোছনা পড়ে অপূর্ব সব নকশা তৈরি হয়েছে। নকশার ভেতর দিয়ে হাঁটতে কেমন লাগবে? লিলিয়ান হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে সে আয়নাঘরের সামনে চলে এল।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ
আয়নাঘরের দরজা ভেজানে। তার ইচ্ছা করতে লাগলাে ভেজানাে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে। ভেতরটা নিশ্চয়ই অন্ধকার। দরজা খুলে দিলে চাদের আলাে কি ঘরে ঢুকবে? লিলিয়ান দরজা খুলল। চাঁদের আলাে ঘরে ঢুকেছে। আয়নার একটা অংশ। আলােকিত হয়ে আছে। কি সুন্দর লাগছে দেখতে! শোবার ঘর থেকে ঘুমের ঘােরে তাহের ডাকল, লিলিয়ান!
শােবার ঘরে যেতে ইচ্ছা করছে না। আয়নাঘরের মেঝেতে পার্টি পেতে শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে। পাটি ছাড়াও সিমেন্টের মেঝের উপর শুয়ে থাকা যায়। এ ঘরের মেঝে কালো সিমেন্টের। খুব মসৃণ। কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব।
তাহের আবার ডাকল, লিলিয়ান। এবার বােধহয় সে জেগে উঠেছে। লিলিয়ান ক্লান্ত গলায় বলল, কি ?
‘পানি খাব। ‘আনছি।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ
পানির গ্লাস নিয়ে লিলিয়ান আবার শােবার ঘরে চলে এল। তাহেরের গায়ে হাত রেখে মনে মনে বলল, I love you. যদিও মনে মনে বলার প্রয়ােজন ছিল না। তাহের ঘুমিয়ে আছে। এই বাক্যটি শব্দ করেও বলা যেত। তবু কিছু কিছু কথা আছে মনে মনে বলতেই ভাল লাগে।
খুব ভােরে পাখির কিচকিচ শব্দে লিলিয়ানের ঘুম ভেঙেছে। এত পাখিকে সে একসঙ্গে কখনাে ডাকতে শুনে নি। তাহেরকে ডেকে তুলে পাখির গান শােনাতে ইচ্ছা করছে। ডেকে লাভ হবে না। এত ভােরে সে উঠবে না। ছুটির দিনে ন‘টা–দশটার আগে তার ঘুম ভাঙে না। এখন তাে প্রতিদিনই ছুটি। লিলিয়ান বিছানা ছেড়ে বাগানে গেল। কাল রাতে যে বাগানটাকে ভয়াবহ জঙ্গল বলে মনে হচ্ছিল এখন তা মনে হচ্ছে না।
ঝােপঝাড় ঠিকই আছে, ঝােপঝাড়ের জন্যেই ভাল লাগছে। বাগানটা বেশ বড়, বেশির ভাগ গাছই তার অচেনা। তাহেরের কাছ থেকে গাছের নামগুলি জেনে নিতে হবে। একটা বড় গাছের সামনে লিলিয়ান থমকে দাড়াল। এ গাছটা চেনা চেনা লাগছে। মনে হচ্ছে ওলিভ গাছ। এ দেশে কি ওলিভ গাছ হয়? একেক দেশে একেক রকম গাছ, সেই হিসেবে মানুষেরও তাে একেক রকম হওয়া উচিত।
Read more
